উনিশ শতকে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী চিন্তোন্মেষ ও কাঙাল হরিনাথ

অশোক চট্টোপাধ্যায়

উনিশ শতকে  আমাদের বাংলাদেশে শহুরে শিক্ষিত ধর্মপ্রচারক, ব্যবসায়ী, ধার্মিক, সাহিত্যিকরা বিভিন্ন অসরকারি অভিধায় সম্মানিত হয়েছেন। কেউ হয়েছেন রাজা, কেউ প্রিন্স, কেউ মহর্ষি, কেউ ঋষি, বিদ্যাসাগর ইত্যাদি। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় উনিশ শতকের তথাকথিত বাংলার নবজাগরণের কলকাতায় কিম্বা কলকাতার নিকটবর্তী অঞ্চলে বিদ্যায়তনিক পরিসরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ই একমাত্র বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। আর সমকালে যেসব অসরকারি খেতাবের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায় তা কোনও বিদ্যায়তনিক বা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক উপাধি নয়। কোনও রাজ্যের রাজা না হয়েও ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠাতা রামমোহন রায় হয়ে যান ‘রাজা’। ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ ঠাকুর হয়ে যান ‘প্রিন্স’। ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ হয়ে যান ‘মহর্ষি’। কেশবচন্দ্র হয়ে যান ‘ব্রহ্মানন্দ’, সাধক গদাধর চট্টোপাধ্যায় হয়ে যান ‘পরমহংস’, ‘বান্ধব’ পত্রিকা সম্পাদক ‘বিশিষ্ট’ সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন ঘোষ হয়ে যান ‘বিদ্যাসাগর’, তাঁর ঘনিষ্ঠজন ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদক এবং  বিশিষ্ট সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হয়ে যান ‘ঋষি’। এমনকি দ্বারকানাথ-দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘গুরুদেব’ আখ্যায় ভূষিত হয়েছিলেন।

এইসব খেতাব উনিশ শতকী বাংলার নবজাগরণের এইসব রথী মহারথীদের ‘মহামান্য’ করেছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু এইসব খেতাবের অধিকারীরা সমসময়ে বিদেশি শাসিত উপনিবেশে অত্যাচারিত, নিপীড়িত দেশের কৃষকজনশক্তির মুক্তির স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সশস্ত্র বিদ্রোহে কখনও কোনরকম আনুকূল্য প্রদর্শনে একান্তই নিস্পৃহ থেকেছিলেন। বিদেশি শাসনকে তাঁরা তাঁদের শ্রেণীগত স্বার্থের সম্পূরক বিবেচনায় বিদেশি ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে এইসব দেশপ্রেমী বিদ্রোহীদের লাগাতর লড়াইয়ের বিরোধিতা  করেছিলেন। আর এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা দেশের ‘জনগণমান্যতা’ পেয়েছেন, সম্মানিত হয়েছেন, দেশপ্রেমিক হিসেবে পূজ্য হয়েছেন। অথচ শহর কলকাতা থেকে অনেক দূরে নবজাগরণের আলোকসীমার বাইরে অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামাঞ্চলে যাঁরা প্রথাগত শিক্ষার অনধিকারী হয়েও সমাজের নিপীড়িত অংশের জারি রাখা লড়াইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, জীবন বিপন্ন করে তাঁদের স্বার্থসেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁরা পূর্বোক্ত রাজা-প্রিন্স-মহর্ষি-ঋষি-বিদ্যাসাগর প্রমুখের কাছে উপেক্ষিত হয়েছেন, অবমানিত হয়েছেন। গ্রামের নির্যাতিত কৃষকজনতার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদেরই একজন হয়ে তাঁদের পরাণপ্রিয় হলেও পূর্বোক্ত শিক্ষিত রাজা-মহর্ষিদের কাছে বাস্তবিক অস্পৃশ্য থেকেছেন। গ্রাম-শহরের এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব তখনও অসমাধেয় থেকেছে, আজও।

বহির্বাংলার এক সাধকের কথা বলা যেতে পারে। দেধরাজ নামক এক ব্রাহ্মণ সন্তান প্রথাগত ধর্ম, সামাজিক সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের কথা প্রচার করায় সমকালের সমাজপতিদের বিষনজরে পড়েছিলেন। তিনি অধার্মিক, ম্লেচ্ছ ইত্যাকার অভিধায় ভূষিত হয়ে হেনস্তার শিকার হন। তিনি জাত মানেন না একথা জানার পর সমাজপতিরা তার প্রমাণ চাইলে তিনি এক বৈশ্যের মেয়েকে বিয়ে করে তাঁকে তাঁর স্ত্রীর সম্মান দেন এবং সমাজপতিদের মুখের ওপর তাঁর কথা ও কাজের মধ্যেকার মিলের প্রমাণ দেন। এই দেধরাজের জন্ম পাঞ্জাব এবং রাজপুতনার অন্তর্বর্তী নারনৌল জেলার ধারসুগ্রামে রামমোহন রায়ের জন্মের একবছর আগে অর্থাৎ ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে। স্বগ্রামে সামান্য শিক্ষালাভের পর তিনি চাকরির চেষ্টায় আগ্রায় যান এবং সেখানে একটি চাকরিও পেয়ে যান, কিন্তু ধর্ম-জাতিভেদ ইত্যাকার বিষয়ে তাঁর মতবাদিক কারণে তাঁকে চাকরি ত্যাগ করতে হয়। হিন্দু এবং মুসলিম সাধকদের সঙ্গে গভীরভাবে মেশার কারণে তাঁর মতবাদিক ধারণা আরও শক্ত ভিত্তি পেয়ে যায়। তাঁর ধর্মীয় অবস্থানে বিরক্ত হয়ে তাঁকে বলা হয় তিনি যেন তাঁর স্বগ্রামে গিয়েই এইসব কথা প্রচার করার সাহস দেখান। দেধরাজ তৎক্ষণাৎ সেই চালেঞ্জ গ্রহণ করে স্বগ্রামে ফিরে যান নবোদ্যমে তাঁর মতবাদ প্রচার করতে শুরু করেন, ফলে তাঁর আত্মীয়স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধবও তাঁর বিরোধিতা করে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। এতদসত্ত্বেও দেধরাজ হতাশ হন নি। এবার তাঁর ‘অব্রাহ্মণ-জনোচিত’ আচার-আচরণের জন্যে হিন্দু সমাজপতিদের আবেদনক্রমে হিন্দুধর্ম রক্ষার্থে নারনৌলের নবাব নজারত আলি দেজরাজকে  কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দীর্ঘ আট বছরের কারাজীবনে তিনি যথেষ্ট কষ্ট সহ্য করা সত্ত্বেও তাঁর চিন্তানুশীলনের পথ থেকে বিচ্যূত হন নি। আট বছর পর তাঁর কারামুক্তির সময়  তাঁকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল, তিনি যেন তাঁর ধর্মীয় মতবাদ আর প্রচার না করেন। কিন্তু মুক্তির অব্যবহিত পরেই তিনি তাঁর মতবাদ প্রচার পূর্ণোদ্যমে  করতে শুরু করেন এবং তাঁকে ঘিরে একটি নতুন ‘ধর্মমণ্ডলী’ গড়ে ওঠে। তাঁর প্রচারের মূল বিষয়গুলি ছিল : (ক) ঈশ্বর এক (খ) শাস্ত্র অভ্রান্ত নয়, (গ) জাতিভেদ মিথ্যে, (ঘ) সাধনায় নারী-পুরুষের সমান অধিকার, (ঙ) নারীদের পর্দাপ্রথাকে মান্যতা দেওয়া অনুচিত, (চ) নারী পুরুষ পরস্পর ভাইবোনের মতো (ছ) হিন্দু মুসলিম সহ কোনও ধর্মই অশ্রদ্ধেয় নয়, (জ) ধর্মের সাধনা চলিত ভাষায় করা বিধেয় এবং (ঝ) মূর্তি কিম্বা শিলা পুজো আসলে ঈশ্বরের অবমাননার সমতুল। এই সমাজবিপ্লবী দেধরাজ  জনমান্যতা পান না। কারণ তিনি তথাকথিত হিন্দুধর্মের আচার আচরণের প্রতিপক্ষে বিদ্রোহ করে হিন্দুধর্মকে বিপন্ন করেছিলেন! ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভুত হওয়া সত্ত্বেও তিনি শূদ্রকন্যাকে বিবাহ করেছিলেন এবং প্রচলিত হিন্দুধর্মের আচার-আচরণের বিরোধিতাই করেছিলেন!

এই দেধরাজ ছিলেন রামমোহন রায়ের সমসাময়িক। স্বয়ং রামমোহনও এই সমাজবিপ্লবী দেধরাজ সম্পর্কে কোনও আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এমন তথ্য সুলভ নয়। এমনকি রামমোহনের সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও লালন ফকির এবং তাঁর মহান মানবিক দর্শনজাত গান সম্পর্কেও তাঁর আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়নি।

লালন ফকির তো জাতপাত মানতেন না। তাঁর দর্শন বৈভবে মানুষই ছিল প্রধান, তাঁর অসংখ্য গানের অন্তর্বস্তুতে সম্প্রদায়গত চিন্তাভাবনাকে খারিজ করে মহামানবের এক নতুন দিগদর্শন উন্মোচিত হয়েছিল। তাঁর গানে অবলীলায় ঢুকে পড়েছিল নিপীড়িত মানবাত্মার কথা, জমিদারের অত্যাচারের কথা, বিদেশি শাসন সম্পর্কে সতর্কবাণী। এককথায় লালন ফকির সমসময়ের সামাজিক অবস্থাকে তুলে ধরে ধর্ম-বর্ণ এবং সম্প্রদায়গত চিন্তার ঊর্ধ্বে এক নতুন সমাজের স্বপ্ন রোপন করতে চেয়েছিলেন। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, মির মশাররফ হোসেন, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রমুখের সঙ্গে ছিল তাঁর আন্তরিক সখ্যের সম্পর্ক। ঠাকুর জমিদারদের আক্রমণের মুখে তিনি তো তাঁর শিষ্যবর্গের সঙ্গে কাঙাল হরিনাথের জীবন রক্ষার ভূমিকাও পালন করেছিলেন। সমসময়ের বিভিন্ন সাধক-গায়কেরা যেমন গগন হরকরা, হাসন রাজা, পাগলা কানাই প্রমুখ গ্রামগঞ্জে, অশিক্ষার অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের মধ্যে তাঁদের গানের ডালি নিয়ে গিয়েছিলেন। হরিনাথ মজুমদারও তাঁর সম্পাদিত সংবাদপত্র অর্থাভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পর তাঁর ফিকিরচাঁদের গানের দল নিয়ে গ্রামের মানুষজনের দরবারেই গিয়েছিলেন ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে এক মহান মানবতার বাণী নিয়ে, যেসব গানে কোনও ধর্মের প্রচার দুর্নিরীক্ষ থেকেছে,  যেসব গানে মূর্ত হয়েছে কৃত্রিমতার বাইরে কিছু স্পষ্ট কথা যা ধর্মব্যবসায়ীদের রীতিমতো আঘাত করেছিল। তিনি গেয়েছিলেন :

বাহিরে তিলক ঝোলা  জপের মালা  দেখে ত ভাই সে ভুলবে না।

বাহিরে মোড়া মাথা  ছেড়া কাঁথা  মনের মধ্যে কুবাসনা।।

তাইতে মাগীর তরে   ভিক্ষা করে  বেড়াও আসন ঠিক  থাকেন

কাঙাল কয় কুবাসনা  মনের মধ্যে   থাকলে না হয় উপাসনা

       তাহলে একদিকে দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত শহুরে ধর্মপ্রচারক-ব্যবসায়ী-বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের শহুরে সংকীর্ণ চেনা গণ্ডির মধ্যে তাঁদের চিন্তাগত অনুশীলনের স্বাক্ষর রেখেছেন, আর বিপরীতে প্রথাগত শিক্ষার অনধিকারী সাংবাদিক, সাধক-গায়কেরা শরণ নিয়েছেন শহর থেকে বহু বহু দূরবর্তী অশিক্ষার অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামের নিপীড়িত-প্রপীড়িত-অত্যাচারিত-নিষ্পেষিত মানুষজনের।  তবে এই দুই পক্ষেরই একটা দর্শনগত মিলের জায়গা অনাবৃত হয়েছিল, তা হলো বিদেশি ব্রিটিশ শাসন নিয়ে এঁদের কারও কোনও মাথাব্যথা ছিলনা। যেমন উনিশ শতকে জমিদারদের প্রজানিপীড়নের বিরুদ্ধে অনাপস লড়াইয়ের মুখ কাঙাল হরিনাথ অত্যাচারী জমিদারের বিপরীতে ভালো দয়ালু জমিদারের প্রত্যাশী ছিলেন, গ্রামের দরিদ্র জনতার ওপর অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের বিপরীতে প্রজাদরদি হৃদয়বান ইংরেজ শাসনের প্রত্যাশী ছিলেন। এগুলো হরিনাথ প্রমুখের কালিক সীমাবদ্ধতা, দর্শনের দারিদ্র্যের প্রকট প্রকাশ। তবে গ্রামের মানুষজনকে এঁরা আন্তরিকভাবেই ভালোবাসতেন, তাঁদের সুখদুঃখের সমাংশভাগী হতেন, তাঁদের আত্মার আত্মীয় হয়ে ওঠাই ছিলো তাঁদের ব্রতবদ্ধতা।

       শৈশবে মাতাপিতৃহীন হওয়ায় হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬) বাস্তবিক অনাথ হিসেবেই বড়ো হয়েছিলেন। তাঁকে অনেকেই স্নেহ করলেও অর্থাভাবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একটা পর্যায়ের পর বন্ধ হয়ে যায়। তবে পড়ার অদম্য আগ্রহ থেকে তিনি যেখানে যে বই, পত্রিকা পেতেন দ্রুত পড়ে ফেলতেন। এমনকি তাঁর জন্মস্থান কুমারখালির ব্রাহ্মসমাজের অফিসে তথা মন্দিরে গিয়ে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা পড়তেন। অন্যদিকে নিজের মনে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতেন, কেউ ডেকে দুমুঠো খেতে দিলে খেতেন, না দিলে অভুক্ত থাকতেন। এই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর সূত্রে তিনি তাঁর গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের খুব নিকট থেকে দেখেছেন, তাঁদের জীবনযাপন এবং জীবনসংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হন। নীলকরদের অত্যাচারের সঙ্গেও পরিচিত হন। এসময় থেকেই এইসব হতদরিদ্র কৃষক জনসাধারণের দুর্দশা লাগবের ব্যাপারে তিনি চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। কিন্তু তিনি কী করবেন? তাঁর নিজেরই তো থাকা-খাওয়ার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অনধিকারিত্বের কষ্টই তাঁকে উদ্দীপিত করেছিল গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান করতে। নিজে পাঠশালা স্থাপন করে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াতে থাকেন। পরে সেই পাঠশালা সরকারি অনুমোদন পেলে কিছু মাসিক বেতনও তিনি পেতেন। যে বিষয়টি নিজে জানতেন না, যে জানে তাঁর নিকট থেকে শিখে নিয়ে এসে ছাত্রদের তিনি শেখাতেন। এই হরিনাথ মজুমদার উত্তরকালে বাংলাভাষায় তাঁর অগাধ ব্যুৎপত্তির পরিচয় রেখেছিলেন। জমিদারদের অত্যাচারে, নীলকরদের অত্যাচারে বিপন্ন হতদরিদ্র গ্রামের মানুষের অপরিমেয় দুর্দশার কথা সরকারের নিকট নিবেদনের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া যাবে এই বিশ্বাসে তিনি সংবাদপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ তিনি কিছু ‘পদ্য’ এবং চিঠিপত্র লিখে তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। নিজে সংবাদপত্র প্রকাশ করে গ্রাম গ্রামান্তরের নিপীড়িত মানুষের লড়াই সংগ্রামের পাশে দাঁড়ানোর ব্রতবদ্ধতায় তিনি তাঁর পাঠশালার চাকরি ছেড়ে দিয়ে সত্য এবং তথ্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের সর্বক্ষণিক ব্রতচর্যায় লিপ্ত হন। সমসময়ের শহরাঞ্চল থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেক জমিদার, ধনাঢ্য ব্যক্তি এমনকি সরকারি পৃষ্ঠপোষণা মিলতো। তবে এই পৃষ্ঠপোষণায় অনুগৃহীত পত্রিকা-সম্পাদকেরা তাঁদের স্বার্থহানিকর কোনও কিছু লিখতেন না। কিন্তু হরিনাথের ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’ তাঁর ক্রমান্বয়িক ত্রিস্তর প্রকাশনা ক্রমশই অত্যাচারী জমিদার, পুলিশ, নীলকরদের বিরুদ্ধে সত্য এবং তথ্যঋদ্ধ সংবাদ প্রকাশ করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে প্রজা দুর্দশা লাঘবের প্রচেষ্টক হয়েছিলেন। এমনকি অনেকসময় সরকারেরও কোনও কোনও কাজের সমালোচনা করতে তিনি পিছপা হতেন না।

       হরিনাথের পত্রিকায় প্রকাশিত অনেক সংবাদের সত্যতার কারণে অনেক সময়ই প্রজাদের সমস্যার আশু সুরাহা হয়েছে, হরিনাথ সেইসব মানুষজনের কাছে ঘরের মানুষ বলে মান্যতা পেয়েছিলেন। কিন্তু বিপরীত দিকে জমিদার-নায়েবরা হরিনাথের জাতশত্রু হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রকম প্রলোভনে তাঁকে বশীভূত করার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর হরিনাথের প্রাণনাশের চক্রান্ত করেন তাঁরা। এরকম একজন জমিদার হলেন রবীন্দ্রজনক ‘মহর্ষি’ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। হরিনাথ তাঁর অপ্রকাশিত ডায়েরিতে লিখেছেন যে তাঁর পত্রিকায় জমিদারি অত্যাচারের সতথ্য সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার ফলে অনেকের মনে এই ধারণা জন্মেছিল যে ‘পূর্ব্বে অনেক ধনবানাদি সবল লোকেরা দুর্ব্বলের প্রতি প্রকাশ্যরূপে সহসা যে প্রকার অত্যাচার করিতেন, এক্ষণে যে তদ্রূপ করিতে সাহসী হইতেছেন না…গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকাই তাহার কারণ।’ এরপর এই ঠাকুর জমিদারদের কথা বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন রানি ভবানীর কাছারির শেষ নায়েব ছিলেন রাধানাথ ঠাকুর। এই রাধানাথ ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের ‘জ্যেষ্ঠ সহোদর’। রাধানাথ ঠাকুরের পিতা দ্বারকানাথকে ‘কলকাতাস্থ ধনবান কোন পিরালী ব্রাহ্মণকে পোষ্যপুত্র দান করিয়াছিলেন।’ বিরাহিমপুর যখন উত্তরকালে রানি ভবানীর ‘হস্তান্তর’ হয় তখন দ্বারকানাথ ঐ পরগনা কিনে নিয়েছিলেন। এই জমিদারি কিনবার টাকা দিয়েছিলেন রানি রাসমণির পিতা পীরিতরাম মাড়। স্বভাবতই এই জমিদারির অর্ধাংশ ছিল দ্বারকানাথের, অর্ধাংশ পীরিতরামের। পরবর্তীকালে এই জমিদারির নায়েব হয়েছিলেন দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাধানাথ। তিনি নায়েব হওয়ার কিছুকাল পরেই এই জমিদারিতে প্রজাবিদ্রোহ হয়, ফলে জমিদারি থেকে কোনও লাভ হয় নি। এরপর পীরিতরাম ‘দ্বারিকানাথ ঠাকুরের নিকট সম্পূর্ণ টাকার এক তমোঃসুক গ্রহণ’ করে জমিদারির তাঁর অংশ পরিত্যাগ করেন। এরপর হরিনাথ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন :

দ্বারিকানাথ ঠাকুর সহজ লোক ছিলেন না, নানা আশঙ্কায় পীরিতরাম তমোঃসুকের নালিশ করিতে সাহসী হন নাই। সে যাহা হউক এরূপে বিরাহিমপুর পরগণার বর্তমান জমীদার ঠাকুরবাবুদিগের সমুদায় অভ্যুদয়ের নিদান। বিরাহিমপুরের জমিদারী হস্তগত হইল। তাঁহারা তের হাজার টাকা রাজকর দাম করিয়া এক্ষণে লক্ষ টাকার উপরেও লাভবান হইয়াছেন। তথাচ প্রজা শোষণের ইচ্ছা ক্রমেই বলবতী হইতেছে।

এরপর রাধানাথ ঠাকুর  সম্পর্কে লিখেছেন :

জমীদারীর ক্ষতি হইলেও প্রজার প্রতি কোন প্রকার অত্যাচার না হয়, ইহাই পূর্ব্বের রাজপদ্ধতি ছিল, তন্নিমিত্তও রাধানাথ ঠাকুর আপন ইচ্ছানুসারে কোন কার্যও করিতে পারেন নাই। এক্ষণে সে রাজনিয়ম আর অন্তরায় হয় না, সুতরাং প্রজার প্রতি কঠিন শাসনের নিয়ম হইল। প্রজারা নানা প্রকারে অপমানিত হইয়া, খাজনা আদায় রহিত করিল। রাধানাথ তাহাদিগের প্রতি নানাপ্রকার অত্যাচার করিতে আরম্ভ করিলেন।  ইহাই প্রজাবিদ্রোহের কারণ।

এরপর তাঁর ডায়েরিতে হরিনাথ ‘প্রিন্স’ দ্বারকানাথের পুত্র ‘মহর্ষি’ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন :

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে পর্য্যন্ত মহর্ষি নাম গ্রহণ করেন নাই, সে পর্য্যন্ত প্রজাগণ তাঁহাকে দুঃখ বিবেদন করিয়া কিছু কিছু ফল পাইয়াছে, কিন্তু তিনি মহর্ষি নাম পরিগ্রহ করিলে, তাহার পর প্রজার হাহাকার তাঁহার কর্ণে প্রবেশ করিতে অবসর পায় নাই।… দেবেন্দ্রিয় মত এই যে, ব্রহ্ম কি ধর্ম্মের সহিত জমীদারীর কোন সম্বন্ধ নাই।…সুতরাং প্রজার প্রতি যথেচ্ছা ব্যবহার করিলে তৎপ্রতি ধর্ম্মের মত কোন ক্ষমতাই  নাই, সর্ব্বত্র যাহার চক্ষু সেই ব্রহ্মও তাহা দেখিতে পান না।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর তাঁর পুত্রদের, বিশেষ করে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের  জমিদারি পরিচালনা প্রসঙ্গে হরিনাথ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন :

মহর্ষি  অবসর গ্রহণ করিলে, যাহারা জমীদারী শাসনের ভার পাইলেন, তাহারা যতোধিক ইংরেজীতে সুশিক্ষিত, ততোধিক কূট কৌশলবুদ্ধির অর্থাৎ ইংরাজ পোলিশির কৃতদাস। সুতরাং ব্রহ্মপরায়ণতা, ধার্ম্মিকতা ও দেশহিতৈষিতা চিহ্নস্বরূপ গীতিকবিতা রচনা করিয়া বাহিরে যতই কেন সাধুতা প্রদর্শন না করুন, অন্যায় অত্যাচারে প্রজার শরীরে আর রক্ত থাকিল না, যতই কেন অত্যাচারিত না হউক, এতই দুর্ব্বল যে, কাহারও মাথা তুলিবার সাধ্য থাকিল না, তাহারা পূর্বে চীৎকার করিত, এক্ষণে ক্ষীণস্বরে হাহাকার করিয়া বক্ষস্থল কেবল সিক্ত করিতে লাগিল। এদিকে জমীদারের অট্টালিকা কোথায় বিলাসসুখের হাস্যধ্বনিতে ও কোথায় ব্রহ্মধর্ম্মের শ্রুতি স্তোত্র পাঠে ধ্বনিত লাগিল।

এভাবে হরিনাথ তাঁর ডায়েরিতে তাঁদের জমিদারিতে দুর্বল প্রজাবর্গের ওপর প্রবল প্রতাপ ঠাকুর জমিদারদের অত্যাচারের কথা বিবৃত করেছেন। নিজে ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’র গ্রাহক হওয়ায় তাঁর জমিদারি সব খবরই তিনি পেতেন। বাংলার সমাজমানসে অতিসম্মানীয় ঠাকুর জমিদারদের কীর্তিকলাপ প্রকাশ্যে নিয়ে আসায় স্বভাবতই ঠাকুর জমিদাররা এক অতিদরিদ্র গ্রামীণ  সংবাদপত্রের সাংবাদিকের এই সাহসী ভূমিকাকে সম্মান জানাতে কুণ্ঠিত ছিলেন এবং জনসমাজে নিজস্বার্থ বিপন্ন হওয়ায় প্রথমে নানাবিধ প্রলোভন দেখিয়ে, উৎকোচে বশীভূত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর গুণ্ডা নিয়োগ করেছিলেন হরিনাথের প্রাণনাশ করার লক্ষ্যে। তাঁর প্রেসের কর্মচারিবৃন্দ এবং হরিনাথের গুণমুগ্ধ ভক্তদের প্রতিরক্ষার বেড়া অতিক্রম করে সেটা  সম্ভব হয়ে ওঠে নি। একবার তো স্বয়ং লালন ফকির সদলবলে হরিনাথের জীবন রক্ষা করেছিলেন।

       অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের, দলিতের ক্ষোভ-বিক্ষোভ-প্রতিবাদকে ক্ষমাহীন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। অত্যাচারিত-দলিতরা সবসময়ই আধিপত্যবাদী বা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিষ্পেষণকে নতচিত্তে মেনে নেবে এটাই হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কাছে প্রত্যাশিত বিষয়। এর ব্যত্যয় ঘটলেই তাঁরা তাঁদের বিরোধী স্বর দমনে বুলডোজার ব্যবহার করবেন অবলীলায় এবং অবশ্যই ‘আইনসঙ্গতভাবে’!

       কাঙাল হরিনাথ তাঁর পত্রিকার ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের জুন  সংখ্যায় লিখেছিলেন :

 … আস্তিকগণ ঈশ্বরের প্রিয়কার্য্য বলিয়া যাহা সম্পাদন করেন, নাস্তিকগণ জগতের কার্য্য বলিয়া তাহা নিষ্পাদন করিতে বাধ্য হন।…যাঁহারা ইহার ব্যভিচার করিয়া থাকেন,  তাঁহারাই স্বেচ্ছাচারী।…ইহারা পৃথিবীর কণ্টকস্বরূপ।

এইসব স্বেচ্চাচারী এবং ব্যভিচারীদের বিরুদ্ধে হরিনাথ আজীবন লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন।

কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’-র শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১২৯২ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে। এরপর হরিনাথ প্রায় আরও সাড়ে এগারো বছর জীবিত ছিলেন। গ্রামবার্তা চলাকালীন ১২৮৭ বঙ্গাব্দের গোড়ার দিকে হরিনাথ লালন ফকিরের অনুপ্রেরণায় গঠন করেন ফিকিরচাঁদের বাউল দল। ছোটবেলা থেকেই কাঙালের মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত হরিনাথ তাঁর গানের শেষে ‘কাঙাল’ ভণিতা ব্যবহার করতেন। এই স্বগৃহীত কাঙাল অভিধার কারণে হরিনাথ সমকালে কাঙাল হরিনাথ নামে পরিচিত হন। গ্রামবার্তায় জমিদারদের প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে হরিনাথের একরৈখিক যুদ্ধঘোষণায় ক্রুদ্ধ জমিদাররা প্রশাসনের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলিতে আধুনিক পরিভাষায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জারি করে গ্রামের মানুষজনের নিকট থেকে হরিনাথকে বিচ্ছিন্ন করার অপপ্রয়াস পেয়েছিলেন। এমত অবস্থায় হরিনাথ যখন নিজে তাঁদের অত্যাচারের শিকার হয়ে তাঁর প্রিয় গ্রামবাসীদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয়ে সেইসব গ্রামবাসীরা হরিনাথের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারেন নি। এর ফলে হরিনাথ মানসিক কষ্ট পেয়েছিলেন ঠিকই তবে তাঁর প্রিয় মানুষজন সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে সমাজ থেকে আত্মনির্বাসন নেননি। বরং গ্রামবার্তা বন্ধ হয়ে যাবার পর তিনি তাঁর ফিকিরচাঁদের গানের দল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সেইসব মানুষজনের কাছেই ফিরে গিয়েছিলেন।

হরিনাথ নির্দিষ্টভাবে কোনও ধর্মের দীক্ষিত অনুশীলক ছিলেন না। মূলগতভাবে হিন্দু ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও তিনি হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-ব্রাহ্মে কোনরকম ভেদাভেদের পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি ব্রাহ্মধর্মের সমালোচনাও করেছেন আবার তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত গায়ক হিসেবে সদলবলে গিয়ে গানও গেয়েছেন। নবহিন্দুবাদের প্রবক্তা বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের সমালোচনাকে প্রশ্রয় দিয়েও শিবচন্দ্রকে সংযত থাকার সুপরামর্শ দিয়েছেন হরিনাথ। নিজে পৌত্তলিকতাবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমদের হিন্দুমন্দির ভাঙার নিন্দা করেছেন, আবার হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি দেশবাসীর চেতনার বিকাশ ঘটাতে প্রয়াসী হয়েছেন। ধর্মের নামে ধর্মব্যবসায়ের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছেন। শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের ‘মায়ের মন্দিরে’ বসেই হরিনাথ তাৎক্ষণিকভাবে ‘দেখ ললিতে আচম্বিতে, শ্যাম যে আমার শ্যামা হল’ শীর্ষক গানটি  রচনা করে ‘মায়ের বাটীর চণ্ডীমণ্ডপে’ শাক্ত-বৈষ্ণব উভয় সম্প্রদায়ের সামনে গানটি গেয়ে তাঁদের ‘দলগত ভ্রান্ত বিবাদ বিসম্বাদ’-এর নিষ্পত্তির প্রয়াসী হয়েছিলেন। বহুবার তিনি শিবচন্দ্রের মায়ের মন্দিরে গান গেয়েছেন। ঈশ্বর সাকার না নিরাকার এই প্রশ্নের উত্তরে হরিনাথ ঈশ্বরকে ‘নরাকার’ বলে অভিহিত করেছিলেন। হরিনাথ নির্দ্বিধায় বলেছেন : ‘এখনকার ব্যবসায়ী গুরুগণের মন্ত্রদান, জমীদারের জমিদারী রক্ষা, মহাজনের ব্যবসায় এবং শিষ্যের মন্ত্রগ্রহণ সামাজিক নিয়মরক্ষা হইয়া উঠিয়াছে।’ অন্যত্র তিনি আবার বলেছেন : ‘মরমের মরমী না হইলে, আত্মার আত্মীয় না হইলে, কে এমন আছে যে, আত্মার বেদনা জানিতে ও বুঝিতে পারে?

এই হলেন হরিনাথ, যিনি সারাজীবন দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করেও কোনোদিন অসৎ হননি, অসাধু হননি, লোভী হননি, সুবিধামনস্ক হয়ে আত্মোন্নতিসাধনের পথানুবর্তী হননি। তিনি বারবার বলতেন : ‘ভালো হও ভালো করো’। নিজে ভালো হয়ে অন্যের ভালো করার ব্রতবদ্ধতায় তিনি তাঁর সারাটা জীবন অতিবাহিত করেছেন। কখনও মসীকে অসি হিসেবে ব্যবহার করে রণক্ষেত্রে আপসহীন সৈনিকব্রত পালন করেছেন, কখনও বাউলগানের দল নিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তরে মানুষের হাটের মাঝখানে গিয়ে সশরীরে হাজির হয়েছেন। ধর্মধ্বজীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন এবং একইসঙ্গে মানবতাবাদের প্রচারক হিসেবে মরমের মরমি হওয়ার, আত্মার আত্মীয় হওয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যথিতের বেদন উপলব্ধি করে তাদের একান্ত আপনজন হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর ‘কাঙালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ’-এর চতুর্থ ভাগের তেত্রিশ পৃষ্ঠার নিচে *(তারকা) চিহ্নিত পাদটীকায় হরিনাথ যা লিখেছিলেন তা দেবী দুর্গা সম্পর্কে একটি চিত্তাকর্ষক আখ্যান নির্মাণ করেছে। তিনি লিখেছেন :

ঊনবিংশ শতাব্দীর সভ্যগণের মধ্যে অনেকেরই বিশ্বাস, বেদ, পূর্ব্বকালীয় কৃষকদিগের রচিত গীত এবং একদা একটী মহিষ আখের ভূঁই নষ্ট করিত। হিমালয় প্রদেশের কোন রাজকন্যা সেই সময়ে একটী সিংহ পুষিয়াছিলেন। কৃষকদিগের প্রার্থনায় তিনি সিংহিতে চড়িয়া মহিষ বধ করেন, ইহাই মহিষাসুরবধের বৃত্তান্ত। শিব ধাঙড়জাতীয় জনৈক বীরপুরুষ ছিলেন। গিরিরাজ তাঁহাকে আপনার বশে রাখিতে কন্যা পার্ব্বতীকে সম্প্রদান করিয়াছিলেন ইত্যাদি…

       হরিনাথের বয়ানপাঠে অবশ্য ধারণা করা যায় আখ্যানটি তাঁর নিজকৃত নয়। উনিশ শতকের অনেকেরই এরকম ‘বিশ্বাস’ বর্তমান ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের এই ধরনের বিশ্বাসকারী কারা সে প্রসঙ্গে অবশ্য হরিনাথ নীরব থেকে গিয়েছেন। তবে দুর্গা এবং শিব সম্পর্কে এই ‘বিশ্বাস’জাত ধারণাটি চিত্তাকর্ষক সন্দেহ নেই। দুর্গা এবং শিব সম্পর্কে এধরনের ন্যারেটিভ হাজির করার পর হরিনাথ লিখেছেন যে এই ‘রচনা’ আসলে ‘শাস্ত্রতত্ত্ব ও তাহার মর্ম্মার্থ অজ্ঞাতরূপ অজ্ঞানতার ফল, এরূপ অনেক দৃষ্টান্ত চতুর্দ্দিকে বিচ্ছিন্ন আছে।’ এখানে আবারও প্রশ্ন ওঠে। প্রথমে হরিনাথ জানিয়েছেন যে এই আখ্যানটি উনিশ শতকের কিছু ‘সভ্য’গণ বা মানুষের ‘বিশ্বাস’ মাত্র। আবার শেষে এই আখ্যানটিকে ‘রচনা’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে  তিনি এই আখ্যানে বিশ্বাসীদের কিম্বা এর ‘রচনা’কারীর নামোল্লেখ করেন নি। এবং সবশেষে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকভবেই জানিয়েছেন যে এই আখ্যান-রচনাটি প্রকৃত অর্থে শাস্ত্রতত্ত্ব এবং তার মর্ম্মার্থ সম্পর্কে ‘অজ্ঞানতা’র পরিণতি! কিন্তু ‘শাস্ত্রতত্ত্ব’-এ কী আছে সে সম্পর্কেও তিনি কিছু বলেন নি। তবে কি স্বয়ং হরিনাথই নিজেকে অপ্রকাশ্য রেখে এবং অনেক দ্বিধা নিয়েই এই আখ্যানটি প্রচার করেছিলেন?

একথা সত্য যে হরিনাথ এদেশে ব্রিটিশশাসনের, বিদেশি রাজত্বের অবসান চাননি, তিনি জমিদারতন্ত্রের অবসানও চাননি। তিনি চেয়েছিলেন অত্যাচারমুক্ত জমিদারি ব্যবস্থা, তিনি চেয়েছিলেন প্রজাবর্গের দুঃখ-দুর্দশার নিরসন করে ব্রিটিশশাসন এদেশে দীর্ঘস্থায়ী হোক। হরিনাথের চিন্তাচেতনার এই প্রকট সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের দরিদ্র, প্রপীড়িত মানুষজনের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসায় কোনও খাদ ছিলনা। আর মানুষের প্রতি  তাঁর এই খাদহীন ভালোবাসার কারণেই তিনি অত্যাচারী-শঠ-কপটাচারীদের স্বরূপ বুঝে উঠতে পেরেছিলেন। তাঁর ‘কাঙ্গালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ’-এর চতুর্থভাগে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন : অর্ধেক সোনা আর অর্ধেক দস্তার সম্মিলনে যা প্রস্তুত হয় তাকে বলে ‘দো-আঁশলা’। জীবের মধ্যেও এরকম অনেক দোআঁশলা আছে যা প্রকৃত অর্থে ‘কপটাচারী ও ভয়ঙ্কর’—এরা পীড়িতের উপকার করা বিপরীতে অপকার করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। এইসব ব্যক্তিদের দ্বারা তাঁর প্রিয় মানুষজনের ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি সবসময়ই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতেন। তাঁর ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’য় ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে তিনি ‘নাস্তিক্যবাদী’দের জনসেবার কাজকে মান্যতা দিয়েছিলেন এবং পাশাপাশি আস্তিক্যবাদীদের মধ্যে যারা এই  বিপরীত কাজ করে থাকেন তাঁরা হলেন ‘ব্যাভিচারী’, আর এই ব্যাভিচারীদের তিনি ‘পৃথিবীর কণ্টকস্বরূপ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

স্বভাবতই কাঙাল হরিনাথ ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বিষ নজরে পড়েছিলেন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ প্রকাশিত হয়েছিল কাঙাল হরিনাথের একটি ছোট অথচ অসাধারণ পুস্তিকা, যার শিরোনাম ছিল ‘পৌত্তলিকতাপনেতা’, যার অর্থ ঈশ্বর আরাধনায় মূর্তিপূজার (প্রতিমামূর্তি) অপ্রয়োজন। অর্থাৎ হরিনাথ সরাসরি মূর্তিপূজার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন :

আমাদের শাস্ত্রকারেরা নিরাকার ঈশ্বরকে কল্পিতরূপ প্রদান করিয়া ক্ষান্ত হন  নাই;…উপাসকদিগের যেরূপ স্ত্রী পরিবার, গুরু-পুরোহিত, বিষয়বৈভব আছে, কল্পিত ঈশ্বরগণকেও সেইরূপ গুরুপুরোহিত…স্ত্রীপরিবারাদি প্রদান করিয়াছেন।

হরিনাথ এখানে ঈশ্বরকে ‘কল্পিত’ বলে অভিহিত করেছেন। সাকার দেবদেবীমূর্তির নির্মাণ করে সেইসব মূর্তির চোখ, কান, মুখ, হাত, পা, ইত্যাদিও শরীরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে নির্মাণ করা হয়ে  থাকে। তিনি এসবের প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নাকীর্ণ করেছেন। তিনি লিখেছেন :

দেবতারা কোন ব্যক্তিকে পীড়ন অথবা অন্য কোন কার্য্য করিতে ইচ্ছুক হইলে যখন হস্তদ্বারা তাঁদের সেই সকল ক্রিয়া সম্পাদন করিতে দৃষত হয় না, তখন তাঁহাদের হস্তের আবশ্যকতা কি? চক্ষুদ্বারা তাঁহাদের কিছুই দৃষ্ট করিতে হয় না। তাঁহারা চক্ষুব্যতিরেকেই যদি অতি নিভৃত স্থানের গুপ্ত ক্রিয়াসকল দেখিতে পারেন…তবে তাঁহাদের চক্ষুর আবশ্যকতা কি? মুখ দিয়া তাঁহাদের আহারাদি করিতে হয় না, কারণ তাহা হইলে উপাসকেরা তাঁহাদের উদ্দেশ্যে যে সকল নৈবেদ্য উৎসর্গ করিয়া দেন তাহার অবশ্যই কিছু না কিছু পরিমাণে লাঘব হইত। অতএব বলিতে হইবে যে দৃষ্টি মাত্রেই দেবতাগণের তৃপ্তি হয়, তবে তাঁহাদের মুখেরই বা প্রয়োজন কি?

হরিনাথ নিরীশ্বরবাদী ছিলেন না, কিন্তু বৈজ্ঞানিক মননের অধিকারী ছিলেন। তাই সাহসের সঙ্গেই  সমাজপতিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই এইসব কথা নির্দ্বিধায় বলে গিয়েছিলেন। মানবহিতচর্চাই ছিল তাঁর চিন্তা-দর্শনের মূল আধার। তাই সমসময়ের গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কারাচ্ছাদিত মানুষের মনে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটানোর লক্ষ্যেই তিনি তৎপর হয়েছিলেন। তিনি একইসঙ্গে সর্বেশ্বরবাদ (প্যান-থিইজম), পৌত্তলিকতা এবং ধর্মীয় কুসংস্কার তথা যুক্তিবিযুক্ততার বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক মননের আলোকেই সংগ্রামে ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন : অনেকের বাড়িতে জাগ্রত দেবদেবীর মূর্তির অতিকথা প্রচারের চল আছে। এই প্রচারে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে সেখানে যান। এরপর তিনি লিখেছেন যে, যাদের ‘ধর্ম্মজ্ঞান’ অতিমাত্রায় ‘দুর্ব্বল’ তাহারাই এইসব ‘অসঙ্গত ও অপ্রামাণিক বাক্যে’ বিশ্বাস করে থাকেন।

       হরিনাথ পৌত্তলিকতাকে একটি মানসিক ‘রোগ’ বলে মনে করতেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে পৌত্তলিকতাবিরোধী ব্রাহ্মদের অনেকেই তাঁদের বাড়িতে মূর্তি(প্রতিমা)পূজা করে থাকেন। ব্রাহ্মদের চিন্তানুশীলনের মধ্যে এই বিরোধাভাষ লক্ষ্য করে তিনি লিখেছিলেন : পৌত্তলিকতা যেদিন ‘ভারতভূমিকে পরিত্যাগ’ করবে,  সেদিন দেশবাসীর সুখ আর সৌভাগ্যের ‘সীমা’ থাকবে না। আর এজন্যেই তিনি লিখেছেন : ‘আমরা ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি, ত্বরায় সেই শুভ দিন উদয় হউক।’

       ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়েও নিরীশ্বরবাদীদের সম্মান জানানো, ধর্মীয়দিক থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বী হয়েও হিন্দুধর্মের অতিরৈখিকতা এবং চরম ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বিরোধিতায় সোচ্চার হওয়া, মূর্তিপুজোর বিরোধিতায় তথাকথিত পৌত্তলিকতাবিরোধীদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করতে কাঙাল হরিনাথ এতটুকু দ্বিধাচিত্ততাকে প্রশয় দেন নি। এমনকি অতিদরিদ্র সহায়সম্বলহীন একজন সাহসী সাংবাদিক, নিপীড়িত মানুষের একান্ত আপনজন, কুসংস্কারাচ্ছাদিত অন্ধকারে আলোর দিশারি হরিনাথ বলেছিলেন, কোরান না মানলে মুসলিমরা কাফের বলে থাকে, বাইবেল না মানলে খৃস্টানরা তাঁদের নাস্তিক বলে থাকে। কোরান এবং বাইবেলে অবিশ্বাসী যদি কাফের আর নাস্তিক হয় তবে যিনি পৌত্তলিকতায় ‘আস্থাবিহীন ব্যক্তি’কে তো ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলে ‘হেয়’ করা হবে! আর হরিনাথ নিজেকে তাঁর পৌত্তলিকতাবাদবিরোধী অবস্থানের জন্যে  তাঁকে স্বেচ্ছাচারী অভিধা দিয়ে হেয় করার সম্ভাবনার কথা জেনেও হরিনাথ মাথা উঁচু করে তাঁর বিরুদ্ধতার নিশান ওড়াবার সাহস দেখিয়েছিলেন, উনিশ শতকে এমন নজির খুবই কম। অথচ ‘বেঙ্গল ইন দ্য নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি’ গ্রন্থে উনিশ শতকের বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের একবারও মনে পড়ে না সাহসী, আপসহীন,  সত্যনিষ্ঠ গ্রামীণ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী কাঙাল হরিনাথের নাম!

বাংলা সমাজেতিহাসের একজন প্রখ্যাত লেখক লিখেছেন : …

সর্বত্র দেখা যায় শিক্ষিতদের সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ শাসক শ্রেণীর স্বার্থ ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষপাতী, একটা সংখ্যা লঘিষ্ঠ অংশ কিন্তু তার বিরোধী। এই বিরোধিতার শক্তি সকলের অবশ্য সমান নয়, অনেকে এক পা এগিয়ে ভয়ে বা প্রলোভনে পিছিয়ে আসেন, অনেকে খানিকটা এগোতে চান। তাঁরা হন সংস্কারবাদী। অনেকে আমূল রূপান্তর চান, তাঁরা বিপ্লবী, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যর্থ হন, কেউ কেউ সফল হন।

কাঙাল হরিনাথ ছিলেন এই দ্বিতীয় অংশের প্রথম ধারার একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি গ্রামের নিপীড়িত মানুষজনের পাশে দাঁড়িয়ে  তাঁদেরই একজন হয়ে তাঁদের ন্যায্য লড়াইয়ে সক্রিয়ভাবেই অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁর পত্রিকা ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’র মাধ্যমে। এই পথের অনুসারিতায় তিনি ‘এক পা’ এগিয়ে কায়েমিস্বার্থের ভয়ে বা তাদের ‘প্রলোভনে’ পিছিয়ে আসার বিপরীতে আর অনেক পথ অতিক্রম করেছিলেন। তবে তিনি অবশ্যই সমাজের আমূল রূপান্তরের ভাবনায় ভাবিত ছিলেন না।

       অথচ এই সমাজবিপ্লবী কাঙাল হরিনাথ সমকালে শহুরে চিন্তক, বুদ্ধিজীবী এবং আলোকপ্রাপ্ত অংশের ব্যক্তিবর্গের নিকট অনাদৃত হয়েছিলেন, তাঁদের চরম উপেক্ষার শিকার হয়েছিলেন। তাঁর কৃতবিদ্য সাহিত্যশিষ্যরা উত্তরকালে অনেক সম্মানে বিভূষিত হয়েছিলেন, সরকারি এবং অসরকারি তকমা-ভূষণে সমাদৃত হয়েছিলেন। এবং তাঁরাও তাঁদের খ্যাতি এবং সাফল্যের উত্তুঙ্গ সীমায় আরোহন করার পর  শিক্ষাগুরু হরিনাথের কথা আর সেভাবে মনে রাখেন নি। গ্রামীণ এবং শহুরে মধ্যবিত্তের শ্রেণীগত মতাদর্শিক অবস্থান এক অসম রণসজ্জায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

সহায়ক গ্রন্থ:

ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রী : রামমোহন ও ভারতীয় মধ্যযুগের সাধনা। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ।

                                                    কলকাতা। ১৩৮৯ বঙ্গাব্দ সংস্করণ

অশোক চট্টোপাধ্যায় : লালন হরিনাথ ও রবীন্দ্রনাথ। খড়ি প্রকাশনী। কলকাতা।

                                                                ২০২১ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ

অশোক চট্টোপাধ্যায় : উনিশ শতকের সামাজিক আন্দোলন কাঙাল হরিনাথ ও

                            ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’। উবুদশ। কলকাতা। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ

অশোক চট্টোপাধ্যায় : কাঙাল হরিনাথ মজুমদার জীবন সাহিত্য ও সমকাল। প্রকাশ ভবন।

                                                        কলকাতা। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ

ড. নরেন্দ্রনাথ  ভট্টাচার্য : ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস। জেনারেল পাবলিশার্স অ্যান্ড প্রিন্টার্স প্রিভেট লিমিটেড। কলকাতা। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ সংস্করণ

‘কাঙালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ’। চতুর্থ ভাগ। প্রকাশন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা। ১২৮৭ বঙ্গাব্দের (১৮৮০-১৮৮১) বৈশাখ থেকে চৈত্র একখণ্ডে বাঁধানো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *