অমিত বন্দোপাধ্যায়
“আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দুজনে সমান অংশীদার
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে
আমাদের পরে দেনা শোধ বার ভার
তাই অসহ্য লাগে ও আত্ম রতি
অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?”
” যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী
আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি
ইতিহাস জানি নীরব সাক্ষী তুমি
আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশভূমি”
১
প্রাককথন- অতি সাম্প্রতিকতম সময়ে দেশভাগের ৭৫ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ঠিক তখনই দু-দুটি বিপরীতমুখী চিত্র আমাদের সামনে উপস্থিত হল। বিগত বছর থেকেই ১৪ আগস্ট কে স্মরণ করতে বলা হচ্ছে জাতীয় ‘বিভাজন বিভীষিকা স্মৃতি দিবস’ হিসেবে তখন ইউটিউব চ্যানেলের কল্যাণে আমরা এক মহান দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলাম। দেশভাগজনিত কারণে অমৃতসরের গ্রাম ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন নিশার বিলোঁর পিতা ও ঠাকুরদা—কোনদিনই তাদের আর ফেরা হয়নি। কিন্তু ইতিহাস এক বহমান স্রোত— থেকে গিয়েছে শিকড় ছেড়ার যন্ত্রণা। এটাই উত্তর প্রজন্মের যুবক নিসারকে অনুপ্রাণিত
করেছে ‘পাঞ্জাব লহর’ গড়ে তুলতে। এটি এমন এক উদ্যোগ যা ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তের দু’পারের পাঞ্জাবি মানুষদের মধ্যে মিলন ঘটায়, ফেরত নিয়ে আসে স্বজন-বান্ধব এর স্পর্শ। দেখা গেল পরস্পর দুই ‘শত্রু দেশ’ এর সাধারণ নাগরিকরা বিভেদ দেশের সীমানা অতিক্রম করছেন— মানবিকতা, সহমর্মিতা আর মানুষের শুভ বুদ্ধির উপর নির্ভর করে। স্বাধীনতা দিবসের আবহে এবছর পাকিস্তানি শিল্পীর রবাব বাদনে ‘জনগণমন’ ভাইরাল হয়েছে। বারো বছর আগে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি ও বন্ধুতায় একটি শৈল্পিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু দু-দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দেশভাগের বিশাল ও গভীর শূন্যতা—বিষাদ এবং ক্ষতকে ছোঁয়ার, এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার কাজটি করে দেখালেন মুসলমান ও তার বন্ধু ভূপিন্দের সিংহ লাভলি পাকিস্তানি শিখ। তাদের এখন মূল লক্ষ্যই হলো দেশভাগ বিচ্ছিন্ন মানুষদের প্রিয়জনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার। এখনকার উচ্চ শিক্ষার পাঠক্রমে— দেশভাগ সাহিত্য পড়ানো হয়— বৃদ্ধি পেয়েছে গবেষণা— আর্কাইভ নির্মাণ।[i]
২
আবার এর একটা অন্যদিকও রয়েছে দেশভাগের বিষয়টি হয়ে থাকছে কখনো বিস্তৃত, কখনো উপেক্ষিত, কখনো খন্ডিত কখনো বা গৌরবান্বিত। একজন বাঙালি ইতিহাসবিদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন দেশভাগ বিষয়টি শোকের—উদযাপনের নয়। কারণ সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম স্থানচ্যুতি ও উদ্বাস্তু সংকট ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের এই দেশভাগের ঘটনা জনিত কারণে। অন্তত কুড়ি লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন— শুধুমাত্র সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী। প্রায় এক লক্ষ মহিলা শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন। এত সংখ্যক নারী নির্যাতন এই উপমহাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি, এমনকি অন্য দেশের ইতিহাসেও এর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোথাও ইতিহাসের এক অনৈতিহাসিক উদাসীনতা সৃষ্টি করেছে— কোথাও ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক চেহারা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দেশভাগকে মনে করেন আশীর্বাদ সেই ভাবাদর্শকে ভিত্তি করে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও অনুপ্রবেশের ধুয়ো তুলে শুরু হয়েছে ইতিহাসের বিস্মৃতি ও কলুষায়ন।[ii] বিশ শতকের আশীর দশকে এপার বাংলার এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের রচিত উপন্যাসের ব্লার্ব-এ লেখা হয়েছিল দেশবিভাগ এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য, তবু বিচ্ছেদ বেদনা আজও রয়ে গেছে। বাঙালি জাতি দ্বিখন্ডিত হয়েছে কিন্তু সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে যায়নি।[iii] দেশভাগকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অসংখ্য স্মৃতিচারণা, মৌখিক সাক্ষাৎকার (ওরাল হিস্ট্রি), আত্মজীবনী, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চলচিত্র—নাটক। এখনো পর্যন্ত তা অব্যাহত। অসীম রায়, গৌরকিশোর ঘোষ, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময়ী দেবী ইত্যাদিদের লেখা আমরা প্রায় সকলেই পড়েছি। হাল আমলেও লেখা হয়েছে— স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘চতুষ্পাঠী’, ‘জলের উপর পানি’— তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শঙ্খচিল’ ট্রিলজি—অমর মিত্র-র ‘ধুলোগ্রাম’ উপন্যাস। এর প্রায় প্রত্যেকটি দেশভাগোত্তর এক নতুন প্রজন্মের চোখে ভারতীয় উপমহাদেশের বাস্তুচ্যুত পারিবারিক ইতিহাস ও জটিল সামাজিক বিন্যাস সমূহ। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালালের সাদাত হাসান মান্টো ওপর লেখা তাঁর ‘দ্য পিটি অফ পার্টিশন’ গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন “এটা একটা পরীক্ষামূলক আখ্যান যেখানে আমি দেখিয়েছি অনেক সাংবাদিককতা ধর্মী লেখা এমনকি অনেক সরকারি বিবরণের থেকে মান্টোর সাহিত্যিক লেখালেখি ইতিহাসিক আখ্যানকে উন্নততর করতে পারে। যে সময়ের তিনি সাক্ষী ছিলেন তা লেখায় তুলে ধরার সময় তাঁর মধ্যে একজন ইতিহাসবিদ কাজ করতো।”[iv] উল্লেখ করার মতো উপন্যাস কপিল কৃষ্ণ ঠাকুরের উজানতলীর উপকথা যেখানে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি আর দেশভাগ ভয়াবহ আসন্ন দেশভাগের আবহমান কিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
৩
ইতিহাস চর্চার সেকাল ও একাল — একটা সময় পর্যন্ত দেশভাগ নিয়ে যে ইতিহাস রচিত লেখা হয়েছে তার মূল ঝোঁকটাই ছিল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে— ব্রিটিশ রাজ, কংগ্রেসের হাইকমান্ড ও মুসলিম লীগের যাবতীয় কার্যকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণই ছিল ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সরকারি দলিল দস্তাবেজ সংবাদপত্র ও আনুষঙ্গিক লেখাপত্র কে ভিত্তি করেই ইতিহাস রচিত হয়েছে।[v] মহম্মদ আলী জিন্নাহ-কে আগে মনে করা হতো এই কাণ্ডের মূল কান্ডারী বা খলনায়ক। পরবর্তীতে ইতিহাস গবেষণার পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে— এর ভরকেন্দ্রটিও সরে এসেছে নিছক রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে। পুনর্মূল্যায়িত হয়েছে জিন্নাহ-র ভূমিকাও। আয়েশা জালাল, জয়া চ্যাটার্জি, জ্ঞান পান্ডে, হৈমন্তী রায়, জয়ন্তী বসু এবং আরো অনেকে।[vi] নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেও রচিত হয়েছে বেশ কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ।[vii] বাংলা এবং পাঞ্জাব নিয়ে ও অঞ্চল ভেদে বিভিন্নতা নিয়ে গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।[viii]
৪
এখানে যে তিনটি গ্রন্থ নিয়ে আমরা কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করব সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমে—
বাংলায় সন্ধিক্ষণ ইতিহাসের ধারা ১৯২০-১৯৪৭ সব্যসাচী ভট্টাচার্য (২০১৪)[ix] ; Different Nationalisms: Bengal (1905-1947)-Semanti Ghosh (2016) [x] এবং Caste and Partition in Bengal: The Story of Dalit Refugees 1946-1961- Sekhar Bandopadhyay and Anusua Basu Roy Chowdhury (2022) [xi]
৫
ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য-র গ্রন্থটিতে দেশভাগ পূর্ববর্তী দুটি দশকের বিস্তারিত আলোচনা দিয়েই শুরু হয়েছে। তাঁর ভাষায় বলা যায়— “আমাদের আজকের যে বাংলা তা মূলত ২০২০-র দশক এবং স্বাধীনতার সঙ্গে দেশভাগের মাঝের বছরগুলিতে গড়ে উঠেছিল। এই গ্রন্থের একটি অন্যতম প্রতিপাদ্য এই যে, ১৯২০-র দশক থেকে বাংলার আত্মপরিচয় বা সত্তার নবতর ব্যাখ্যার সূচনা হয়েছিল। এই ধারা ‘নবজাগরণ’ ও তার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পন্ন সময় থেকে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কাল থেকে পৃথক করে বিশ শতকীয় বাংলাকে।” গ্রন্থটির সূচিপত্র লেখক বিন্যাস করেছেন এইভাবে—১) সত্তার পুনর্নির্মাণঃ ১৯২০-র দশক। ২) নতুন ভদ্রমহিলার উদ্ভাবন—৩) সংযুক্তি এবং বিচ্ছিন্নতাঃ জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সত্তা—৪) বিভাজনের যুক্তি এবং মুসলিম সত্তা চেতনা—৫) গান্ধীবাদী রাজনীতি এবং তার বিকল্পঃ ১৯২০-৩৫—৬) বিভেদের রাজনীতিঃ ১৯৩৬-৪৬—৭) বিপদ সংকেতঃ চল্লিশের দশকের সংকট—৮) আগ্নেয়গিরির মুখেঃ ১৯৪৬-৪৭ ও ৯) হৃদয়ের বিভাজনঃ অবিভক্ত বাংলার শেষ দিনগুলি।
প্রথম দুটি অধ্যায়ের কথা বলতে গেলে আমাদের মনে পড়ে যায় ইতিহাসবিদ সুমিত সরকারের একটি বক্তৃতার কথা—”জাতীয়তাবাদ ছাড়িয়েঃ স্বদেশী যুগে বাংলার কয়েকটি দিক”।[xii] সুমিত সরকারের Swadeshi Movement in Bengal (1903-1908) এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। পরবর্তীকালে এর দ্বিতীয় পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। এই বক্তৃতাটি এর অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বলেছিলেন— সাম্প্রতিক কিছু অত্যন্ত মূল্যবান গবেষণা থেকে মনে হচ্ছে অন্তত তিনটি সংযুক্ত অথচ কিছুটা বিচ্ছিন্ন, দিক থেকে ওই দশক বোধহয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাংলার ইতিহাসে। এই তিন দিক হলো নিম্ন জাতের উত্থান, পরস্পর বিরোধী হিন্দু বা মুসলিম জাতীয়তাবাদ তথা সাম্প্রদায়িকতার আবির্ভাব, এবং স্ত্রী-পুরুষ সম্বন্ধ আর নারী মুক্তি সম্পর্কিত আলোচনা ও প্রচেষ্টা। নিঃসন্দেহে বলা চলে দ্বিতীয় এবং তৃতীয়—চতুর্থ এবং ছয় থেকে নবম অধ্যায়গুলি সুমিত সরকার উল্লেখিত দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বিষয়টিকে অনেকাংশেই সমৃদ্ধ করেছে।
৬
আমাদের আলোচনা মূলত জোর দেবে কিভাবে সাম্প্রদায়িক বিভেদের রাজনীতি বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকেই ধীরে ধীরে বাংলাকে গ্রাস করতে শুরু করে যেটা সব্যসাচী ভট্টাচার্য বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন অধ্যায় ৩ ৪ ৬ ৭ ৮ ও ৯ নম্বর অধ্যায় জুড়ে। বিস্তারিত আলোচনায় যাবার সুযোগ নেই আমরা শুধুমাত্র মূল বিষয়গুলোকেই ছুঁয়ে যাবার চেষ্টা করব।
বিশেষভাবে তৃতীয় অধ্যায়ঃ সংযুক্তি এবং বিচ্ছিন্নতা— জাতিগত ও সাম্প্রতিক সত্তা— চতুর্থ অধ্যায়ঃ বিভাজনের যুক্তি এবং মুসলিম সত্তা চেতনা— ষষ্ঠ অধ্যায়ঃ বিভেদের রাজনীতি ১৯৩৬-৪৬— সপ্তম অধ্যায়ঃ বিপদ সংকেতঃ চল্লিশের দশকের সংকট— অষ্টম অধ্যায়ঃ আগ্নেয়গিরির মুখে ১৯৪২-৪৭ এবং সর্বশেষ নবম অধ্যায়— হৃদয়ের বিভাজনঃ অবিভক্ত বাংলার শেষ দিনগুলি—আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন দেশভাগ ছিল এক অনিবার্য পরিণতি। সব্যসাচী বাবু একটি বক্তৃতায়[xiii] লিখেছিলেন “সাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দিতে আমরা যদি কেবলমাত্র জনজীবনের রাজনীতিতে অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতা ও রাজনৈতিক দলের গৃহীত প্রস্তাব ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখি তাহলে সাম্প্রদায়িক আবেগের মূল উৎস ও পরবর্তী কার্যকলাপের সূত্র খুঁজে পাবো না। এর সূত্র নিহিত থাকে ব্যক্তিজীবনে, দৈনন্দিন কার্যকলাপে, সামাজিক ব্যবহারে, ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই সবগুলি চিরাচরিত কায়দায় লেখা রাজনৈতিক ইতিহাসের বাইরে।…. সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস চর্চা কে ওই চিরাচরিত পথের বাইরে ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দিকে এগিয়ে নিতে হবে।”
বক্তৃতাটির প্রারম্ভেও তিনি বলেছেন “জনজীবনের রাজনীতি ক্ষেত্রের উপর এই বিশেষ গুরুত্ব আরোপের ফলে জনসাধারণের প্রাত্যহিক জীবনে যে সামাজিক দেওয়া-নেওয়ার সম্বন্ধ সম্পাদন হয় সেগুলি অবহেলিত হয়েছে। …. ইতিহাসবিদদের দৃষ্টি এইসব দিকে প্রসারিত হওয়া দরকার— বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষেরা কিভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্ক রেখেছেন কিংবা রাখেননি (উদাহরণস্বরূপ সামাজিক অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ সংগঠনের মাধ্যমে; শৈশবের অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিতে সাম্প্রদায়িক বিভেদের সম্মুখীন হওয়ার কথা যেভাবে গেঁথে আছে; প্রচলিত বাক ভঙ্গিতে অনেক সময় অজান্তেই বিভেদমূলক ভাষা ব্যবহার (যেমন মুসলমানদের ‘নেড়ে’, নমঃশূদ্রদের ‘চাঁড়াল’ বলে উল্লেখ করা); ভাষার সাম্প্রদায়িক অভিধা (যেমন ‘মুসলমানি বাংলা’); সম্ভাষণের প্রচলিত ঢং (যেমন নিম্নবর্ণের মানুষদের এবং আতরাফ মুসলিমদের ‘তুই’ সম্ভাষণ); নিষিদ্ধ খাবার সম্বন্ধে অসহিষ্ণুতা (যেমন নিম্নবর্ণের হিন্দুদের শূকর খাওয়ার অভ্যাসকে মুসলিমরা নিচু নজরে দেখে ও হিন্দুদের গোমাংস ভক্ষণ এর বিরুদ্ধে সংস্কার; গ্রামে এমনকি অনেক সময় শহরাঞ্চলে সম্প্রদায়ভিত্তিক ও বর্ণ ভিত্তিক পাড়া গড়ে ওঠা; বিদ্যালয় ও কলেজে উচ্চবর্ণের ও নিম্ন বর্ণের হিন্দু ও মুসলিম ছাত্রাবাসের পৃথক ব্যবস্থা (এটা কেবল ঢাকা কিংবা কলকাতাতেই নয়, মফস্বল শহরেও লক্ষ্য করা যাবে)…. এই সব মিলিয়ে এক সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে যা বিভিন্ন সম্প্রদায় কে পরস্পরের থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। মুসলিম লীগের প্রস্তাব কিংবা কংগ্রেস অধিবেশন এর বক্তৃতা অথবা নেতাদের করা এবং না করা রাজনৈতিক চুক্তির তুলনায় এই বিষয়গুলি সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতার বোধ কে জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে নগণ্য নয়।” সব্যসাচী ভট্টাচার্য আরো কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন— আরোপিত একাত্মতা, বিদ্যালয় শিক্ষা ও সাম্প্রদায়িক পরিচিতি, বিদ্যালয় পাঠ্যপুস্তকসমূহ, ইতিহাস যখন এক সংঘাত ক্ষেত্র, সংঘাতের আরেকটি ক্ষেত্রঃ ভাষা ও ভাষার স্থানিক বিভিন্নতা ও সম্প্রদায় ইত্যাদি। বলা চলে এই বক্তৃতাটি আমাদের আলোচ্য গ্রন্থে আলোচিত বিষয় গুলির পরিপূরক।
৭
সেমন্তী ঘোষের আলোচ্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬- তে। তার আগে বাংলা ভাষায় বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছেন— একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং আরেকটি গ্রন্থ সম্পাদনাও করেছেন— তাঁর গবেষণার বিষয়কে কেন্দ্র করে।[xiv]
‘বারোমাস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল— ১) বঙ্গভঙ্গ কাল এবং মুসলিম আত্মপরিচয়।[xv] ২) আত্মপরিচয়ের সন্ধানে বাঙালি মুসলমান ১৯৩৭-৪০।[xvi] আদর্শ আর তার প্রয়োগঃ জাতীয়তাবাদের একটি ছোট তর্ক।[xvii] ৪) রাজনীতি কাহাকে বলে?[xviii] ৫) পথ হারানো প্রতিশ্রুতি, চিত্তরঞ্জন দাশ ও বাংলার কথা।[xix] ৬) জড়ায়ে আছে বাধাঃ ১৯৩০-এর জাতি— রাজনীতি ও রবীন্দ্রনাথ।[xx] ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল—১৯১১-প্যাঁচের রকমফের।[xxi] আলোচ্য গ্রন্থটিতে রয়েছে মোট পাঁচটি অধ্যায়ঃ-
১) Unity and difference in a Divided Homeland (1905-11); ২) Promises and Politics of a New Nation (1912-25); ৩) Politics of Enumeration and the Changing Nation (1926-36); ৪) Two Coalitions and Three Moments of Failure (1937-45); ৫) Pakistan, Partition and the Province (1946-47); and Concusion.
সেমন্তী ঘোষ এর উপরে উল্লেখিত প্রবন্ধগুলোতে এবং তাঁর রচিত গ্রন্থে যে নির্যাস তাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করলে বিষয়টি দাঁড়ায় এইরকমঃ-
“এ দেশের জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কিন্তু সেটাই সব নয় বঙ্গভঙ্গের সঙ্গে একটি অত্যন্ত বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে এ দেশের জাতীয় চেতনার সংগ্রামের ইতিহাসেও। … এই ‘জাতি’ চেতনার উন্মেষ কিন্তু একটি ধারায় হয়নি হয়েছে বহু ধারায় আর নিরন্তর সেই বিভিন্ন ধারার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতে থেকেছে।
…………………………..
‘জাতীয় বোধে’-র এই সংঘাত বা সংগ্রামের মূল ছিল অন্য একটি চেতনার উপর। এই দ্বিতীয় চেতনাটি ‘জাতি’- চেতনার সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পৃক্ত বা সংযুক্ত, যদিও প্রকৃতিগতভাবে বিপরীত। পরস্পরের সঙ্গে একটা মূলগত ‘ঐক্যে’র বোধের নিজেকে স্থাপন করতে চায় ‘জাতি’। আর দ্বিতীয় চেতনাটি কিন্তু পরস্পরের মধ্যে ‘পার্থক্যে’-র উপর জোর দেয়, যে পার্থক্যকে আমরা বলতে পারি স্বাতন্ত্র্য বা ‘ডিফারেন্স’। …. “তার মানে যে সব সময়ই তাদের পরস্পরকে বিপরীত বা বিরুদ্ধ হতে হবে, তেমন কোনো কথা ছিল না কিন্তু। ঐক্যের বোধের পক্ষে খুবই সম্ভব ছিল স্বাতন্ত্র্যের বোধের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে বোঝাপড়া করে নেওয়া। বহু বহু ক্ষেত্রে তা করাও হয়েছে। আবার বহু ক্ষেত্রে ঐক্যের বোধে উদ্দীপ্ত জাতি হয়তো কোন এক ধরনের স্বাতন্ত্র্যকে নিজের মধ্যে ‘বিলীন’ করে নিতে অস্বীকার করেছে, তাকে ব্রাত্য করে রেখেছে নিজের গণ্ডির বাইরে….. এক এক ধারার ‘জাতি’ বোধ এক এক ভাবে এই সমস্যার সমাধান করেছে আর এভাবেই আমাদের জাতীয়তাবাদের দুনিয়াটা হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ‘জাতি’ বোধের একটা সংগ্রামের ক্ষেত্র। ইতিহাস বারবার এই সংগ্রামকে মুছে ফেলে একটু সহজ করে ফেলতে চায় ব্যাপারটাকে। ভাবতে চায় যেন একটা ছিল ঐক্যের ধারা, আর একটা স্বাতন্ত্র্যের, তাদের মধ্যে কোন সেতু ছিল না একেবারে। ……
“বঙ্গভঙ্গের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাংলার মুসলিম সমাজকে যেমন ঐক্যবদ্ধ করেছিল নিজেদের মধ্যে তেমনি অন্যান্য সমাজের থেকে নিজেদের সমাজের স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নটা কেউ সামনে এনে উপস্থাপিত করেছিল। জাতীয়তা আর স্বাতন্ত্র্যের ভাবনার মধ্যে বোঝাপড়া করতে করতে তারা কেবল নিজেদের ‘মুসলিম’ পরিচয় কেই তুলে ধরেননি, বাঙালি মুসলমান বা ভারতীয় মুসলমান হিসেবে নিজেদের স্থানিক বা সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতার ওপরে সমান জোর দিচ্ছিলেন।”[xxii]
“বিশ শতকের প্রথম পাঁচটি দর্শকের বঙ্গীয় মুসলিম রাজনীতি ও সমাজ চিন্তার ধারাকে তাই আবার খুঁটিয়ে পড়ার দরকার হয়। সেই ফিরে পড়ার পাঠ থেকে কিন্তু অন্য একটি সূত্র নির্মিত হয়ে ওঠে। সূত্রটি বলে, মুসলিম লীগ প্রকৃতপক্ষে কখনোই ব্রিটিশ ভারতের সকল মুসলমানকে একটিমাত্র ছাতার তলায় সঙ্ঘবদ্ধ করতে পারেনি। এমনকি পাকিস্তান আন্দোলনের সময়ও নয়। বাংলা প্রদেশের মুসলমান রাজনীতি ও সমাজ-এর গতি প্রকৃতির একটি বিশিষ্ট নিজস্বতা ছিল। সম্ভবত বাংলার ইতিহাস থেকে মুসলিম সমাজের অন্তর্লীন এই বিসম্বাদ ও বিভাজনের ধারাটি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। …..
“বাংলার ইতিহাসের একটি পর্ব ১৯৩৭-৪০। এই সময়টাকে একটা টার্নিং পয়েন্ট বা সন্ধিক্ষণ বলা চলে হাজার 935 সালের ভারত শাসন আইনের ফল হিসেবে পরাধীন ভারতে প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৩৭ সাল। বাংলার তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দল— কংগ্রেস, লীগ এবং কৃষক প্রজা পার্টি (কে পি পি) ইউনিয়নবোর্ড নির্বাচন মঞ্চে প্রতিযোগিতা করেছিল, এবং শেষ পর্যন্ত অনেক নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাতের পর কংগ্রেস- কেপিপি হাত মিলিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করতে অসমর্থ হওয়ায় তৈরি হয়েছিল মুসলিম লীগ-কে পিপি মন্ত্রিসভা।
১৯৩৭ থেকে ৪০ সালের ঘটনা প্রবাহের বিশ্লেষণ ছাড়া ১৯৪০ পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টির প্রকৃত মর্মোদ্ঘাটন কঠিন। …কেমন ছিল এই সময়টি রাজনৈতিক পশ্চাদপট? বাংলায় মুসলিম সমাজের মধ্যে প্রধানত দুটি রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য দেখা যাচ্ছিল প্রজা পার্টি (পরে ফজলুল হক যার নাম দেন কৃষক প্রজা পার্টি) এবং মুসলিম লীগ। সাধারণভাবে মনে করা হয়, কৃষক প্রজা পার্টির প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা গুলির দিকে, যেখানে লীগ ছিল প্রধানত শহুরে এলিট-এর দল।
মনে রাখতে হবে কেপিপি নেতৃত্বের প্রধান নেতাদের জোতদার-চরিত্রের বিষয়টি কিন্তু সমসাময়িক এবং পরবর্তীকালে যথেষ্ট চর্চিত।…. আবুল মনসুর আহমেদ বরং মনে করেছেন কেপিপি কে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দল হিসেবেই বোঝা ভালো যাদের মূল লড়াই ছিল একাধারে হিন্দু প্রভাবিত কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের সামন্ততান্ত্রিক মুসলিম মূল্যবোধের বিরুদ্ধে।
……
বিরাট তফাৎ ছিল দুই দলের নেতাদের ব্যক্তিগত ইমেজ এর মধ্যে, তফাৎ ছিল দলীয় প্রচারের ধরণে, বাংলার চাষীদের উদ্বুদ্ধ করার ধরণে। তফাৎ ছিল ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। লেখিকার ভাষায়—”এ ভাষা সেদিনের বাঙালি নিজের প্রাণের ভাষা, অবাঙালি ইস্পাহানিদের প্রতাপ রঞ্জিত ভাষা নয়।” … প্রজা পার্টির আহবানের মধ্যে এসে মিলছিল একাধারে মুসলিম এবং কৃষক সমাজের স্বার্থ।…কেবল নির্বাচনে নয়, তার পরেও প্রজা পার্টির জনপ্রিয়তা ছিল একই রকম অব্যাহত। এই জনপ্রিয়তার পেছনে প্রজা পার্টির সাফল্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সাধারণ বাঙালি সমাজে পৌঁছতে মুসলিম লীগের ব্যর্থতাও ছিল ততখানিই দায়ী।…..
লীগ বোর্ড যে কেবল মুসলিম জমিদার ও বড় ব্যবসায়ীদের দল ছিল তাই নয় এর শক্তি ও নীতির উৎস সর্বতোভাবে তখন বাংলা বহির্ভূত কলকাতার বড় লীগ নেতারা এ এইচ ইস্পাহানী, আব্দুর রহমান সিদ্দিকী বা আদমজী হাজী দাউদ প্রধানত চালিত হতেন উত্তর ভারতের মুসলিম ব্যবসায়ী সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বারা।…. আর এর বিপরীতে কৃষক প্রজা পার্টি যেন একেবারে অঞ্চলের মাটির গন্ধে মেখে উঠে আসা দল। বেশিরভাগ সদস্য ও চেয়ারম্যান কোনো-না-কোনো লোকাল বোর্ড বা জেলা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত মফস্বলেই বরং তার জোর বেশি শহরের তুলনায়…
ভারতীয় মুসলিম কৃষক সমাজের সঙ্গে যদি সত্যি কারের কোন সংযোগ তৈরি করতে হতো তা একমাত্র সম্ভব ছিল তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পথ ধরেই তাকে উপেক্ষা করে নয় তাকে পাশে সরিয়ে রেখেও নয়। সে দিক থেকে সেদিনের বাংলার প্রজা পার্টি এবং তার প্রধান নেতা ফজলুল হক একেবারে ঠিক জায়গাটা খুঁজে পেয়েছিলেন সন্দেহ নেই। হকের কৃষক প্রজা পার্টির পথ চলা…. তাকে বাদ দিয়ে এই সমাজের মনে প্রবেশ করা কেবল কঠিন নয়, ছিল প্রায় অসম্ভবঃ এবং এই সার সত্যটি অন্যত্র প্রমাণিত হয় জাতীয় কংগ্রেসের নেহেরুপন্থী রাজনীতির ব্যর্থতা থেকে।[xxiii] ……………
৮
শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় ও অনুসূয়া বসু রায় চৌধুরীর গ্রন্থটির সময়কাল ১৯৪৬-৬১ পর্যন্ত বিস্তৃত। অতএব আমাদের আলোচনা সীমিত থাকবে হাজার ১৯৪৭ পর্যন্তই। কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন তা এতাবৎ কাল পর্যন্ত প্রায় অনালোচিত থেকে গেছে। জাতপাত বিশেষ করে দলিত সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা যেটি অব্যাহত থেকে গিয়েছিলো ঔপনিবেশিক শাসনের পরবর্তীকালেও এবং বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত যার ঘাত-প্রতিঘাত অভিঘাত আমরা প্রতিনিয়ত টের পাই ও অনুভব করি। শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন সেই ইতিহাসবিদ যিনি নমঃশূদ্র দের উত্থান নিয়ে প্রামাণ্য গবেষণা করেছিলেন যেটা সুমিত সরকার তার একটি বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন (পূর্বে উল্লেখিত)। [xxiv] বাংলার তপশিলি সম্প্রদায়ের ওপর একটি গবেষণা নিয়ে ইতিপূর্বে একটি গবেষণা গ্রন্থ রচিত হয়েছে।[xxv]
কিন্তু সামগ্রিকভাবে ১৯৪৭-এর দেশভাগে নিম্ন জাতপাতের বিষয়টি আলোচনা অতি সাম্প্রতিককালে সূচনা হয়েছে এদের নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার ভূমিকা নিয়ে আগেকার ইতিহাস চর্চা নীরবই থেকেছে। ঔপনিবেশিক সময় কালে দেখা গেছে জাতপাত সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা বিষয়ে এক শক্তিশালী দলিত আন্দোলন। তবে দলিত বরবটি বাংলায় ১৯৪৬-৬১ পর্যায়কালে কখনোই ব্যবহৃত হয়নি। তবে ইদানিং কালে যে গবেষণার জোয়ার এসেছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে উদ্বাস্তু সমস্যাটি উত্তর ঔপনিবেশিক আমলেও। আমরা আমাদের আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রেখেছি—Partition and Caste-Dalits in Partition-Caste and Partition-The Riots-Towards Partition —এই অধ্যায়গুলো এর মধ্যেই।
মূলত দু’টি সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে স্বাধীন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য জনিত আন্দোলন লক্ষ্য করা যে ছিল একটি হল উত্তরবঙ্গে জেলাগুলিতে রাজবংশী সম্প্রদায়ের[xxvi] অন্যটি পূর্বদিকের জেলাগুলিতে নমঃশূদ্র গোষ্ঠীর। গবেষণায় দেখা গেছে যে বিশেষ করে এই দুটি সম্প্রদায় কখনোই ঘটনাবলীর নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে থাকেনি। ১৮৭০ থেকে কয়েকটি স্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট ভৌগলিক অঞ্চলে এই দুটি গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। উত্তর বাংলার জেলাগুলির মধ্যে রংপুর-দিনাজপুর জলপাইগুড়ি এবং রাজন্যবর্গ পরিচালিত রাজ্য কুচবিহারে। অন্য সম্প্রদায়টি অর্থাৎ নমঃশূদ্র দের নিবাস ছিল মূলত পূর্বাঞ্চলের রায়গঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর এবং খুলনাতে— তাছাড়াও পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য জেলাগুলিতেও তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। পশ্চিম এবং বাংলার মধ্যভাগে দলিত আন্দোলন ছিল ঐতিহাসিকভাবেই দূর্বল যেখানে নিম্নজাতির কৃষকেরা জঙ্গী কৃষক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও জাতি হিসেবে সংগঠিত ছিল না। ব্যতিক্রম দক্ষিণ 24 পরগনা পৌন্ড্ররা ছিল অপেক্ষাকৃতভাবে অসংগঠিত ছিল কিন্তু তারা ‘কংগ্রেস’ পরিচালিত জাতীয়তাবাদের অংশ হিসেবে পরিগণিত হত। ১৯৪২-৪৩ সাল নাগাদ তিনটি নির্দিষ্ট ‘স্বাধীন’ গোষ্ঠী আবির্ভূত হয়— জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পরিচালিত গোষ্ঠী; বাংলার তপশিলি দল মুকুন্দ বিহারী মল্লিক এর নেতৃত্বাধীন এবং বাংলার তপশিলি লীগ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ছিলেন যেটির নেতৃত্বে। দলিত এবং মুসলিম কৃষকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চলে। ১৮৮৯, ১৯১১, ১৯২৩, ১৯২৫ এবং ১৯৩৮-এ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জোতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ঘটেছিল। কিন্তু এই দাঙ্গা ধর্মভিত্তিক ছিলনা— ছিল মর্যাদা এবং জমির জন্য লড়াই কে কেন্দ্র করে। মুসলিম লীগের সঙ্গে আঁতাত কে কেন্দ্র করে বাংলাতে দলের জনগণ এবং তার নেতৃত্তের মধ্যেও সুস্পষ্ট বিভাজন ঘটে যায়।
১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে উইনস্টন চার্চিলকে লেখা এক চিঠিতে ডাক্তার আম্বেদকার লেখেন যে তিনি চান প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি তপশিলি সম্প্রদায় ও গোষ্ঠিকে রাজনৈতিক সংখ্যালঘিষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দিণ। ১৯৪৬-এর ১৯ ডিসেম্বর যখন পর্যন্ত কলকাতা এবং নোয়াখালীতে দাঙ্গার আগুন সম্পূর্ণরূপে নির্বাপিত হয়নি তখন বাংলার তপশিলি নেতা প্রমথরঞ্জন ঠাকুর কনস্টিটিউন্ট অ্যাসেম্বলিতে একটি অসাধারণ বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন— যার মূল কথাটি ছিল উত্তর ঔপনিবেশিক ভারতে এবং বাংলায় দলিত পরিচিতিকে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই বক্তৃতাটির অনেকাংশ উদ্ধৃত হয়েছে— আমাদের আলোচ্য গ্রন্থটিতে। বস্তুতপক্ষে প্রাক স্বাধীনতার পূর্বের ঐক্যবদ্ধ ভারতে বিশ ত্রিশ এবং চল্লিশের তপশিলি সম্প্রদায় গোষ্ঠী এবং দলিত বর্গটিকে নিয়ে এত তথ্যবহুল ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস এর আগে লেখা হয়নি বললেই চলে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমরা পেয়ে যাই সম্প্রতিককালে এবং অধুনা রচিত নতুন গবেষণা গ্রন্থ এবং প্রবন্ধের বিস্তারিত পরিচয় ও সেগুলিকে কেন্দ্র করে আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
৯
শেষের কথা
উপরোক্ত তিনটি গ্রন্থই দেশভাগ সংক্রান্ত এমন সমস্ত দিক উন্মোচন করেছে যে দিকগুলি আগে প্রায় আলোচিত হয়নি বললেই চলে বা নিতান্তই ছিল সর্বালোচিত। একেবারে প্রকৃত সামাজিক-সাংস্কৃতিক- ঐতিহাসিক এবং নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সব্যসাচী ভট্টাচার্য আলোচনা করেছেন সত্তার পুনর্নির্মাণঃ ১৯২০-এর দশক ও নতুন ভদ্রমহিলার উদ্ভাবন-এর মত অধ্যায়; ‘হিন্দু সমাজের’ গড়ন বাংলাতে কিভাবে কল্পনা করা হতো? ভূমিজ বনগোষ্ঠী নমঃশূদ্র জাতি— মুসলিম সম্প্রদায় ও মধ্যবিত্তের রাজনীতি— সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভাষ্যঃ গণমাধ্যম সত্তার অন্তর্দ্বন্দ্ব— হিন্দু মহাসভার ভাষ্য পরিবর্তন—কংগ্রেস হাইকমান্ড— চূড়ান্ত সমস্যাঃ ‘হৃদয়ের বিভাজন’ ইত্যাদি বিষয় গুলি।
সব্যসাচী বাবু গ্রন্থের অন্তিম অধ্যায়ে লিখেছেনঃ দেশভাগের পরিকল্পনা নেতাদের পূর্ণ সহযোগিতায় বলবৎ হয়। ভারতের বাটোয়ারার কাজে উভয় সম্প্রদায়ের নেতারাই যে সহযোগিতার মনোভাব দেখান দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার ভারতের ঐক্য রক্ষায় সেই মনোভাবের একান্ত অভাব ছিল।
১৯০৫- এর প্রথম বঙ্গভঙ্গে বিদেশি শাসকদের হাত ছিল, ১৯৪৭-এর দেশভাগে হাত ছিল বঙ্গবাসীদের…… এই ঘটনাসমূহের সমীক্ষায় আমরা যা দেখেছি তা হলো বাংলার বিভাজন আসলে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় পক্ষের বেশিরভাগ রাজনৈতিকদের নীরব সক্রিয় সম্মতিতেই হয়েছিল। উভয়পক্ষের একে অপরকে দোষারোপ করা একপ্রকার আত্মপ্রবঞ্চনা। ১৯৪৭-এর আগে যে বাংলা ছিল, দেশভাগ পরবর্তী বাংলায় তার জন্য রোমান্টিক আক্ষেপ সম্ভবত একটি অপরাধের পরিশীলিত পরিনাম।[xxvii]
সেমন্তী ঘোষ লিখেছেন—”মোটকথা আমাদের মূল স্রোতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যর্থতা যে সে প্রায় কখনোই ঠিক ঠিকমতো বাঙালি মুসলিমদের বক্তব্য বা বিক্ষোভ গুলি সম্মান সহকারে বিবেচনা করেনি। … আসলে ধর্ম, ভাষা, জাতি, দেশের পরিচয়ে পরিচিত সত্তাগুলির এই সমানে মিলতে থাকা এবং সমানে আলাদা হতে থাকার বাস্তব ছবিটা ছিল বেশ জটিল। বিশ শতকের প্রথম দিকের বাংলার মুসলমান সমাজের মধ্যে আলাদা আলাদা সত্ত্বাও যেমন সত্য ছিলো, তাগের সংঘাতও ছিল তেমনই অবশ্যম্ভাবী ধরনের সত্য। এর মধ্য থেকে তারা নিজেদের সমাজ ও রাজনীতি তৈরি করতে চাইছিলেন। কঠিন পথে হাঁটছিলেন তাঁরা। বিশেষত এই সমাজ যেহেতু সামগ্রিক দিক দিয়ে সামাজিকভাবে অনগ্রসর, অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপর এবং রাজনৈতিকভাবে অপরিণত ছিল, সেই কারণেই বাঙালি মুসলমানের ‘জাতীয়তা’ উন্মেষের পথটিও বিশেষভাবে কঠিন। হয়তো আরো একটু সহমর্মিতা ও সহযোগিতা তাদের প্রাপ্য ছিল এই হাঁটার পথে। হয়তো বঙ্গভঙ্গের মত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কেন তাঁদের এতোখানি নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল সে বিষয়ে কিছুটা খোলাখুলি কথা হতেও পারত তাঁদের মূল স্রোতের রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে। বদলে তাঁরা কেবল প্রান্তেই থেকে গেলেন। আর ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ হিসেবে ভুল পরিচয়ে পরিচিত হয়ে গেল তাঁদের সামাজিক ‘স্বাতন্ত্র্যের’ ভাবনা।[xxviii]
১০
উপরোক্ত তিনটি গ্রন্থেই যে ধরণের তথ্য সূত্র উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে তা আমাদেরকে সমৃদ্ধশালী করে তুলতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। বোঝা যায় যে— বিগত কয়েকটি দশক জুড়ে এই বিষয় সম্পর্কিত গবেষণা কতটা দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। গ্রন্থ গুলি আবারও নতুন করে পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে আরো বহুমাত্রিক ও নতুন নতুন দৃ
[i] আনন্দবাজার পত্রিকা ২৩ আগস্ট, ২০২২
[ii] আনন্দবাজার পত্রিকা ২৮ আগস্ট, ২০২২
[iii] সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ব পশ্চিম (আনন্দ পাবলিশার্স প্রা লি, ১৯৯৩)
[iv] সাক্ষাৎকার-আয়েশা জালালের সঙ্গে গর্গ চট্টোপাধ্যায় (এই সময়, ২১ জুলাই ২০১৩)
[v] মূলতঃ V.P.Menon, The Transfer of Power
V.P. Menon, Story of Integration of Indian States (Bombay, 1956)
- Campbell Johnson, Mission with Mountbatten (London, 1951)
H.V.Hodson, The Great Divide (London, 1969)
Penderel Moon, Divide and Qint (London, 1961)
- Mansergh, (ed) The Transfer of Power 1942-47 12 vols (London:1970-83)
[vi] Ayesha Jalal- The sole spokesman: Jinnah the Muslim League and the Demand for Pakistan. (Cambridge University Press, 1985)
[vii] Ayesha Jalal- Exploding Communalism: The politics of Muslim Identity in South Asia. In Nationalism, Democracy and Development: State and Politics in India ed. by Sugata Bose and Ayesha Jalal (O.U.P Delhi, 1997)
[viii] Joya Chatterjee-Bengal Divided (New Delhi, 1995)
Gyanendra Pandey- The consrtuction of communalism in North India (Oxford, Second Edition, 2006)
Remembering Partition, Violence, Nationalism and History in India (Cambridge, 2001)
Haimanti Roy-Partitioned Lives: Migrants, Refugees, Citizens in India and Pakistan, 1947-1965 (O.U.P, New Delhi, 2012)
Jayanti Basu- Reconstructing the Bengal Partition: The Psyche under a Different Violence (Samya, 2013)
Neeti Nair- Changing Homelands: Hindu Politics and the Partition of India (Parmanent Block, Ranikhet, 2011)
[ix] Ritu Menon and Kamla Bhasin- Borders and Boundaries: Women in India’s Partition (New Brunswick, 1998)
[x] Semanti Ghosh, Different Nationalisms: Bengal 1905-1947 (O.U.P 2016)
[xi] Sekhar Bandopadhyay and Anusua Basu Roy Chowdhury- Caste and Partition in Bengal: The Story of Dalit Refugees 1946-1961
[xii] সুমিত সরকার, জাতীয়তাবাদ ছাড়িয়েঃ স্বদেশী যুগে বাংলার কয়েকটি দিক (পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, অশীন দাশগুপ্ত স্মারক বক্তৃতা ৩)
[xiii] সব্যসাচী ভট্টাচার্য, বিভাগ পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাঃ রাজনীতির বাইরে রাজনীতি (১৯২০-১৯৪৭) (অধ্যাপক গৌতম চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা, ২০০৪ SUCHI)
[xiv] সেমন্তী ঘোষ (সম্পাদিত), দেশভাগ স্মৃতি আর স্তব্ধতা (গাঙচিল, কলকাতা ২০০৮)
[xv] সেমন্তী ঘোষ, বারোমাস (শারদীয় ২০০৫)
[xvi] সেমন্তী ঘোষ, বারোমাস (শারদীয় ২০০৭)
[xvii] সেমন্তী ঘোষ, বারোমাস (শারদীয় ২০০৮)
[xviii] সেমন্তী ঘোষ, বারোমাস (শারদীয় ২০০৯)
[xix] সেমন্তী ঘোষ, বারোমাস (শারদীয় ২০১১)
[xx] সেমন্তী ঘোষ, বারোমাস (শারদীয় ২০১৪)
[xxi] সেমন্তী ঘোষ, পরিচয় (বৈশাখ-আষাঢ় ১৪১২)
[xxii] সেমন্তী ঘোষ, পরিচয় (বৈশাখ-আষাঢ় ১৪১২)
[xxiii] সেমন্তী ঘোষ, মূল ইংরেজী গ্রন্থের অধ্যায় ১ এবং ৪ নং অধ্যায়ের বক্তব্য সমূহের ওপর লেখিকার প্রবন্ধ। বারোমাসে উল্লিখিত প্রবন্ধগুলিতে।
[xxiv] Sekhar Bandopadhyay —Caste, Protest and Identity in Colonial India: The Namasudras of Bengal (O.U.P London, New Delhi, 2011)
[xxv] Roop Kumar Barman, Partition and its Impact on the Scheduled Castes of Bengal (New Delhi, 2012)
[xxvi] Swaraj Basu, Dynamics of a Caste Movement: The Rajbansis of North Bengal 1910-1947 (New Delhi, Manohar, 2003)
[xxvii] সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বে উল্লিখিত।
[xxviii] সেমন্তী ঘোষ, পূর্বে উল্লিখিত।






