নালন্দা মহাবিহার – জ্ঞানচর্চার কয়েক শতক

Nalanda (Image Source – www.gettyimages.in)

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

গঙ্গার দক্ষিণ তীরবর্তী প্রাচীন মগধ অঞ্চলের দু’টি প্রধান নগর রাজগৃহ (বর্তমান রাজগির) ও পাটলিপুত্র (বর্তমান পাটনা)। দুই নগরের সংযোগকারী রাজপথের ধারে, রাজগৃহ নগরের উপকন্ঠে, অবস্থিত ছিল নালন্দা জনপদ। সাধারণাব্দের প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি এখানেই গড়ে ওঠে শ্রীনালন্দা মহাবিহার। পরবর্তী কয়েক শতক ধরে পূর্ব ভারতে মহাযান বৌদ্ধ শাস্ত্রচর্চা, বিশেষত মধ্যমক দর্শনের বিভিন্ন শাখা ও তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ অধ্যয়ন ও রচনা, পুথির প্রতিলিপি লিখন ও প্রতিমা নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই মহাবিহার। বর্তমান বিহার রাজ্যের নালন্দা জেলায় অবস্থিত এই বৌদ্ধ সংঘারামের শ্রমণদের জ্ঞানচর্চা এবং বৌদ্ধ শাস্ত্র ও দর্শন বিষয়ক গ্রন্থসম্ভার সংগ্রহের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও তিব্বতের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বেশ কয়েক শতক ধরে এখানে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। তারপর, পূর্ব এশিয়া ও তিব্বতের শাসকদের উদ্যোগে নিজেদের ভাষায় বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থসমূহের অনুবাদ, ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ রচনা এবং বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পর, সেখানকার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে নালন্দার প্রতি আকর্ষণ ক্রমশ কমে আসতে শুরু করে। শেষে, মূলত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দ্বাদশ শতক সাধারণাব্দের পর থেকে নালন্দার মহাবিহারে আবাসিক শ্রমণদের সংখ্যা ক্ষীণ হয়ে আসে, বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার আলোকও ধীরে ধীরে অস্তমিত হয়। 

অন্ত-মধ্যযুগে নালন্দার মহাবিহারে শ্রমণদের আগমন স্তব্ধ হওয়ার সাথে সাথে নালন্দা জনপদের স্মৃতিও ক্রমশ জনমানস থেকে ক্ষীণ হয়ে যায়। ১৫৬৫ বিক্রম সংবতে (১৬০৫ সাধারণাব্দে) জৈন বিদ্বান হংসসোম অপভ্রংশ ভাষায় ‘পূর্বদেশীয়চৈত্যপরিপাটী’ নামের একটি গ্রন্থে জানিয়েছেন, রাজগৃহের কাছে নালন্দ পাড়ায় (ছোটো গ্রাম) মহাবীর ১৪টি চতুর্মাস (অর্থাৎ বর্ষাকাল) অতিবাহিত করেছেন। এই লোকপ্রসিদ্ধ স্থানকে এখন বড়গাম বলা হয়। সেখানে ১৬টি প্রাসাদে (মন্দিরে) জিন বিম্ব (প্রতিমা) পূজিত হয়। এরপর, ১৭০০ বিক্রম সংবতে (১৬২৩ সাধারণাব্দে) জৈন বিদ্বান বিজয়সাগর তাঁর অপভ্রংশ ভাষায় রচিত ‘সম্মেতাশিখরতীর্থমালা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রাজগৃহের বাইরে নালন্দ পাড়া। এই পবিত্র স্থানে বীর (বর্ধমান মহাবীর) ১৪টি চতুর্মাস থেকেছেন। এখন এই স্থান বড়গাম নামে পরিচিত। পরবর্তী কালে রাজগিরের কাছে অবস্থিত বড়গাম বা বড়গাওঁই যে প্রাচীন নালন্দা জনপদ, সে কথাও সম্পূর্ণ বিস্মৃতির অন্তরালে বিলীন হয়ে যায়।

১৮১২ সালে ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিল্টন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে জরিপের কাজে বড়গাওঁ এসে গ্রামের দক্ষিণে এক বিশাল সৌধমালার অবশেষ দেখতে পান। এর অর্ধশতক বাদে, ১৮৬১ বা ১৮৬২ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করার জন্য বড়গাঁও পৌঁছে, গ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত অবশেষকে নালন্দা মহাবিহারের অবশেষ বলে চিহ্নিত করেন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে নালন্দার প্রত্নক্ষেত্রে দীর্ঘ উৎখননের ফলে অবশেষগুলি সম্পূর্ণ অনাবৃত হওয়ার পর আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে নালন্দা মহাবিহার নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি হয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ফাসিয়ান, জুয়ানজাং, ইজিং প্রমুখ ভারতে আগত চীনা বৌদ্ধ শ্রমণদের রচিত নালন্দা সম্পর্কিত তথ্য সন্নিবিষ্ট গ্রন্থের ফরাসি ও ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের পর সেই তথ্যের ভিত্তিতে আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে নালন্দায় জ্ঞানচর্চার ইতিহাস নিয়ে চর্চা ব্যাপকতা লাভ করে। বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে নালন্দা নিয়ে আধুনিক বিদ্বানদের রচনায় সন্নিবিষ্ট অতিকথনের পরিণামে আজ নালন্দার বৌদ্ধ মহাবিহারকে একটি প্রাচীন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে কল্পনা করার প্রবণতা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সেই অতিকথনকে উপেক্ষা করে শুধু মাত্র প্রামাণিক উত্স থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নালন্দার মহাবিহারে জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে যুক্তিনিষ্ঠ অনুসন্ধান করা খুবই কঠিন কাজে পরিণত পড়েছে। নালন্দার মহাবিহারে কয়েক শতক ব্যাপী জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠভূমি নিয়ে জানার জন্য নালন্দা জনপদের প্রাচীন ইতিহাস এবং সেই জনপদে মহাবিহারের উদ্ভব কবে ও কীভাবে হলো সেই প্রসঙ্গেও খোঁজ খবর নেওয়া দরকার। তারও আগে, প্রথমে দেখে নেওয়া দরকার, বৌদ্ধ ধর্মীয় পরিমণ্ডলে মহাবিহার বলতে কী বোঝায়।

বিহার ও মহাবিহার

বৌদ্ধ, জৈন বা আজীবিক ধর্মের অনুসারী শ্রমণদের মূলত বর্ষাকালের আশ্রয়স্থল হিসেবে বিহার নির্মাণের ভাবনা অবশ্যই বহু প্রাচীন। বৌদ্ধ শ্রাবকযানী থেরবাদী নিকায়ের (সম্প্রদায়ের) পালি শাস্ত্রগ্রন্থ বিনয়পিটকের অন্তর্গত ‘মহাবগ্গ’ গ্রন্থে (মহাখন্ধক।৬৯.১২৮) দেখা যায়, বুদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য বৃক্ষতল ছাড়া ৫ প্রকার স্থানে অবস্থানের অনুমতি দিয়েছেন – বিহার, অড্ঢযোগ (অর্ধযোগ, চিলেকোঠা), পাসাদ (প্রাসাদ), হম্মিয় (হর্ম্য) ও গুহা। পালি বিনয়পিটকের অন্তর্গত ‘চুল্লবগ্গ’ গ্রন্থে (পারিবাসিকক্খন্ধক।১.২) বিহার কথাটি ভিক্ষুদের ব্যক্তিগত আবাস অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। শ্রাবকযানী মূলসর্বাস্তিবাদী নিকায়ের সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থ বিনয়ের অন্তর্গত ‘বিনয়বস্তু’ গ্রন্থেও (পারিবাসিকবস্তু) একই অর্থে বিহার কথাটি প্রযুক্ত হয়েছে। বিহার শ্রমণদের ব্যক্তিগত অস্থায়ী আবাসস্থল থেকে ক্রমশ সামূহিক স্থায়ী আবাসে পরিবর্তিত হয়েছে। সাধারণাব্দের গোড়ার দিক থেকে বিভিন্ন লেখে ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থিত বিহারগুলির নামের উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে।     

সাধারণত, প্রথমে কোনও বিশিষ্ট বৌদ্ধ বিদ্বান শ্রমণের আবাসের উদ্দেশে বিহার বা আরাম (বা সংঘারাম) নির্মাণ করা হতো। ক্রমশ, সেখানে তাঁর অনুসারী শ্রমণরা এসে বাস করতে শুরু করতেন। এরপর সেখানে আগত নবাগত বিদ্বান স্থবির ও তাঁর সঙ্গী শ্রমণদের আবাসের জন্য নির্মিত আরও কয়েকটি বিহার যুক্ত হওয়ার পর সেই স্থানটিকে মহাবিহার বলে আবাসিক ভিক্ষুরা উল্লেখ করতেন। সাধারণাব্দের প্রথম সহস্রাব্দের গোড়ার দিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্মিত সংঘারাম বা মহাবিহারগুলি সাধারণত পাথর বা ইটের চতুষ্কোণ উচ্চ প্রাকার দ্বারা বেষ্টিত হতো। প্রাকারের অভ্যন্তরে তিন দিক (বা চার দিক) ঘিরে আবাসিক ভিক্ষুদের জন্য বেশ কিছু সংখ্যক সারিবদ্ধ আবাস প্রকোষ্ঠ, সাধারনত দ্বিতল, নির্মাণ করা হতো। উপরের তলায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি থাকত। মাঝখানের উন্মুক্ত পরিসরে থাকত সামূহিক রন্ধনের জন্য চুল্লি এবং জলাধার বা কূপ। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিসরের মধ্যেই নির্মিত হতো ভিক্ষুদের উপাসনার জন্য এক বা একাধিক মন্দির, স্তূপ বা চৈত্য, শৌচালয়, কোষ্ঠক (গুদাম), ওষধি ভাণ্ডার ও শস্যাগার। মহাবিহারগুলিতে সদ্য প্রবজ্যা গ্রহণ করে অধ্যয়নরত কিশোর বা তরুণ শ্রামণের থেকে প্রৌঢ় স্থবির, বৌদ্ধ শাস্ত্র ও দর্শন আত্মস্থ করে শিক্ষাদানরত আচার্য বা উপাধ্যায় সকলেই তাঁদের অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত আবাস প্রকোষ্ঠ লাভ করতেন। শুধু তাই নয়, থেরবাদী বিনয়পিটকের অন্তর্গত ‘মহাবগ্গ’ (ভেসজ্জক্খন্ধক।৩.১১) ও মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়ের অন্তর্গত ‘বিনয়বিভঙ্গ’ গ্রন্থের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় প্রাচীন কাল থেকেই বিহারের বিভিন্ন কাজের জন্য ভৃত্য (বা দাস) নিযুক্ত করা হতো, এবং তাঁদেরও বিহারের কাছেই থাকার ব্যবস্থা করা হতো। 

নালন্দা জনপদ – প্রাচীন ইতিহাস

নালন্দা জনপদের কথা সাধারণাব্দের কয়েক শতক পূর্বেই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের শাস্ত্রকারদের কাছে পরিচিত ছিল। থেরবাদী নিকায়ের প্রথম শতাব্দী সাধারণপূর্বাব্দে লিপিবদ্ধ পালি শাস্ত্রগ্রন্থ বিনয়পিটকের অন্তর্গত খন্ধকের চুল্লবগ্গের পঞ্চসতিকক্খন্ধক; সুত্তপিটকের অন্তর্গত দীঘনিকায়ের ব্রহ্মজালসুত্ত, কেবট্টসুত্ত ও মহাপরিনিব্বানসুত্ত; মজ্ঝিমনিকায়ের উপালিসুত্ত; সংযুত্তনিকায়ের কস্সপসংযুত্তের তৃতীয় সুত্ত, সলায়তনসংযুত্তের ১২৬তম সুত্ত, গামণিসংযুত্তের ষষ্ঠ সুত্ত ও সতিপট্ঠানসংযুত্তের নালন্দাবগ্গে রাজগৃহের নিকটবর্তী নালন্দ বা নালন্দার কথা উল্লেখ রয়েছে। দীঘনিকায়ের কেবট্টসুত্তে বলা হয়েছে, নালন্দার পাবারিক আম্ববনে বুদ্ধ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন১০ (জুয়ানজাং সম্ভবত স্থানীয় প্রবীণদের কাছে এই আম্রকুঞ্জের কথাই শুনেছিলেন)। শ্রাবকযানী মহাসাংঘিক নিকায় থেকে উদ্ভূত লোকোত্তরবাদী নিকায়ের সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থ ‘মহাবস্তু’ সম্ভবত দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শতক সাধারণাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল।১১ ‘মহাবস্তু’ গ্রন্থে রাজগৃহের নিকটবর্তী নালন্দাগ্রামক অর্থাৎ নালন্দা গ্রামকে গৌতম বুদ্ধের অন্যতম প্রধান শিষ্য শারিপুত্রের জন্মস্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।১২ অনুমান করা যায় বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থকাররা চতুর্থ শতক সাধারণাব্দ পর্যন্ত নালন্দা জনপদ সম্পর্কে অবহিত থাকলেও সেখানে কোনও বিহারের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন।

প্রাচীন জৈন শাস্ত্রগ্রন্থেও নালন্দা জনপদের উল্লেখ রয়েছে। জৈন শাস্ত্রগ্রন্থ সূয়গড়াংগ (সংস্কৃত সূত্রকৃতাঙ্গ) সম্ভবত সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকের রচনা। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় শ্রুতস্কন্ধের নালন্দীয় নামের সপ্তম অধ্যয়নে ণালন্দা (নালন্দা) রাজগৃহ নগরের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত বাহিরিয়া (উপকণ্ঠ) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।১৩ কপ্পসুত্তং (সংস্কৃত ‘কল্পসূত্র’) চতুর্থ শতক সাধারণপূর্বাব্দের জৈন আচার্য ভদ্রবাহু স্বামীর রচনা বলে ঐতিহ্যগতভাবে  স্বীকৃত। তবে, এই গ্রন্থটি আনুমানিক পঞ্চম শতক সাধারণাব্দে বলভীতে দেবর্ধিগণি ক্ষমাশ্রমণের নেতৃত্বে আয়োজিত জৈন মহাসংঘে সংকলিত ও আগমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই গ্রন্থে (জিণচরিত্তং, ১২২) বলা হয়েছে তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর রাজগৃহ নগরের বাহিরিয়া (উপকণ্ঠ) নালন্দায় ১৪টি বর্ষায় বর্ষাবাস করেছিলেন।১৪ জৈন শাস্ত্রকাররা নালন্দার জনপদকে তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীরের বর্ষাবাসের সঙ্গে  যুক্ত করলেও সেখানে কোনও বিহার নির্মাণের কথা উল্লেখ করেননি।        

পঞ্চম শতক সাধারণাব্দের প্রথম দিকে চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও অনুবাদক ফাসিয়ান (৩৩৭-৪২২ সাধারণাব্দ) ভারতে এসেছিলেন। ফাসিয়ান তাঁর ‘ফোগুও জি’ শিরোনামের ভারত ভ্রমণের বিবরণে রাজগৃহের নিকটবর্তী নাল জনপদকে (চীনা ভাষায় 那羅聚落, ‘নালুও জুলুও’; আক্ষরিক অনুবাদ ‘নালক’) শারিপুত্রের জন্ম ও মহাপরিনির্বাণের স্থান বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এখানে শারিপুত্রের চিতাস্থলে একটি স্তূপও দেখতে পেয়েছিলেন।১৫ নাল (বা নালক) ও নালন্দা আদৌ একই জনপদের নাম কিনা এ বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে সংশয় থাকলেও১৬ ফাসিয়ান-এর বিবরণে নালন্দার বিহারের সম্পূর্ণ অনুল্লেখ থেকে অনুমান করা যায় পঞ্চম শতক সাধারণাব্দের প্রথম দিকেও নালন্দা জনপদে কোনও বিহার নির্মাণের সূত্রপাত ঘটেনি।   

নালন্দা মহাবিহার – উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

নালন্দায় মহাবিহারের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ইতিহাসকে বোঝার জন্য যে মন্দিররাজি ও ভিক্ষুদের আবাসের জন্য নির্মিত প্রকোষ্ঠসমূহের সমন্বয়ে মহাবিহারটি গড়ে উঠেছিল, সেই সৌধগুলির নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, সেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং আবাসিক শ্রমণদের পোষণের জন্য আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাসের সন্ধান করতে হবে। নালন্দা জনপদে বিহার নির্মাণের ইতিহাস প্রসঙ্গে সপ্তম শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধে নালন্দায় আগত চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক জুয়ানজাং-এর (৬০২-৬৬৪ সাধারণাব্দ) লেখা ‘মহান তাং সাম্রাজ্যের পশ্চিমে অবস্থিত অঞ্চলসমূহ বিষয়ক লিখিত বিবরণ’ (চীনা ভাষায় 大唐西域記 ‘দাতাং সিইউ জি’) গ্রন্থটি সম্ভবত প্রাচীনতম বিদ্যমান উত্স। জুয়ানজাং তাঁর বিবরণে জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন, নালন্দা সংঘারামের দক্ষিণ দিকে একটি আম্রকুঞ্জ ছিল। ঐ আম্রকুঞ্জের অভ্যন্তরে একটি জলাশয় ছিল, সেই জলাশয়ে নালন্দা নামে এক নাগ বাস করত, তারই নামে এই স্থানের নাম নালন্দা হয়। কিন্তু তাঁর মতে, বুদ্ধের কোনও এক পূর্বজন্মে তিনি এখানকার শাসক ছিলেন, তখন দানশীলতার জন্য তাঁকে ‘ন-অলম্-দা’ বলে অভিহিত করা হয়, এই শব্দটি থেকে নালন্দা কথাটির উত্পত্তি। পাঁচশো’ বণিক দশ কোটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে এই আম্রকুঞ্জ ক্রয় করে তথাগত বুদ্ধকে সমর্পণ করেন এবং বুদ্ধ এখানে তিন মাস অবস্থান করে ধর্মদেশনা করেন। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের স্বল্পকাল পরেই ত্রিশরণ ও একযানের অনুগামী শাসক শক্রাদিত্য নালন্দায় একটি বিহার নির্মাণ করেন। এই বিহারে বুদ্ধের একটি প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছিল। শক্রাদিত্যের পর তাঁর পুত্র রাজা বুদ্ধগুপ্ত সিংহাসনে আরোহণ করে মূল বিহারের দক্ষিণে আর একটি বিহার নির্মাণ করেন। এরপর রাজা তথাগতগুপ্ত পূর্বপুরুষদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে মূল বিহারের পূর্বে একটি বিহার নির্মাণ করেন। রাজা বালাদিত্য মূল বিহারের উত্তর-পূর্বে একটি বিহার নির্মাণ করেন। তাঁর পুত্র বজ্র মূল বিহারের পশ্চিমে একটি বিহার নির্মাণ করেন। এরপর মধ্য ভারতের এক শাসক মূল বিহারের উত্তরে একটি বিহার নির্মাণ করেন এবং নালন্দার বিহারসমূহের একটি দ্বারযুক্ত সুউচ্চ প্রাকার নির্মাণ করেন। এই মধ্য ভারতের শাসক শক্রাদিত্য স্থাপিত বিহারে একটি বুদ্ধপ্রতিমা স্থাপন করেন।১৭ জুয়ানজাং তাঁর বিবরণে এই মহাবিহারের পশ্চিমে অনতিদূরে তথাগতের তিন মাসব্যাপী ধর্মদেশনের স্থানে একটি মন্দির বা বিহারের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি মহাবিহারের দক্ষিণে অবলোকিতেশ্বরের একটি দণ্ডায়মান প্রতিমা, পূর্বে একটি সুউচ্চ বিহার, দক্ষিণে রাজা শিলাদিত্য (অর্থাৎ হর্ষবর্ধন) কর্তৃক নির্মীয়মাণ একটি কাঁসার বিহার এবং উত্তর-পূর্বদিকে, মহাবিহারের প্রাকারের বাইরে, একটি ৬টি তলবিশিষ্ট আচ্ছাদিত মণ্ডপে স্থাপিত রাজা পূর্ণবর্মন নির্মিত বিশাল ৮০ ফুট উঁচু তামার দণ্ডায়মান বুদ্ধ প্রতিমার কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রতিমার উত্তরে কিছুটা দূরে অবস্থিত একটি ইটের তৈরি বিহারে স্থাপিত তারা প্রতিমার কথাও জুয়ানজাং উল্লেখ করেছেন।১৮

সপ্তম শতক সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে আগত আরেক চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক ইজিং (৬৩৫-৭১৩ সাধারণাব্দ) তাঁর ভারতে আগত পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার ৫৬ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর জীবনকথা নিয়ে অষ্টম শতকের গোড়ার দিকে লেখা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সংঘারামটির প্রকৃত নাম ‘শ্রীনালন্দা মহাবিহার’ এবং নালন্দা নামটি নিকটে বসবাসকারী নাগনন্দ (বা নাগলন্দ) নামের এক নাগের নামে হয়েছে। তিনি এই মহাবিহারে একই রকম গঠনশৈলীতে নির্মিত ৭টি (বা ৮টি) বিহারের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। ইজিং লিখেছেন, নালন্দার পশ্চিম দিকের মুখ্যদ্বার থেকে সমগ্র মহাবিহারটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যেত। পশ্চিম দ্বার থেকে ২০ ফুট দক্ষিণে একটি ১০০ ফুটেরও বেশি উঁচু স্তূপ অবস্থিত, এই স্তুপটিকে তিনি মূলগন্ধকুটি বলে উল্লেখ করেছেন। বিহারের (পশ্চিম) দ্বারের ৫০ ফুট পূর্বে (বা উত্তরে) এর চেয়েও উঁচু একটি আর একটি স্তূপ অবস্থিত। এই স্তূপটি বালাদিত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই স্তূপে স্বর্ণ ও রত্নখচিত পাদপীঠের পর ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রায় আসীন তথাগতের প্রতিমা স্থাপিত ছিল।১৯ এই গ্রন্থেরই অন্যত্র ইজিং লিখেছেন, শক্রাদিত্য নামের এক প্রাচীন শাসক রাজবংশ নামের জনৈক উত্তর ভারতীয় ভিক্ষুর জন্য ক্ষুদ্র আকারের একটি বিহার নির্মাণ করেন। পরে ঐ শাসকের পুত্র ও উত্তরসূরিদের নির্মাণের ফলে এই সংঘারামটি বিশাল আকার লাভ করে। ইজিং-এর দেখা নালন্দা একটি চতুষ্কোণ প্রাকার দ্বারা বেষ্টিত বিহার। স্তম্ভের উপর নির্মিত ছাদবিশিষ্ট  অপরূপ ভাস্কর্যমণ্ডিত নালন্দার মুখ্যদ্বার অবস্থিত ছিল পশ্চিম প্রাকারের মধ্যে। প্রাকারের অভ্যন্তরে বিহারগুলি ইটের তৈরি, ত্রিতল, প্রতিটি তল ১০ ফুট উঁচু। ছাদও ইটের নির্মিত, ভার বহনের জন্য কাঠের কড়ি-বরগা দেওয়া হয়েছে। বিহারগুলির প্রত্যেক সারিতে ৯টি করে প্রকোষ্ঠ নির্মিত; প্রত্যেকটি প্রকোষ্ঠ ১০০ বর্গফুট আকারের, প্রকোষ্ঠগুলির পিছনের দেয়ালে (ছাদ পর্যন্ত উঁচু) জানলা।২০

ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে আগত তিব্বতি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও অনুবাদক ছোইজে পাল-এর (সংস্কৃতে ধর্মস্বামী বা ধর্মশ্রী) (১১৯৭-১২৬৪ সাধারণাব্দ) ‘নাম-থর’ অর্থাৎ জীবনী গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তাঁর শিষ্য ছোই পাল দারপ্যাং। এই জীবনী গ্রন্থে নালন্দাকে ‘নালেন্দ্র’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোইজে পাল-এর জীবনী গ্রন্থের দশম অধ্যায়ে তাঁর নালন্দায় অবস্থানের বিবরণ পাওয়া যায়। সেই বিবরণ অনুযায়ী, নালন্দার কেন্দ্রস্থলে ৭টি শিখরযুক্ত সৌধ (সম্ভবত মন্দির), তার উত্তরে ১৪টি শিখরযুক্ত সৌধ (সম্ভবত বিহার) এবং ৮৪টি (বা ৮০টি) ক্ষুদ্র বিহার বা ভিক্ষুদের আবাসিক প্রকোষ্ঠের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দু’টি বিহার ছোইজে পাল-এর নালন্দায় অবস্থানের সময় থাকার উপযুক্ত অবস্থায় ছিল। সেই সময় নালন্দায় চার দেবপ্রতিমার উপাসনা হত – খসর্পণ লোকেশ্বর, মঞ্জুশ্রী, জ্ঞাননাথ (বা মহাকাল, নালন্দার রক্ষক দেবতা) ও তারা দেবী। খসর্পণ লোকেশ্বরের প্রতিমা রাজকীয় বিহারে অবস্থিত ছিল। ছোইজে পাল-এর জীবনী গ্রন্থ অনুযায়ী ৭টি শিখরযুক্ত সৌধের মধ্যে দু’টি সৌধ জনৈক শাসক ও দুই আচার্য একটি করে সৌধ নির্মাণ করেছিলেন। ক্ষুদ্র বিহারগুলি সেই শাসক ও তাঁর পত্নী কর্তৃক নির্মিত।২১ নালন্দার গোধূলিকালে আগত ছোইজে পাল-এর জীবনী গ্রন্থের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তিনি নালন্দার সূচনা বা পৃষ্ঠপোষক শাসকদের নাম, কোনও বিষয়েই বিশেষ কিছু জানতে পারেননি। তবে এই জীবনী গ্রন্থের বিবরণে অবশ্যই নালন্দার মহাবিহারের প্রায় অবসানকাল পর্যন্ত নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ে কিছু প্রাথমিক তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।   

আধুনিক বিদ্বান সুকুমার দত্তের মতে, কয়েকটি বৌদ্ধ বিহারকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে মহাবিহার গঠনের প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয় গুপ্ত যুগে।২২ নালন্দার প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে প্রাপ্ত পোড়ামাটির সিলগুলির মধ্যে অধিকাংশ সিলে সংস্কৃত ভাষায় ‘শ্রী-নালন্দা-মহাবিহার-আর্য-ভিক্ষুসংঘ’ উত্কীর্ণ। কিন্তু কিছু সিলে অন্য কয়েকটি বিহারের নাম উল্লিখিত হয়েছে। যে নামগুলির উল্লেখ পাওয়া গেছে, তার মধ্যে রয়েছে: ‘শক্রাদিত্য-কারিত-বিহার’, ‘হরিবর্মন-মহাবিহার’, ‘করজ্ঞ-মহাবিহার’, ‘সোমপাল-কারিত-ধম্মোয়িকা-বিহার’, ‘শ্রীমদ্-উদ্দণ্ডপুর-শ্রীবোধিসত্বাগম-মহাবিহার’ এবং ‘প্রথমশিবপুর-মহাবিহার’। এ ছাড়া কিছু সিলে এখানে অবস্থিত কয়েকটি গন্ধকুটি, অর্থাৎ বিহারের অভ্যন্তরে অবস্থিত বুদ্ধের উপাসনা মন্দিরেরও নাম পাওয়া যায়। সিলগুলিতে উত্কীর্ণ লেখে ‘বালাদিত্য-গন্ধকুটি’, ‘ধর্মপালদেব-গন্ধকুটি’ ও ‘দেবপাল-গন্ধকুটি’র নাম পাওয়া যায়।২৩ সিলে উল্লিখিত নামগুলি থেকে নালন্দায় বিহার থেকে মহাবিহারের গঠন প্রক্রিয়া ও পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা তৈরি করা সম্ভব। অবশ্য নালন্দার প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত সিলগুলিতে উল্লিখিত সব বিহার বা গন্ধকুটি নালন্দা মহাবিহারের অন্তর্গত ছিল তা বোধ হয় নয়। ‘উদ্দণ্ডপুর মহাবিহার’ নিঃসন্দেহে বহুজ্ঞাত ওদন্তপুরী মহাবিহার। নালন্দার নিকটবর্তী তেল্হারা প্রত্নক্ষেত্রে যে বৌদ্ধ বিহারের অবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেই বিহারই যে ‘প্রথমশিবপুর মহাবিহার’ তা এই প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত বহু সংখ্যক অবিকল এক দেখতে পোড়ামাটির সিলের মধ্যে একটি সিলের সাম্প্রতিক কালে পাঠোদ্ধারের পর চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এই সিলটিতে সংস্কৃত ভাষায় সিদ্ধমাতৃকা লিপিতে “শ্রীপ্রথমশিবপুর মহাবিহারীয় আর্যভিক্ষুসংঘস্য” উত্কীর্ণ করা আছে।২৪ নালন্দা মহাবিহারের অবশেষ থেকে উদ্দণ্ডপুর (বা ওদন্তপুরী) এবং প্রথমশিবপুর (বা তিলাঢক) মহাবিহারের সিলের প্রাপ্তি আদি-মধ্যযুগের পূর্ব ভারতে, বিশেষত মগধে, নিকটবর্তী বৌদ্ধ মহাবিহারগুলির ভিক্ষুদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার ইঙ্গিত বহন করে।   

নালন্দা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষকগণ

জুয়ানজাং-এর ও ইজিং-এর বিবরণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে একত্র করলে নালন্দার সূত্রপাত নিয়ে তৎকালীন প্রচলিত পুরাকথা, নালন্দার গঠন প্রক্রিয়া এবং সপ্তম শতক সাধারণাব্দ পর্যন্ত নালন্দা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষক শাসকদের সম্পর্কে কিছু তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেলেও একমাত্র রাজা বালাদিত্য ও রাজা পূর্ণবর্মন ছাড়া অন্য শাসকদের চিহ্নিত করার মতো বিশেষ তথ্য পাওয়া যায় না। বালাদিত্য প্রসঙ্গে জুয়ানজাং জানিয়েছেন, তিনি প্রথমে হুন শাসক মিহিরকুলকে কর প্রদান করতেন, পরে কর দিতে অস্বীকার করলে মিহিরকুল তাঁকে শাস্তি দিতে তাঁর রাজ্য আক্রমণ করেন। জুয়ানজাং তার বিবরণে উল্লেখ করেছেন বালাদিত্য মিহিরকুলকে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দি করেন, কিন্তু পরে মায়ের নির্দেশে মুক্তি দেন।২৫ রাজা পূর্ণবর্মন সম্পর্কে জুয়ানজাং তার বিবরণে জানিয়েছেন পূর্ণবর্মন মগধের অশোক রাজার বংশের শেষ শাসক, গৌড়ের শাসক শশাঙ্কের সমসাময়িক।২৬

নালন্দায় ১৯২৫-১৯২৬ মরশুমে উৎখননের সময় এই প্রত্নক্ষেত্রের দক্ষিণতম প্রান্তে অবস্থিত ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের ১ সংখ্যক বিহার বলে চিহ্নিত সৌধের দক্ষিণের বারান্দার অবশেষ থেকে একটি স্তম্ভশীর্ষ ব্র্যাকেটের উপর সংস্কৃত ভাষায় সিদ্ধমাতৃকা লিপিতে উত্কীর্ণ একটি লেখ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এই লেখটিতে কনৌজের শাসক যশোবর্মনের (রাজত্বকাল আনুমানিক ৭২৫-৭৫২ সাধারণাব্দ) মন্ত্রী তিকিনের পুত্র মালাদের নালন্দায় বালাদিত্য স্থাপিত প্রাসাদে (মন্দিরে) বুদ্ধের প্রতিমার উপাসনা সামগ্রী, ৪ জন ভিক্ষুর দৈনিক আহার্য সামগ্রী এবং ভিক্ষুদের আবাসের জন্য একটি ‘লয়ন’ (প্রকোষ্ঠ) নালন্দার ভিক্ষুসংঘকে দানের উল্লেখ রয়েছে।২৭ নালন্দার উৎখননের পাওয়া পোড়ামাটির সিলে বালাদিত্য-গন্ধকুটির উল্লেখের কথা আগেই বলা হয়েছে। এই তথ্যসমূহের ভিত্তিতে জুয়ানজাং উল্লিখিত বালাদিত্যকে গুপ্তবংশীয় শাসক নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য (রাজত্বকাল আনুমানিক ৪৯৫-৫৩০ সাধারণাব্দ) বলে আধুনিক বিদ্বানরা শনাক্ত করেছেন।

আলেকজান্ডার কানিংহাম শুধুমাত্র জুয়ানজাং উল্লিখিত বিবরণের ভিত্তিতে পূর্ণবর্মনকে সপ্তম শতক সাধারণাব্দের মগধের মৌখরি বংশীয় শাসক বলে চিহ্নিত করেছিলেন।২৮ পরবর্তী কালের আরও আধুনিক বিদ্বানদের অন্য কোনও সূত্র থেকে যাচাই না করে সেই একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করতে দেখা গিয়েছে। ১৯৭৩-১৯৭৪ মরশুমে প্রত্নতত্ত্ববিদ বিজয়কান্ত মিশ্রের নেতৃত্বে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের একটি দল যখন নালন্দার সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষগুলির পূর্ব দিকে সরাই ঢিবিতে উৎখননের জন্য অবশেষ পরিষ্কার করার কাজ করছিলেন, তখন একটি ইটের মন্দিরের দেয়ালে, একটি কুলুঙ্গির পাশে লাগানো কৃষ্ণবর্ণের প্রস্তরের ফলকের উপর উত্কীর্ণ একটি প্রশস্তি লেখ খুঁজে পাওয়া যায়।২৯ তারিখবিহীন সংস্কৃত ভাষায় রচিত এই লেখে পূর্ণবর্মনের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিজয়কান্ত মিশ্র লেখের পূর্ণবর্মনকে জুয়ানজাং-এর বিবরণের ভিত্তিতে মৌখরি বংশীয় শাসক বলেই চিহ্নিত করেন।৩০ এই লেখটির প্রথম প্রকৃত পাঠোদ্ধার করেন দীনেশচন্দ্র সরকার। জানা যায়, এই প্রশস্তিটির রচয়িতা দুর্গাদত্ত মথুরার শাসক প্রথমশিবের মহাসন্ধিবিগ্রহিক (যুদ্ধমন্ত্রী)। তিনি প্রথমশিব কর্তৃক নালন্দায় একটি বিশাল বুদ্ধ প্রতিমা স্থাপন উপলক্ষ্যে এই প্রশস্তিটি রচনা করেছেন। এই লেখের শেষদিকে বলা হয়েছে, প্রখ্যাত ভাস্কর পূর্ণবর্মন এই বিশাল বুদ্ধ প্রতিমা নির্মাণ করেছেন।৩১ শিল্প ইতিহাসবিদ গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য সিদ্ধমাতৃকা লিপিতে উত্কীর্ণ এই লেখটির কাল লিখনশৈলীর ভিত্তিতে ষষ্ঠ শতক শেষার্ধ বলে নির্ণয় করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন জুয়ানজাং-এর নালন্দা আগমনের অর্ধ শতক পূর্বের এই লেখে পূর্ণবর্মনের উল্লেখ কোনও মতেই কোনও মৌখরি বংশীয় মগধের শাসক পূর্ণবর্মনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না।৩২ সাম্প্রতিক কালে ঐতিহাসিক রজত সান্যাল তাঁর ‘নালন্দা’ শীর্ষক নিবন্ধে এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, জুয়ানজাং যাঁদের কাছ থেকে এই বিশাল বুদ্ধ প্রতিমার নির্মাণের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, পঞ্চাশ বছর বাদে তাঁদের কাছে প্রতিমার স্থানীয় ভাস্কর পূর্ণবর্মনই পৃষ্ঠপোষক বলে স্মৃতিতে ভাস্বর ছিল, বহিরাগত শাসক প্রথমশিব যে এই প্রতিমার পৃষ্ঠপোষক, তা তাঁদের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।৩৩ এখানে উল্লেখ্য, ১৯৭৫-১৯৭৬, ১৯৭৬-১৯৭৭, ১৯৭৭-১৯৭৮, ১৯৭৮-১৯৭৯ এবং ১৯৭৯-১৯৮০ মরশুমে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ কর্তৃক সরাই ঢিবিতে উৎখননের ফলে আবিষ্কৃত একটি ইটের পঞ্চায়তন বৌদ্ধ মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি প্রস্তরের পাদপীঠের উপর আর একটি চুন-সুরকির আস্তরযুক্ত অর্ধবৃত্তাকার ইটের পাদপীঠের সন্ধান পাওয়া যায়। এই অর্ধবৃত্তাকার পাদপীঠের উপর একটি স্টাকোর দ্বিদল পদ্ম নির্মিত, এর উপর লাল রঙের আভাস দেখতে পাওয়া যায়। এই দ্বিদল পদ্মের উপর স্টাকোর এক বিশাল বুদ্ধ প্রতিমার গোড়ালি পর্যন্ত পদদ্বয়ের অংশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গুলিযুক্ত পদদ্বয়ের আকার থেকে অনুমান করা যায় এই বুদ্ধ প্রতিমাটি অন্ততপক্ষে ১৮ থেকে ২০ মি উঁচু ছিল।৩৪ এই আবিষ্কারের পর বোঝা যায়, জুয়ানজাং তাঁর বিবরণে তামার বিশাল বুদ্ধ প্রতিমা বলে এই প্রতিমাটির কথাই উল্লেখ করেছেন, যদিও প্রতিমাটি তামার নয়, স্টাকোর তৈরি (হতে পারে, প্রতিমাটিকে তাম্রবর্ণে রঞ্জিত করা হয়েছিল)।          

১৯০৯ সালে প্রথম সতীশ চন্দ্র বিদ্যাভূষণ তাঁর ‘হিস্ট্রি অফ দ্য মিডাইভ্যাল স্কুল অফ ইন্ডিয়ান লজিক’ গ্রন্থে জুয়ানজাং বর্ণিত বালাদিত্যের পূর্ববর্তী তিন শাসকের কালপর্ব নির্ণয়ের প্রয়াস করেন। তাঁর অনুমিত শক্রাদিত্যের রাজত্বকাল ৪৫০ সাধারণাব্দ।৩৫ এরপর, হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী তাঁর ১৯২৩ সালে লেখা ‘পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ এনশ্যেন্ট ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে জুয়ানজাং বর্ণিত শক্রাদিত্য ও বুদ্ধগুপ্তকে গুপ্তবংশীয় শাসক প্রথম কুমারগুপ্ত ও তাঁর পুত্র বুধগুপ্ত বলে চিহ্নিত করেন।৩৬ ১৯২৮ সালে হেনরি হেরাস তাঁর লেখা একটি নিবন্ধেও জুয়ানজাং বর্ণিত শাসকদের গুপ্তবংশীয় বলে চিহ্নিত করেন। তাঁর অনুমান, শক্রাদিত্য হলেন প্রথম কুমারগুপ্ত, যাঁর মুদ্রায় মহেন্দ্রাদিত্য উপাধি দেখতে পাওয়া যায়; বুদ্ধগুপ্ত আসলে স্কন্দগুপ্ত; তথাগতগুপ্ত প্রকৃতপক্ষে স্কন্দগুপ্তের ভ্রাতা পুরগুপ্ত, এবং বজ্র অবশ্যই দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত। জুয়ানজাং উল্লিখিত মধ্য ভারতের শাসক তাঁর মতে হর্ষবর্ধন।৩৭ নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী ১৯৪১ সালে তাঁর লেখা ‘নালন্দা’ শীর্ষক নিবন্ধে জুয়ানজাং বর্ণিত শাসকদের মধ্যে বালাদিত্যের পূর্ববর্তী কোনও শাসকের ঐতিহাসিকতা মানতে অস্বীকার করেন। তাঁর মতে জুয়ানজাং বর্ণিত বালাদিত্যের পরবর্তী শাসকদের পরিচয়ও  স্পষ্ট নয়। তবে তিনি মনে করেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রথম দিকেই নালন্দার নির্মাণের সূত্রপাত ঘটে।৩৮ কিন্তু, নালন্দায় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে প্রাপ্ত একটি পোড়ামাটির সিলে শক্রাদিত্য স্থাপিত বিহারের নামের উল্লেখ৩৯ পাওয়ার পর তাঁর অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। নালন্দায় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের সময় গুপ্তবংশীয় শাসকদের ২৬টি পোড়ামাটির সিল পাওয়া গেছে। সিলগুলিতে উল্লিখিত শাসকদের মধ্যে আছেন বুধগুপ্ত (রাজত্বকাল আনুমানিক ৪৭৬-৪৯৫ সাধারণাব্দ), নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য (রাজত্বকাল আনুমানিক ৪৯৫-৫৩০ সাধারণাব্দ), তৃতীয় কুমারগুপ্ত (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৩০-৫৪০ সাধারণাব্দ) এবং বৈন্যগুপ্ত (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৪৩-৫৪৮ সাধারণাব্দ)।৪০ এই সিলগুলির সাক্ষ্য থেকে এটা বোঝা যায়, অন্তত পঞ্চম শতক সাধারণাব্দের মাঝামাঝি থেকে গুপ্তবংশীয় শাসকরা নালন্দার বিহারগুলিকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করেছিলেন।  

নালন্দায় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবসানের পর হর্ষবর্ধন, মৌখরি ও পালবংশীয় শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কেও কিছু তথ্য জানা গেছে। এই প্রত্নক্ষেত্র থেকে হর্ষবর্ধন ও মৌখরি শাসক শর্ববর্মনের (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৬০-৫৭৫ সাধারণাব্দ) পোড়ামাটির সিল পাওয়া গেছে।৪১ মৌখরিবংশের প্রতিষ্ঠাতা শাসক হরিবর্মন স্থাপিত মহাবিহারের সিলের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। নালন্দা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সংগৃহীত ও উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুসমূহের কালপর্ব ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, সাধারণাব্দের পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি থেকে দ্বাদশ শতক সাধারণাব্দ পর্যন্ত নালন্দার বিহারগুলি জ্ঞানচর্চার জন্য শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। তবে শাসককুল ছাড়া সমাজের অন্যরাও যে দান করতেন, তার প্রমাণ ক্যাপ্টেন মার্শালের তত্ত্বাবধানে ১৮৬৪ সালে নালন্দার প্রত্নক্ষেত্রে একটি মন্দিরের (ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ কর্তৃক ১২ সংখ্যক চৈত্য বলে চিহ্নিত) উৎখননের সময় প্রাপ্ত দ্বারফলকের নিম্নভাগে উত্কীর্ণ একটি লেখ। পালবংশীয় শাসক প্রথম মহীপালের (রাজত্বকাল ৯৭৭-১০২৭ সাধারণাব্দ) ১১তম রাজ্যবর্ষের এই লেখে কৌশাম্বী থেকে এসে নালন্দার নিকটবর্তী তৈলাঢক (বর্তমান তিল্হারা) নিবাসী, হরদত্তের পৌত্র, গুরুদত্তের পুত্র মহাযান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বালাদিত্য কর্তৃক নালন্দার বিহারের অগ্নিদাহের পর জীর্ণোদ্ধারের জন্য দানের উল্লেখ৪২ পালবংশীয়দের  শাসনামলে নালন্দার বিহারের পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের অংশগ্রহণের ইঙ্গিত বহন করে।

নালন্দা – সপ্তম শতকে জ্ঞানচর্চা

নালন্দার মহাবিহারে জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে কোনও ভারতীয় বৌদ্ধ বিদ্বানের রচিত গ্রন্থ থেকে বিশেষ কোনও তথ্য জানা যায়নি। প্রাচীন শ্রাবকযানী নিকায়দের মধ্যে স্থবিরবাদী ও মহাসাংঘিক বিনয়ের ঐতিহ্য অনুযায়ী বুদ্ধশাসন (সমগ্র বৌদ্ধ শাস্ত্র) নবাঙ্গ অর্থাৎ ৯টি অঙ্গে বিভক্ত – সুত্ত (সংস্কৃত সূত্র), গেয্য (সংস্কৃত গেয়), বেয্যাকরণ (সংস্কৃত ব্যাকরণ), গাথা, উদান, ইতিবুত্তক (সংস্কৃত ইতিবৃত্তক বা ইত্যুক্ত), জাতক, অব্ভূতধম্ম (সংস্কৃত অদ্ভুতধর্ম) ও বেদল্ল (সংস্কৃত বৈপুল্য)। অন্যদিকে সর্বাস্তিবাদী, ধর্মগুপ্তক, মহীশাসক ও মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়ের ঐতিহ্যে বুদ্ধশাসনের দ্বাদশাঙ্গ বিভাজন স্বীকৃত, অর্থাৎ সমগ্র বৌদ্ধ শাস্ত্র ১২টি অংশে বিভক্ত বলে মনে করা হয়। এই ঐতিহ্যে বুদ্ধশাসনের ৩টি অতিরিক্ত অঙ্গ হলো নিদান, অবদান ও উপদেশ।৪৩ ইজিং-এর বিবরণ পাঠ করলে অনুমান করা যায়, মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়ের অনুসারী নালন্দা মহাবিহারে সম্ভবত দ্বাদশাঙ্গ বৌদ্ধশাস্ত্রেরই চর্চা হয়েছে। নালন্দা মহাবিহারে অবশ্যই অনেক সংখ্যক আচার্য ও তাঁর অন্তেবাসী শিষ্যগণ মহাযান বৌদ্ধশাস্ত্র ও পূজাপদ্ধতি, বৌদ্ধ তন্ত্রশাস্ত্র ও তান্ত্রিক উপাসনারীতি এবং মধ্যমক দর্শনশাস্ত্রের বিভিন্ন ধারার চর্চা ও গ্রন্থ রচনার কাজ করেছেন, কিছু গ্রন্থের চীনা ও তিব্বতি ভাষায় অনুবাদের কাজও হয়েছে। সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার জন্য ব্যাকরণের চর্চাও হয়েছে। অনুমান করা যায়, বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে যুক্ত পটচিত্র ও ভিত্তিচিত্র এবং প্রস্তর, স্টাকো ও ধাতুর প্রতিমা নির্মাণের কাজও নালন্দা মহাবিহারের শ্রমণরা করেছেন।

প্রথম সহস্রাব্দ সাধারণাব্দের মাঝামাঝি থেকে নালন্দা মহাবিহারের পরিচিতি ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ার পর পূর্ব এশিয়া থেকে এসে যে বিদ্বান ভিক্ষুগণ এখান থেকে বৌদ্ধ শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও বৌদ্ধ শাস্ত্র সংগ্রহ করে দেশে ফিরে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেছেন, তাঁদের মধ্যে সপ্তম শতক সাধারণাব্দের দুই চীনা পরিব্রাজকের গ্রন্থে সমাবিষ্ট রয়েছে এই মহাবিহার সম্পর্কে প্রাচীনতম প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ। নালন্দা মহাবিহারে সপ্তম শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধে আগত জুয়ানজাং-এর বিবরণ ও তাঁর শিষ্যদের রচিত জীবনী গ্রন্থ এবং সপ্তম শতক সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে আগত ইজিং-এর লেখা গ্রন্থদ্বয় থেকে সপ্তম শতকের নালন্দা মহাবিহারে জ্ঞানচর্চা, এবং তখনকার শিক্ষার্থী ও আচার্যদের সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য প্রাপ্তি সম্ভব হয়েছে।

মগধের বৌদ্ধ বিদ্বান শুভাকরসিংহ (বা শুভকরসিংহ) (৬৩৬-৭৩৫ সাধারণাব্দ) নালন্দা মহাবিহারে সম্ভবত সপ্তম শতকের শেষার্ধে অবস্থান ও শিক্ষা গ্রহণের পর ৭১৬ সাধারণাব্দে চীনে পৌঁছান এবং সেখানে তাঁর শেষ জীবন অতিবাহিত করেন। তাঁর সমাধিস্তম্ভে উত্কীর্ণ চীনা ভাষার লেখটি লি হুয়া (?-৭৭০ সাধারণাব্দ) নথিবদ্ধ করেন এবং ৯৮৮ সাধারণাব্দে সম্পূর্ণ চীনা ভাষায় সংকলিত ‘সং গাওসেং ঝুয়ান’ শিরোনামের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জীবনী সংকলন গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত শুভাকরসিংহের জীবনী এর ভিত্তিতেই রচিত। এই জীবনী গ্রন্থ অনুসারে শুভাকরসিংহ নালন্দা মহাবিহারে এসে আচার্য ধর্মগুপ্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ধর্মগুপ্ত তাঁকে ধারণী, যোগ ও ত্রিগুহ্য তত্ত্বের শিক্ষা দান করেন। নালন্দায় শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর কাশ্মীর ও তিব্বত হয়ে চীনে পৌঁছানোর পর প্রথমে বোধিসত্ত্ব আকাশগর্ভের উদ্দেশ্যে রচিত একটি ধারণীর চীনা অনুবাদ করেন। তারপর সম্রাটের আদেশে ৭২৪ সাধারণাব্দে ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’ সংস্কৃত থেকে চীনা ভাষায় অনুবাদ করেন। এরপর তিনি ‘আর্য-সুবাহুপরিপৃচ্ছনাম-তন্ত্র’ ও ‘সুসিদ্ধকরমহাতন্ত্র-সাধনোপায়িকা-পটল’ গ্রন্থদ্বয়ের চীনা ভাষায় অনুবাদ করেন।৪৪          

জুয়ানজাং-এর দেখা জ্ঞানচর্চা

নালন্দার জ্ঞানচর্চা নিয়ে সবচেয়ে পুরোনো উল্লেখ বোধ হয় পাওয়া যায় জুয়ানজাং-এর জীবনবসানের অব্যবহিত পর তাঁর শিষ্য হুই লি ও ইয়ানকং-এর চীনা ভাষায় রচিত জুয়ানজাং-এর জীবনী গ্রন্থে। ৬৮৮ সাধারণাব্দে সমাপ্ত এই জীবনী গ্রন্থের বর্ণনা থেকে জুয়ানজাং যখন নালন্দায় আসেন, সেই সময়কার জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে একটি ধারণা করা যেতে পারে। এই জীবনী গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী জুয়ানজাং-এর অবস্থানের সময় নালন্দায় আবাসিক ও অতিথি মিলিয়ে দশ হাজার ভিক্ষু প্রায় সব সময় বাস করতেন। (এখানে উল্লেখ্য, নালন্দার প্রত্নক্ষেত্রে উৎখননের পর ১১টি বিহার মিলিয়ে মাত্র ৮x৮ বর্গফুট থেকে ১০x১০ বর্গফুট আকারের ৩০০টি প্রকোষ্ঠ আবিষ্কৃত হয়েছে, এই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠগুলিতে একসাথে দু’ জনের বেশি থাকা অসম্ভব। যদি ধরেও নেওয়া যায়, সব বিহারই জুয়ানজাং-এর অবস্থানের সময় ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় ছিল এবং সব প্রকোষ্ঠই দ্বিতল ছিল, তাহলেও ১২০০ জনের বেশি ভিক্ষুর একসাথে বাস করা সম্ভব ছিল না।৪৫)। ভিক্ষুরা মহাযান শাস্ত্রের চর্চা করতেন, একই সঙ্গে (শ্রাবকযানী) অষ্টাদশ নিকায়ের শাস্ত্রগ্রন্থেরও চর্চা করতেন। জাগতিক বিষয় নিয়ে রচিত বেদ (চীনা ভাষায় 吠陀 ‘ফেই তুও’) ও অন্যান্য গ্রন্থ, হেতুবিদ্যা (চীনা ভাষায় 因明 ‘ইয়িন মিং’), শব্দবিদ্যা (চীনা ভাষায় 聲明 ‘শেং মিং’), চিকিৎসাবিদ্যা (চীনা ভাষায় 醫方 ‘ই ফাং’) ও ভবিষ্যৎগণনা (চীনা ভাষায় 術數 ‘শু শু’) নিয়েও চর্চা হতো। সেই সময় নালন্দা বিহারে ২০টি (মহাযানী) শাস্ত্রগ্রন্থ ও তার ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থসমূহের মর্মগ্রহণ করতে পারতেন, এমন ভিক্ষুর সংখ্যা ছিল এক সহস্রেরও বেশি। ৩০টি শাস্ত্রগ্রন্থ আয়ত্ত করতে পেরেছেন, এমন ভিক্ষুর সংখ্যা ছিল পাঁচশো’রও বেশি। জুয়ানজাং সমেত দশ জন ভিক্ষুর ৫০টি শাস্ত্রগ্রন্থে অধিগত ছিল এবং আচার্য শীলভদ্র সর্বশাস্ত্র আয়ত্ত করেছিলেন।৪৬ জুয়ানজাং-এর জীবনী গ্রন্থে জুয়ানজাং নিজে নালন্দায় যে শাস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন, সে সম্পর্কেও উল্লেখ রয়েছে। জুয়ানজাং নালন্দায় ‘যোগাচারভূমিশাস্ত্র’ (অসঙ্গ রচিত বলে জ্ঞাত ‘সপ্তদশভূমিশাস্ত্র-যোগাচারভূমি’), ‘অভিধর্ম-ন্যায়ানুসার’ (সর্বাস্তিবাদী বৈভাষিক দার্শনিক সংঘভদ্র রচিত বলে জ্ঞাত ‘ন্যায়ানুসার’), প্রকরণার্যবাচাশাস্ত্র (অসঙ্গ রচিত বলে জ্ঞাত ‘প্রকরণার্যশাসনশাস্ত্র’), ‘অভিধর্মসমুচ্চয়ব্যাখ্যা’ (অসঙ্গ রচিত বলে জ্ঞাত ‘অভিধর্মসমুচ্চয়’), ‘হেতুবিদ্যা শাস্ত্র’, ‘শব্দবিদ্যা শাস্ত্র’, ‘সমুচ্চয়-প্রমাণ শাস্ত্র’, ‘মাধ্যমিক শাস্ত্র’ ও ‘শতশাস্ত্র’ (আর্যদেব রচিত বলে জ্ঞাত) অধ্যয়ন করেন। জুয়ানজাং ‘অভিধর্মকোশশাস্ত্র’ (বসুবন্ধু রচিত বলে জ্ঞাত সর্বাস্তিবাদী ‘অভিধর্মকোশ’), ‘বিভাষশাস্ত্র’ ও ‘জ্ঞানপ্রস্থানষটপাদাভিধর্মশাস্ত্র’ (কাত্যায়নীপুত্র রচিত বলে জ্ঞাত ‘জ্ঞানপ্রস্থানশাস্ত্র’) বিষয়ক শিক্ষা ইতিপূর্বে কাশ্মীরেই লাভ করেছিলেন। নালন্দায় তিনি এই বিষয়গুলি নিয়ে তাঁর সংশয়ের নিরসন করেন। তিনি নালন্দায় সংস্কৃত ব্যাকরণও অধ্যয়ন করেছিলেন।৪৭     

সপ্তম শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধে জ্ঞানচর্চার যে চিত্র এখানে পাওয়া গেল তা থেকে বোঝা যায়, এই সময় নালন্দায় মহাযানী শাস্ত্র ও মধ্যমক দর্শনের গ্রন্থসমূহের সাথে শ্রাবকযানী শাস্ত্র, ন্যায়, ব্যাকরণ এবং ভেষজবিদ্যার চর্চাও হতো। এই গ্রন্থে উল্লিখিত নালন্দার আচার্য শীলভদ্র রচিত ‘বুদ্ধভূমিব্যাখ্যান’ গ্রন্থের তিব্বতি অনুবাদ বর্তমান। এই গ্রন্থটি মহাযানী বৌদ্ধ দর্শন যোগাচারের ভাবনাসম্পৃক্ত বলে আধুনিক বিদ্বানরা মনে করেন। জুয়ানজাং তাঁর বিবরণে শীলভদ্র ছাড়াও নালন্দা মহাবিহারে বিভিন্ন সময়ে অবস্থানকারী আরও কয়েক জন প্রখ্যাত বৌদ্ধ বিদ্বানের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর উল্লিখিত বৌদ্ধ বিদ্বানদের মধ্যে রয়েছেন ধর্মপাল, চন্দ্রপাল (বা চন্দ্রগুপ্ত), গুণমতি, স্থিরমতি, প্রভমিত্র, জিনমিত্র (বা বিশেষমিত্র) এবং জ্ঞানচন্দ্র।৪৮ শীলভদ্রের গুরু ধর্মপাল (আনুমানিক ৫৩০-৫৬১ সাধারণাব্দ) যোগাচার দর্শনের বিদ্বান।৪৯ তাঁর রচিত তিনটি গ্রন্থের চীনা ভাষায় অনুবাদ বিদ্যমান, ব্যাকরণ বিষয়ক চতুর্থ গ্রন্থ বর্তমানে বিলুপ্ত। তাঁর বিদ্যমান তিনটি গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আর্যদেবের ‘চতুঃশতক’, বসুবন্ধুর ‘বিংশিকা’ ও দিঙনাগের ‘আলম্বনপরীক্ষা’ গ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক রচনা।৫০ স্থিরমতিও (আনুমানিক ৫১০-৫৭০ সাধারণাব্দ) যোগাচার মতাবলম্বী দার্শনিক।৫১ তাঁর ‘প্রমাণসমুচ্চয়’ গ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক রচনা বর্তমানে বিলুপ্ত; ৯টি ব্যাখ্যামূলক রচনা মূল সংস্কৃত বা চীনা, তিব্বতি, মঙ্গোলীয় বা উইঘুর ভাষার অনুবাদে বিদ্যমান – ‘অভিধর্মসমুচ্চয়ব্যাখ্যা’, ‘তত্ত্বার্থাভিধর্মকোশটীকা’, ‘পঞ্চস্কন্ধকবিভাষা’, ‘ত্রিংশিকাবিজ্ঞপ্তিভাষ্য’, ‘মধ্যান্তবিভাগটীকা’, ‘সূত্রালঙ্কারবৃত্তিভাষ্য’, ‘রত্নকূটসুত্রটীকা’ (বা ‘কাশ্যপপরিবর্তটীকা’), ‘দাশেং-ঝোংগুয়ান-শিলুন’ এবং ‘অক্ষয়মতিনির্দেশটীকা’।৫২ গুণমতি স্থিরমতির গুরু, তিনি নাগার্জুন রচিত বলে স্বীকৃত ‘মূলমধ্যমককারিকা’র একটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।৫৩ জুয়ানজাং-এর বিবরণে উল্লিখিত বৌদ্ধ বিদ্বানদের নামের দিকে নজর দিলে ষষ্ঠ-সপ্তম শতক সাধারণাব্দে নালন্দায় যে মধ্যমক দর্শনের যোগাচার শাখার ব্যাপক চর্চা হতো তা বেশ বোঝা যায়।

বৌদ্ধ মহাবিহারে বেদচর্চা?

জুয়ানজাং-এর জীবনী গ্রন্থে বেদ বলতে গ্রন্থের লেখক অর্থাৎ তৎকালীন চীনা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, এবং কেন তাকে জাগতিক বিষয় নিয়ে লেখা গ্রন্থ বলা হয়েছে তা বুঝতে হলে সমসাময়িক চীনা বৌদ্ধ ধর্মীয় সাহিত্যে ‘বেদ’ (চীনা ভাষায় 吠陀 ‘ফেই তুও’ বা 韋陀 ‘ওয়েই তুও’) সম্পর্কে উল্লেখের বিষয়ে সন্ধান করা দরকার। এই বিষয়ে সন্ধান করলে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেই প্রসঙ্গে কিছুটা বিস্তারিতভাবে বলার প্রয়োজন আছে। ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’ অন্যতম প্রাচীন সংস্কৃত বৌদ্ধ তন্ত্রগ্রন্থ, সপ্তম শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধ এই গ্রন্থের রচনাকাল বলে অনুমান করা হয়। চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উ-জিং ৬৬৭ সাধারণাব্দে ভারতে আসেন এবং ৬৭৪ সাধারণাব্দে চীনে ফিরে যাওয়ার সময় তাঁর মৃত্যু হয়, ভারত থেকে যে গ্রন্থসমূহ সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর চীনে পৌঁছে দেওয়া হয়। তাঁর সংগৃহীত গ্রন্থগুলির অন্যতম এই ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’। উ-জিং নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, এই গ্রন্থের চীনা ভাষায় অনুবাদক শুভাকরসিংহও নালন্দায় ধর্মগুপ্তের কাছ থেকে এই গ্রন্থের শিক্ষালাভ করেছিলেন এবং এই গ্রন্থের ‘পিণ্ডার্থ’ নামে সংস্কৃত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থের রচয়িতা আর এক ভারতীয় বৌদ্ধ বিদ্বান বুদ্ধগুহ্যও নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। সেই কারণে এই গ্রন্থের রচনা নালন্দা মহাবিহারে হয়েছিল বলে আধুনিক বিদ্বান স্টিফেন হজ অনুমান করেছেন। স্টিফেন হজের অনুমানের আর একটি কারণ এই তন্ত্রগ্রন্থে বর্ণিত উদ্ভিদগুলি একত্রে একমাত্র পূর্ব ভারতে হিমালয়ের পাদদেশে পাওয়া সম্ভব।৫৪ শুভাকরসিংহের সঙ্গে তাঁর চীনা শিষ্য ইসিংয়ের (৬৭৩-৭২৭ সাধারণাব্দ) ৭১৬ সাধারণাব্দে প্রথম দেখা হয়। ইসিং চীনা ভাষায় ‘দা পিলুঝে’না চেনফো জিংশু’ নামে ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’ গ্রন্থের একটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে প্রথম ‘বৌদ্ধ বেদ’ বা ‘বুদ্ধ বেদ’ (চীনা ভাষায় 佛韋陀 ‘ফো ওয়েই তুও’) কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’ গ্রন্থের ‘জাগতিক এবং অধিজাগতিক হোম’ বিষয়ক ২৭তম অধ্যায়ের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইসিং লিখেছেন যে বেদের মূল শিক্ষা স্বয়ং বুদ্ধ প্রদান করেছেন, এবং প্রকৃত হোমের তত্ত্ব ও পদ্ধতি সেই শিক্ষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বৌদ্ধ বেদের ধারণা চীন থেকে অন্যত্রও  প্রসারিত হয়েছিল। সিলভ্যাঁ লেভি বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার বালি থেকে সংস্কৃত ভাষায় ‘বুদ্ধ বেদ’ নামে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠানের গ্রন্থ সংগ্রহ করে, ঐ গ্রন্থ সম্পাদনা করে ১৯৩৩ সালে প্রকাশ করেছিলেন।৫৫ সপ্তম শতক থেকে বৌদ্ধ ধর্মে ব্রাহ্মণ্যবাদী তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান অনুপ্রবেশ করতে শুরু করে। হোম এর মধ্যে অন্যতম। ইসিং যে ব্রাহ্মণ্যবাদী তান্ত্রিক হোমকে জাগতিক বেদ ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক হোমকে অভিজাগতিক বুদ্ধ বেদ বলে পৃথকীকরণ করেছেন, তা ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’ গ্রন্থে বেদ সংক্রান্ত উল্লেখ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।

ইজিং-এর দেখা জ্ঞানচর্চা

এবার সপ্তম শতক সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে আগত ইজিং-এর ভারতে অনুসৃত বৌদ্ধ ধর্মীয় আচরণের বিবরণ নিয়ে লেখা ‘দক্ষিণ সমুদ্র থেকে স্বদেশে প্রেরিত ধর্মের লিখিত বিবরণ’ (‘নানহাই জিগুই নেইফা ঝুয়ান’) গ্রন্থে উল্লিখিত ভারতের বৌদ্ধ বিহারসমূহে জ্ঞানচর্চার বিবরণের দিকে নজর দেওয়া যাক। ইজিং ভারতে আসার পর তাম্রলিপ্তিতে এক বছর থেকে চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহাযানপ্রদীপের কাছ থেকে ব্রহ্মভাষা (অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষা) ও শব্দবিদ্যার (অর্থাৎ ব্যাকরণ) শিক্ষা গ্রহণ করেন। এর পর দশ বছর (আনুমানিক ৬৭৫-৬৮৫ সাধারণাব্দ) নালন্দায় রত্নসিংহের কাছে শিক্ষাগ্রহণ ও বৌদ্ধ শাস্ত্রের অনুবাদের কাজে অতিবাহিত করেন। তাঁর এই গ্রন্থ লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল চীন থেকে আগত ভিক্ষুদের জন্য ভারতের বিহারগুলিতে ভিক্ষুদের পালনীয় নিয়মবিধি ও জীবনযাপন প্রণালী সম্পর্কে একটি তুলনামূলক তথ্যভিত্তিক বিবরণ রচনা।৫৬

ইজিং-এর এই গ্রন্থে ‘পাশ্চাত্যে শিক্ষালাভের পদ্ধতি’ শীর্ষক ৩৪তম অধ্যায়ে চীনা শিক্ষার্থীদের ভারতের বৌদ্ধ বিহারগুলিতে শিক্ষার পাঠক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লিখিত হয়েছে। তাঁদের শিক্ষার সূত্রপাত হতো সংস্কৃত শব্দবিদ্যা অর্থাৎ বর্ণমালা, লিপি (খুব সম্ভবত সিদ্ধমাতৃকা লিপি৫৭) ও ব্যাকরণ শিক্ষার মাধ্যমে। প্রথমে তাঁরা মহেশ্বর রচিত বলে কথিত ‘সিদ্ধিরস্তু’ নামের একটি ক্ষুদ্র গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন। এই গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের শুরুতে লেখা ‘সিদ্ধিরস্তু’ শব্দটি থেকে এই নামের উৎপত্তি। এই গ্রন্থে ৩০০ শ্লোকে সংস্কৃত বর্ণমালা ও শব্দসমূহের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ইজিং জানিয়েছেন এই গ্রন্থটি ভারতীয় শিক্ষার্থীরা ৬ বছর বয়সে শিখতেন। এরপর তাঁরা পাণিনির সূত্র (অর্থাৎ ‘অষ্টাধ্যায়ী’) অধ্যয়ন করতেন। ভারতীয় শিক্ষার্থীরা এই গ্রন্থ ৮ বছর বয়সে শিখতেন। চীনা শিক্ষার্থীরা এরপর ধাতুরূপ বিষয়ক একটি গ্রন্থ (সম্ভবত ‘ধাতুপাঠ’), অষ্টধাতু, মুণ্ড ও উণাদি (সম্ভবত ‘উণাদিসূত্র’) নামের তিনটি এক সহস্র শ্লোকবিশিষ্ট ‘খিল’ (পরিশিষ্ট) গ্রন্থের একটি সংকলন এবং পাণিনির সূত্রের জয়াদিত্য রচিত ব্যাখ্যামূলক ১৮০০০ শ্লোকবিশিষ্ট ‘বৃত্তিসূত্র’ গ্রন্থের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। (সপ্তম শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধে জয়াদিত্য ও বামন পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ বলে পরিচিত ব্যাকরণের সূত্র গ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক ‘কাশিকাবৃত্তি’ গ্রন্থের রচনা করেন। কিন্তু, ‘কাশিকাবৃত্তি’র কে কোন অংশটি লিখেছেন তা আজ আর জানা যায় না। তবে, ইজিং সম্ভবত কোন অংশ জয়াদিত্যের রচনা তা জানতেন এবং সেই কারণে কেবল তাঁরই নাম উল্লেখ করেছেন।) ইজিং-এর মতে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা ১০ বছর বয়স থেকে তিন বছর ধরে এই তিনটি ‘খিল’ (পরিশিষ্ট) গ্রন্থের সংকলন এবং ১৫ বছর বয়স থেকে পাঁচ বছর ধরে ‘বৃত্তিসূত্র’ অধ্যয়ন করতেন। ইজিং চীনা শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিয়েছেন, অন্য শিক্ষার পূর্বে  অবশ্যই ‘বৃত্তিসূত্র’ অধ্যয়ন করতে। ইজিং চীনা শিক্ষার্থীদের ব্যাকরণ শিক্ষার পর সংস্কৃতে পত্ররচনা, সম্রাটদের জন্য প্রশস্তি রচনা ও কাব্য রচনার শিক্ষা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন। সংস্কৃত ভাষাশিক্ষার পর চীনা শিক্ষার্থীরা বৌদ্ধ হেতুবিদ্যা (ন্যায়) ও অভিধর্মকোশশাস্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। ‘ন্যায়দ্বারতর্কশাস্ত্র’ (বৌদ্ধ বিদ্বান দিঙনাগের রচনা বলে জ্ঞাত ‘ন্যায়প্রবেশ’) গ্রন্থ থেকে তাঁরা ‘অনুমান’ বিষয়ে শিক্ষা নিতেন। ‘জাতকমালা’ পাঠ করে তাঁরা রচনাশক্তি অর্জন করতেন। চীনা শিক্ষার্থীরা তাঁদের ভাষাশিক্ষার সম্পূর্ণতার জন্য পতঞ্জলির ‘চূর্ণি’ (অর্থাৎ ‘মহাভাষ্য’), ‘ভর্তৃহরিশাস্ত্র’ (পতঞ্জলির মহাভাষ্য গ্রন্থের ভর্তৃহরি রচিত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ ‘মহাভাষ্যদীপিকা’) ও ‘বাক্যপদীয়’ এবং ধর্মপালের রচিত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ সমেত ভর্তৃহরির ‘বৃত্ত’ গ্রন্থও অধ্যয়ন করতেন। সাধারণত নালন্দায় তাঁরা ২ থেকে ৩ বছর শিক্ষাগ্রহণ করতেন। উপসম্পদা গ্রহণের পর ভিক্ষুদের ‘বিনয়’ শিক্ষাদান করা হতো। ইজিং-এর বিবরণে বেদের সম্পর্কেও উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণরা অন্য জাতির মানুষদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। এক লক্ষ শ্লোকে লেখা চারটি বেদ তাঁদের পবিত্র গ্রন্থ। বেদ কোনও কাগজ বা পাতার উপর লেখা হতো না, মৌখিক ভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হতো, ধীশক্তিসম্পন্ন কোনও কোনও ব্রাহ্মণ এই এক লক্ষ শ্লোক আবৃত্তি করতে পারতেন।৫৮

নালন্দায় সপ্তম শতক সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধের জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে ইজিং-এর বিবরণ থেকে যথেষ্ট স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এ কথাও বোঝা যায়, এই সময় ‘বিনয়’ বিষয়ক জ্ঞান ছাড়া অন্য জ্ঞানচর্চার জন্য উপসম্পদা গ্রহণ করার প্রয়োজন ছিল না। ইজিং, তাঁর এই ভারতে অনুসৃত বৌদ্ধ ধর্মীয় আচরণ সংক্রান্ত গ্রন্থের ‘উপসম্পদা গ্রহণের নিয়মাবলি’ শীর্ষক ১৯তম অধ্যায়ে এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। ইজিং জানিয়েছেন, গৃহত্যাগ করে প্রবজ্যা গ্রহণের পর ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের ‘শ্রামণের’ ও ‘শ্রামণেরী’ বলা হতো। উপসম্পন্ন হওয়ার পর, অর্থাৎ, পূর্ণাঙ্গ দীক্ষা উপসম্পদা গ্রহণের অব্যবহিত পর তাঁদের ‘দহর’ ভিক্ষু বলে অভিহিত করা হতো। উপসম্পদা গ্রহণের পর শ্রমণদের উপাধ্যায় প্রথমে প্রাতিমোক্ষ শিক্ষা দিতেন, তারপর ভিক্ষুরা প্রতিদিন বিস্তারিতভাবে ‘বিনয়’ অধ্যয়ন করতেন এবং ‘বিনয়’ নির্দেশিত নিয়মাবলি অনুসরণ করা অভ্যাস  করতেন। ‘বিনয়’ শিক্ষার পর তাঁরা মহাযান সূত্র ও শাস্ত্র গ্রন্থসমূহের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। দশটি বর্ষাবাসের (অর্থাৎ, বর্ষাকালের তিন মাস পরিব্রাজন ত্যাগ করে বিহারে অবস্থান) পর ভিক্ষুদের ‘স্থবির’ বলা হতো, তখন তাঁরা স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করতে পারতেন, উপাধ্যায় হওয়ারও যোগ্যতা অর্জন করতেন। কর্মাচার্যরা মূলত বিহারে বিনয়ের নিয়মপালনের দিকে নজর রাখতেন, কর্মাচার্য হওয়ার জন্য এই রকম কোনও জ্যেষ্ঠতার মানদণ্ড ছিল না। গৃহী উপাসকরা শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে ভিক্ষুদের আবাসে এসে তাঁদের কাছ থেকে বৌদ্ধ শাস্ত্র শিক্ষা নিতেন। এঁদের ‘মানব’ বলা হতো। আবার অনেকে তাঁদের সন্তানদের বিহারগুলিতে ভিক্ষুদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানচর্চার জন্যও পাঠাতেন, এঁদের ‘ব্রহ্মচারী’ বলা হতো।৫৯ ইজিং, তাঁর এই গ্রন্থের ভূমিকা অংশে তৎকালীন মগধের বিহারগুলিতে চারটি শ্রাবকযানী নিকায়ের ‘বিনয়’ অনুসরণ করার কথা উল্লেখ করেছেন – আর্য মহাসাংঘিক, আর্য স্থবির (থেরবাদী), মূলসর্বাস্তিবাদী ও সম্মিতীয়। তবে, তাঁর মতে এখানে মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়েরই প্রাধান্য ছিল।৬০ সম্ভবত, এই সময় নালন্দায় মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়েরই চর্চা করা হতো এবং সেই কারণেই তিব্বত ও পূর্ব এশিয়ার মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়ের অনুগামী মহাযানী বৌদ্ধরা নালন্দায় অধ্যয়ন ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতে আসতেন। মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়ের অনুগামী ইজিং তাই তাঁর ভারতে অনুসৃত বৌদ্ধ ধর্মীয় আচরণ সংক্রান্ত গ্রন্থের ১০ম অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন, নালন্দায় সেই সময় তিন হাজার ভিক্ষু বাস করতেন, এবং নালন্দার এই সমৃদ্ধির কারণ বিনয় নির্দেশিত নিয়ম পালন।৬১

ইজিং তাঁর ভারতে আগত পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার ৫৬ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর জীবনকথা সংক্রান্ত গ্রন্থেও নালন্দার জ্ঞানচর্চা নিয়ে কিছু তথ্য উল্লেখ করেছেন। এই গ্রন্থে নালন্দায় আগত বিদেশি শিক্ষার্থীরা যে গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করতেন বা যে সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতেন সে বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। ইজিং জানিয়েছেন, চীনা বৌদ্ধ শ্রমণ জুয়ান ঝাও (সংস্কৃত প্রকাশমতি) ৩ বছর নালন্দা মহাবিহারে অতিবাহিত করেন। জুয়ান ঝাও আচার্য বিজয়রশ্মির (বা জিনপ্রভ) কাছে মহাযানী মধ্যমক শাস্ত্রগ্রন্থ ‘প্রজ্ঞামূলশাস্ত্র’ (‘মূলমধ্যমককারিকা’) ও ‘শতশাস্ত্র’ গ্রন্থের শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং আচার্য রত্নসিংহের কাছে ‘সপ্তদশভূমিশাস্ত্র-যোগাচারভূমি’ গ্রন্থের শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি নালন্দায় ধ্যান ও সমাধি সম্পর্কে জ্ঞানও অর্জন করেন।৬২ আর এক চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তাও লিন (সংস্কৃত শীলপ্রভ) নালন্দা মহাবিহারে বহু বছর অতিবাহিত করে মহাযান সূত্র ও শাস্ত্রের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর এখানে সর্বাস্তিবাদী ‘অভিধর্মকোশ’ গ্রন্থ সম্পর্কে জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে।৬৩

নালন্দা – অষ্টম শতকে জ্ঞানচর্চা

অষ্টম শতক সাধারণাব্দে নালন্দা মহাবিহারে জ্ঞানচর্চার প্রত্যক্ষ তথ্য পাওয়া যায় পূর্বে উল্লিখিত যশোবর্মনের রাজত্বকালে উত্কীর্ণ শিলালেখ থেকে। এই প্রশস্তি লেখের চতুর্থ শ্লোকে নালন্দায় আগম ও কলার ক্ষেত্রে বিখ্যাত বিদ্বজ্জনের উপস্থিতির উল্লেখ থেকে ঐ সময়কার নালন্দা মহাবিহারে জ্ঞানচর্চার প্রসিদ্ধি সম্পর্কে অনুমান করা যায়।৬৪ অষ্টম শতকের দুই প্রখ্যাত বৌদ্ধ মধ্যমক দার্শনিক শান্তরক্ষিত (আনুমানিক ৭২৫-৭৮৮ সাধারণাব্দ) ও তাঁর শিষ্য কমলশীলের (আনুমানিক ৭৪০-৭৯৫ সাধারণাব্দ) নালন্দা মহাবিহারে অবস্থানের কথা জানা গেছে।৬৫ শান্তরক্ষিত ও কমলশীল মূল শূন্যবাদী মধ্যমক দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানবাদী যোগাচার দর্শনের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তিব্বতি ঐতিহ্যে তাঁদের দার্শনিক মত স্বাতন্ত্রিক-মাধ্যমিক মত নামে পরিচিত। এই দার্শনিক মত তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মীয় ভাবনাকে তাঁদের জীবনাবসানের পরেও কয়েক শতক ধরে প্রভাবিত করেছে। শান্তরক্ষিত রচিত ‘তত্ত্বসংগ্রহ’ এবং কমলশীল রচিত এই গ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক ‘পঞ্জিকা’ এই দার্শনিক মতের দু’টি উল্লেখনীয় গ্রন্থ। এ ছাড়া শান্তরক্ষিতের ‘মধ্যমকালংকার’, ‘সত্যদ্বয়বিভঙ্গপঞ্জিকা’, ‘সংবরবিংশকবৃত্তি’, ‘বিপঞ্চিতার্থ’ ও ‘তত্ত্বসিদ্ধি’ এবং কমলশীলের ‘মধ্যমকালোক’, তিনটি ‘ভাবনাক্রম’, ‘ভাবনাযোগাবতার’ ও ‘তত্ত্বালোক’ গ্রন্থগুলিও প্রসিদ্ধ।৬৬ সম্ভবত এই গ্রন্থগুলির কয়েকটি নালন্দায় রচিত ও লিপিবদ্ধ হয়েছিল। অষ্টম শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধে নালন্দা মহাবিহারে আর এক বৌদ্ধ বিদ্বান শান্তিদেবের অবস্থানের কথাও জানা যায়। শান্তিদেব রচিত দু’টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ – ‘শিক্ষাসমুচ্চয়’ ও ‘বোধিসত্ত্বচর্যাবতার’। বু-তোন ও তারনাথ তাঁর ‘বোধিসত্ত্বচর্যাবতার’ গ্রন্থের দু’টি শ্লোকের ভিত্তিতে তাঁকে ‘সূত্রসমুচ্চয়’ নামে আর একটি গ্রন্থের রচয়িতা বলে অনুমান করলেও, এই গ্রন্থের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিব্বতি ঐতিহ্যে শান্তিদেবের দার্শনিক মত প্রাসঙ্গিক-মাধ্যমিক মত নামে পরিচিত।৬৭ শান্তিদেবও সম্ভবত এই গ্রন্থদ্বয় নালন্দায় অবস্থানকালে রচনা করেছিলেন। ‘অর্থবিনিশ্চয়সূত্রনিবন্ধন’ সর্বাস্তিবাদী অভিধর্ম বিষয়ক ‘অর্থবিনিশ্চয়সূত্র’ গ্রন্থের সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ। এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির পুস্পিকায় লেখক বীর্যশ্রীদত্ত পালবংশীয় শাসক ধর্মপালের (রাজত্বকাল ৭৭৪-৮০৬ সাধারণাব্দ) শাসনামলে নালন্দা বিহারে এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন বলে উল্লিখিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে নালন্দায় সর্বাস্তিবাদী অভিধর্ম শাস্ত্রের চর্চা অষ্টম শতক সাধারণাব্দের শেষ দিকেও অব্যাহত ছিল।৬৮    

নবম শতকের নালন্দা

নবম শতক সাধারণাব্দের নালন্দায় জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় পালবংশীয় শাসক দেবপালের (রাজত্বকাল ৮০৬-৮৪৫ সাধারণাব্দ) ৩৫তম (বা ৩৯তম) রাজ্যবর্ষে মুদ্গগিরি জয়স্কন্ধাবার থেকে জারি করা একটি তাম্রশাসন থেকে। ১৯২১ সালে নালন্দায় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের সময় হীরানন্দ শাস্ত্রী ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের নকশার ১ সংখ্যক বিহার থেকে সংস্কৃত ভাষায় সিদ্ধমাতৃকা লিপিতে উত্কীর্ণ এই লেখটি আবিষ্কার করেন। লেখটিতে সুবর্ণদ্বীপের (সুমাত্রা) শাসক বালপুত্রদেবের অনুরোধে দেবপাল কর্তৃক তাঁর নির্মিত নালন্দায় একটি বিহারের ভিক্ষুদের আহার, বস্ত্র, ঔষধি, উপাসনা সামগ্রী, বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা ও বিহারের মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক নির্বাহের উদ্দেশে ৫টি গ্রামের রাজস্ব দানের উল্লেখ রয়েছে। তাম্রশাসনে গ্রহীতা ভিক্ষুসংঘকে ‘চাতুর্দিশ-আর্যভিক্ষুসংঘ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।৬৯ সাধারণাব্দের সপ্তম শতকে বর্তমান ইন্দোনেশিয়ায় শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এই অঞ্চল থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নালন্দায় শিক্ষা গ্রহণ করতে আসতে শুরু করেন। নবম শতকের প্রথমার্ধে সুমাত্রার শৈলেন্দ্রবংশীয় শাসকের এই ভিক্ষুদের জন্য পৃথক আবাসস্থলের নির্মাণের অনুরোধ তৎকালীন নালন্দায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী ভিক্ষুদের সংখ্যাধিক্যের ইঙ্গিত বহন করে।

নালন্দার নিকটবর্তী হিলসা গ্রাম থেকে প্রাপ্ত তারা দেবীর একটি প্রস্তর প্রতিমার পাদপীঠে উৎকীর্ণ দেবপালের ২৫তম (বা ৩৫তম) রাজ্যবর্ষের সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটি লেখে নালন্দা মহাবিহারের বহুশ্রুত বিদ্বান মঞ্জুশ্রীদেবের শিষ্য গৃহী উপাসক গঙ্গাধর তাঁর আচার্যের উল্লেখ করেছেন।৭০ নালন্দা থেকে প্রাপ্ত একটি বুদ্ধ প্রতিমার পাদপীঠে একটি তারিখবিহীন সংস্কৃত লেখ উত্কীর্ণ করা আছে। লিপির ছাঁদ দেখে আধুনিক বিদ্বানরা লেখটি দেবপালের আমলের বলে অনুমান করেছেন। এই লেখটি নালন্দা মহাবিহারের সর্বাস্তিবাদী ভিক্ষু মঞ্জুশ্রীবর্মনের প্রশস্তি।৭১ দেবপালের আমলের এই দু’টি লেখে উল্লিখিত মঞ্জুশ্রীদেব ও মঞ্জুশ্রীবর্মন একই ব্যক্তি কিনা জানা যায়নি। বিহার শরীফের কাছে ঘোষরাবাঁ থেকে প্রাপ্ত দেবপালের আমলের একটি  সংস্কৃত প্রস্তরফলক লেখে নগরহার (বর্তমান আফগানিস্তানের ননগরহার) অঞ্চলের অধিবাসী বীরদেবকে নালন্দার পরিপালনের দায়িত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রশস্তি লেখে বীরদেব সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাঁর জন্ম ব্রাহ্মণ পরিবারে; সমগ্র বেদ ও শাস্ত্র অধ্যয়নের পর তিনি কণিষ্ক মহাবিহারের আচার্য সর্বজ্ঞশান্তির নির্দেশে তপস্যা করেন। যশোবর্মপুর বিহারে দীর্ঘকাল অবস্থানের সময় তিনি দেবপালের দ্বারা পূজিত হয়েছিলেন বলে উল্লিখিত হয়েছে। এই লেখ থেকে নবম শতকে পালবংশীয় শাসকদের নিযুক্ত নালন্দা মহাবিহারের প্রশাসকদের সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়।৭২ বুদ্ধজ্ঞানপাদ রচিত সংস্কৃত ‘মহাযানলক্ষণসমুচ্চয়’ গ্রন্থের নবম শতকের তিব্বতি অনুবাদের পুষ্পিকায় নালন্দা মহাবিহারে ভারতীয় বিদ্বান কর্ণপতি ও তিব্বতি অনুবাদক প্রজ্ঞাসিংহ মিলে অনুবাদ গ্রন্থটি রচনা করেছেন বলে উল্লিখিত হয়েছে।৭৩ নবম শতকের নালন্দায় মহাযান ধর্মতত্ত্ব নিয়ে চর্চা সম্পর্কে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।               

নালন্দার প্রত্নক্ষেত্র থেকে উৎখননে প্রাপ্ত এবং বর্তমানে নালন্দার সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত বহুসংখ্যক প্রস্তর, স্টাকো  ও ব্রোঞ্জের বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবদেবীর প্রতিমার অধিকাংশই পালবংশীয়দের শাসনকালে নির্মিত। প্রত্নতত্ত্ববিদ অমলানন্দ ঘোষের মতে, নালন্দা মহাবিহারে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবদেবীর প্রতিমাসমূহের শুধু উপাসনা হতো এমন নয়, তাঁদের প্রতিমাগুলিও এখানেই নির্মিত হয়েছিল।৭৪ সাধারণাব্দের অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত পালবংশীয় শাসকদের রাজত্বকালে নালন্দায় প্রতিমা নির্মাণ শিল্পের চর্চা যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করেছিল। বিশ শতকের শুরু থেকেই আধুনিক বিদ্বানরা পাল যুগের নালন্দার সঙ্গে জাভার সমকালীন ব্রোঞ্জের বৌদ্ধ প্রতিমাগুলির প্রভূত মিল খুঁজে পান। তাঁদের অনুমান পালবংশীয়দের রাজত্বকালে নালন্দায় নির্মিত ব্রোঞ্জের বৌদ্ধ প্রতিমা ভারতের বাইরে নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলংকা ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করা হতো।৭৫ অমলানন্দ ঘোষ তাঁর নালন্দা নিয়ে লেখা বইতে সঙ্গত কারণেই অনুমান করেছেন এই কালপর্বে ধাতু ঢালাইয়ের পদ্ধতি নালন্দার পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল।৭৬ নালন্দায় ১৯৩৬-১৯৩৭ মরশুমে উৎখননের সময় ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের নকশায় ১৩ সংখ্যক চৈত্য বলে চিহ্নিত সৌধের উত্তর দিকে একটি ইটের তৈরি ধাতু বিগলন চুল্লি খুঁজে পাওয়া যায়। চুল্লিটি বর্গাকার, চারটি পৃথক প্রকোষ্ঠে বিভক্ত এবং প্রত্যেক প্রকোষ্ঠে অগ্নিসংযোগ ও বায়ু নির্গমনের জন্য দু’টি পৃথক নালি নির্মিত। এই চুল্লি থেকে পাওয়া দগ্ধ ধাতুখণ্ড ও ধাতুমল থেকে বোঝা যায়, নালন্দার ধাতব প্রতিমা ঢালাইয়ের কাজে এই চুল্লি ব্যবহৃত হত।৭৭

পাল যুগের নালন্দায় যে শুধু প্রতিমা নির্মাণ হতো তাই নয়, নালন্দার বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যে ধর্মীয় চিত্র অঙ্কনেরও চর্চা করতেন তার নিদর্শন অনেক দিন আগেই পাল যুগের চিত্রিত পুথি থেকে পাওয়া গিয়েছে। পাল যুগের এই পুথিচিত্রগুলি সম্পর্কে শিল্প ইতিহাসবিদ নীহার রঞ্জন রায় তাঁর ১৯৫৭ সালে লেখা একটি নিবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন, এই অনুচিত্রগুলি আসলে ক্ষুদ্রাকার ভিত্তিচিত্র; এর সঙ্গে পারস্য, চীন, মধ্যযুগের ইউরোপ বা অন্ত-মধ্যযুগের ভারতের বই চিত্রায়নের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পর্যায়ের কোনও মতেই তুলনা করা যায় না। এই চিত্র শৈলীর সঙ্গে আদিম বা লোকচিত্র শৈলীরও কোনও সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে এই চিত্রগুলি ছোট আকারে আঁকা বৃহদাকার ভিত্তিচিত্র।৭৮ দীর্ঘদিন পর্যন্ত পাল যুগের কোনও ভিত্তিচিত্রের সন্ধান না পাওয়া যাওয়ায় নীহার রঞ্জন রায়ের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি। অমলানন্দ ঘোষ ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের নকশার ১৪ সংখ্যক মন্দিরের এক বিশাল বুদ্ধ প্রতিমার পাদপীঠের কুলুঙ্গিতে অঙ্কিত ভিত্তিচিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন, ঐ ভিত্তিচিত্রটিতে একটি হরিণ ও সিংহ আঁকা ছিল। কিন্তু, পরবর্তীকালে এর কোনও অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।৭৯ অবশেষে, ১৯৭৫-১৯৭৬ মরশুমে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের সরাই ঢিবিতে উৎখননের সময় পঞ্চায়তন মন্দিরের গর্ভগৃহে বুদ্ধ প্রতিমার প্রস্তর পাদপীঠের গায়ে দু’টি সারিতে অঙ্কিত ভিত্তিচিত্রের অংশবিশেষ খুঁজে পাওয়া যায়।৮০ এর ফলে পাল যুগের নালন্দায় ভিত্তিচিত্র অঙ্কনের শৈলী সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা অর্জন সম্ভব হয়। এই ভিত্তিচিত্র পাল যুগের ভিত্তিচিত্র শৈলীর এখনও পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র নিদর্শন।৮১ এরপর, ১৯৭৭-১৯৭৮ মরশুমে উৎখননের সময় ঐ মন্দিরের গর্ভগৃহের উত্তর, দক্ষিণ ও পিছন দিকের অভ্যন্তরীণ দেয়ালগুলির গায়ে সাদা চুনের আস্তরের উপর নীল (বা কালো) রঙের নিরবচ্ছিন্ন ফুলের নকশা খুঁজে পাওয়া যায়।৮২ প্রস্তর পাদপীঠের গায়ে আঁকা ভিত্তিচিত্রের দু’টি সারি অষ্টদল ফুলের নকশা দিয়ে বিভক্ত। সাদা পৃষ্ঠপটের উপর লাল, নীল, কালো ও গেরুয়া রঙে চিত্রগুলি অঙ্কিত। উপরের সারিতে উপবিষ্ট দ্বিভুজ অবলোকিতেশ্বর ও নীচের সারিতে বৌদ্ধ দেবতা জম্ভল ও তাঁর দুই দিকে বৌদ্ধ সাহিত্যে বর্ণিত সাতটি রত্নের চিত্র আঁকা হয়েছে বলে বুঝতে পারা যায়।৮৩

এখনও পর্যন্ত পাল যুগের নালন্দায় কাপড়ের উপর আঁকা চিত্রের কোনও নিদর্শন খুঁজে না পাওয়া গেলেও দেং চুন কর্তৃক ১১৬৭ সাধারণাব্দে সংকলিত চীনা ভাষায় শিল্প বিষয়ক ‘হুয়া জি’ গ্রন্থের দশম অধ্যায়ে নালন্দা মহাবিহারে ভারতে তৈরি কাপড়ের উপর বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব ও অর্হৎদের চিত্র অঙ্কনের পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। এই চিত্রগুলি আঁকার জন্য লাল, সাদা, কালো, সবুজ ও হলুদ রং ব্যবহার করা হতো।৮৪ ‘হুয়া জি’ গ্রন্থের বর্ণনা থেকে নালন্দায় পাল যুগে কাপড়ের উপর অঙ্কিত বৌদ্ধ চিত্রমালাকে মধ্যযুগের তিব্বতে অঙ্কিত বৌদ্ধ থাংকা চিত্রের পূর্বসূরি বলে অনুমান করা যায়। 

দশম-দ্বাদশ শতকে নালন্দা

নালন্দার প্রত্নক্ষেত্রের একটি নিবেদন স্তূপের গায়ে উত্কীর্ণ গুর্জর প্রতিহার বংশীয় শাসক প্রথম মহেন্দ্রপালের (রাজত্বকাল ৮৮৫-৯১০ সাধারণাব্দ) আমলের একটি সংস্কৃত লেখের পাঠোদ্ধারের পর থেকে জানা যায়, দশম শতক সাধারণাব্দের গোড়ার দিকে (অথবা, যদি এই লেখটি পালবংশীয় শাসক প্রথম মহেন্দ্রপালের আমলের হয়, তাহলে নবম শতকের মাঝামাঝি) নির্মিত ঐ চৈত্যটি নির্মাণ করিয়েছিলেন প্রভাকরমতির শিষ্য যতি বুদ্ধাকর। এই লেখে বৌদ্ধ সংস্কৃত তান্ত্রিক গ্রন্থ ‘ভদ্রচরীপ্রণিধান’ থেকে একটি শ্লোক (৪৬) উদ্ধৃত হয়েছে।৮৫ নালন্দা মহাবিহারে  মগধের বৌদ্ধ বিদ্বান ধর্মদেব (?-১০০১ সাধারণাব্দ) দশম শতকে শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাপ্রদান করেছিলেন। ৯৭১ সাধারণাব্দে তিনি তাঁর ভাই ধর্মলক্ষণ ও দুই শিষ্যকে নিয়ে চীনের পথে রওনা হন, কিন্তু কেবল তিনি ও তাঁর ভাই চীনে পৌঁছাতে সক্ষম হন। ধর্মদেব ৪৪টি বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থ সংস্কৃত থেকে চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখনীয় ‘সুবাহুপরিপৃচ্ছ’ গ্রন্থের আর একটি চীনা অনুবাদ এবং উষ্ণীষবিজয়ধারণীসূত্র ও বেশ কিছু ক্ষুদ্র ধারণী গ্রন্থের চীনা অনুবাদ।৮৬ অনুমান করা যায়, দশম শতকে নালন্দায় তন্ত্র চর্চার যথেষ্ট প্রাবল্য ছিল। দশম শতক সাধারণাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী জিয়ে (কিয়ে) ভারত ভ্রমণে আসেন, তিনি নালন্দা মহাবিহারেও অবস্থান করেছিলেন, তবে শুধু সব বিহারের দ্বার পশ্চিম দিকে এই তথ্য ছাড়া তাঁর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে মহাবিহার সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি।৮৭

নালন্দার প্রত্নক্ষেত্র থেকে বৌদ্ধ আচার্য বিপুলশ্রীমিত্রের প্রশস্তিমূলক একটি শিলালেখের দু’টি ভগ্নাংশ ১৯২৮-১৯২৯ এবং ১৯২৯-১৯৩০ মরশুমে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের উৎখননের সময় পাওয়া যায়। উত্কীর্ণ লিপির শৈলীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে প্রত্নতত্ত্ববিদ ননী গোপাল মজুমদার তারিখবিহীন এই লেখের কাল দ্বাদশ শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধ বলে অনুমান করেছেন। এই লেখে উল্লিখিত বিপুলশ্রীমিত্রের ‘মিত্র’দের জন্য, অর্থাৎ তাঁর নিজের সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের জন্য প্রদত্ত বিহারটি ননী গোপাল মজুমদারের অনুমান নালন্দায় অবস্থিত।৮৮ এই লেখটি থেকে অনুমান করা যায়, দ্বাদশ শতকে নালন্দায় বিভিন্ন বৌদ্ধ আচার্যরা গুরু-শিষ্য পরম্পরায় পৃথকভাবে বৌদ্ধ শাস্ত্রচর্চা করতেন।

লামা তারনাথের ১৬০৮ সাধারণাব্দে লেখা ভারতে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ ও মঙ্গোলীয় বৌদ্ধ বিদ্বান সুমপা খনপো ইয়েশে পালজোর-এর (১৭০৪-১৭৮৮ সাধারণাব্দ) ১৭৪৮ সাধারণাব্দে লেখা বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসগ্রন্থ ‘পাগ সাম জোন জাং’ (অর্থাৎ কল্পদ্রুম) গ্রন্থে নালন্দা মহাবিহারের গ্রন্থভাণ্ডার সম্পর্কে একটি বিবরণ পাওয়া যায়। এই বিবরণ অনুযায়ী নালন্দা মহাবিহারের অভ্যন্তরে ধর্মগঞ্জ নামে পরিচিত একটি অংশে গ্রন্থভাণ্ডারগুলি অবস্থিত ছিল। এই গ্রন্থভাণ্ডার রত্নসাগর, রত্নোদধি ও রত্নরঞ্জক (বা রত্নরণ্ডক) নামের ধর্মগঞ্জের ৩টি বহুতল মন্দির জুড়ে ব্যাপ্ত ছিল। রত্নোদধি মন্দিরটি ৯টি তলবিশিষ্ট ছিল। এর নবম তলে মহাযানী ‘প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্র’ ও তান্ত্রিক ‘গুহ্যসমাজতন্ত্র’ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিসমূহ সংরক্ষিত ছিল।৮৯ এই বিবরণের সত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব নয়, তবে নিঃসন্দেহে পালবংশীয়দের শাসনকালে নালন্দা মহাবিহারে বহুসংখ্যক পাণ্ডুলিপি লিপিবদ্ধ, চিত্রিত ও সংগৃহীত হতো। পালবংশীয় শাসকদের আমলে নালন্দায় লিপিবদ্ধ ও চিত্রিত কিছু পুথির প্রতিলিপি আজও বিদ্যমান, যেমন, প্রথম মহীপালের ষষ্ঠ রাজ্যবর্ষে লেখা ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’, নয়পালের চতুর্দশতম রাজ্যবর্ষে লেখা ‘ধারণীসংগ্রহ’ এবং রামপালের পঞ্চদশতম রাজ্যবর্ষে লেখা ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’।৯০ নালন্দায় লিপিবদ্ধ বা সংগৃহীত পাণ্ডুলিপিগুলির সংরক্ষণের জন্য অবশ্যই এক বা একাধিক মন্দিরের (বা বিহারের) প্রয়োজন ছিল। তবে, প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের মাধ্যমে নালন্দার মহাবিহারের গ্রন্থাগারের অবস্থান নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।

ত্রয়োদশ শতক – নালন্দার গোধূলিকাল

নালন্দার গোধূলিকাল নিয়ে অন্যত্র ৯১ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি, এখানে তার পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই। ত্রয়োদশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে আগত ছোইজে পাল-এর নাম-থর অর্থাৎ জীবনী গ্রন্থে সম্ভবত নালন্দা মহাবিহারের জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে শেষ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাওয়া যায়। ছোইজে পাল ১২৩৫ সাধারণাব্দের এপ্রিল মাস থেকে ১২৩৬ সাধারণাব্দের মার্চ মাস পর্যন্ত নালন্দায় অবস্থান করেন। নালন্দায় তখন আচার্য রাহুলশ্রীভদ্রের কাছে ৭০ জন শিষ্য শিক্ষাগ্রহণ করতেন। রাহুলশ্রীভদ্র তাঁর ব্যাকরণের প্রগাঢ় জ্ঞানের জন্য জ্ঞাত ছিলেন।৯২ ছোইজে পাল রাহুলশ্রীভদ্রের কাছে ব্যাকরণ ও অশ্বঘোষের রচনা বলে জ্ঞাত দশম শতক সাধারণাব্দে রচিত ‘গুরুপঞ্চাশিকা’ নামের একটি তান্ত্রিক গ্রন্থ ঐ গ্রন্থের সংস্কৃত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ সমেত অধ্যয়ন করেন।৯৩ এখানে উল্লেখ্য ‘গুরুপঞ্চাশিকা’ গ্রন্থের এখনও পর্যন্ত একমাত্র জ্ঞাত সংস্কৃত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ ‘গুর্বারাধনাপঞ্জিকা’ ছোইজে পাল-এর নালন্দায় আগমনের পরবর্তীকালে রচিত।৯৪ ছোইজে পাল-এর জীবনী গ্রন্থ থেকে বোঝা যায় নালন্দার শেষ দিনগুলিতে জ্ঞানচর্চা ব্যাকরণ ও তন্ত্রচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

শেষকথন

আদি-মধ্যযুগের ভারতে বৌদ্ধ মহাবিহারগুলির জ্ঞানচর্চার অভিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। নালন্দা মহাবিহারের আচার্য ও তাঁর শিষ্যদের বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থ বিনয় ও অভিধর্ম চর্চা, বৌদ্ধ দর্শন চর্চা, সংস্কৃত ব্যাকরণ চর্চা, তান্ত্রিক সাধনার বিভিন্ন দিকে নিয়ে চর্চা, পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি লিখন বা প্রতিমা নির্মাণ – সবই নির্ভরশীল ছিল পৃষ্ঠপোষকদের চাহিদার উপর। শাসকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির অধিবাসীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ ছিল এই মহাবিহারের আয়ের প্রধান উৎস। নালন্দার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকার মিথোজীবিতার প্রকৃতি বুঝতে নালন্দার প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম উত্কীর্ণ সিলগুলি যথেষ্ট সহায়তা করে। অধিকাংশ পোড়ামাটির সিলগুলিতে দেখা গিয়েছে দু’ পাশে দু’টি পৃথক সংস্থার সিলের অস্তিত্ব বিদ্যমান – এক পাশে গ্রামের প্রশাসনিক সিল ও অন্য পাশে চাতুর্দিশ-আর্য-ভিক্ষুসংঘের সিল। এই সিলগুলি বা পূর্বে উল্লিখিত দেবপালের তাম্রশাসন থেকে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, নালন্দা মহাবিহারের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহের প্রশাসনিক দায়িত্ব সেখানকার চাতুর্দিশ-আর্য-ভিক্ষুসংঘের শ্রমণদের উপর অর্পিত ছিল।৯৫ মূলসর্বাস্তিবাদী নিকায়ের বিনয়ের অন্তর্গত ‘বিনয়বিভঙ্গ’ গ্রন্থের নির্দেশ এবং সাঁচি স্তূপ থেকে প্রাপ্ত সাধারণাব্দের পঞ্চম শতকের একটি সংস্কৃত শিলালেখ পাঠ করলে বোঝা যায় নালন্দার মতো বৌদ্ধ বিহারগুলিতে নির্মাণকার্য বা মেরামতের জন্য গৃহী উপাসকদের দানের অর্থ বা সম্পদ সেই বিহারের চাতুর্দিশ-আর্য-ভিক্ষুসংঘের একটি ‘অক্ষয় নীবী’ অর্থাৎ, স্থায়ী ভাণ্ডারে জমা করা হতো এবং বিহারগুলি সেই সঞ্চিত অর্থ বা সম্পদ ঋণ দিয়ে সুদের অর্থ উপার্জন করত। ঋণ দেওয়ার জন্য বিহার ও গ্রহীতার মধ্যে লিখিত চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হতো। এই চুক্তিপত্রে বিহারের কর্তৃপক্ষের নাম, ঋণগ্রহীতার নাম, ঋণের বিবরণ ও বৃদ্ধির (সুদের) পরিমাণের উল্লেখ করা হতো।৯৬ নালন্দা মহাবিহারের ক্ষেত্রে, কীভাবে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি সংগৃহীত সম্পদ এবং বিহারের সঞ্চিত সম্পদ ঋণ দিয়ে উপার্জিত অর্থ চাতুর্দিশ-আর্য-ভিক্ষুসংঘের তহবিল থেকে আচার্যগণ ও তাঁদের শিষ্যদের মধ্যে আবণ্টিত হতো, এবং বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানচর্চার উপর পৃষ্ঠপোষকদের দানের কী প্রভাব ছিল সেই সম্পর্কে এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।

টীকা

  1. “নালন্দই পাড়ই চউদ চউমাস সুণীজই/ হবড়া লোক প্রসিদ্ধ তে বড়গাম কহীজই/ সোল প্রাসাদ তিহাঁ অছই জিনবিম্ব নমীজই।” – সংশোধক (সম্পাদক) বিজয়ধর্মসূরি, ‘প্রাচীন তীর্থমালা সংগ্রহ, ভাগ ১ লো’; ভাবনগর: অমৃতলাল ছগনলাল ও অনোপচন্দ নরসিংহদাস, ১৯২১, পৃ. ১৭; ইংরেজি ভাষান্তরের জন্য দেখুন: Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material, Memoirs of the Archaeological Survey of India No. 66’; Calcutta: Manager, Government of India Press, 1942, p. 4. 
  2. “বাহিরি নালন্দো পাড়ো সুণয়ো তস পুন্য পবাড়ো/ বীর চউদ রহ্যা চউমাস হবড়া বড়গাম নিবাস।” -সংশোধক (সম্পাদক) বিজয়ধর্মসূরি, ‘প্রাচীন তীর্থমালা সংগ্রহ, ভাগ ১ লো’; ভাবনগর: অমৃতলাল ছগনলাল ও অনোপচন্দ নরসিংহদাস, ১৯২১, পৃ. ৮; ইংরেজি ভাষান্তরের জন্য দেখুন: Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material, Memoirs of the Archaeological Survey of India No. 66’; Calcutta: Manager, Government of India Press, 1942, p. 4.
  3. Alexander Cunningham, ‘Four Reports Made During the Years 1862-63-64-65, Vol. I’; Simla: Government Central Press, 1871, p. 28.
  4. পধান সংসোধক ভিক্খু জগদীসকস্সপ, ‘বিনয়পিটকে মহাবগ্গপালি’; বিহার রাজকীয় পালি পকাসন মণ্ডল, ১৯৫৬, পৃ. ১০০।
  5. পধান সংসোধক ভিক্খু জগদীসকস্সপ, ‘বিনয়পিটকে চুল্লবগ্গপালি’; বিহার রাজকীয় পালি পকাসন মণ্ডল, ১৯৫৬, পৃ. ৬৮।
  6. Nalinaksha Dutt edited, ‘Gilgit Manuscripts, Vol. III, Part 3’; Calcutta: Calcutta Oriental Press Limited, 1943, p. 99.
  7. John Marshall, ‘Taxila: An Illustrated Account of Archaeological Excavations Carried Out At Taxila under the Orders of the Government of India between the Years 1913 and 1934, Vol. I’; Delhi: Motilal Banarsidass, 1975, pp. 233-234.
  8. Gregory Schopen, ‘Buddhist Monks and Business Matters: Still More Papers on Monastic Buddhism in India’; Honolulu: University of Hawaii Press, 2004, pp. 193-218.
  9. Hira Nand Shastri, “Nalanda in Ancient Literature” in ‘Proceedings and Transactions of the Fifth Indian Oriental Conference, November 19, 20, 21 and 22, 1928, Vol. I’; Lahore: University of the Panjab, 1930, pp. 393-398.
  10. পধান সংসোধক ভিক্খু জগদীসকস্সপ, ‘সুত্তপিটকে দীঘনিকায়পালি (১. সীলক্খন্ধবগ্গো)’; বিহার রাজকীয় পালি পকাসন মণ্ডল, ১৯৫৮, পৃ. ১৮৩।
  11. J.J. Jones translated, ‘The Mahāvastu, Vol. I’; London: Luzac & Company, 1949, p. xi.
  12. J.J. Jones translated, ‘The Mahāvastu, Vol. III’; London: Luzac & Company, 1956, pp. 56-57.
  13. নেমীচন্দ বান্ঠিয়া ও পারসমল চণ্ডালিয়া সম্পাদিত, ‘সূয়গড়াংগ সূত্র (দ্বিতীয় শ্রুতস্কন্ধ)’; জোধপুর: শ্রী অখিল ভারতীয় সুধর্ম জৈন সংস্কৃতি রক্ষক সংঘ, তৃতীয় আবৃত্তি, ২০০৫, পৃ. ১৮৮।
  14. বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, ‘জৈন আগম-শাস্ত্রের অন্তর্গত ভদ্রবাহু-রচিত কল্পসূত্র’; কলিকাতা: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫৩, পৃ. ১০০।
  15. জেমস লেগ, তাঁর অনুবাদে ‘নাল’ কথাটি ব্যবহার করেছেন, এবং এই অনুবাদ মূলানুগ; দেখুন: James Legge translated, ‘A Record of Buddhist Kigdoms: Being An Account by The Chinese Monk Fā-Hien of His Travels in India and Ceylon (A.D. 399-414) in Search of The Buddhist Books of Discipline’; Oxford: The Calendron Press, 1886, p. 81। পরবর্তীকালে হারবার্ট গাইলস, তাঁর অনুবাদে ‘নাল’-এর পরিবর্তে ‘নালন্দা (বরাগং)’ কথাটি ব্যাবহার করেছেন; দেখুন: H.A. Giles re-translated, ‘The Travels of Fa-hsien (399-414 A.D.), or Record of the Buddhist Kingdoms’; Cambridge: Cambridge University Press, 1923, p. 49। সাম্প্রতিককালে লি রংজি তাঁর অনুবাদে ‘নাল’-এর পরিবর্তে ‘কালপিনাক’ কথাটি ব্যাবহার করেছেন; দেখুন: “The Journey of the Eminent Monk Faxian (Taisho Volume 51, Number 2085)” in ‘Lives of Great Monks and Nuns’; Berkeley, California: Numata Center for Buddhist Translation and Research, 2002, p. 193।
  16. Chandra Shekhar Prasad, “Nalanda vis-à-vis the Birthplace of Śāriputra” in ‘East and West’, December 1988, Vol. 38, No. ¼; Rome: Istituto Italiano per l’Africa e l’Oriente, 1988, pp. 175-188.
  17. এখানে জুয়ানজাং-এর বিবরণের তিনটি ইংরেজি অনুবাদেরই সাহায্য নেওয়া হয়েছে, অবশ্য এই অনুবাদগুলির মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নেই। দেখুন: Li Rongxi, ‘The Great Tang Dynasty Record of The Western Regions (Taishō Volume 51, Number 2087)’; Moraga, California: BDK America, 1996, pp. 248-250। আরও দেখুন: Samuel Beal, ‘Si-Yu-Ki, Buddhist Record of The Western World: Translated from The Chinese of Hiuen Tsiang (A.D. 629), Vol. II’; London: Trübner & Co., 1884, pp. 167-170; এবং Thomas Watters, ‘On Yuan Chwang’s Travels in India, Vol. II’; London: Royal Asiatic Society, 1905, pp. 164-166।
  18. Li Rongxi, ‘The Great Tang Dynasty Record of The Western Regions’, pp. 251-252। আরও দেখুন: Samuel Beal, ‘Si-Yu-Ki, Buddhist Record of The Western World, Vol. II’, pp. 172-174 এবং Thomas Watters, ‘On Yuan Chwang’s Travels in India, Vol. II’; London: Royal Asiatic Society, 1905, pp. 170-171।
  19. ইজিং-এর বিবরণের লতিকা লাহিড়ীর ইংরেজি অনুবাদ ও শভান-এর ফরাসি অনুবাদের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। যেখানে পার্থক্য আছে, সেখানে বন্ধনীর মধ্যে শভান-এর অনুবাদ উল্লেখ করা হয়েছে। দেখুন: Latika Lahiri, ‘Chinese Monks in India: Biography of Eminent Monks who went to the Western World in Search of the law during the Great Tang Dynasty by I-Ching’; Delhi: Motilal Banrasidass, 1995, pp. 57-59 এবং Édouard Chavannes, ‘Mémoire composé a l’époque de la grande dynastie T’ang sur les religieux éminents qui allèrent chercher la loi dans les pays d’Occident par I-Tsing’; Paris: Ernest LeRoux, 1894, pp. 93-95।
  20. ইজিং-এর বিবরণের লতিকা লাহিড়ীর ইংরেজি অনুবাদ ও শভান-এর ফরাসি অনুবাদের জন্য দেখুন: Latika Lahiri, ‘Chinese Monks in India’, p. 51-52 এবং Édouard Chavannes, ‘Mémoire’, pp. 84-86।
  21. George Roerich translated, ‘Biography of Dharmasvāmin (Chag lo tsa-ba Chos-rje-Pal), A Tibetan Monk Pilgrim’; Patna: K.P. Jayaswal Research Institute, 1959, pp. 90-91.
  22. Sukumar Dutt, ‘Buddhist Monks and Monasteries: Their History and Their Contribution to Indian Culture’; London: George Allen and Unwin Ltd, 1962, p. 319.
  23. Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material’, pp. 36-45.
  24. Atul Kumar Verma and Rajat Sanyal, “Discovery of a Buddhist Monastery at Telhara (Bihar)” in ‘Monthly Bulletin, Vol. XLV, No.9’, September 2016’; Kolkata: The Asiatic Society, pp. 10-12.
  25. Li Rongxi, ‘The Great Tang Dynasty Record of The Western Regions’, pp. 97-100। আরও দেখুন: Samuel Beal, ‘Si-Yu-Ki, Buddhist Record of The Western World: Translated from The Chinese of Hiuen Tsiang (A.D. 629), Vol. I’; London: Trübner & Co., 1884, pp. 167-171।
  26. Li Rongxi, ‘The Great Tang Dynasty Record of The Western Regions’, p. 217। আরও দেখুন: Samuel Beal, ‘Si-Yu-Ki, Buddhist Record of The Western World, Vol. II’, p. 118 এবং Thomas Watters, ‘On Yuan Chwang’s Travels in India, Vol. II’; London: Royal Asiatic Society, 1905, p. 115।
  27. Hirananda Sastri, “Nalanda Stone Inscription of the Reign of Yasovarmmadeva” in ‘Epigraphia Indica, Vol. XX (1929-30)’; Delhi: Manager of Publications, 1933, pp. 37-45.
  28. Alexander Cunningham, ‘Report of A Tour in Bihar and Bengal in 1879-80 from Patna to Sunargaon, Vol. XV’; Calcutta: Office of the Superintendent of Government Printing, 1882, pp. 165-166.
  29. B.K. Thapar edited, ‘Indian Archaeology 1973-74 – A Review’; New Delhi: Archaeological Survey of India, 1979, pp. 67-68.
  30. Vijayakanta Mishra, “A New Sanskrit Praśasti from Nālanda” in S.V. Sohoni edited ‘The Journal of the Bihar Research Society, Vol LVIII, January-December, 1972’; Patna: The Bihar Research Society, pp. 183-187.
  31. D.C. Sircar, “Nalanda Inscription of King Prathamasiva” in P.R. Srinivasan edited, ‘Epigraphia Indica, Vol. XXXIX’; New Delhi: Director General, Archaeological Survey of India, 1981, pp. 117-122.
  32. Gouriswar Bhattacharya, “The Newly Discovered Buddhist Temple at Nalanda” in Janine Schotsmans and Maurizio Taddei edited ‘South Asian Archaeology 1983, Vol. 2’; Naples: Istituto Universitario Orinetale, Dipartimento Di Studi Asiatici, 1985, pp. 734-738.
  33. Rajat Sanyal, “Nalanda” in Abdul Momin Chowdhury and Ranabir Chakravarti edited ‘History of Bangladesh: Early Bengal in Regional Perspectives (up to c. 1200 CE), Vol. 1’; Dhaka: Asiatic Society of Bangladesh, 2018, p. 299.
  34. চারটি উৎস থেকে তথ্য সংগৃহীত: B.K. Thapar edited, ‘Indian Archaeology 1975-76 – A Review’; New Delhi: Archaeological Survey of India, 1979, pp. 8-9; B.K. Thapar edited, ‘Indian Archaeology 1976-77 – A Review’; New Delhi: Archaeological Survey of India, 1980, p. 13; B.K. Thapar edited, ‘Indian Archaeology 1977-78 – A Review’; New Delhi: Archaeological Survey of India, 1980, p. 16; B.K. Thapar edited, ‘Indian Archaeology 1978-79 – A Review’; New Delhi: Archaeological Survey of India, 1981, p. 67। একত্রে সম্পূর্ণ বিবরণের জন্য দেখুন: Gouriswar Bhattacharya, “The Newly Discovered Buddhist Temple at Nalanda”, pp. 719-722।
  35. Satis Chandra Vidyabhusana, ‘History of the Medieval School of Indian Logic’; Calcutta: University of Calcutta, 1909, p. 146.
  36. Hemchandra Raychaudhuri, ‘Political History of Ancient India: From the Accession of Parikshit to The Extinction of The Gupta Dynasty’; Calcutta: University of Calcutta, 1922, p. 289.
  37. H. Heras, “The Royal Patrons of the University of Nalanda” in The Journal of The Bihar Orissa Research Society, Vol. XIV, Part I, March, 1928; Patna: The Bihar Orissa Research Society, pp. 1-23.
  38. K.A. Nilakanta Sastri, “Nālandā” in ‘Journal of the Madras University, Vol. XIII, No. 2, July, 1941”; Madras: Madras University, pp. 149-156.
  39. “…[নালন্দা]য়াং-শ্রী-শক্রাদিত্য-কারিত-[বি]হারে-চাতুর্দিশ্যার্য-মহাভিক্ষুসংঘস্য”; দেখুন: Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material’, p. 38।
  40. Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material’, pp. 64-67.
  41. Ibid, pp. 67-69.
  42. অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, ‘গৌড়লেখমালা’; রাজসাহী: বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি, ১৯১২, পৃ. ১০১-১০৩।
  43. Hirakawa Akira (translated and edited by Paul Groner), ‘A History of Indian Buddhism: From Śākyamuni to Early Mahāyāna’; Honolulu: University of Hawaii Press, 1990, pp. 74-75.
  44. শুভাকরসিংহের চীনা জীবনীগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য দেখুন: Chou Yi-liang, “Tantrism in China” in ‘Harvard Journal of Asiatic Studies, Vol. 8, No. 3/4 (March 1945)’; Cambridge, Massachusetts: Harvard-Yenching Institute, 1945, pp. 251-272। শুভাকরসিংহের জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে দেখুন: Klaus Pinte, “Śubhākarasiṃha (637-735)” in Charles D. Orzech, Henrik H. Sørensen and Richard K. Payne edited, ‘Esoteric Buddhism and the Tantras in East Asia’; Leiden: Brill, 2011, pp. 339-341।
  45. D.R. Patil, ‘The Antiquarian Remains in Bihar’; Patna: K.P. Jayaswal Research Institute, 1963, pp. 321-322.
  46. এখানে মূলত জুয়ানজাং-এর জীবনী গ্রন্থের লি রংজি-র ১৯৯৫ সালের ইংরেজি অনুবাদকে অনুসরণ করা হয়েছে। দেখুন: Li Rongxi, ‘A Biography of the Tripiṭaka Master of the Great Ci’en Monastery of The Great Tang Dynasty: Translated from the Chinese of Sramana Huili and Shi Yancon (Taishō, Volume 50, Number 2053)’; Berkeley, California: Numata Center for Buddhist Translation and Research, 1995, pp. 94-95। এর সাথে লি ইউংশি-র ১৯৫৯ সালের ইংরেজি অনুবাদকেও তুলনার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে; দেখুন: Li Yung-Hsi, ‘The Life of Hsuan-Tsang: The Tripitaka Master of the Great Tzu En Monastery Compiled by Monk Hui-li’; Peking: The Chinese Buddhist Association, 1959, pp. 107-109। স্যামুয়েল বিলের ১৯১১ সালের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বিভিন্ন বিদ্যার সংস্কৃত নামগুলি গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু, এই দুই নতুন অনুবাদ পড়লে মনে হয় স্যামুয়েল বিলের অনুবাদ আদৌ মূলানুগ নয়; দেখুন: Samuel Beal, ‘The Life of Hiuen Tsiang by the Shaman Hwui Li’; London: Kegan Paul, Trench, Trübner & Co., 1911, p. 112।
  47. Li Rongxi, ‘A Biography of the Tripiṭaka Master of the Great Ci’en Monastery, p. 101। আরও দেখুন: Li Yung-Hsi, ‘The Life of Hsuan-Tsang’ p. 117 এবং Samuel Beal, ‘The Life of Hiuen Tsiang’, p. 121।
  48. Li Rongxi, ‘The Great Tang Dynasty Record of The Western Regions’, p. 250-251। আরও দেখুন: Samuel Beal, ‘Si-Yu-Ki, Buddhist Record of The Western World, Vol. II’, p. 171 এবং Thomas Watters, ‘On Yuan Chwang’s Travels in India, Vol. II’; London: Royal Asiatic Society, 1905, pp. 165, 168-169।
  49. David Seyfort Ruegg, ‘The Literature of The Madhyamaka School of Philosophy in India’; Wiesbaden: Otto Harrassowitz, 1981, pp. 52, 67.
  50. Ching Keng, “Dharmapāla: A Janus-Faced Interpreter of Yogācāra?” in William Edelglass, Pierre-Julien Harter and Sara McClintock edited ‘The Routledge handbook of Indian Buddhist philosophy’; New York: Routledge, 2023, p. 362.
  51. David Seyfort Ruegg, ‘The Literature of The Madhyamaka School of Philosophy in India’, p. 61.
  52. Roy Tzohar and Jowita Kramerin, “Sthiramati: A Yogācāra Commentator and Innovator” in William Edelglass, Pierre-Julien Harter and Sara McClintock edited ‘The Routledge handbook of Indian Buddhist philosophy’; New York: Routledge, 2023, p. 377.
  53. David Seyfort Ruegg, ‘The Literature of The Madhyamaka School of Philosophy in India’, p. 62.
  54. Stephen Hodge translated, ‘The Mahā-Vairocana-Abhisaṃbodhi-Tantra with Buddhaguhya’s Commentary’; Oxon: Routledge Curzon, 2003, pp. 11, 17-18.
  55. Robert H. Sharf, “Buddhist Veda and the Rise of Chan” in Yael Bentor and Meir Shahar edited, ‘Chinese and Tibetan Esoteric Buddhism’; Leiden: Brill, 2017, pp. 85-86, 86n2.
  56. এই তথ্য ইজিং-এর বিবরণের চীনা ভাষা থেকে কৃত দু’টি ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকা অংশ থেকে সংগৃহীত। দেখুন: Li Rongxi, ‘Buddhist Monastic Traditions of Southern Asia: A Record of The Inner Law Sent Home from The South Seas by Sramana Yijing (Taishō, Volume 54, Number 2125)’; Berkeley, California: Numata Center for Buddhist Translation and Research, 2000, pp. 1-2 এবং J. Takakusu, ‘A Record of The Buddhist Religion As Practised in India and The Malay Archipelago (A.D. 671-695) by I-Tsing’; Oxford: The Clarendon Press, 1896, pp. xxv-xxxviii।
  57. উত্তর ভারতের গুপ্ত ব্রাহ্মী থেকে ষষ্ঠ শতক সাধারণাব্দের শেষ দিকে সিদ্ধমাতৃকা লিপি উদ্ভূত হয়, দশম শতক সাধারণাব্দে পূর্ব ভারতে এই লিপি প্রত্ন-বাংলা বা গৌড়ী লিপিতে, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে দেবনাগরী লিপিতে পরিবর্তিত হয়। পূর্ব এশিয়ায় এই লিপি ‘সিদ্ধম’ নামে পরিচিত এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, তিব্বতি লিপিরও উদ্ভব সিদ্ধমাতৃকা লিপি থেকে। দেখুন: Richard Salomon, ‘Indian Epigrphy: A Guide to The Study of Inscriptions in Sanskrit, Prakrit, and the Other Indo-Aryan Languages’; Oxford: Oxford University Press, 1998, pp. 39-41, p.39 n. 112। খুব সম্ভবত ইজিং-এর সময় নালন্দা ও অন্যত্র শিক্ষার্থীদের এই লিপিতেই সংস্কৃত বর্ণমালা শিখতে হতো, কারণ বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ এই লিপিতেই লিপিবদ্ধ করা হতো।
  58. Li Rongxi, ‘Buddhist Monastic Traditions of Southern Asia: A Record of The Inner Law Sent Home from The South Seas’, pp. 145-154। আরও দেখুন: J. Takakusu, ‘A Record of The Buddhist Religion as Practised in India and The Malay Archipelago’, pp. 167-185; J.F. Staal edited, ‘A Reader on the Sanskrit Grammarians’; Cambridge, Massachusetts: The Massachusetts Institute of Technology Press, 1972, pp. 12-17।
  59. Li Rongxi, ‘Buddhist Monastic Traditions of Southern Asia: A Record of The Inner Law Sent Home from The South Seas’, pp. 93-102। আরও দেখুন: J. Takakusu, ‘A Record of The Buddhist Religion as Practised in India and The Malay Archipelago’, pp. 96-107।
  60. Li Rongxi, ‘Buddhist Monastic Traditions of Southern Asia: A Record of The Inner Law Sent Home from The South Seas’, pp. 10-12 । আরও দেখুন: J. Takakusu, ‘A Record of The Buddhist Religion as Practised in India and The Malay Archipelago’, pp. 6-9 ।
  61. Li Rongxi, ‘Buddhist Monastic Traditions of Southern Asia: A Record of The Inner Law Sent Home from The South Seas’, p. 63। আরও দেখুন: J. Takakusu, ‘A Record of The Buddhist Religion as Practised in India and The Malay Archipelago’, p. 65 ।
  62. Latika Lahiri, ‘Chinese Monks in India’, p. 10 এবং Édouard Chavannes, ‘Mémoire’, pp. 17-18।
  63. Latika Lahiri, ‘Chinese Monks in India’, p. 64 এবং Édouard Chavannes, ‘Mémoire’, p. 101।
  64. Hirananda Sastri, “Nalanda Stone Inscription of the Reign of Yasovarmmadeva”, p. 43.
  65. Satis Chandra Vidyabhusana, ‘History of the Medieval School of Indian Logic’, pp. 124, 129.
  66. David Seyfort Ruegg, ‘The Literature of The Madhyamaka School of Philosophy in India’, pp. 88-99.
  67. Ibid, pp. 82-86.
  68. N.H. Samtani edited, ‘The Arthaviniścaya-sūtra and Its Commentary (Nibandhana) (Written By Bhikṣu Vīryaśrīdatta of Śrī-Nālandāvihāra): Critically Edited and Annotated for the First Time with Introduction and Several Indices (Tibetan Sanskrit Works Series, Vol. XIII)’. Patna: K. P. Jayaswal Research Institute, 1971, pp. 1-172.
  69. Dines Chandra Sircar edited, ‘Select Inscriptions bearing on Indian History and Civilization: From the Sixth to the Eighteenth Century A.D.’, Vol. II; Delhi: Motilal Banarsidass, pp. 71-79। আরও দেখুন: Hirananda Shastri, “The Nalanda Copper-Plate of Devapaladeva” in ‘Epigraphia Indica, Vol, XVII, 1923-24’; Calcutta: Manager, Government of India Central Publication Branch, pp. 310-327 এবং N.G. Majumdar, ‘Nālandā Copper-Plate of Devapāladeva’; Rajshahi: The Varendra Research Society, 1926, pp. 1-31।
  70. Susan L. Huntington, ‘The “Pāla-Sena” Schools of Sculpture’; Leiden: E.J. Brill, 1984, pp. 209-210। আরও দেখুন: Surendranath Majumdar Sastri, “The Hilsa Statue Inscription of the Thirty-fifth Year of Devapala” in ‘Journal of the Bihar and Orissa Research Society, Vol. X, Part I & II’; Patna: The Bihar and Orissa Research Society, 1924, pp. 31-36 এবং Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material’, pp. 87-88।
  71. Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material’, p. 103.
  72. অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, ‘গৌড়লেখমালা’ পৃ. ৪৫-৫৪।
  73. Yoshiyasu Yonezawa, “Sanskrit Fragment of the Mahāyānalakṣaṇasammucaya” in ‘Journal of Research Society of Buddhism and Cultural Heritage, Vol. 1998, issue 7’; Tokyo: Research Society of Buddhism and Cultural Heritage, 1998, pp. 36-65.
  74. A. Ghosh, ‘A Guide to Nālandā’; Delhi: Manager of Publications, 1939, p. 21.
  75. J. Bernet Kempers, “The Bronzes of Nālandā and Hindu-Javanese Art” in ‘Bijdragen tot de Taal-, Land- en Volkenkunde van Nederlandsch-Indië’, 1933, Deel 90 (1933); Brill, pp. 1-88.
  76. A. Ghosh, ‘A Guide to Nālandā’, p. 23.
  77. Ibid, p. 18। আরও দেখুন: D.R. Patil, ‘The Antiquarian Remains in Bihar’, pp. 311-312।
  78. Nihar Ranjan Ray, “Painting” in R.C. Majumdar, A.D. Pusalkar and A.K. Majumdar edited, ‘The Struggle for Empire’, The History and Culture of the Indian People, Vol. V; Mumbai: Bharatiya Vidya Bhavan, 2001 [1957], p. 690.
  79. A. Ghosh, ‘A Guide to Nālandā’, p. 19.
  80. B.K. Thapar edited, ‘Indian Archaeology 1975-76 – A Review’; New Delhi: Archaeological Survey of India, 1979, pp. 8-9.
  81. Susan L. Huntington and John C. Huntington, ‘Leaves from the bodhi tree: the art of Pāla India (8th–12th centuries) and its international legacy’; Seattle and London: Dayton Art Institute in association with the University of Washington Press, 1990, p. 99.
  82. Gouriswar Bhattacharya, “The Newly Discovered Buddhist Temple at Nalanda”, p. 722; আরও দেখুন: B.K. Thapar edited, ‘Indian Archaeology 1977-78 – A Review’, p. 16।
  83. Gouriswar Bhattacharya, “The Newly Discovered Buddhist Temple at Nalanda”, pp. 722-724.
  84. Susan L. Huntington and John C. Huntington, ‘Leaves from the bodhi tree: the art of Pāla India (8th–12th centuries) and its international legacy’, pp. 100, 120 n.116; সম্পূর্ণ বর্ণনাটির চীনা ভাষা থেকে সাম্প্রতিকতম ইংরেজি অনুবাদের জন্য দেখুন: Robert J. Maeda translated, ‘Two Twelfth Century Texts on Chinese Painting’; Ann Arbor, Michigan: The University of Michigan Center for Chinese Studies, 1970, p. 65।
  85. Gregory Schopen, ‘Figments and Fragments of Mahāyāna Buddhism in India: More Collected Papers’; Honolulu: University of Hawaii Press, 2005 pp. 299-305; আরও দেখুন: Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material’, pp. 106-107।
  86. Charles D. Orzech, “Translation of Tantras and Other Esoteric Buddhist Scriptures” in Charles D. Orzech, Henrik H. Sørensen and Richard K. Payne edited, ‘Esoteric Buddhism and the Tantras in East Asia’; Leiden: Brill, 2011, p. 448; Tansen Sen, “The Revival and Failure of Buddhist Translations during the Song Dynasty” in ‘T’oung Pao: International Journal of Chinese Studies, Second Series, Vol. LXXXVIII, Fasc. 1/3’; Leiden: Brill, 2002, pp. 43-44.
  87. Edouard Huber, “L’itinéraire du pèlerin Ki Ye dans l’Inde” in ‘Bulletin de l’École française d’Extrême-Orient, Vol. 2, No. 3 (Juillet-Septembre1902)’; École française d’Extrême-Orient, 1902, p. 259.
  88. N.G. Majumdar, “Nalanda Inscription of Vipulasrimitra” in ‘Epigraphia Indica, Vol. XXI (1931-32)’; Delhi: Manager of Publications, pp. 97-101.
  89. Satis Chandra Vidyabhusana, ‘A History of Indian Logic (Ancient, Medieval and Modern Schools)’; Calcutta: University of Calcutta, 1921, p. 516.
  90. সরসীকুমার সরস্বতী, ‘পালযুগের চিত্রকলা’; আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৭৮, পৃ. ৩৭-৪৩।
  91. জয়ন্ত ভট্টাচার্য, “নালন্দার শেষ অধ্যায় – বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা”, ‘অতিকথা বনাম ইতিহাস’; কলকাতা: কাউন্টার এরা, ২০২২, পৃ. ১-১৩।
  92. George Roerich translated, ‘Biography of Dharmasvāmin (Chag lo tsa-ba Chos-rje-Pal), A Tibetan Monk Pilgrim’; Patna: K.P. Jayaswal Research Institute, 1959, p. vi.
  93. Ibid, p. 95.
  94. Peter-Daniel Szanto, “A new manuscript of the Gurupañcāśikā” in Nina Mirnig, Peter-Daniel Szanto and Michael Williams edited ‘Puṣpıkā: Tracing Ancient India, through Texts and Traditions, Contributions to Current Research in Indology’, Vol. 1; Oxford: Oxbow Books, 2013, p. 444n.
  95. Sayantani Pal, “Village Seals of Nalanda: Understanding Linkages between the Monastery and Its Environs” in ‘Pratna Samiksha: A Journal of Archaeology, Vol. 10, 2019’; Kolkata: Centre for Archaeological Studies & Training, Eastern India, pp. 95-104; আরও দেখুন: Hirananda Sastri, ‘Nalanda and its Epigraphic Material’, pp. 41-43।
  96. Gregory Schopen, ‘Buddhist Monks and Business Matters: Still More Papers on Monastic Buddhism in India’, pp. 45-54.

 

(নাম: জয়ন্ত ভট্টাচার্য , জন্ম: ২৫শে নভেম্বর, ১৯৬৩, বাবা মণি ভট্টাচার্য ছিলেন স্বাধীনতা পত্রিকার সাংবাদিক। বাবার কাছে নিবন্ধ লেখার হাতেখড়ি। জন্মস্থান: কলকাতা, পড়াশোনা: প্রথমে পাঠভবন, তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, স্নাতক। মেকানিক্যাল প্রযুক্তিবিদ্যার, কাজকর্ম: বিমান রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তিবিদ হিসাবে
তিন দশকের বেশি জীবিকা নির্বাহের পর এখন একই বিষয় নিয়ে শিক্ষকতা। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন যাবৎ মুম্বই প্রবাসী।
লেখালেখি: ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে নিবন্ধ
লেখার অভ্যাস অনেকদিনের। সামাজিক মাধ্যমে ও ছাপার অক্ষরে আত্মপ্রকাশ সাম্প্রতিক। এখনও পর্যন্ত লিটল ম্যাগাজিন আর সংবাদপত্রের মধ্যেই গণ্ডি। এই প্রথম সংকলিত নিবন্ধের বই হিসাবে আত্মপ্রকাশ।)

1 Comment

  1. Sibananda Pal says:

    অত্যন্ত সুচিন্তিত টিকা সহ প্রবন্ধ। ভীষণভাবে সমৃদ্ধ করেছে। লেখককে ধন্যবাদ জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *