১।
ভারতীয় নাস্তিকতা সংক্রান্ত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ লেখার কৃতিত্ব দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের। আধ্যাত্মবাদ ও ঈশ্বরবাদের আবর্জনার ভীড় ঠেলে তাঁকে এগোতে হয়েছিল। ভারতীয় দর্শন জগৎ সংক্রান্ত নানা রকম মিথ্যা ও মিথ নস্যাৎ করতে যে ক্ষমতা, যে ধৈর্য, ত্যাগ ও পরিশ্রম প্রয়োজন – তাঁর মধ্যে এই সবকটি গুণই ছিল। তিনি ভারতীয় দর্শনকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন এই মিথ্যা ও মিথের হাত থেকে। দীর্ঘ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মিথ্যাটি হল ভারতীয় দর্শন ও দার্শনিক মাত্রই অধ্যাত্মবাদী ও ঈশ্বরবাদী। এটাকেই দেবীপ্রসাদ প্রশ্ন করেছেন। আর উন্মোচন করেছেন, সত্যটিকে। সত্যটি হল অধিকাংশ ভারতীয় দার্শনিকই হলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নাস্তিক। (DPC. 2012:20) এই সত্যটিকে মধ্যযুগ বা বর্তমানকালের আস্তিক্যবাদীদের কাছে গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে খুবই কষ্টকর। দেবীপ্রসাদ দেখিয়েছেন, এই সত্যটিকে গ্রহণ করা যেহেতু যন্ত্রণাদায়ক, তাই ঈশ্বরবাদীগণ বাঁকা পথ গ্রহণ করেছিলেন। দার্শনিক বিতর্কে বৌদ্ধিক অসততার পথ গ্রহণ করা প্রায় একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে – অন্যান্য যুগের মতো এমন কি প্রাচীন যুগের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। ঈশ্বরবাদীগণ নানা ছলাকলার ব্যবহার করেছেন বিরুদ্ধ মতকে জব্দ করতে। প্রয়োজনে অন্যের মতকে বিকৃত করেছেন, ভ্রান্ত অর্থ, ভ্রান্ত ব্যাখ্যার সাহায্য নিয়েছেন এবং সর্বোপরি প্রতিপক্ষ যে মতকে একেবারেই ঠিক বলে মনে করে না, সেই মতকেই তার মত বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়েছে।
উদাহরণ দিতে গিয়ে দেবীপ্রসাদ নৈয়ায়িক উদয়ন-এর ‘ন্যায়কুসুমাঞ্জলী’র উদাহরণ দিয়েছেন। গ্রন্থটি ধ্রুপদী ঈশ্বরবাদী রচনার একটি চমৎকার নমুনা। এই গ্রন্থের একেবারে গোড়াতেই উদয়ন-এর দাবীটি হলঃ সকল ভারতীয় দর্শন এবং দার্শনিকগণ হলেন ঈশ্বরবাদী। কেবল সাংখ্য, ন্যায়, মীমাংসা বা বৈশেষিকই নয়, এমন কি চার্বাক দার্শনিকগণও ঈশ্বরবাদী। (DPC. 2012:20-21) উদয়ন-এর মতোই আধুনিক কালে একটি সমান্তরাল বক্তব্য দেখতে পাওয়া যাবে রাধাকৃষ্ণানের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। রাধাকৃষ্ণানের ঘোষণা হল, “কমিউনিজম একটি নতুন ধরনের ধর্ম। এই ধর্মের প্রবক্তা হলেন লেনিন এবং বিজ্ঞান হল পবিত্র প্রতীক।“ (উদ্ধৃত DPC. 2012:23)। মার্কস-লেনিন ও কমিউনিজমের মধ্যে ধর্মকে খুঁজে পাওয়া এবং উদয়নের সাংখ্য, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, পূর্বমীমাংসা এবং চার্বাকের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়ার মতো একান্ত কুতর্ক ছাড়া কিছুই নয়।
কিছুটা বিশদে বিষয়টি নিয়ে দেবীপ্রসাদ আলোচনা করেছেন। আদি বিদ্বান কপিল-এর নাম সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। কপিলের সাংখ্য দর্শন জগৎ ব্যাখ্যায় সচেতন ভাবেই ঈশ্বরকে বাদ দিয়েছে। সাংখ্য দার্শনিকগণ ঈশ্বরকে স্বীকার করেন না। ব্যাপক অর্থে বৌদ্ধ ও জৈনদের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। আবার মীমাংসা সাহিত্যর ক্ষেত্রে উপাস্য বিষয় হিসেবে কোনও কিছুর অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায় না। (DPC. 2012:22) উদয়নের আপন মনের মাধুরী মেশানোর কাজটি তখনই অসম্ভব পর্যায়ে পৌঁছায় যখন তিনি চার্বাক দর্শনকে ঈশ্বরবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। (পূর্বোক্ত:23) আর এখানেই উদয়নের চিন্তার সঙ্গে সাদৃশ্য পাওয়া যাবে রাধাকৃষ্ণানের। কারণ বস্তুবাদী মার্কসবাদকে রাধাকৃষ্ণান ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করতে কোনও দ্বিধা করেন না।
ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নকে সামনে রেখে দেবীপ্রসাদ ভারতীয় দর্শনগুলির উপর একটি সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা চালিয়েছেন। বৌদ্ধ দর্শন, জৈন দর্শন, চার্বাক/লোকায়ত, পূর্ব মীমাংসা (যা সাধারণভাবে মীমাংসা দর্শন নামেই পরিচিত), সাংখ্য, বেদান্ত (বা উত্তর মীমাংসা), ন্যায়-বৈশেষিক এবং যোগ দর্শন – এগুলিই ভারতের প্রধান দর্শন হিসেবে পরিচিত। এখন প্রশ্ন হল ভারতীয় দর্শন ধারার এই শাখাগুলির কোন কোনটিকে সুস্পষ্টভাবে ঈশ্বরবাদী বলে চিহ্নিত কর যেতে পারে? দেবীপ্রসাদের জবাব হল – বেদান্ত ও ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনকে। এদেরকে ঈশ্বরবাদী বলা হলেও, কতগুলি সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা তাঁর চোখ এড়ায়নি।
২।
‘বেদান্ত’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বেদের অন্ত বা শেষ পর্যায়ে রচিত। বৈদিক সাহিত্যের অন্তে বা শেষ পর্যায়ে রচিত হয় উপনিষদসমূহ। উপনিষদগুলি কোনও সুসংবদ্ধ দার্শনিক রচনা নয়। (DPC. 2007:68) পরবর্তীকালে দার্শনিকগণ এই উপনিষদগুলির মধ্য থেকে নানা উপাদান সংগ্রহ করে একটি সুসংবদ্ধ দার্শনিক ধারণাকে গড়ে তোলেন। এই কাজের প্রথম ও সম্পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায় বাদরায়নের ‘বেদান্তসূত্র’ বা ‘ব্রক্ষ্মসূত্র’-র মধ্যে। তবে পণ্ডিতদের মধ্যে ‘বেদান্তসূত্র’-এর রচনাকাল নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। জ্যাকোবির মতে, এর রচনাকাল খ্রিস্টাব্দ ২০০ থেকে ৫০০-র মধ্যে। (পূর্বোক্ত) বেদান্ত দর্শনের উৎস হিসেবে যে উপনিষদকে চিহ্নিত করা হয়, সেই উপনিষদ সম্পর্কে সুকুমার সেনের বক্তব্যটি চিত্তাকর্ষকঃ “উপনিষদের চিন্তা বৌদ্ধ ও জৈন মতের চেয়ে কম বিপ্লবকারী ছিল না ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্মের পক্ষে। উপনিষদ, বৌদ্ধ এবং জৈন – তিনটি মতই প্রাচ্য ভারতে উদ্ভূত এবং তিনটি মতই অনীশ্বর।“ (সেন, সুকুমার। ১৯৯৯:২৫) এখানে অনীশ্বর শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে কারণ উপনিষদে ঈশ্বরের প্রসঙ্গ নেই। এই উপনিষদকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বেদান্ত দর্শন। বেদান্ত দর্শনের দুটি বড় গোষ্ঠী – অদ্বৈত এবং দ্বৈত। এরা আবার আরও দুই ভাগে বিভক্ত – বৈষ্ণব ও শৈব। এখন উপনিষদে যতই ঈশ্বরের প্রসঙ্গ না থাকুক এঁদের নানা গোষ্ঠীর কাছে ব্রহ্মই হল ঈশ্বর। রামানুজ ও নির্ম্বাক এই ঈশ্বরকে বিষ্ণু হিসেবে এবং শ্রীকান্ত প্রমুখ শিব কল্পনা করেছেন। (DPC. 2007:70)
বেদান্তবাদী দার্শনিকদের কাছে বেদই প্রমাণ বা একমাত্র সঠিক জ্ঞান। শ্রুতি প্রামাণ্য – এই অর্থে বেদান্ত আস্তিক হলেও ঈশ্বরের প্রশ্নে তাদের অবস্থানটি যথেষ্টই জটিল। অদ্বৈত বেদান্তের মতে, ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। তা বাদে বাকী সবই মিথ্যা বা মায়া। জগৎ যেহেতু মায়া বা কল্পনা বা মিথ্যা, তাই তার স্রষ্টা হিসেবেও কারোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। এই ‘অজাতবাদ’ অনুযায়ী কোনও ঈশ্বরেরও স্থান নেই। (DPC. 2012:25) তাহলে আছে কী? আছে পরমাত্মা, যা আনন্দময়। শঙ্করাচার্য এই আনন্দময়-এর অর্থ করেছেন ব্রহ্ম (অর্থাৎ পরমাত্মা)। (তর্কভূষণ, প্রমথনাথ। ১৪১৭ বাংলা:১৩৪) তাহলে ঈশ্বর হল মায়া বা কল্পনা। অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার ফল। অদ্বৈত বেদান্তের এই ধারণার প্রতি অন্যান্য বেদান্তবাদীরা রীতিমত ক্ষুব্ধ। ক্রুদ্ধ মাধব তাই মনে করেছিলেন, “God Himself got incarnated to annihilate the Advaita philosophy.” (DPC. 2012:26)
সংক্ষেপে বলা যায় যে, উপনিষদগুলি অনিশ্বরবাদী, বা অদ্বৈত বেদান্তবাদীরা আনন্দময় ব্রহ্মবাদী হলেও বেদান্তের অন্যান্য গোষ্ঠীগুলি কিন্তু ঈশ্বরবাদী। অর্থাৎ সমস্ত বেদান্ত দর্শনকে এক কথায় ঈশ্বরবাদী বা অনিশ্বরবাদী বলে চিহ্নিত করায় বেশ কিছু সমস্যা আছে।
অদ্বৈত বেদান্ত যেহেতু বেদ প্রামাণ্যে বিশ্বাসী তাই এটি একটি আস্তিক দর্শন। একই সঙ্গে অনিশ্বরবাদীও। কিন্তু চরম ভাববাদী আর সেই কারণেই সাংখ্য ও লোকায়ত দর্শনের প্রতি এর ভয়ানক রাগ। কারণ এই দুটি দর্শন প্রস্থান কিন্তু কেবল নিরীশ্বরবাদীই নয়, বস্তুবাদীও বটে। এখানে সাংখ্য বলতে আদি সাংখ্যের কথাই বলা হচ্ছে।
৩।
ঈশ্বর সংক্রান্ত প্রশ্নে ন্যায়-বৈশেষিকের অবস্থান আরও জটিল। সাতকরি মুখার্জীকে উদ্ধৃত করে দেবীপ্রসাদ দেখিয়েছেন যে, বাৎস্যায়ন ও প্রসস্তপদ-র কাছ থেকে পাওয়া ন্যায়-বৈশেষিক দর্শন নবদ্বীপ গোষ্ঠীর হাতে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ঈশ্বরবাদীতে পরিণত হয়। আর এর মধ্যে দিয়ে এই দর্শন ঈশ্বর অস্তিত্বের সপক্ষে প্রধান প্রচারকে পরিণত হয়। (DPC. 2012:26-27) সাতকরি মুখার্জীকে উদ্ধৃত করার কারণ হল এটাই যে, তিনি কেবল ভারতীয় ঐতিহ্য চর্চার খুব বড় মাপের ব্যাখ্যাকারই নন, একজন চূড়ান্ত রক্ষণশীল মানুষ যাঁর পক্ষে নাস্তিকতার সমর্থনে কথা বলার কোনও সম্ভাবনাই নেই। এ হেন সাতকরি মুখার্জী লিখেছেনঃ
“It is a matter of surprise that in the enumeration of the objects of authentic knowledge (Nyāyasūtra. 1.19), there is no specific mention of God, and in the proofs adduced for the existence of a unitary soul-entity as distinguished from the psychological processes, there is not the slightest allusion to God either as a supreme soul primus inter parts or as a separate category.” (Cited by DPC. 2012:27)
সাতকরি মুখার্জীর পর্যবেক্ষণের মোদ্দা কথাটি হল, ন্যায় সূত্রে কোথাও ঈশ্বরের কোনও সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই এবং ঈশ্বরকে পরম আত্মা হিসেবে বিবেচনা করে কোনও প্রমাণের উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর কাছ থেকে আরও জানা যায় যে কেবল ন্যায়সূত্র নয়, বৈশেষিক সূত্রেও ঈশ্বরের কোনও নাম গন্ধ নেই।
ন্যায়-সূত্রে মোট ৫২৮ বা ৫৪৭ টি সূত্র। এগুলির মধ্যে মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে ঈশ্বর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। আর একটিতে প্রত্যক্ষভাবে ঈশ্বরের নাম ব্যবহৃত হয়েছে।
ক) “[পূর্বপক্ষ] ঈশ্বরই (সর্বকার্যের) কারণ, যেহেতু পুরুষের (জীবের) কর্মের বৈফল দেখা যায়।” (সূত্রঃ ৪/১/১৯। তর্কবাগীশ, ফণিভূষণ। ১৯৮৮:৪:৪২)
খ) “(উত্তর) না, অর্থাৎ জীবের কর্মনিরপেক্ষ একমাত্র ঈশ্বরই জগতের কারণ নহেন।” (সূত্র: ৪/১/২০। পূর্বোক্ত: ৫০)
গ) “- ‘তৎকারিতত্ত্ব’ বশত অর্থাৎ জীবের কর্মের ফল ঈশ্বরকারিত বা ঈশ্বর জনিত, ঈশ্বরই জীবের কর্মফলের বিধাতা, এজন্য ‘অহেতু’ অর্থাৎ পূর্বসূত্রোক্ত ‘জীবের কর্মের অভাবে ফলের উৎপত্তি হয় না’ এই হেতু জীবের কর্মই তাহার সমস্ত ফলের কারণ, ঈশ্বর কারণ নহেন, এই বিষয়ে হেতু (সাধক) হয় না।“ (সূত্র: ৪/১/২১। পূর্বোক্ত: ৫২)
এইভাবে আদি ন্যায়শাস্ত্রে ঈশ্বরকে জগতের কারণ হিসেবে অস্বীকার করা হয়েছে। আবার দেখা যাবে যে ন্যায় দর্শনে যে বারোটি প্রমেয় পদার্থের কথা উল্লেখ আছে সেখানেও ঈশ্বর নেই। “প্রমাণ দ্বারা যে সকল বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান হয়, তাহাকে প্রমেয় বলে।“ (দত্ত, অক্ষয়কুমার। ১৪২০ বাংলা: ২: ২৫) এই বারোটি প্রমেয় পদার্থ হল – আত্মা, শরীর, ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়-বিষয়, বুদ্ধি, মন, প্রবৃত্তি, দোষ, প্রেত্যভাব (অর্থাৎ বারংবার মরণোৎপত্তি), ফল, দুঃখ ও অপবর্গ। (পূর্বোক্ত) অক্ষয় কুমার দত্তের পর্যবেক্ষণটি এখানে তাৎপর্যপূর্ণ:
“দ্বাদশ প্রকার প্রমেয় পদার্থের মধ্যে ঈশ্বর-পদার্থ পরিগণিত [হয়] নাই কেন এ কথাটি বিবেচ্য। উত্তরকালীন নৈয়ায়িকেরা উহার অন্তর্গত আত্মা শব্দটি জীবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়-প্রতিপাদক বলিয়াই ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু যখন বিশ্ব-কারণ নিরূপণ দর্শন-শাস্ত্রের একটি প্রধান প্রয়োজন, তখন প্রমেয় পদার্থের মধ্যে ঈশ্বরের নাম পৃথক নির্দেশ না করা কোনোরূপেই সঙ্গত ও সদ্ভাবিত নয়। একটি সূত্রে ঈশ্বরকে কারণ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে সত্য, কিন্তু উহার পর সূত্রেই আবার মনুষ্য-কৃত কর্মকে কারণ বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে। পশ্চাৎ ঐ উভয় সূত্র যথাক্রমে উদ্ধৃত হইতেছে, পাঠ করিয়া দেখিলেই জানিতে পারা যাইবে প্রথম সূত্রটি [৪/১/১৯] পূর্ব্বপক্ষ ও পর সূত্রটি [৪/১/২০] সিদ্ধান্ত।“ (১৪২০ বাংলা: ২: ২৫-২৬)
অক্ষয়কুমার দত্তের আরও দুটি মন্তব্য এখানে তাৎপর্যপূর্ণ:
ক) “গোতম [ন্যায় দর্শনের প্রবর্ত্তক] ঈশ্বরের সত্তা স্বীকার করিতেন এমন বোধ হয় না।
উত্তরকালীন নৈয়ায়িক পণ্ডিতেরা স্পষ্টরূপে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অঙ্গীকার করিয়াছেন; কিন্তু তাহাদের মতে, তিনি জগতের সৃষ্টিকর্তা নন, নির্ম্মাণকর্ত্তা।“ (১৪২০ বাংলা: ২: ২৩)
খ) আস্তিকতাবাদী গ্রন্থ-ব্যাখ্যাতা পণ্ডিতেরা মূল গ্রন্থে সুস্পষ্ট ঈশ্বর-প্রসঙ্গ নাই দেখিলে, শব্দ বিশেষ হইতে তদীয় সত্তা নিষ্পন্ন করিবার চেষ্টা পাইবেন ইহা অসম্ভব নয়।“ (পূর্বোক্ত: ২৫)
৪।
দেবীপ্রসাদ ঈশ্বরবাদীদের দ্বারা দর্শনকে বিকৃত করার অভিযোগ করেছেন – তা যে কতটা সত্য সেটা প্রমাণিত হয় বৈশেষিক দর্শনের দিকে তাকালেই। বৈশেষিক দর্শন ন্যায় দর্শনেরও পূর্ববর্তী। (সরখেল। ২০১৩: ৮) মহর্ষি কণাদকেই এই দর্শনের প্রবক্তা হিসেবে মনে করা হয়। পদার্থের উপাদান, পরমাণু তত্ত্ব ইত্যাদির প্রতি তিনি বিশেষভাবে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এই কারণেই তাঁর সঙ্গে গ্রীক পরমাণু চিন্তাবিদ ডিমোক্রিটাসের তুলনা করা হয়। (Ray. 2011: IIIA: 2) অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষায় “ডেমক্রিটস্ গ্রীস দেশীয় কণাদ এবং কণাদ ভারতবর্ষীয় ডেমক্রিটস্।“ (১৪২০ বাংলা: ২: ১৯) বৈশেষিক দর্শনের পরমাণুবাদ, বলবিদ্যা, কার্য-কারণ তত্ত্ব, প্রাকৃতিক ঘটনার (বৃষ্টি, বজ্র, ভূমিকম্প) বস্তুজাগতিক ব্যাখ্যা আজও মানুষের বিস্ময় সৃষ্টি করে। কণাদ রচিত ৩৭০টি মূল-সূত্রের একটিতেও ঈশ্বর শব্দটির উল্লেখ নেই। (সরখেল। ২০১৩: ৮৭) অথচ সেই বৈশেষিক দর্শনেই ঈশ্বর ও বেদ সর্বোচ্চ মান্যতা পেল। কীভাবে পেল তার উত্তর খুঁজতে গেলে দেবীপ্রসাদ উল্লেখিত ‘ছল’-এর কথা স্মরণ করতে হবে।
টীকাকারের হাতে পড়েই এমন ঘটনা। অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁরা ঈশ্বরকে উপস্থিত করেছেন বৈশেষিক দর্শনের অন্দরে। ভারতের আদি সমাজতাত্ত্বিক অক্ষয় কুমার দত্তও বিষয়টি নজর করেছিলেন:
“ঈশ্বর বিষয়ে যেরূপ বিশ্বাস থাকাতে টীকাকারেরা সূত্রের মধ্যে তদীয় প্রসঙ্গ না দেখিয়াও তাহা হইতে যোগে যোগে কোনওরূপে অস্তিত্ব নিষ্পন্ন করিবার চেষ্টা পাইয়াছেন, কণাদ ঋষির যেইরূপ বিশ্বাস থাকিলে, সূত্রের মধ্যে ঈশ্বর-প্রসঙ্গ সুস্পষ্ট না লিখিয়া তাহার অন্তর্গত শব্দ বিশেষের অভ্যন্তর-গুহায় তাহা প্রচ্ছন্ন রাখা কি কোনরূপে সম্ভব হয়? টীকাকারেরা যদি নিজে ঐ সূত্রগুলি রচনা করিতেন, তাহা হইলে এরূপ বিষয়ে কিরূপ ব্যবহার করিতেন, একবার ভেবে দেখিলেই হয়। বারংবার ঈশ্বরের নাম কীর্ত্তন করিতেনই করিতেন তাহার সন্দেহ নাই। না করিবেনই বা কেন? যাঁহার যাহাতে দৃঢ় বিশ্বাস ও অবিচলিত ভক্তি থাকে, সুযোগ ও প্রয়োজন উপস্থিত হইলে, তিনি তাহা কীর্ত্তন না করিয়া থাকিতে পারেন না। কেবল ঈশ্বরের নাম তো অল্প কথা; তাঁহারা ‘গোপবধূটীদুকূলচৌরায়’ ও অন্য অন্য বিশেষণে বিশেষত কৃষ্ণ, বিষ্ণু, ষষ্ঠী, পঞ্চানন প্রভৃতি কত কত দেবতার পদযুগলে প্রণিপাত করিয়া গ্রন্থের মঙ্গলাচরণ সম্পাদন করিতে পারিতেন। যদি তাঁহাদের ন্যায় কণাদ ঋষির ঈশ্বরেতে আস্থা থাকিত, তাহা হইলে তিনি পদার্থ – গণন সৃষ্টি প্রক্রিয়া – বর্ণন ও মুক্তি সাধনাদি সংক্রান্ত কোন না কোন সূত্রে ঈশ্বরের বিষয় সুস্পষ্ট উল্লেখ না করিয়া থাকিতে পারিতেন না। প্রত্যুত তাঁহার মতে পরমাণু-পুঞ্জের সংযোগে জড়ময় জগতের উৎপত্তি হয়; অদৃষ্ট কারণ বিশেষ সেই সংযোগের প্রবর্ত্তক। তাহাতে ঈশ্বরের কর্তৃত্ব-প্রসঙ্গও কিছুমাত্র লিখিত নাই। এই সমস্ত পর্য্যালোচনা করিয়া দেখিলে, তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব অঙ্গীকার করিতেন না এইরূপই প্রতীয়মান হইয়া উঠে।“ (দত্ত, অক্ষয় কুমার। ১৪২০ বাংলা: ২: ২১)
দেবীপ্রসাদ ব্যবহৃত ছল শব্দটির অর্থ হল ‘বিকৃতি’। (সরখেল। ২০১৩: ১০৭) ঈশ্বরবাদীগণ এই ‘ছল’-এর সাহায্যে ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের মূল অবস্থানকে বিকৃত করে ঈশ্বরের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। অক্ষয়কুমার দত্তের বক্তব্যের মধ্যে তার স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু এখানেই বিষয়টির শেষ নয়। অর্থাৎ আদি অবস্থায় এই দর্শনগুলি কেবল ঈশ্বর সম্পর্কে উদাসীনই থাকেনি, বেদের রচনাকার হিসেবে ঈশ্বরকেও গ্রহণ করেননি। (DPC. 2012: 27-28) দেবীপ্রসাদ এই আদি গ্রন্থগুলির উপর গুরুত্ব দিয়ে তাই বলেন:
“The original works of this philosophy [ন্যায়-বৈশেষিক] were entirely unaware of the devine authorship of the Vedas.” [পূর্বোক্ত: ২৮]
৫।
এই পর্বের আলোচনায় দেবীপ্রসাদ যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা হল:
“Of all our major philosophies, only the Vedanta (with some reservation) and specifically the later version of the Nyāya-Vaiśesika were theistic. By contrast, Buddhism, Jainism, Pūrvamimāmsā, Sāmkhya, Lokāyata and Nyāya-Vaisesika in its original form were philosophies of committed atheism. Thus the stupendous importance of atheism in Indian wisdom can be questioned only by the disallowing the largest majority of the significant Indian philosophers representing it.” (DPC. 2012: 29)
অর্থাৎ
“আমাদের প্রধান দর্শনগুলির মধ্যে কেবলমাত্র বেদান্ত (কয়েকটি সীমাবদ্ধতা সহ) এবং বিশেষ করে ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনের অর্বাচীন রচনাগুলি হলো ঈশ্বরবাদী। এরই প্রতি তুলনায় বৌদ্ধ, জৈন, পূর্বমীমাংসা, সাংখ্য, লোকায়ত এবং আদি ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনগুলি ছিল দৃঢ়ভাবে নিরীশ্বরবাদী [এবং অনীশ্বরবাদী]। অতএব ভারতীয় প্রজ্ঞায় নিরীশ্বরবাদের এই বিস্ময়কর গুরুত্বকে সন্দেহ করা যেতে পারে একমাত্র ভারতীয় দর্শনের সংখ্যাগরিষ্ঠ [নিরীশ্বরবাদের] প্রতিনিধিত্বকারী দার্শনিকদের অবজ্ঞা করার মধ্য দিয়ে।“
এখন এ প্রশ্ন উঠতেই পারে যে পতঞ্জলির নামের সঙ্গে যুক্ত যোগ-এর উল্লেখ নেই কেন। দেবীপ্রসাদ সচেতনভাবেই যোগের নাম উল্লেখ করেননি। কারণ “There is no ground to take this Yoga a really serious and independent philosophical view. Besides, the admission of God in it is not much of philosophical consequence.” (DPC. 2012:29) অর্থাৎ যোগকে স্বাধীন এবং গুরুতর কোনও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করার কোনও ভিত্তি নেই। উপরন্তু এই দর্শনে ঈশ্বরের প্রবেশ দার্শনিক চর্চার ???????
তথ্যসূত্র – গ্রন্থপঞ্জি:
তর্কবাগীশ, পণ্ডিত ফণিভূষণ। ১৯৮৮, খণ্ড ৪। ন্যায় দর্শন ও বাৎসায়ন ভাষ্য। কলিকাতা: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ।
তর্কভূষণ, পণ্ডিত প্রমথনাথ। ১৪১৭ বাংলা। বেদান্ত সূত্রম্। কলকাতা: পাতাবাহার।
দত্ত, অক্ষয়কুমার। ১৪২০ বাংলা। দ্বিতীয় ভাগ। ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়। কলকাতা: করুণা প্রকাশনী।
সরখেল, রণজিৎ। ২০১৩। ভারতীয় দর্শনে অনীশ্বরবাদ। কলকাতা: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স।
DPC (Debiprasad Chattopadhyaya). 2007. Indian Philosophy – A Popular Introduction. New Delhi: People’s Publishing House.
DPC (,,). 2012. Indian Atheism. New Delhi: People’s Publishing House.
Ray, Acharya Prafulla Chandra. 2011. Vol.-III A. A Collection of Writings. Kolkata: Calcutta University.



