ড: আবু সঈদ আহমেদ
আমরা উপমহাদেশের মানুষরা জাতপাত প্রথা সম্বন্ধে সকলের কম বেশি কিছু না কিছু জানি। এবং এটাও দেখে আসছি প্রায় প্রত্যেক অঞ্চলে, প্রত্যেক ভাষাভাষী বা জাতি গোষ্ঠীর, প্রত্যেক ধর্মের মানুষের মধ্যে এই ধরনের ব্যবস্থার কিছু না কিছু নিদর্শন কোন না কোন ভাবে পাওয়া যাবে. হয়তো তার চেহারা বা প্রয়োগ সব জায়গায় একইরকম নয়। কিন্তু ভারতবর্ষের যেকোন প্রান্তেই দেখা হোক না কেন, এই জিনিসটা একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যায় নি। এর উৎস ও বিকাশ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে তাই এনিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হলো। এই জাতব্যবস্থার উল্লেখ, আমরা প্রাচীন শাস্ত্রগুলো থেকেই পেয়ে থাকি। একটা শ্লোক মনুবাদের সমর্থক বা বিরোধীরা প্রায়ই বলে থাকেন, “ব্রাহ্মণ হয়েছে ব্রহ্মার মুখ থেকে ক্ষত্রিয় হয়েছে ব্রহ্মার হাত থেকে বাহু থেকে হয়েছে। বৈশ্য হয়েছে ব্রহ্মার উদর থেকে। আর পা থেকে হয়েছে শুদ্র।” [ঋগবেদ ১০ম মন্ডল ৯০ সূক্ত, পুরুষসূক্ত]
আরো একটা শ্লোক বিশেষভাবে পরিচিত বা আলোচনার দাবি রাখে যে
“দৈবাধীনং জগৎ সর্ব্বং মন্ত্রাধীনীশ্চ দেবতাঃ
তে মন্ত্রা ব্রাহ্মণাধীনাস্ত ব্রহ্মদৈবতম।।”
“সবকিছু দেবতাদের অধীন, দেবতারা মন্ত্রের অধীন এবং মন্ত্র ব্রাহ্মণদের অধীন। অতএব ব্রাহ্মণগণ দেবতা কথিত হন।”
অর্থাৎ কারও ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হলে তিনি মন্ত্র মুখস্থ করে যে দেবতাদের অধীনে সমগ্র জগত, সেই দেবতাদেরও অধীন করে নিতে পারেন। সেকালে সমাজে এতটাই প্রতাপ ছিল তাঁদের।
যেসময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজকের মত উন্নতি করেনি, সেসময় মানুষের জীবন ছিল ভয়ঙ্করভাবে অনিশ্চিত। সেজন্য এই অনিশ্চয়তা যিনি বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দূর করতে পারেন, সমাজে তাঁর স্বাভাবিকভাবেই আলাদা গুরুত্ব থাকার কথা। আর এই গুরুত্ব যদি বংশ পরম্পরায় এবং সামাজিকভাবে চলতে থাকে তাহলে একটা প্রবল প্রথায় পরিণত হবে সেটা। এই জন্য অন্যান্য জায়গায় আর্য জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে না থাকলেও ভারতের মধ্যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রতিষ্ঠা পেয়ে এসেছে। এমনকি পরবর্তী ধর্মমত প্রতিষ্ঠা পাবার পরেও আমরা দেখেছি দিব্যোকের নেতৃত্বে কৈবর্ত্যদেরকে বৌদ্ধ পালরাজাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে। মারা যাওয়ার পরেও ভিন্ন ভিন্ন মুসলমানদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কবরস্থানও দেখা গেছে। খ্রীষ্টানদের মধ্যেও জাতব্যবস্থার উদাহরণ দেখা গেছে। কিছু কিছু গুরুদ্বারে মজহবী শিখদের অন্যদের সাথে খাবার নিতে দেওয়া হয়না বলেও খবর এসেছে।
কিন্তু বহুনিন্দিত এই ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়লো কেন? খুব সহজভাবে একটা সরলীকরণ করা যায় যে, এটা পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করার জন্য হয়েছে।
বিশ্ববরেণ্য রাজনৈতিক দার্শনিক কার্ল মার্ক্স ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের দশম অধ্যায়ে বলে গেছেন,
“Capital is dead labour, that, vampire-like, only lives by sucking living labour, and lives the more, the more labour it sucks. The time during which the labourer works, is the time during which the capitalist consumes the labour-power he has purchased of him.
অর্থাৎ “পুঁজি হল মৃত শ্রম, যে, ভ্যাম্পায়ারের মতো, শুধুমাত্র জীবন্ত শ্রম চুষে বেঁচে থাকে, এবং যত বেশি বেঁচে থাকে, তত বেশি শ্রম চুষে যায়। যে সময়টাতে শ্রমিক কাজ করে, সেই সময়টাতে পুঁজিপতি তার থেকে কেনা শ্রমশক্তিকে গ্রাস করে।”
এখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সহজে খাটিয়ে নিতে এরকম প্রথার কোন জুড়ি নেই। সাথে যদি মানুষের বর্তমান দূরবস্থার কারণ হিসেবে যদি আগের জন্মের ফলাফলকে দায়ী করা যায়, তাহলে মানুষের মধ্যে সেরকম প্রতিরোধ আসবেনা। আর বর্তমান দূরবস্থাকে যদি পরের জন্মে ভালো কিছু পাবার উপায় হিসেবে দেখানো যায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। সহজ ও সস্তা শ্রম তো প্রত্যেক পুঁজিপতিরই কাম্য। তাই মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে যদি মানুষকে উঁচু ও নীচু শ্রেণীবিভাগে চিরকালের মত যদি আবদ্ধ রাখা যায়, তাহলে শ্রমের মূল্য নিয়ে কোনও দিন প্রতিবাদ আসবে না। মানুষ পূর্বজন্মের পাপ মেনে নিয়ে সারা জীবন অবিরাম সেবা করে যাবে পরের জন্মে ভালো কিছু পাবার আশায়।
এখানে পুঁজিবাদী শোষকের না হয় স্বার্থ আছে, কিন্তু শোষিত মানুষ এই ব্যবস্থা মেনে নিল কেন? এই ভারতবর্ষেই তো জৈনমত, বৌদ্ধমত প্রভৃতি ধর্মমতের উদ্ভব হয়েছে। এছাড়াও পারসিক, গ্রীক কিংবা পরের দিকে ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ইউরোপীয়দের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই ভারতবর্ষের মাটিতেই। তাহলে এই ধর্ম ব্যবস্থা ছেড়ে সব ধর্ম গ্রহণ করেনি কেন? শিখ ধর্মেরও এই উপমহাদেশের জমিতে উদ্ভব। তাহলে জাত ব্যবস্থায় নিভৃত মানুষ নিপীড়িত বর্ণাশ্রমবাদী ধর্মব্যবস্থা ছেড়ে এইসব ধর্মে আশ্রয় নেননি কেন?
সম্পূর্ণ জনসংখ্যা বা জনগোষ্ঠীর এই সব ধর্মে আশ্রয় নেননি সেটা বলা যাবে না। সেই জন্য এই ধর্মের অনুসারীরা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচুর পরিমাণে আছেন। এবং এই ধর্মের মধ্যেও এই ধর্মের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেও জাতপ্রথার ছায়া দেখা গেছে। সেটা বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রেও কিংবা মারা যাওয়ার পর কবর দেওয়ার ক্ষেত্রেও দেহ সৎকার করার ক্ষেত্রেও কিছু কিছু জায়গায় কিছু কিছু সমাজে প্রকট হয়ে পড়ে। আর অর্থনৈতিক শোষণ তো আছেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে বলেছেন,
“ধনের ধর্মই অসাম্য।”
ফলে একবারে নিচু তলা থেকে ধর্মান্তরিত মানুষের জীবন যে একেবারে আমূল বদলে গেছিল সেটা কিন্তু নয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তথাকথিত নিচু জাতের লোকেরা, বিশেষ করে পুঁজির মালিক অংশগুলো সেটা বৈশ্য সমাজ হতে পারে কিম্বা তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বৈশ্য সমাজ, এই জাত ব্যবস্থার শোষণ ফাঁদের মধ্যেই নিজেদের ফায়দা খুঁজে পেয়েছে। যেরকম, নিজেদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে বা সেটার মান্যতা পেতে ব্রাহ্মণদের সমর্থন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
নিজেদের জমিতে ব্রাহ্মণকে ভূমি দান করলে সমাজের প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। কলকাতায় ঠাকুর পরিবারও, বন্দর অঞ্চলে শ্রমজীবি সমাজের দান করা জমিতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এটার সুযোগ নিয়েছেন অনেক বৈশ্য সম্প্রদায়। কিংবা শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের সমাজের মানুষকেও যাদেরকে সাধারণভাবে শূদ্র বলে দাবি করা হতো, তাঁরাও এই সুযোগ নিতে পেছপা হন নি বলে দেখা গেছে। অর্থাৎ উঁচুতলার মান্যতা নিচুতলার কয়েকজনকে সামাজিকভাবে বলিষ্ঠ করেছে।
এই পরিস্থিতিকে ইতিহাসের বৃহত্তর পরিসরে বিচার করলে অনুধাবন করতে আরও সুবিধা হবে। ভারতের ইতিহাসে মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও এরকম দেখা গেছে। মুঘল সম্রাটের অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন দেশীয় রাজারা রাজত্ব করে গেছেন। মুঘল বাদশার ফরমান নিয়ে ইউরোপীয় বণিকরাও তাদের মানদণ্ডকে রাজদণ্ডতে পরিণত করেছেন। এর আগেও দেখা গেছে কনস্টান্টিনোপলের সম্রাটের অনুমোদন নিয়ে অনেক ছোট বড় রাজ্য গজিয়ে উঠেছে। বাগদাদের খলিফার ছাড়পত্র পেয়ে অনেকেই রাজত্ব করে গেছেন। এমনকি দিল্লির সুলতানেরাও তাঁদের রাজত্বের জন্য বাগদাদের খলিফার অনুমোদন প্রার্থী হতেন। জাতব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নিচুতলার মানুষের প্রতিষ্ঠা লাভ জাতীয় এই ধরনের বিষয়গুলো ছোট ছোট পুঁজির অন্য জায়গা থেকে অনুমোদন পেয়ে বেড়ে ওঠার ছোট ছোট নিদর্শন।
এই জন্য মার্ক্স ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত Preface to the Critique of Political Economyতে বলে গেছেন,
“No social order is ever destroyed before all the productive forces for which it is sufficient have been developed, and new superior relations of production never replace older ones before the material conditions for their existence have matured within the framework of the old society. Mankind thus inevitably sets itself only such tasks as it is able to solve, since closer examination will always show that the problem itself arises only when the material conditions for its solution are already present or at least in the course of formation.”
অর্থাৎ “যে সমস্ত উৎপাদন শক্তির জন্য যা যথেষ্ট তা গড়ে তোলার আগে কোন সামাজিক শৃঙ্খলা কখনও ধ্বংস হয় না, এবং পুরানো সমাজের কাঠামোর মধ্যে তাদের অস্তিত্বের জন্য বস্তুগত অবস্থা পরিপক্ক হওয়ার আগে উত্পাদনের নতুন উচ্চতর সম্পর্ক কখনও পুরানোগুলিকে প্রতিস্থাপন করে না। মানবজাতি এইভাবে অনিবার্যভাবে নিজেকে কেবলমাত্র এমন কাজগুলি স্থাপন করে যা এটি সমাধান করতে সক্ষম, এখানে খতিয়ে দেখলে সর্বদা দেখা যাবে যে সমস্যাটি তখনই উদ্ভূত হয় যখন এর সমাধানের জন্য উপাদান শর্তগুলি ইতিমধ্যে উপস্থিত থাকে বা অন্তত গঠনের সময়।”
ঠিক এই কারণেই অজস্র ধর্মমত ভারতবর্ষের বুকে জাঁকিয়ে বসে থাকা জাতব্যবস্থাকে সেই আঘাত দিতে পারেনি যে আঘাত সাগরপার থেকে আসা বাণিজ্যতরীগুলো দিয়েছিল। উপনিবেশিক শাসনের ফলে যে ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লবের পুঁজিবাদের স্রোত আমাদের শিক্ষিত মননে আছড়ে পড়ে তা দীর্ঘকালের জীর্ণ জাতব্যবস্থাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ছুঁড়ে দেয়। জড়িবুটির জায়গা নেয় আধুনিক চিকিৎসা। পাঁজির জায়গা নেয় আবহাওয়াবিদ্যা। ফুলে-হরিচাঁদ-আম্বেদকরের হাত ধরে অনেক দলিত সন্তান সেই শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন যেখানে শ্লোক-মন্ত্র কাজ করতো না। রেলের কামরাতে জাতবেজাতের বেড়াজাল ভেঙে গেছিল। ফলে যে দেশী পুঁজিব্যবস্থায় জাতব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, পুঁজির মালিকানা বিদেশীদের হাতে চলে যাওয়াতে সেই জাতব্যবস্থা অন্তত পুরনো কলেবর ধরে রাখতে পারেনি নতুন গড়ে ওঠা সমাজব্যবস্থায়। শহুরে সমাজ গ্রামাঞ্চলকে গ্রাস করতে থাকলে প্রান্তিক জায়গাগুলোতে চলতে থাকা বর্ণাশ্রম প্রথাও ভেঙে পড়তে শুরু করে। তবুও প্রতিষ্ঠিত পরিবারগুলি টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছে। এই কারণে জাতব্যবস্থা রূপ পালটে হলেও আজও টিকে রয়েছে।

