শ্রমিক অঞ্চলে দাঙ্গা — কারণ ও প্রতিকারের খোঁজ

সন্দীপ ব্যানার্জি

[Working Class areas of Bengal are riot prone. This tendency is heard to have increased in the past few years. But what is the reality?If it is true, what is the root of it? Is it to destroy working class unity? Sandeep Banerjee has reviewed historically whether there was a trend of riots in the working areas of Bengal from period before 1947, and what are its characteristics.]

শ্রমিক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — (১) আপনি কে? আপনি কি শ্রমিক? নাকি আপনি একজন হিন্দু অথবা মুসলিম? না আপনি বিহারি কিম্বা বাঙালি?

খুব কম মাত্রার হলেও কিছু সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষ তো ঘটে গেল। দু্ঃখজনক। এবং দুশ্চিন্তার বিষয়ও বটে। বিশেষ করে গোন্দোলপাড়া-চন্দননগর, হুকুমচাঁদ-নৈহাটি, খড়গপুর… খুবই নাম শোনা এমন সব শিল্পাঞ্চলে।  তা, ধর্ম-সম্প্রদায় নিয়ে মারদাঙ্গাই হোক বা এমনকি যদি শুধু ভাগাভাগি হয় আর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস জন্মায় – যেখানেই হোক সেটা খারাপ। কিন্তু এরকম শ্রমিক অঞ্চলে হলে সেটা বেশী ধাক্কা দেয়। এমনতো শুধু নয় যে এর ফলে ঐ জায়গায় শ্রমিকদের শুধু ভবিষ্যতে একসাথে আন্দোলন গড়ে তুলতে মুশকিল হবে। এটা তার থেকেও বড় ব্যাপার। এইসব জায়গাগুলিতে অতীতে অনেক অনেক গৌরবময় আন্দোলন হয়েছে শ্রমিকদের। সেসব বিরাট বিরাট লড়াই হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খৃষ্টান বাঙালি-আদিবাসি-বিহারি-ওড়িয়া-তেলেগু-নেপালি এবং উঁচু-নিচু জাতপাতেরফারাক ভুলে সব শ্রমিক এক হয়েই করেছিল। তাহলে? কি হল?

অনেকে বলেন যে আধুনা এই সময়ে বা এই যুগে “আইডেনটিটিপলিটিকস” বা নিজের পরিচিতির রাজনীতি সামনে এসে গেছে। কেউ নিজেকে কখন কি ভাবে দেখে, নিজেকে কি মনে করে, সেটাই ব্যাপার। যেমন কেউ নিজেকে শ্রমিক বা কর্মচারী হিসেবে না-ই দেখতে পারে। “তুমি কে?” এই প্রশ্ন করলে কেউ বলতে পারে – নারী অথবা পুরুষ; আমি হিন্দু বা মুসলমান বা খৃষ্টান বা শিখ; বলতে পারে আমি আদিবাসি; অথবা বলতে পারে আমি বাঙালি বা বিহারি বা আমি একজন ওড়িয়া বা গোর্খা; কিম্বা আমি কায়স্থ বা আমি জোলা বা তিলি বা কৈবর্ত বা নমঃশুদ্র; অথবা বলতে পারে আমি আমি কুমোর পাল, বা আমি গোয়ালা ঘোষ বা আমি ও.বি.সি. বা আমি বাউরিতপশিলি জাতি…। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র হলে আবার গায়ের রঙ দেখে সাদা না আফ্রিকান না এশিয়ান না ল্যাটিনো এই বিভেদগুলো সামনে আসে। এরকম নানা “আত্মপরিচিতি” বা আইডেনটিটি হতে পারে। আবার শ্রমিক কি কর্মচারি বা চাষী বা মাস্টার … এগুলোও হতে পারে। তারা বলেন –কে কখন নিজের পরিচয় কি দেবে সেটা কে কখন কি মনে করছে তার ওপর নির্ভর করে। ‘সত্যিকারের পরিচয়’ বা ‘আসল পরিচয়’ বলে কিছু নেই।

কিন্তু দু’একটা কথা যদি একটু ভেবে দেখেন। ধরুন আপনি নারী বা পুরুষ হবেন লিঙ্গ বিচারে। যৌন-চাহিদার ব্যাপারটা লিঙ্গ অনুযায়ী বেশীরভাগ ক্ষেত্রে হয়, কিন্তু সেটা কিছু ক্ষেত্রে সেরকম না-ও হতে পারে — তাতেও কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। আপনার গায়ের চামড়ার রঙও আপনার হাতে নেই। সেটা আপনার পছন্দমত রঙ করতে গেলে, মাইকেল জ্যাকসনের মত খরচ করে ডাক্তারি করতে গেলে, আপনাকে কোটিকোটি’র মালিক হতে হবে। তো এই পর্যন্ত যা যা দেখা গেল – লিঙ্গ, গায়ের রঙ ইত্যাদিগুলো আপনার দেহের প্রতিটি কোষের মধ্যে কোষকেন্দ্রকে থাকা ক্রোমোজোম, জিন ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল — বা এগুলো জীবজাগতিক বা বায়োলজিকাল। এগলোর কিছু একটা করে আপনার মধ্যে থাকবেই। তা নিয়ে বিব্রত হওয়ারও কিছু নেই। লিঙ্গ বা যৌনতা বা গায়ের রঙ বিচারে ভালো বা মন্দ ভাবলে বুঝতে হবে — যে এরকম ভাবছে তার চিন্তাভাবনায়গন্ডগোল আছে – অথবা সে মেয়েদেরকে পুরুষের অধীনে রাখতে চায়। আর “মেয়েরা মেয়েদের মত শান্ত-শিষ্ট বাধ্য হবে” এই ভাবনাটা জৈবিক নয়, এটা সামাজিক বা সোশাল। যৌনতার বিষয়টা খানিকটা সামাজিক।

এবার ভাষা-জাতি। প্রথমেই দেখুন — আপনার ভাষা-জাতি পরিচয় যাই হোক সেটা মোটেই খারাপ বা ভালো – সেটা নয়। পৃথিবীতে কোনো শিশু এলে সে তার মা-বাবা ও নিকটতম পরিবেশ থেকে এক এক করে শব্দ শেখে, ভাষা শেখে – ভাষা ছাড়া সে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেনা, অন্যের কথা বুঝতে পারবেনা, এবং ভাষা ছাড়া সে কিছু শিখতেও পারবেনা। এবং সব ভাষারই সমান মর্যাদা হওয়া উচিত ও হওয়া সম্ভব। সুইৎজারল্যান্ড এবং আরো কিছু দেশে সরকারের থেকে সব ভাষা সমান মর্যাদা পায়। ফলে ভাষা ও সে অনুযায়ী জাতি পরিচয় নিয়ে কাউকে বড়- ছোটো ভাবার কোনো মানে হয়না। কেউ যদি ভাবে ‘বিহারি’ বা ‘ওড়িয়া’রা হ’ল নিচু আর ‘বাঙালি’ বা ‘মালয়ালি বা কেরালিয়ান’ রা উঁচু – তা আদৌ ঠিক নয়। বরঞ্চ এরকম ভাবনা অত্যন্ত ভুল। কোনো ভাষাকে কোনো জাতিকে ছোটো করা, অপমান করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যেহেতু ভাষা পরিচয় এমন জিনিষ যে – কোনো না কোনো ভাষা ছাড়া আপনি চালাতে পারবেনই না। তাই এটা আবশ্যিক ব্যাপার মানুষ হিসেবে। কিন্তু এটা আপনার জীবজাগতিক পরিচিতি নয়, এটা সামাজিক ও বৌদ্ধিক। ভাষা অনুসারে জাতি পরিচয় – সেটাও আবশ্যিক ভাবে সকলের থাকে। তবে জাতি ও জাতিয়তাবাদ কিন্তু আলাদা ব্যাপার।

আবার — ধর্মও সামাজিক। জাতপাতও সামাজিক। কিন্তু সেগুলো ভাষার মত ব্যাপার নয়। যেকোনো লোক, ধরা যাক কোনো ধর্ম জানে না, মানে না। তাও সে বেঁচে থাকতে পারবে। কারো যদি কাস্ট বা জাত না থাকে – যেমন হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মে জাতপাতের স্থান নেই সেও বেঁচে থাকতেই পারে কোনো অসুবিধা ছাড়াই। জাত-নেই, ধর্মপরিচয়-নেই এরকম ভাবে দিব্য বেঁচে থাকা গেলেও, ভাষা ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয়। বরং জাত-পরিচয়ের মাধ্যমে বহু বহু মানুষকে হাজার হাজার বছর অপমান-লাঞ্ছনা-বঞ্চনা-অত্যাচার কত কি সহ্য করতে হয়েছে। জাত ব্যাবস্থা উচ্ছেদ করা উচিৎ। তাহলে দেখলাম — কিছু পরিচিতি আবশ্যিক ভাবে থাকবে; আর কিছু পরিচিতি ঐচ্ছিক, যেগুলো ছাড়াও মানুষের চলে। বরং সেগুলি হয়তো জনসাধারনের এক অংশকে অন্য অংশের বিরুদ্ধে চালিত করে হামেশাই।

 

শ্রমিক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — (২) আপনি কোন‍্ শ্রেণীর মধ্যে পড়েন?

বর্তমান সমাজগুলোর যা অবস্থা তাতে করে আপনাকে কোনো না কোনো শ্রেণীর মধ্যে পড়তেই হবে। এটা ঐচ্ছিক নয়, এটা আবশ্যিক। মানুষ প্রকৃতির সৃষ্টি। কিন্তু মানুষ প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মের অধীন। “কর্ম” করে বা “শ্রম” দিয়ে তাকে তার অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান সব কিছুর ব্যবস্থা করতে হয়। একজন শিশু সেটা পারেনা, তার অবিভাবকেরা তা করে দেয় ও শিশুটির অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান এর ব্যবস্থা করে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে পুত্র-কন্যারা এটা সাধারনত করে। সুইডেন এর মত উন্নত “জনকল্যান” রাষ্ট্রে শিশু ও বয়স্কদের অনেক দায়িত্ব সরকারই বহন করে।

বর্তমান সমাজ শ্রেণী বিভক্ত। এটা কেউ মানে কি মানেনা তার ওপর নির্ভর করেনা। শ্রেণীবিভাগ ও শ্রেণীবিরোধমানামানি’র বিষয় নয়। বাস্তব। যে যাই মনে করুক। এবার ধরুন — ব্রাজিল বা বলিভিয়ায়অরণ্যবাসীআদিবাসি যেসব গোষ্ঠী এখনো এই চালু সমাজের অর্থনীতিতে নিজেদের জড়ায় নি – সেখানে শ্রেণী এখনো নেই। এরকম বাদে সব জায়গায় শ্রেণী – কারন সব জায়গায় শ্রম করতে হয় প্রকৃতির ওপর। প্রকৃতি ও মানুষের শ্রম মিলে সব ভোগ্যবস্তু তৈরী হয়, সম্পদ তৈরী হয়। কিন্তু অধুনা এরকম সমাজগুলোতে শ্রম করতে গেলেই আপনি কোনো না কোনো শ্রেণীর মধ্যে পড়ে যাবেন।

এবার ধরুন আপনি বললেন – টাটা কম্পানিতে যে কন্ট্রাক-কম্পানির অধীনে টাটা’র কারখানার গেটে রোদে জলে দাঁড়িয়ে গাড়ি চেক‍্ করে সুইচ টিপে গেট খোলা বন্ধ করছে আর মাসে ১০ হাজার পাচ্ছে, সেও খেটে রোজগার করছে। আর যে সাহেব ভিতরে এ.সি. ঘরে গদীতে বসে কম্পিউটার নিয়ে কোন লোকে বাইরে কি করছে কি করবে এসব ঠিকঠাক করছে, আর মাসে ৬০ হাজার টাকা পাচ্ছে সেও খেটেই রোজগার করছে। দুজনেরই শ্রমের “উপকরন” মানে ঐ একজনের কাছে দরজার সুইচ, চেকিঙ মেশিন বা ডিটেক্টর মেশিন। আর আরেকজনের কাছে কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক … এগুলো দু’জনেরই নিজেদের নয়। তাহলে কি দু’জনেইসর্বহারা? দু’জনেই শ্রমিক? দু’জনেই এক? এখন দেখুন — এই প্রশ্নের উত্তর আমরা দিই বা না দিই – ঐ দু’জনেই কিন্তু কোনো না কোনো শ্রেণীতে, কোনো না কোনো স্তরে (স্ট্র্যাটামে) পড়বেনই। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ রাখা যায় না।

যেমন, আগে আমরা এককথায় একটা লোককে বলে দিতে পারতাম – ও চাষী, চাষের কাজ করে। এখন এটা দিয়ে ওর সঠিক পরিচিতিও বোঝা যাবে না। আর ভবিষ্যতের বিপ্লবী সংগ্রামে ওর কি ভূমিকা হতে পারে সেটাও বোঝা যাবে না। তাই এখন এভাবে বলা হয় – সে একজন ভাগচাষী, বা সে একজন ধনী-চাষী, বা সে একজন ক্ষেত-মজুর। কারো হয়তো প্রথান চাহিদা নিজের মালিকানায় জমি। কারো হয়তো প্রধান চাহিদা মজুরী বৃদ্ধি ও নিয়মিত কাজ। আবার কারো হয়তো চাহিদা ফসলের বাড়তি দাম ও ব্যাঙ্কের কম-সুদের ঋণ। আলাদা স্তর। আলাদা চাহিদা। তবে মনে রাখা দরকার যে জমি লিজ এ নিয়ে বা নিজের জমিতে লেবার লাগিয়ে “চাষ করাচ্ছে” – সে চাষী নয়, অকৃষক।

যাই হোক – সব আইডেনটিটি-ই সমান বা একই মাত্রার তা যে নয় সেটা তো বোঝা গেল।

(১) ভাষা ও লিঙ্গ/যৌনতা এবং শ্রেণী পরিচয় এই সমাজে থাকতে বাধ্য আলাদা আলাদাকারনে ও আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে এরা কাজ করছে; এই অনুসারে সমাজে শোষণ-নির্যাতন হয় – এবং এটা দূর করা অবশ্যই দরকার “সাম্যবাদ” বা ‘সবাই সমান’ এটা করতে গেলে। * যদিও মনে রাখা দরকার যে নারী-শ্রমিকেরা বেশী শোষিত হয়; বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তাদের মজুরী কম হয়; তাদের অন্য নানা হেনস্থারও শিকার হতে হয়।

(২) শ্রেণী পরিচয় ঐ সমাজে থাকতে বাধ্য এবং এটা নানা অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ও সামজিক নানা ক্ষেত্রে আপনার ভূমিকার অনেকটা নির্ধারন করে।

(৩) জাত ও ধর্ম আবশ্যিক নয় – কিন্তু আমাদের দেশে সামাজিক ক্ষেত্রে এসবের প্রভাব আছে ও এই পরিচিতি অন্য পরিচিতি বিশিষ্ট কারোর সাথে আপনার বৈরিতার জায়গায় চলে যেতে পারে – সে আর আপনি উভয়েইশোষিত, উভয়েই গরীব হওয়া সত্ত্বেও। অবশ্য ভাষা-জাতি পরিচিতিও এরকম করে নানা ক্ষেত্রে।

 

শ্রমিক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — (৩) শ্রেণী বাদে অন্য পরিচিতিগুলো সামনে আসছে কেন, কবে থেকে

কোনো কারনে যদি কেউ শোষিত, নির্যাতিত হয়, এবং যদি তার সুরাহা নিয়ে সমাজে কোনো শক্তি কার্যকরী কিছু না করে, তবে সেই শোষিতেরা, নির্যাতিতেরা এককাট্টা হয়ে লড়ার পথে যেতে বাধ্য হয়। যেমন ধরা যাক আমেরিকায় কালো চামড়ার জনগণ একজোট হয়েছে। বারবার লড়াইএ নেমেছে। ভবিষ্যতেও নামবে যতদিন বর্ণবিদ্বেষ, কালো চামড়ার মানুষদের প্রতি ঘৃণা ইত্যাদি নোংরামো সমাজে থাকবে। এটা ঠিকই যে আব্রাহাম লিঙ্কনের নেতৃত্বে এক বিরাট বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ হয়েছে আমেরিকাতে– ১৮৬১ সাল থেকে টানা দু’বছর। সেই যুদ্ধে লিঙ্কনদের বিজয়ের মধ্যে দিয়ে কালো চামড়ার লোকেদের ক্রিতদাস হিসেবে খাটানো বন্ধ হয়। কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ কি উঠে গেছিলো? না। আর তাই বারে বারে কালো চামড়ার লোকেদের বিদ্রোহ। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে বিরাট লড়াই তো ৫০ বছর আগেও হয়েছে। তবে এখনো নানা বড় প্রতিবাদ হচ্ছে নিগ্রোদের ওপর পুলিশের গুলি চালানো, নিছক সন্দেহবশে গুলি করে হত্যা ইত্যাদির বিরুদ্ধে।

সেরকমই, ভারতে নিচু জাতের জনগণ, বিশেষ করে দলিত’রা (যাদেরকে এদিকে শিডিউলডকাস্ট বা তপশিলি জাতি হিসেবেই লোকে বেশী জানেন তারা) সংগঠিত হয়েছে, লড়েছে। তাদের নিয়ে অন্যেরা যদি নিছক ভোটের খেলা খেলে, তাদেরকে যদি পার্টিগুলো শুধু “ভোটার” হিসেবেই দেখে – তো তারাও পার্টিগুলোকে ধান্দাবাজ ও কার্যত উঁচুজাতের পার্টি হিসেবেই দেখবে। নারীদেরও আলাদা করে সংগঠিত হতে হয়েছে তাদের দাবীর দিকে বিশেষ জোর দেওয়ার জন্য। শোষিতদের কোনো পার্টি যদি এরকম থাকতো যারা নারীদের সমস্যা নিয়ে লড়তো, সত্যিই লড়তো দলিতদের সমস্যা নিয়ে, কাশ্মীরি, মনিপুরী সমেত জাতিদের সমস্যা নিয়ে, অবহেলিত ভাষার সমস্যা নিয়েও লড়তো, তাহলে হয়তো এরকমও হতে পারতো যে তার মধ্যে দিয়েই সব ধরনের লড়াই হ’ত। তবে, কি হতে পারতো ভেবে তো আর লাভ নেই। হয়নি এটা বাস্তব। আর তাই নিপীড়িত, শোষিত বর্গগুলোকে নিজেদের লড়াই নিজেরাই সংগঠিত হয়ে করতে হয়েছে।

এই আলোচনাটা অনেক বড়। অর্থাৎ বিভিন্ন পরিচিতি নিয়ে সামজে সংগঠিত হওয়া ও সমাজের ওপর চাপসৃষ্টি করা কবে কোথায় কিভাবে শুরু হল। আমরা এখানে অতটা করতে পারবোনা। শুধু শ্রেণীপরিচিতি, শ্রেণীবোধ এর জায়গায় ধর্ম-পরিচিতি বা ‘আমি হিন্দু’ বনাম ‘আমি মুসলমান’ এসব সামনে আসলো কি করে, কবে, কেন এসব দেখবো।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ হিন্দু জনগণের উদ্বাস্তুতেপরিনত হওয়া ও এপাড়ে চলে আসা, এবং তারপরে আবার ১৯৫৯ ও ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ – এসব সত্ত্বেও কিন্তু পশ্চিমবাংলায় শ্রমিক অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা তেমন মাত্রায় ঘটেনি। যদিও কিছু গন্ডগোল কিছু কিছু বিশেষ ও মিশ্রধরনের অঞ্চলে হয়েছে। সেসবও মূলত কিছু দুস্কৃতকারীর কাজ ছিল। সাধারন খেটেখাওয়া জনগণ খুব তাতে অংশ নিয়েছে তা নয়। অন্তত ১৯৮০-৮৪ পর্যন্ত এরকম চিত্র ছিল। দাঙ্গা বললেই সাধারনত অন্যান্য রাজ্যের কথা মনে আসতো।  ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর সারা দেশে যে শিখ বিরোধীদাঙ্গা হয় তা দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এরাজ্যেও বেশ কিছু শহরাঞ্চলে ঘটে যায়। তারপর সেই কুখ্যাত ১৯৯২ এর বাবরি মসজিদ ভাঙার পরের দাঙ্গা। নানা শ্রমিক অঞ্চল থেকে বহু কমবয়সী হিন্দু যুবকেরা করসেবক হয়ে অযোধ্যায় গেছিল।

যে জিনিষটা ১৯৪৭ থেকে ধরুন ১৯৮৪ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের খেটেখাওয়া জনগণের একজোট ঠাসা সামাজিক বুনট বজায় রেখেছিল সেটা শ্রেণী হিসেবে একসাথে থাকা, একসাথে কাজ করা, একসাথে মালিকশ্রেণী ও সরকারের বিরুদ্ধে লড়া – কখনো কারখানায়, কখনো নিজের অঞ্চলে, কখনো নিজেদের শিল্পে – যেমন গোটা পাট, বা চা শিল্পে, কখনো সারা রাজ্যে বা আরো বড় আকারে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশক শ্রমিক-কৃষকদের লড়াই এর জন্য বিখ্যাত। না হলে চিন্তা করুন না – ১৯৭০ দশক থেকে সংগঠিত শিল্পে চালু হল ডি.এ. ব্যবস্থা, যাতে বাজারের দামের সাথে আয়ও কিছু বাড়ে; তৈরী হল ঠিকা ও অস্থায়ী শ্রমিকদের স্থায়ী করার আইন …।

কিন্তু বাম দলগুলো ১৯৭৭ এ একাধিক রাজ্যে সরকার তৈরী করে সরকার যে করেই হোক টিকিয়ে রাখার যে লাইন নিল, তাতে মালিকশ্রেণীর সাথে সমঝোতা, সহযোগিতা বাড়ালো। শ্রমিকদের ভয় পাওয়ানো শুরু হল – বেশী কিছু করতে গেলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে মালিকশ্রেণীরজুলুম জোর করে গিলিয়ে দেওয়া শুরু হল। দুর্নীতি ধীরে ধীরে গ্রাস করলো। পার্টির যে কোনো আদর্শ বলে ব্যাপার আছে তা উবে গেল। লালঝান্ডা তার ইজ্জত হারাতে লাগলো, তার আকর্ষণ হারাতে লাগলো। বরং তখন যুবকদের মনে হচ্ছে ধর্মীয় বা গোঁড়া হিন্দু বা গোঁড়া ইসলামিস়ংগঠনগুলোর যেন তবু কিছু আদর্শ আছে। খেটেখাওয়া জনগণের কাছে তার মেহনতী শ্রেণী পরিচয় এর থেকে বড় হিসেবে মনে হতে লাগলো ধর্মীয় পরিচয়কে।

অন্যদিকে  দেখুন — বহু বছর ধরে লড়াইহীন পরিবেশে থাকার ফলে, মেনে নেওয়ার পরিবেশে থাকর ফলে, দিনরাত নেতার কাছে শোনা – বেশী লড়ার কথা বোলো না কারখানা বন্ধ হযে যাবে,চাকরী চলে যাবে, কেউ বাঁচাবে না – এসব শুনতে শুনতে লড়াই এর ওপর আস্থাও চলে গেল। ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। নিয়তির লিখন কি বদলানো যায়! ধীরে ধীরে ‘তোমার নাম আমার নাম ভিয়েৎনামভিয়েৎনাম’, বা ‘লড়াই ছাড়া বাঁচার কোনো পথ নেই’ এসব স্লোগানের বদলে বেশী করে কানে আসতে লাগলো ‘ভোলে বাবা পার করেগা’, ‘জয় জগদীশ হরে’সিপিএমদেরবামফ্রন্ট ১৯৭৭এ সরকারি ক্ষমতায় আসার কিছু পরে বেরোনো সিনেমা “জয় বাবা তারকনাথ” তখন বাস্তবের মাটিতে রমরম করে চলছে। ওদিকে সারা পৃথিবীতে যেটা ‘কমিউনিস্ট’ বা সমাজতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল – সেসব সাঙ্ঘাতিক ভাবে মুখ থুবড়েপড়লো। যেই হেরে যাওয়ার মধ্যে গৌরব নেই – আছে গ্লানি। আদর্শের জগতে এলো শূণ্যতা

১৯৯০-৯১ থেকে যেন একটা আলাদা সময় এসে গেল। যেন সব বদলে গেল। অণ্যদিকে ১৯৮৮ থেকে টি.ভি.তেরামায়ন, তারপরে এলো মহাভারত। আফগানিস্তানে এলো মুজাহিদিন, তালিবান। বিজেপি নেতা আদবানীর “রাম রথের” যাত্রা হল। ১৯৯২র ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙা হল।  এইভাবে ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ, পরস্পরকে অবিশ্বাস, সন্দেহ, ভালোমাত্রায় সামনে চলে এলো সমাজে।

 

শ্রমিক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — (৪) জুটমিল অঞ্চলে দাঙ্গা কবে থেকে হচ্ছে

দুটি ধর্ম-সম্প্রদায়ের শ্রমিক দুটি ভাগে জোট বাঁধছে, একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে, এই ঘটনা জুটমিল অঞ্চলে প্রথম সামনে আসে আজ থেকে ১২০ বছর আগে, ১৮৯৬ সালে। অবশ্য তার এই ধরেনের জোট বাঁধা, ধর্মীয়-সম্প্রদায় হিসেবে নিজের দাবী মালিকের কাছে বা প্রশাসনের কাছে পেশ করা, প্রশাসনের সাথে গন্ডগোল… এসব অবশ্য সামনে আসে বছর পাঁচেক আগে থেকেই, বা প্রায় ১৮৯১ থেকে। তার আগে এরকম ঘটনার কোনো তথ্য এখনো পর্যন্ত পাইনি।  ১৮৯১ থেকে কিছু ধর্ম-সম্প্রদায় ভিত্তিক দাবীতে ‘আন্দোলন’, ‘বিক্ষোভ’, পুলিশের সাথে ঝামেলা এসব হল কিছু অদ্ভুত দাবীতে, যেমন – মহরমে বা রথযাত্রায়সবেতন ছুটির দাবীতে।

১৮৯৬ সালে হিন্দু – মুসলমান মুখোমুখি দাঙ্গা। স্থান – টিটাগড় জুট মিল, হেস্টিংস‍্ জুট মিল (রিষড়া), লোয়ার হুগলী জুট মিল ইত্যাদি কিছু শ্রমিক অঞ্চলে। এবং সেটা ঈদ উদ‍্জোহা নিয়ে। বলা বাহুল্য সেটা হ’ল গরু জবাই হবে কি হবেনা তা নিয়ে। “হিন্দু”রা বাধা দেয়। উভয়ক্ষেত্রেইঅবাঙালী হিন্দু ও অবাঙালী মুসলমান শ্রমিক ও খেটেখাওয়া মানুষ দাঙ্গারলোকলস্কর।

রিষড়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু লোকজন কিছু ‘তেলী’ ব্যবসায়ী এবং এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে গো-হত্যা বন্ধের দাবীতে ডেপুটেশন দেয়। তারা নাকি মুসলমানদেরবলাবলি করতে শুনেছে যে এবার গরু কুরবানি দেওয়া হবে। পুলিশ জানতে পারে একজন ‘নাজির মিঞা’ ব্যারাকপুরে খবর পাঠিয়েছে – দাঙ্গা হলে সেখান থেকে যেন মুসলিমরা সাহায্যের জন্য আসে। তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। শেষে পুলিশ ও প্রশাসন গো-হত্যা বন্ধের দাবী মেনে নেয়। গরু কুরবানি নিষিদ্ধ করে।

টিটাগড়ের ক্ষেত্রে রাজমিস্ত্রি মহম্মদ হোসেন এর কেনা কুরবানির জন্য আনা বকনা-বাছুহরটিকে চুরি করে চারজন হিন্দু। যারা কেউ দারোয়ান কেউ অন্য কাজ করে এমন গরীব মানুষ। তারপরেদাঙ্গায় দুই পক্ষের শত শত শ্রমিক জড়িয়ে যায়।

গার্ডেনরিচ এর লোয়ার হুগলী জুট মিল-এ আরো সাঙ্ঘাতিক কান্ড হয়। মুসলমানেরা ঈদে গরু কুরবানি দিয়েছে – তার ‘পাল্টা’ হিসেবে ‘নিচু জাত’ এর (দোসাধ) কিছু শ্রমিক জানায় সেদিন তাদেরও একটা পরব আছে। এবং পরদিন মিল এর ভেতরে শুয়োর জবাই হয়েছে তা আবিস্কৃত হয়। এটা মুসলমান শ্রমিকেরা জানতে পারে সকালের শিফ‍্ট এ তাদের জলখাবারের বিরতির সময়। তারা এর বিহিত দাবী করে ম্যানেজারদের কাছে এবং বলে যতক্ষণ বা এটার বিহিত হচ্ছে ততক্ষণ তারা কাজ করবেনা – যেই দিন কিনা ম্যানেজমন্টের বেশী উৎপাদন খুব দরকার। কিছু মুসলমান শ্রমিক বললো – কই, আমাদের তো মিল এর মধ্যে গো-কুরবানি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলনা! ওরা কেন করার অনুমতি পেল! ব্যাস। এভাবে শুরু হল দাঙ্গা।

 

শ্রমিক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — (৫) জুটমিল অঞ্চলে দাঙ্গা শুরুর পেছনের ঘটনা

 

১৮৯৬ এ প্রথম এধরনেরদাঙ্গার পর একটা কলকাতার খবরের কাগজে নাকি লেখে – গো-কুরবানি নিয়ে এর আগে বাঙলায় কোনোদিনদাঙ্গা হয়নি। অথচ আমরা জানি যে অবিভক্ত সেই বাঙলায় অন্তত ৬০-৬৫% বা তার বেশী জনসংখ্যা মুসলমান। এবং তারা গো-মাংস খেতোকেন ১৮৯১ থেকে ধর্ম-সম্প্রদায় ভিত্তিতে শ্রমিকাঞ্চলে জনতা সংগঠিত হতে লাগলো?ঐতিহাসিকেরা বলছেন –  ১৮৮৮-৯৩ সময়কালে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে, বিশেষ করে– বালিয়া, বেনারস, আজমগড়, গোরখপুর, আরা, সারন, গয়া, পাটনা জেলাতে গো-হত্যা নিয়ে দাঙ্গা হয়। কারন সেই সময়ের কিছু আগে থেকেই গো-হত্যা বন্ধ করার জন্য একশ্রেণীর হিন্দু নেতারা সংগঠন তৈরী করতে থাকে ও তা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর ভারতে। গো-শালা তৈরী হতে থাকে গরুদের নিরাপদ আস্তানার ব্যবস্থা করার জন্য। দুঃস্থ গরুদের খাদ্যের জন্য লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা শুরু হয়। এসব কাজে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রমুখ নেতৃত্ব দেন, আর্য সমাজী’রা অতি সক্রিয় হয়। গো-হত্যা বন্ধ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ দিতে থাকে ।

এদিকে ১৮৮৫-৮৬-র পর থেকে ক্রমশ জুটমিলগুলোতে বিহার উত্তরপ্রদেশের থেকে আসা শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এবং ১৮৯৫-৯৬ নাগাদ দেখা যায় জুটমিল শ্রমিকদের মধ্যে

অধিকাংশই অবাঙালী – যেটা পরে ১৯১১০ নাগাদ দেখা যায় আরো আরো বেশী।

রিষড়া অঞ্চলের পুলিশের বড় সাহেব (বৃটিশ) অফিসার বলেন – দাঙ্গায় এখানে সেইরকম দাঙ্গাকারীদের দেখছি ঠিক যেরকম দেখেছিলাম আরা, সারন, বালিয়া, আজমগড়ে দাঙ্গার সময় ডিউটিতে। তাই বাঙলার ক্ষেত্রে ঈদে গো-কুরবানি ও গো-মাংস নিয়ে দাঙ্গাকে বাইরে থেকে আমদানী হওয়া দাঙ্গা বলা হয়। একবার দাঙ্গা হলে তার এক গভীর ক্ষত থেকে যায় জনসাধারনের মনে। “আমরা” – “ওরা” বিভাজন শুরু হয়। এবং দু’পক্ষেই এরকম লোকের অভাব নেই যারা এগুলোকে বাড়িয়ে তোলার জন্য সর্বদা কাজ করে চলেছে।

এর পরে উল্লেখযোগ্য দাঙ্গা হয় ১৯২৬ এ। কিন্তু তখন বাঙলা ভাগ করার ব্যাপার এসে গেছে। তারপরে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ব্যাপারও এলো। ফলে কে কোন ভাগে সরকারি ক্ষমতা পাবে, কার কত জমি-জায়গা/লোক-লস্কর/ধন-সম্পদ ব্যাপারটা এসে গেল এবং উপরের মহল থেকে জনগণকে বিভক্ত করার ব্যাপারটা খোলাখুলি সামনে চলে এসেছে সেই সময় থেকে।

 

শ্রমিক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — (৬) কিন্তু দাঙ্গা তো সমসময়েইহতো না। তখন আবার জনগণের ঐক্যের ব্যাপারটা কিভাবে আসতো।

২৬-শে এপ্রিল ১৮৯৫। জুটমিল মালিকদের সংগঠন আই.জে.এম.এ. বৃটিশ সরকারকে চিঠি দিচ্ছে – কাশীপুর থেকে নৈহাটি – গঙ্গার দুধারেরমিউনিসিপালিটি অঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশব্যাটেলিয়ন দিতে হবে – শ্রমিকদের বাগে রাখা যাচ্ছে না। [তারপর ১৮৯৬ এ দাঙ্গা।] ১৮৯৭ এ ব্যারাকপুরে বেঙ্গল মিলিটারিপুলিশ এর ফোর্থ কম্পানি তৈরী হল শ্রমিক বিক্ষোভ মোকাবিলার জন্য। [১৯২৬ এ দাঙ্গা হ’ল। ১৯৩৬-৩৭ এ আবার দাঙ্গা।] ১৯৩৭ এ নৈহাটিরজুটমিলগুলোর ২০,০০০ শ্রমিকের মিছিল, বিক্ষোভ, আন্দোলন – হুকুমচাঁদজুটমিলের কুখ্যাত মালিক শ্রমিকদের অধিকার ও দাবীগুলো মানতে বাধ্য হচ্ছে।… এরকম ঘটনার অভাব নেই।

খড়গপুরেও একই ব্যাপার। বৃটিশ আমল থেকেই বহু গৌরবোজ্জ্বল লড়াই এর নজীর। আবার নক্কারজনক, লজ্জাজনক দাঙ্গারক্ষতচিহ্ন। ১৯২৮-২৯ এর দাঙ্গায় খড়গপুরে ২৪ মারা যায়, আর ৫৬ জন জখম। ৮ই অক্টোবর ১৯২০ – খড়গপুরে রেল শ্রমিকদের ধর্মঘট মজুরী বৃদ্ধির দাবীতে – ১০,০০০ – হ্যাঁ, দশ হাজার রেল শ্রমিক, তাদের অনেকেই লোকো রানিঙ স্টাফ – বি.এন.আর. কোম্পানি দাবী মানতে বাধ্য হ’ল। ১৯২৭ এর খড়গপুর – পুলিশেরবেয়োনেট চার্জ শ্রমিকদের ওপর – তাকে কেন্দ্র করে ফেব্রুয়ারী মাসে হাজার হাজার রেল শ্রমিকের ধর্মঘট। বিধান চন্দ্র রায় বাঙলার বিধানসভায় এই নিয়ে মুলতুবী প্রস্তাব তুলছেন …। ১৯২৮ সালে ২৯শে জুন থেকে ২রা আগস্ট ফের রেল ধর্মঘট – কেন্দ্র খড়গপুর। ১৯৩১ সালে খড়গপুরের হিজলি জেলে বন্দীদের আনন্দ-উৎসব – দীনেশ এর ফাঁসির আদেশ দেওয়া জজ‍্ সাহেব শেষ পর্যন্ত এক সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীর গুলি খেয়ে মৃত! ১৯৩২ এর ১৩ই নভেম্বর – খড়গপুরের রেল শ্রমিকেরা মাদ্রাজ রেলওয়ের ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমর্থনে সভা করছে। মাদ্রাজ রেলের ধর্মঘটের ফান্ড এর জন্য রেল শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাঁদা উঠলো ১০০০ টাকা – তখনকার ১ টাকা যে এখন কত তা চিন্তার বাইরে।

 

শ্রমিক অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — (৭) কিছু করার আছে কি

যে জিনিষটাকে কেন্দ্র করে জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরী হচ্ছে সেটা তাদের ধর্মীয় পরিচয়। যেটা এই বিভেদকে পিছনে সরিয়ে দেয় তা হ’ল তাদের মানুষ হিসেবে পরিচয়, তাদের শ্রেণী হিসেবে পরিচয়। কোনো হিন্দু বা মুসলনমান বা শিখ বা খৃষ্টান শ্রমিক বা কৃষক কিম্বা এমনকি অত ধর্মটর্ম মানে না এমনও যেকোনো শ্রমিক বা কৃষক সমাজের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারী কাজ করেন — তারা সমাজের জন্য উৎপাদন করেন বা সেটা লোকজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। উৎপাদন ও বিতরণের কাজে ও সেই সংক্রান্ত আরো নানা কাজেই দেশের বেশীরভাগ লোক নিযুক্ত। শ্রমিক-কৃষকদের মেহনত ছাড়া কোনো সমাজ চলতেই পারেনা। ফলে শ্রমিক বা কৃষক হিসেবে তাদের গর্ববোধ করাই উচিৎ। শুধু বড়লোকশ্রেণীর বাবু লোকেরা বা “ভদ্রলোকেরা” মেহনতি জনগণকে “চাষা” বা “লেবার-ক্লাস”, “কুলি/মজুর” এসব বলে ব্যাঙ্গ করে। অথচ তারা কোনো খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান কিছুই উৎপাদন করতে পারেনা।

শ্রমিকেরা যখন কিছু উৎপাদন করে তাতে লেখা থাকেনা কোন ধর্মের লোক তা উৎপাদন করেছে, বা কোন জাতের, কোন জাতির। সেটা শুধু মানুষের শ্রম হিসেবেই গণ্য হয়। এই যে কাগজটা পড়ছেন সেই কাগজটা, বা রাত্রে যে ইলেক্ট্রিক লাইটে পড়বেন সেই ইলেক্ট্রিক, বা জামা-কাপড়, বা চাল-গম … সেসবই তাই। ট্রেন বা বাসে গেলে ড্রাইভার কোন ধর্মের লোক, কোন জাতের লোক, তাতে কিছুই যায় আসে না। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল – পরবের সময়, প্রার্থনার সময়, বিয়ে-সাদির সময়, মরার সময়, এরকম কিছু সময়ে হুঠ করে একজন আরেকজনের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। যাক গে – কিন্তু বাকি সময়, যখন সে সমাজের জন্য দরকারি কাজ করছে – সেসময়ে তার কি জাত কি ধর্ম তা কেউ দেখে না। (একটু ভুল হল – সমাজের সব চেয়ে দরকারী কাজের একটা হল পরিস্কার করা ও রাখা – ভারতে সেই সব চেয়ে দরকারী কাজটা বেশীরভাগ জায়গাতেই মেথর জাতের লোকেরা করে – যাদেরকে অন্যায়ভাবে সমাজ ‘নিচু’ জাতের বলে – ঘেন্না করে!! এরকম সমাজটার প্রতি ঘেন্না হওয়া উচিৎ।)

শ্রেণী পরিচয় সমানেভালোভাবে থাকে যখন পরস্পরবিরোধীশ্রেণীরা একে অপরের সাথে লড়ে। শ্রেণী-সংগ্রামের সময় শ্রমিকেরা একজোট হয়ে মালিক – প্রশাসন – তাদের সব দালাল পার্টি – ইউনিয়ন … এদের সাথে লড়ে। যত লড়াইএর পরিবেশ থাকে ততই শ্রেণীবোধ গেঁড়ে বসে। আবার দীর্ঘদিনলড়াইএর পরিবেশ না থাকলে সেই চিহ্ন চাপা পড়ে যেতে থাকে। তাড়াতাড়ি চাপা পড়ে যায় যদি ধুলো-ময়লা বেশী ওড়ে।

আবার অন্যদিকে ধর্ম। বেশীরভাগ শ্রমিকই কট্টর হিন্দু বা মুসলমান নয়। কিন্তু তাদের কেউ পুজোয় বোনাস পায়, ছেলেমেয়ের জন্য জামাকাপড়কেনে: আবার কেউবা ঈদে ছেলেমেয়ের জন্য নতুন জামা কেনে। চাষীর বাড়িতে ভাদ্র-আশ্বিন-কার্তিক বেশ কষ্টের মাস। তাকে ধারদেনা করতে হতে পারে। কারোর ছেলেমেয়ের বিয়েতে পুরুত এসে সংস্কৃতে মন্ত্রটন্ত্র পড়ে। কারোর ছেলেমেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে কাজীসাহেব আসেন। কেউ দেখা হলে নমস্কার জানায়, কেউ বা সালাম জানায়। এই রকম কিছু হল আলাদা। এবার আসবে কিছু ধর্মীয়-সামপ্প্রদায়িক সংগঠন। তারাই এসবের ভিত্তিতে আপনাদের দুটো শিবিরে ভাগ করবে। তারপরেনানাকিছু প্রচার করে এক শিবিরের মন বিষিয়ে দেবে আরেক শিবিরের বিরুদ্ধে। একদলকেলেলিয়ে দেবে অপর দলের বিরুদ্ধে। ভুলিয়ে দেবে যে মেহনতি জনগণ হিসেবে সবাইই এক।

এই নিয়ে প্রচারমাধ্যমও খুব কাজ করছে। কত সিরিয়ালে দেখা যায় ভয়ানক ধর্মীয় উপাদান ঢোকানো হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যাপক চাঁদা দিচ্ছে সেইসব ছড়িয়ে দিতে। মালিকেরা ধুমধাম করে মন্দির বানচ্ছে, পূজো দিচ্ছে।

মন্দির আর পুজোবাড়ানোর বিদেশ থেকে ডলার আসছে হিন্দু এন.আর.আই. দের থেকে। ধনী মুসলমানদের দানে ঝাঁচকচকে মসজিদও বানানো হচ্ছে নানা জায়গায়। আরবের দিনার আসছে মসজিদ নির্মানে।ধর্ম নিয়ে সিনেমা হচ্ছে। বিখ্যাত সিনেমাস্টার ছেলের বিয়ে দিচ্ছে ঠিকুজি-কুষ্ঠি মিলিয়ে, জাঁকজমক করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে – সেসব কাগজে, টিভিতে দেখানো হচ্ছে। ভারত-পাকিস্তানের খেলা মানেই যেন হিন্দু-মুসলমান যুদ্ধ।

এক ভয়ঙ্কর জোয়ার ধর্মীয় উন্মাদনাবাড়ানোর। আর শ্রেণীসংগ্রামে এখনো ভাটার টান। এই স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতেই হবে যদি এই বিভেদ-বিদ্বেষ দূর করতে হয়। মনে করিয়ে দিতে হবে শ্রেণী পরিচয়। পুরোনো বাস্তব সংগ্রামগুলো এখন হয়তো গল্পকথা। শ্রমিক কৃষকের লড়াইএর অতীত আজ গল্পকথালাগলেও সেটা কিন্তু বাস্তব। সেটা সত্য। সেসব ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে মেহনতিদের কাছে। পাশাপাশি নানা দাবীতে, কিম্বা নানা অসহ্য অবস্থার প্রতিবাদে মেহনতিদের ঐক্যবদ্ধ লড়াই শুরু করার চেষ্টাও করতে হবে। স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার খুবই কঠিন। কিন্তু কোনো সোজা উপায় আর নেই।

‘জাগো ভাই! ঘরে আগুন!!’ – সেই হুকুমচাঁদ, গোন্দোলপাড়া, ভদ্রেশ্বর … তোমরা সব কোথায়!

 

 

 

২০১৫ হুকুমচাঁদ জুট মিল:মাত্র গেল বছরেই হল।হুকুমচাঁদ এর একটা ইউনিটের শ’য়েশ’য়ে শ্রমিক, কয়েক হাজার শ্রমিক, ধর্মঘট করছিল – হ্যাঁ ২০১৫ তেই। তারা ভয়ঙ্কর জেদের সাথে একটা প্রায় হেরে যাওয়া যুদ্ধ করছে মালিকের সাথে। অন্য অনকে জায়গায় বিদেশ থেকে এসে গেছে নতুন সব তাঁত। বা আসতে চলেছে নতুন মেশিন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কাজ হারাবে হাজার হাজার জন। তারা তো নিজেদেরই প্রায় বাড়ির ছেলে। বা পাড়া-প্রতিবেশী। নিজের হয়তো চাকরীটা থেকে যাবে। কিন্তু পাশের মহল্লার ঐ যে প্রসাদ বলে ছেলেটা, তার কি হবে? হাসানের চাচা রিটায়ার, এখনো পি.এফ. গ্রাচুইটিইপায়নি, তো সেই চাচার ছেলেটার কাজের কি হবে?  আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কি আর কোনো চাকরীইথাকবেনা? চারদিকে কোথাও কাজ নেই। তাহলে সেই চেন্নাই না পুনে না কি সব জায়গায় মারাত্বক খাটনির কাজগুলোতে যাবে?  গুজরাতে আলঙ এ জাহাজ ভাঙতে যাবে? আর টিবিজন্ডিসে ভুগবে? তামিলনাডু নয় গুরগাঁওতে ডেলি লেবার হবে? অসম্ভব। এসব মানা যায়না। হ্যাঁ, পাশের ইউনিটে হয়ে গেছে। এখানে নাকি জেতা যাবেইনা বলছে এই লড়াইটা। তবু। নিজের ছেলেদের জন্য একটা শেষ চেষ্টা করবোনা? শেষ চেষ্টা?

গেল বছর যখন লড়েছিলেন তখন দেখেছিলেন যার জন্য লড়ছেন সে হিন্দুর ছেলে না মুসলমানের ছেলে? দেখেছিলেন সে বাঙালি না বিহারি? দেখেছিলেন সে কায়স্থ না চামার? না। দেখেননি এসব। কারন সবাই শ্রমিক। সবাই খেটে খায়। সবার স্বার্থ এক। মনে রেখেছিলেন কিছু আদর্শ – সব মানুষ সমান। মনে রেখেছিলেন – প্রতিবেশী অভুক্ত রেখে যে ভোজ খায় সে ঈমানদার নয়। আপনাদের তখন মনে ছিল – দুনিয়া কা মজদুর এক হো!

আর আজ! লজ্জায় মাথা হেঁট। এ কি করলাম আমরা। কি শিখবে আমাদের বাড়ির বাচ্চারা। আমরা বৃটিশ আমলে সাহেব মালিকদের সাথে কত বড় বড় লড়াই করলাম সব মজদুর এক হয়ে। হাজার হাজারওয়ার্কারের মিছিল। বিক্ষোভ। দালাল আর পুলিশপারছেনা দাবিয়ে রাখতে। মালিককে মানতে হচ্ছে লেবারদের দাবী, অধিকার। আর আজ? নিজেরা নিজেদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে মারদাঙ্গা! মালিকরা আর তাদের বেইমান দালালগুলো হাততালি দিচ্ছে। ভাবছে – এই যে সব শ্রমিক – বহুদিনএরা আর একসাথে লড়তে পারবেনা। একে অপরকে বিশ্বাসই করবেন।

 

২০১২ ভদ্রেশ্বর জুট মিল:  জুন ২০১২। রিটায়ার করে যাওয়া শ্রমিকেরা গ্রাচুইটি-পি.এফ. এর টাকা পাচ্ছেনা। নতুন কাজে ঢোকা ঠিকা-শ্রমিকদেরকে খুব কম মজুরী দেওয়া হচ্ছে — আগেকার ঠিকা শ্রমিকদের রেট এর থেকে কম রেটে কাজ করানো হচ্ছে। কেউ ভাবতে পারে — “তাতে তোদের কি? তোরা তো এখন চাকরী করছিস – কে কবে চাকরী করেছে – তার কত টাকা কম্পানি দিচ্ছে না – তাতে তোদের কি? তোরা তো স্থায়ী শ্রমিক! কিম্বা তোরা পুরোনো ঠিকা শ্রমিক। তোরা তো মাইনে বেশীই পাচ্ছিস। যে কম পাচ্ছে – সে কম পাচ্ছে। তোদের কি?” কিন্তু এভাবে তো ভাবেনি ভদ্রেশ্বর জুটের হাজার হাজার শ্রমিক – স্হায়ী শ্রমিক, ঠিকা শ্রমিক কেউই তো এরকম ভাবেননি। আপনারা সবাই মিলে ঠিক করে ফেললেন যে স্ট্রাইক করবেন। কোনো লিডার – ইউনিয়ন নেতা – পার্টি – সব কিছু ছাড়াই নিজেরা সিদ্ধান্ত নিলেন – নিজেরা ধর্মঘট করলেন।

তখন তো কেউ ভাবেননি – যার জন্য লড়ছি সে হিন্দু না মুসলমান? তাহলে? আজ যখন ঘরের কাছেই শ্রমিক অঞ্চলে হিন্দু মুসলমান একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে – তখন আপনারা যাবেননা সেটা আটকাতে? আপনাদের লড়াইএর জোর কত বড়লোক মালিকদেরকে, সরকারকে, নাড়িয়ে দিতে পারে – আর আপনারা পারবেননা? সামান্য মুষ্টিমেয় কিছু ধান্দাবাজ লোকে মিলে এই শ্রমিকে শ্রমিকেগন্ডগোল বাঁধাচ্ছে – একজন যাতে অন্যজনকে অবিশ্বাস করে সেরকম আবহাওয়া তৈরী করছে। আর নিজেদের ঘরের সেই আগুন নেভাতেআপানার সকলে মিলে প্ল্যান করে কিছু করবেন না? ছেড়ে দেবেন?

 

২০১২ ফিতাকল (টিটাগড়) জুট মিল: ৩৫০০ জন শ্রমিক। সকলেই – মানে ১০০% শ্রমিক – এককাট্টা হয়ে ৩ দিনের ধর্মঘট। যে ধর্মঘট কোনো ইউনিয়ন ডাকেনি, কোনো পার্টি ডাকেনি। শ্রমিকেরা নিজেরাই ডেকেছে, নিজেরাই স্ট্রাইক করছে। কেন? একটা ম্যানেজার – তার এতো সাহস – এক বয়স্ক চাচা – একজন বহুদিনেট শ্রমিক – তাকে কিনা চড় মেরে দিলো!!! ম্যানেজার যা বলবে মানতে হবে – আর না মেনে তর্ক করলে কিনা গায়ে হাত তুলবে! এতো সাহস। কি ভাবে! শ্রমিকেরা সব শেষ হয়ে গেছে! না – কোনো ক্ষমা চাইলেহবেনা। ঐ ম্যানেজারকে বার করে দিতে হবে। ওকে মিলের মধ্যে দেখা গেলে কাজ বন্ধ। আর হ্যাঁ। শেষ পর্যন্ত ৩ দিনের ধর্মঘটের পর সেটা মানতে হল। তারপর কারখানা চালু হল।

তখন তো কেউ দেখেননি যে এখজন মাত্র শ্রমিকের জন্য ৩৫০০ জন শ্রমিক লড়লেন সে হিন্দু নাকি সে মুসলমান! ধর্ম দেখেননি – দেখেছিলেন শ্রমিক – দেখেছিলেন শ্রমিকের ইজ্জত। আর আজ। ভুলে যাবো নাকি সেসব কথা?

 

২০১২ খন্যান, পান্ডুয়া:  আট ঘন্টা ধরে অবরোধ চলছে। জি.টি. রোডের ওপর হাজার হাজার গ্রামবাসী। চার হাজার না ছয় হাজার লোক, তা মনে নেই। তবে সবাই খেটেখাওয়া লোকজন, বেশীর ভাগই ক্ষেতমজুর ও গরীব চাষী বাড়ির। ১০০ দিনের কাজের টাকা দিচ্ছো না কেন! কাজ করা হয়েগেছে অনেক দিন আগে। অথচ টাকা বকেয়া পড়ে আছে। সেসব দিতে হবে। পুলিশ এলো। সমবেত লোকজনেরমেজাজ দেখে ভয়ে তারা চুপচাপ। তারপর সরকার পাঠালো রায়ট-পুলিশ, সশস্ত্র র‍্যাফ বাহিনী। এবার এখেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ে শ্রমিক চেঁচিয়েপুলিশদেরবললো — ‘মারবে তো? ঠিক আছে। তারপর আমরা গ্রামের ভেতরে ঢুকে ঢুকে সব নেতাদের মারবো। সব পার্টির সব সদস্য বাবুদেরকে মারবো। তখন? বাঁচাতে পারবে’? এরকম কথা কখনো কোনো ভদ্রলোক নেতা-বাবুদের মুখ দিয়ে বেরোবেনা। সশস্ত্র পুলিশ পুরো চুপ। তরিঘড়ি খোদ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লোক পাঠাচ্ছে। তখন বলে ‘তোমরা প্রতিনিধি পাঠাও – ডি.এম. অফিসে আমরা আলোচনা করে কিভাবে টাকাটা দেওয়া হবে ঠিক করবো।’ যাদের মারতে গেল, তাদেকেই কিনা ডেকে এনে কথা বলতে হল, ফয়সালা করতে হল। তাহলে?

সেই বছরই অনেক গ্রামে বেশ বহু বছর পর ক্ষেতমজুরেরা নিজেরা মজুরী বৃদ্ধির জন্য ধর্মঘট করলো। মজুরী অনেকটা বাড়াতে পারলো। তা, এই রকম জোর যার সেই ঐক্যবদ্ধ মেহনতীরা – তারা কি ভেঙে টুকরো টুকরো হবে? একে অপরের বিরুদ্ধে হাত তুলবে!

 

২০১৫ গোন্দলপাড়া জুট মিল:  মে কি জুন মাস। নেপালে সাঙ্ঘাতিক ভূমিকম্প হয়েছে। সেই খবরের পর পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে সাহায্য যাচ্ছে নেপালে। নেপালের সরকারের কাছে। কলকাতা ও আশেপাশের কিছু ছাত্র-যুব ঠিক করে এখানে সাধারন মানুষের থেকে সাহায্য সংগ্রহ করে নেপালে নিয়ে যাবে। গিয়ে গরীব খেটেখাওয়া জনগণকে সোজাসুজি দিয়ে আসবে। সেই উদ্দেশ্যে তারা গোন্দলপাড়া’র শ্রমিক মহল্লাগুলোয় গেছে সাহায্য সংগ্রহে। এদিকে তখন বেশ কয়েকমাস হ’ল মিল লক আউট। মাইনে নেই। রোজ ঠিকমত খাবার জুটছেনাখুবই খারাপ আবস্থা শ্রমিকদের। কিন্তু অনেক দূর বিদেশে বিপদে পড়া সেখানকার গরীব মেহনতীদের সাহায্য দরকার। মুখ ফেরায়নিগোন্দলপাড়ার শ্রমিক। সকালের মাত্র কয়েক ঘন্টাতেই তিন-চার হাজার টাকা উঠে গেছে। চরম অভাবের মধ্যেও মানবিকতার অভাব নেই। যে ছাত্রযুবরা সাহায্য তুলছে তারা অবাক।

 

২০১০ গোন্দলপাড়া জুট মিল:  আজব ঘটনাই বটে। একটা মাঠে ৬০০-৭০০ শ্রমিক জমায়েত। ঘোষণা হচ্ছে যে শ্রমিকেরা নিজেরাই নিজেদের নতুন সংগঠন তৈরী করছে। সব চেনাজানা নেতা-পার্টি-ইউনিয়ন-এম.এল.এ.-মন্ত্রী সব বাদ দিয়ে শ্রমিকেরা নিজেরা নিজেদের সংগঠন বানাচ্ছে। নাম দেওয়া হল আজাদ মজদুর সংঘ‍্। মানে স্বাধীন শ্রমিক সঙ্ঘ। তো কার থেকে স্বাধীন? শ্রমিকের নিজেদের ব্যাখ্যা — আগে আমরা ছিলাম বৃটিশের গোলাম। স্বাধীনতার পর হলাম পুঁজিপতির গোলাম। তাই সব গোলামী থেকে মুক্তি চাই। সেইটা করার বড় লক্ষ্য সামনে রেখে এই সংগঠন তৈরী হল।

তারপর সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা বটে। আজাদ মজদুর সংঘ‍্ ইউনিয়ন নয়। পার্টি নয়। পাড়ার ক্লাব নয়। অথচ শ্রমিকের দরকারের সবকিছ। কোন কোন প্রতিবাদী মজদুরকে কোন ডিপার্টমেন্ট এ চার্জশীট দিয়েছে – তো আজাদ মজদুর সংঘ‍্ সেই কেস টা নিয়ে লড়ছে। ম্যানেজমেন্ট ঝামেলা করছে – তো আজাদ মজদুর সংঘ‍্ আছে। কোন পাড়ায় পুলিশ এসে চমকানোর জন্য চারটে ছেলেকে বেফালতু কেস দিয়ে ধরে নিয়ে গেছে – তো আজাদ মজদুর সংঘ‍্ থানায় যাচ্ছে ছাড়াতে। আজাদ মজদুর সংঘ‍্ দরকার হলে উকিল থেকে কোর্ট-কাছাড়ি সব করছে। কার মেয়ের বা ছেলের বড়সড়রোগ – ডাক্তার – হাসপাতাল – ওনেক টাকার ধাক্কা — এখন কিন্তু সেই শ্রমিক আর “একা” নয় – আজাদ মজদুর সংঘ‍্ আছে না?

ঠিকই, বেশীদিন এই সংগঠন চালানো যায়নি। মজদুরের জীবনে কতকিছুর চাপ, কত ঝামেলা। একসময় যেন দম হারিয়ে যাচ্ছে। আজাদ মজদুর সংঘ‍্ এখন কি তবে ছাই চাপা আগুন হয়ে লড়াকু শ্রমিকদের মনের মধ্যে? কিন্তু আবার বাতাস করে, বা ফুঁ দিয়ে দিয়ে সেই আঁচটা আবার তুলবেননা? যখন চোখের সামনে শ্রমিকদের বসতি অঞ্চলে ছোকড়া ছেলেদেরকে বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছে হিন্দু হিসেবে আর মুসলমান হিসেবে – তখন সেটা আটকাতে হবেনা? আমাদের মধ্যেকারএকতাকে যদি ওরা ভাঙে, যদি চিড় ধরে – কে সারাবে সেটা? আমাদেরকেই করতে হবে। বাজোরিয়া’র মত অত বড় মালিক, সি.পি.এম. এর মত সেদিনকার অত বড় পার্টি, কতসব ইউনিয়ন, থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছাড়ি’রহয়রানি, দালাল-গুন্ডা … কত বড় বড় বাধা সামলে আপনারা একজোট হযেছেন, লড়েছেন — আর এখন? দালালগুলোকে আপনারা সামল দিতে পারবেন না?

 

১৯৯২ মেটিয়াবুরুজ-গার্ডেনরিচ-খিদিরপুর:সেই সাঙ্ঘাতিক দাঙ্গা – ১৯৯২ এর ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার পর। কলকাতাতে দিনের পর দিন কারফিউ। রাস্তায় বেরোনোযাচ্ছেনা। হয় দাঙ্গাবাজদের ভয়ে, নয়তো সশস্ত্র সেনার ভয়ে রাস্তা শুনশান। কল-কারখানা দোকান-বাজার সব বন্ধ।

কিন্তু সেই অসময়ে শ্রমিকেরা বেশ কিছু জায়গাতে দাঙ্গা রুখে দিতে পেরেছিল। হাতের কাছে সে সময়কার খবরের কাগজ তো নেই। একটা বই পাওয়া গেল – মিকডগলাস এর লেখা “মেলবোর্ন কোলকাতা ট্রামযাত্রা”। তাতে লেখা ১৯৯২ এর দাঙ্গারসময়কার একটা ছোট্টো কাহিনী। হাজার হাজার ট্রাম শ্রমিক – রীতিমত তাদের ডিউটিরসময়াকারইউনিফর্ম পরে – লাইন করে দাঁড়িয়ে গেছে দাঙ্গাবিধ্বস্ত অঞ্চলে। আওয়াজ তুলছে – শ্রমিক ঐক্যের, মেহনতীগরীবদের ঐক্যের আওয়াজ, দাঙ্গার বিরুদ্ধে আওয়াজ। সমস্ত বাড়িগুলো – দরজা জানালা বন্ধ করে রেখেছিল ভয়ে – একে একে জানালা খুলে যাচ্ছে – অবিশ্বাস চোখে – এও কি হয়! জানালা দিয়ে মহিলারা বলছে — আরেকটু থাকুন আপনারা। লোকজন তো ভুলে গেছে সেই ট্রাম শ্রমিককে। ১৯৪৬ এর সেই সাঙ্ঘাতিক দাঙ্গা কলকাতায় – হাজার হাজারহতাহত – তখনোট্রামশ্রমিকেরা পেরেছে সেই দাঙ্গা আটকাতে নেমেছে। তাদেরও জোর কম নয়। তাদেরও হাতে থাকে আর কিছু না হোক – অন্তত তাদের কাজের শাবল, গাঁইতি, লোহার রড …। লোকজন তো ভুলে গেছে যে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে  একবার যখন সশস্ত্র গুন্ডারা এসেছে বিপ্লবী ছাত্রদের মারতেতখনো ঐ ট্রামশ্রমিকেরা সেই শাবল-রড-চেন নিয়ে রে রে করে তেড়ে গিয়ে সেই গুন্ডাদেরখেদিয়েছিল।

তারপর – হিন্দুস্তান লিভার। এখন যার নাম হ’ল হিন্দুস্তান ইউনিলিভার। গার্ডেনরিচ এ লিভারের দু’হাজারের মত শ্রমিক তখন। তারাও দাঙ্গার বিরুদ্ধে অদ্ভুত কায়দায় আন্দোলন করে দাঙ্গাবাজদের দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে দেয় মেটিয়াবুরুজের শ্রমিক অঞ্চল থেকে।

হিন্দুস্তান ইউনিলিভার কম্পানি বিদেশী মালিকের। যেমন ডানলপ-ও। ডানলপের “মালিক” হিসেবে কখনো গোয়েঙ্কা, কখনো ছাবাড়িয়া, কখনো রুইয়া … এসব নাম দেখে ভাবারকারন নেই এটা দেশী – এদের শেয়ার অনেক কম বিদেশের মূল ডানলপ কম্পানির শেয়ারের চেয়ে । এই ডানলপ আর তারপর লিভার — এরাইকোটিকোটি টাকা স্পন্সরশিপ দিয়ে টি.ভি.তে চালু করেছিল ১৯৮৮ তে রামায়নসিরিয়াল, আর সেটা শেষ হতেই, মহাভারত সিরিয়াল। তার সাথে সাথেই চলছিল বিজেপি নেতাদের “রাম রথ” যাত্রা। এই ভাবে সারা দেশে ধর্মের মোহ ছড়ানো আর বিজেপ পার্টির উগ্র মুসলমান বিদ্বেষী প্রচার চলছিল। সেই একই সময় এবং তার একটু আগেও, আমেরিকা টাকা দিয়ে অস্ত্র দিয়ে মদত করছিল আফগানিস্তানের মুজাহিদিনদের, তারপর তালিবানদের।

দেশী বিদেশী মালিকেরা তো চাইবেই সাধারন খেটেখাওয়া জনগণ ধর্মে ডুবে থাক – হিন্দু-মুসলমান ভগভাগ হয়ে থাক, মারাঠি-বিহারি ভাগ হয়ে থাক — মালিকরা শ্রমিকদেরকে দুরমুষ করবে – কেউ  বাধা দেবে না।

সেই ফাঁদে কি আমরা পড়বো, ভাই?

 

সন্দীপ ব্যানার্জি লেখক, অনুবাদক এবং গণ আন্দোলনের কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *