বাম রাজনৈতিক পরিমন্ডলে নারী প্রশ্নঃ কয়েকটি অনালোচিত পরিপ্রেক্ষিত

বহ্নিহোত্রী হাজরা

ছোটবেলা থেকে দেখে, শিখে আসা রীতি-নীতি, অভ্যাস এবং মনের অবচেতনে গেঁথে যাওয়া ধারণা থেকেই আমরা আমাদের চারপাশের পরিবেশকে দেখি। বিশেষত এই উপমহাদেশে শিকড় গেঁড়ে বসা এক ব্রাহ্মণ্যবাদী-পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একজন কিশোর/কিশোরী তার ৬ থেকে ১২ বছর বয়সের বেড়ে ওঠার সময়টাতেই মনের মধ্যে গেঁথে নেয় বেশ কিছু ধারণা। জাত-পাত ভিত্তিক থাকবন্দীর ধারণা, লিঙ্গ সম্পর্কিত-লিঙ্গ ভিত্তিক ভূমিকা, কর্তব্য, শ্রমবিভাজন, সুরক্ষা, নিয়মের বেড়াজাল ইত্যাদি সমস্ত ধারণাই শিশুর অবচেতনে ধীরে ধীরে গেঁড়ে বসে। পরিবারের মা-কাকীমাদের ভূমিকা দেখতে দেখতে, পুতুল খেলতে খেলতেই একটা মেয়ে সামাজিক নির্মাণের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘নারী’ হয়ে ওঠে। ফলে একথা আজ যথেষ্ট চর্চিত যে যৌন পরিচয় আর লিঙ্গ পরিচয় ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। আজো সমাজ নারীকে মহিমান্বিত করতে চায় কেবল মা, স্বামী সহ পরিবারের শিশু-বৃদ্ধদের সেবায় নিয়োজিত দয়া-মায়া-মমতায় সর্বস্য উজাড় করে দেওয়া দেবী মূর্তি হিসেবে। এ সত্তাকেই তুলে ধরা হয় গল্প উপন্যাসে, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়, বিশেষ করে ভদ্রলোকের কৃষ্টি চর্চায়। নারীর প্রথাগত ভূমিকা থেকে নারীর সুরক্ষার বিষয়ে সমাজের এঁকে দেওয়া লক্ষ্মণরেখায় বিশ্বাস করেন অনেকেই। তাই নারীর সাথে হওয়া অন্যায়ের জন্যেও তাকেই দোষারোপ করা হয় প্রায়শই। অর্থাৎ এভাবেই তৈরি হয় “ভালো মেয়ে” আর “খারাপ মেয়ে”র সংজ্ঞা। আর স্তরবিন্যাস প্রধান এই সমাজে “ভালো” হয়ে থাকার প্রবণতা যেহেতু বেশিরভাগের, তাই তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রসমাজে পিতৃতন্ত্র নিয়ে তাত্তিক বাতেলা দিলেও, সেই অবস্থানকে চলার সংখ্যা আজও বেশি। অথচ এই উগ্র পণ্যায়নের যুগে যা যা ভোগ করা এতোদিন পর্যন্ত মেয়েদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ, ভদ্রলোক শ্রেণির মেয়েদের একাংশ সেটাকেই আর পাঁচটা পণ্যের মতো গোপনে কিনে ভোগ করার কথা ভাবলো- বাইরে “ভালো মেয়ের” সাজ বজায় রেখেই। একেই তারা নারী স্বাধীনতা নাম দিল। এই ছদ্ম নারী স্বাধীনতার ধ্বজাধারীরাই ক্ষেত্রবিশেষে প্রবল নারীবাদী আর ক্ষেত্রবিশেষে চরম পিতৃতান্ত্রিক বা উন্নাসিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো শুধু সাধারণ সমাজেই নয়, রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডের আঙিনার পরিবেশও কিন্তু ভিতর থেকে আজো এই ধ্যান ধারণাগুলো থেকে তেমন বেরোতে পারেনি। এই একবিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন পেশায় মেয়েদের উপস্থিতি বাড়লেও একটা প্রশ্ন আমাদের আজো ভাবায় যে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে এবং বিশেষত বাম রাজনীতির পরিসরে মহিলাদের সংখ্যা এত কম কেন? আর সংখ্যাগত উপস্থিতি যদি থেকেও থাকে সংগঠকের ভূমিকায় বা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ভূমিকায় মহিলারা আজো কেন উঠে আসতে পারল না?বাধা কোথায়? আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি নারী দিবসে নারীমুক্তির প্রশ্নে, নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি বলেই মনে হয়।

আমার রাজনৈতিক কর্মী জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পাওয়া কয়েকটা বাস্তব ছবি তুলে ধরলে হয়তো আমরা সমস্যাটা আরেকটু গভীরে গিয়ে বুঝতে পারবো। রাজনীতির এই পরিসরে নেতৃত্বকারী কমরেডদের অনেকেই আজো প্রকাশ্যেই ‘গার্হস্থ্য শ্রম বা মেয়েদের প্রথাগত ভূমিকা ভাঙা নিয়ে চর্চা বা নারী প্রশ্নে ক্লারা জেটকিন, আলেকজান্দ্রা কোলনতাইদের নিয়ে চর্চা প্রসঙ্গে বলেন- এসবের এখন প্রয়োজন কী? এসব নিয়ে চর্চা আমাদের শ্রেণী সংগ্রামের বিষয়ে থেকে বিচ্যুত করবে।” যারা একথা বলে তারা বুঝতে পারে না যে, এই সমস্ত সংগ্রামই সামগ্রিক শ্রেণী সংগ্রামের অংশ। শ্রেণী সংগ্রামকে প্রায়শই ভুলভাবেই কেবল অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখা হয়; অথচ বাস্তবে, এটি শ্রেণী সংগ্রামের একটি মাত্র দিক। শ্রেণী সংগ্রামের অঙ্গ আসলে সমস্ত ধরনের নিপীড়নকে উচ্ছেদ করার লড়াই- তা পিতৃতান্ত্রিক, বর্ণ-জাতপাত ভিত্তিক, ধর্মীয় ইত্যাদি সবকিছুই। আরেকজন পুরুষ কমরেড বলেন- “নারী স্বাধীনতা খণ্ড স্বাধীনতা, ফলে বিপ্লবের পরে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে।” নারী-পুরুষ সম্পর্ক নিয়ে এতোটাই ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা এই পরিমন্ডলে যে, এক পুরুষ কমিউনিস্ট নেতা প্রায় হিন্দুত্ববাদীদের কায়দায় নারী কমরেডের ওপর নীতি পুলিশগিরি করে তার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় বা সে কোনও অন্য সম্পর্কে গেলে।  এদের  অনেকের বাড়িতে গেলেই দেখা যায় চা-জলখাবার বানানো থেকে শুরু করে জলের গ্লাস পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া সবটাই অবলীলায় করেন তাঁদের স্ত্রী। অনেকে এটাকে কোনও সমস্যা হিসেবেই দেখেন না বরং এই লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজনকে নিতান্ত স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ বলে মনে করেন। অনেকে দীর্ঘদিন একসঙ্গে একই সংগঠনে কাজ করার পরেও একজন মহিলার পরিচয় দেন কারোর স্ত্রী বা প্রেমিকা হিসেবে। শিক্ষিত, সচেতন বা বুদ্ধিজীবী অংশের মানুষও নারীকে একজন আলাদা ব্যক্তিত্ব হিসেবে মূল্যায়ন করতে অভ্যস্থ নয়, পুরুষের অনুষঙ্গ হিসেবেই দেখে। অনেকেই মনে করেন একজন নারী কর্মীর আলাদা কোনও মতামত থাক্তেই পারেনা, তাই তার পুরুষ বন্ধুর অনুসঙ্গ হিসাবেই তার সব ভূমিকা বা মতামত বিচার হতে থাকে। পরিবারের প্রশ্নে ভয়ানক ট্রাডিশানাল এই রাজনৈতিক পরিসর। প্রেমের সম্পর্ক ভাঙা গড়াকে এই শিবিরের অনেকেই অত্যন্ত খারাপ চোখে দেখে এবং ব্যক্তিমালিকানার সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবারকে রাষ্ট্রের ইউনিট হিসেবে দেখার বদলে “পারিবারিক জীবনে থিতু হওয়াকে” ভালো হওয়া বা প্রকৃত কমিউনিস্ট জীবনযাপনে ফিরে আসা বলে সার্টিফিকেট দেয়। এ সব বিষয়ে প্রতিদিনের সংগ্রাম করার কথা বললেই খণ্ড স্বাধীনতার চর্চা বলে নাকচ করা হয় বলেই, এটা আজ জোরের সাথেই বলা দরকার, রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্ছেদের লড়াই ছাড়া সম্পূর্ণভাবে নারী মুক্তি সম্ভব নয় একথা যেমন সত্যি, তেমনই প্রতিদিনের আভ্যন্তরীণ লড়াই লড়ে ব্রাহ্মণ্যবাদকে নিজেদের ভিতর থেকে নির্মূল করার লড়াই তার পাশাপাশি চালানোর প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তুমি আসলে দ্বিচারিতা করছ। এই পরিবেশেই আবার অনেক পুরুষদের মধ্যে ছোট থেকেই গড়ে ওঠে যৌনতার বিষয়ে সামন্ততান্ত্রিক বিকৃত পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। নারীরা অনেকসময় তার কমরেডদের দ্বারাও অত্যাচারিত, নির্যাতিত এবং লাঞ্ছিত হয়, শারীরিক এবং মানসিকভাবেও। অনেক ক্ষেত্রেই এই ঘটনাগুলির ঘটে যাবার পর দীর্ঘদিন কেটে গেলেও কোনও বিচার পায় না মেয়েরা। সংগঠনগুলো উপযোগিতার নিরিখে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করে এবং পুরুষ কর্মীকেই (বিশেষত যদি নেতা হয়) প্রাধান্য দেয় এবং অভিযোগকারীকেঅন্যায় মেনে নিতে শেখায়। ছকভাঙা জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র জীবনে যে যুবতীরা এই গণ আন্দোলনের ময়দানে ঘোরাফেরা শুরু করে, তারা যখন দেখে সমাজেরই দেখানো পথে তাদের অন্যায়কে মেনে নিতে শেখানো হচ্ছে, তখন সমস্ত বাঁধ ভেঙে উপচে পড়ে এক রাশ ঘৃণা। বিদ্রোহী মেয়েরাও কয়েক বছরের মধ্যে এই রাজনীতির আঙিনা ছেড়ে চলে যায় এক রাশ হতাশা নিয়ে। আরেকটা চিত্র প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এই পরিমন্ডলে। ছাত্রী থাকাকালীন অগ্রণী কর্মী বিয়ের পর একেবারে পিছনের সারিতে চলে যাচ্ছে, বা একেবারে গৃহবধু হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা এবং সংসার সামলানোকেই প্রাথমিক কর্তব্য বলে সেও মেনে নিচ্ছে। তাদের সেদিকে ঠেলে দেওয়াও হয় সেইদিকে। এর পরেও যারা কাজেকর্মে টিকে থাকে, তাদেরকে‘অরাজনৈতিক’ করে রাখার চেষ্টাও চালিয়ে যাওয়া হতে থাকে নেতাদের বশংবদ করে রাখার জন্য। অর্থাৎ রাজনীতিকরণ করার কোনও সদর্থক পদক্ষেপ প্রায়শই দেখা যায় না। কখনও কখনও অনেক মহিলা কর্মী তার স্বাভাবিকতায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সভায় বা ঘরোয়া বৈঠকে চা করার দায়িত্ব নিয়ে থাকে নিয়মিত। কিন্তু সমাজ যে তার ঐ ভুমিকাকেই স্বাভাবিক ভাবতে শিখিয়েছে তা তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় না। ফলে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়ে তার আর মনোনিবেশ করাই হয়ে ওঠেনা। রাজনৈতিক-তাত্তিক বিতর্ক এবং চর্চা এই পরিমণ্ডলের অনেকটা জুড়ে রয়েছে। নারী কর্মীরা যদি বৌদ্ধিক চর্চার প্রতি আলস্য দেখায় অনীহা বোধ করে এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের অভ্যেস তৈরি করে তাহলে তার বিকাশ হওয়া খুব মুশকিল। এই বিষয়ে সামাজিক পরিবেশের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তার নিজেরও সেক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। অনেকেই স্বেচ্ছায় ঐ “ভালো” প্রেমিকার ভূমিকা বেছে নেয়। বাস্তবের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় এই সমস্ত ফ্যাক্টরই হয়তো কাজ করছে বাম রাজনীতিতে মেয়েদের অনুপস্থিতির কিংবা খণ্ড উপস্থিতির পিছনে, তবু ঐতিহাসিকভাবেও এর কারণ খোঁজা জরুরি।

প্রথমত বাংলার ইতিহাসে অগ্নিগর্ভ সংগ্রাম এবং আন্দোলনগুলো জনমানসে কিছুটা হলেও ছাপ রেখে গেছে। তার সদর্থক এবং নঞর্থক প্রভাব- দুইই রয়েছে সমাজে। লিঙ্গ রাজনীতি, লিঙ্গ প্রশ্নকে কিভাবে দেখব- এই বিষয়েও নির্দিষ্ট কিছু ছাপ রেখে গেছে এই আন্দোলনগুলো। আত্মত্যাগ, বিপ্লবী মতাদর্শের প্রতি আবেগ, রোমান্টিকতা এবং সম্মান এই আন্দোলনগুলো যেমন তৈরি করেছে জনমানসে, সেই সঙ্গে শীলমোহর দিয়েছে নারীদের প্রথাগত ভূমিকা সম্পর্কে চিরায়ত ব্রাহ্মণ্যবাদী কিছু ধারণাতেও। একদিকে প্রকাশ্যে বা আন্দোলনের সামনের সারিতে মহিলাদের অনুপস্থিতি লক্ষ্যণীয়, অপরদিকে আড়ালে থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন হাজারে হাজারে মহিলা- অন্তত এই বাংলায়। আশ্রয় দেওয়া, রান্না করে শয়ে শয়ে কর্মীদের খাওয়ানো বা গোপনে কিছু ক্যুরিয়ারের কাজ করে দেওয়া মহিলার সংখ্যা নেহাত কম নয়। এখন প্রশ্ন হল কবে থেকে মহিলাদের এই ভূমিকা নির্ধারিত হলো? আমরা যদি খেয়াল করি অগ্নিযুগে যে নারীদের অবদানের কথা আমরা পড়ি তাঁদের বেশিরভাগের ভুমিকাও ঠিক এমনই ছিল। প্রীতিলতা-কল্পনাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল সংগঠনের নেতৃত্বকে বুঝিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের ধারায় প্রত্যক্ষ কাজে জায়গা পেতে। এর ধারাবাহিকতা দেখা যায় নকশালবাড়ি আন্দোলনেও। নকশালবাড়ির গ্রামের কৃষক রমণীদের এগিয়ে থাকা ভূমিকার কথা মাথায় রেখেও বলছি, শহরে ছবিটা কিন্তু একেবারেই উল্টো। তাই তো আজও দেখি অরাজনৈতিক প্রেমিকার ভূমিকাকে রোমান্টিসাইজ করা হয় কালজয়ী উপন্যাসে। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সাহায্যকারী “গৃহিণীদের” নীরবে করে যাওয়া অক্লান্ত পরিশ্রম আর আত্মত্যাগকে আজ ছাপার অক্ষরে আনতে হয়। বিস্মৃতির আড়ালে তা চাপা থাকবেই বা কেন? কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও বলা দরকার এই আড়ালে থাকা ভূমিকা আর কতদিন গ্লোরিফাই করে যাব আমরা? সেই ভূমিকাকে আদর্শায়িত করার চেষ্টা মেয়েদেরকে সেই ভূমিকাতেই বেঁধে রাখবার মানসিকতার প্রচার ছাড়া আর কী!তাদের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে নিয়ে আসার চেষ্টা কি আদৌ করা হয়েছিল? শত শত ছাত্র-যুব শহিদের নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে একজনও ছাত্রীর নাম খুঁজে পাইনা তো! তারা কি আড়ালেই থেকে গেছে তাহলে? এই প্রশ্নগুলো আমরা তুলবোকবে থেকে?এই ভূমিকাগুলোকে মহিমান্বিত করার মধ্যে দিয়ে আজকের মেয়েদেরকেও সেই “ভালো” প্রেমিকা বা আদর্শ গৃহিণী হওয়ার পাঠই আমরা দিচ্ছি না তো?

এই প্রসঙ্গে শহরের ভদ্রলোক পরিমন্ডল আর গ্রামে-গঞ্জে ভদ্রলোক সমাজের বাইরের ছবিটা বেশ আলাদা বলেই মনে হয়। ৭০-এর নকশালবাড়ি গ্রামের ছবি শুধু নয়, পরবর্তী পর্যায়ে উচ্ছেদ বিরোধী, কর্পোরেট বিরোধী – SEZ বিরোধী আন্দোলন, লালগড়ের পুলিশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জন আন্দোলন এমনকি মহল্লায় মহল্লায় সাম্প্রতিকের এন আর সি বিরোধী আন্দোলন (যদিও গ্রামের থেকে এই আন্দোলনে থাকা মহিলাদের ভূমিকা খানিকটা আলাদা)- প্রতিটা ক্ষেত্রেই মেয়েদের দেখা গেছে সামনের সারিতে। তাদের মধ্যে অনেকেই রাজনীতিতে থেকে গেছেন, অনেকে ফিরে গেছেন গৃহস্থালীতে। কেন আরও বেশি সংখ্যায় সেখানে মহিলাদের ধরে রাখা যায়নি তা আরও গভীর পর্যালোচনার দাবী রাখে যা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। এখন আমরা মূলত আলোচনা করছি সেই মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক গণ আন্দোলনের পরিসর নিয়ে, যেখানে আজও একচেটিয়া ভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভদ্রলোক পুরুষরাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের স্ত্রীরা রাজনীতি থেকে যোজন যোজন দূরে  ঘরের মধ্যে আবদ্ধ বা সংসারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব সামলাতে ব্যস্ত। বাংলায় এই ভদ্রলোক বাবু সম্প্রদায় ব্রাহ্মণ্যবাদ আর ভিক্টোরিয়ান মরালিটির সংমিশ্রণে সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই মেয়েদের জীবনে চাপিয়ে রেখেছে এক অদ্ভুত লক্ষ্মণরেখা।

এদিকে ভদ্রলোক সমাজের সবচেয়ে এলিট একটি অংশের মধ্যে (মূলত একাডেমিক পরিসরে) নানা ধারার নারীবাদ নিয়ে চর্চা হয়। এখানে এক শ্রেণীর নারীর প্রাধান্য দিন দিন বাড়ছে, যারা লিঙ্গ বৈষম্য সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হলেও মেয়েদের সক্রিয় রাজনৈতিক/সামাজিক ভূমিকা রাখার দিকে ঠেলার বদলে বরং রাজনীতি বিমুখীনতার পাঠ দেয়। এরা selective feminism-এর চর্চা করে। তাদের “নির্ভয়া” ধর্ষণ কান্ডে রাস্তায় দেখা গেলেও অদ্ভুত নীরবতা দেখা যায় বিলকিস বানু বা হাথরাসের দলিত মেয়েটির ধর্ষণের পর। এরা সাংস্কৃতিক নারীবাদের প্রচার করে, যা প্রকারান্তরে “মেয়ে”দের রক্ষণশীল সামাজিক সংজ্ঞাকে মেনে নিয়ে যেকোনো জঙ্গি আন্দোলনের বিরোধিতা করে। জঙ্গি আন্দোলনকে দেখানো হয় উগ্র পৌরুষের বহিঃপ্রকাশ বলে। এভাবে তারা মেয়েদের আন্দোলনের ময়দান থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। এরাই “মি টু” আন্দোলনকে এক চরম দিকে নিয়ে যায়, যেখানে সংবেদনশীলভাবে মেয়েটির অভিযোগ গ্রহণ করে বিচারপ্রক্রিয়া নেওয়া এবং অভিযোগকারিণীর দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়াটা মুখ্য হয়ে ওঠে না, বরং বিচার প্রক্রিয়ার কষ্ট সাধ্য পদ্ধতি এড়িয়ে সামাজিক বয়কটের মতো খাপ পঞ্চায়েতি প্রথাকে নারীবাদের নামে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই শ্রেণীর বুর্জোয়া নারীবাদীরা নারী মুক্তির প্রশ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাবার বদলে ছাত্র-ছাত্রীদের করে তুলছে আন্দোলন বিমুখ এবং নারীবাদকে করে তুলছে বিমূর্ত একাডেমিক চর্চার বিষয়।

কিন্তু এত কিছুর পরেও সবটাই তো আর অন্ধকার নয়। আমাদের সামনে ব্যাতিক্রমী কিছু উদাহরণও তো রয়েছে। আমাদের দেশে অনুরাধা গান্ধীর মতো রাজনৈতিক কর্মী এবং তাত্তিক রয়েছেন যার জীবন থেকে সরল, স্বাভাবিক অথচ লক্ষ্যে অবিচল দৃঢ় ব্যক্তিত্ব মেয়েদের আজো অনুপ্রাণিত করে। আমাদের সামনে রয়েছে ১৯৩০-এর দশকে বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার অভিজ্ঞতা এবং ক্লারা জেটকিন, কোলনতাই, রোজা লুক্সেমবার্গদের মতো তাত্তিক যারা নারীপ্রশ্নে, নতুন সমাজের নৈতিকতা, মুক্ত স্বাধীন ভালোবাসার কথা, পরিবার থেকে বেরিয়ে কমিউন জীবনযাপনের কথা তুলে ধরেছেন তাঁদের লেখাপত্রে। সেই সব ঐতিহাসিক চর্চা এবং আমাদের দেশের আন্দোলনের থেকে উঠে আসা শিক্ষাকে পাথেয় করে সক্রিয় আন্দোলনে-অধিকার অর্জনের সংগ্রামে নারীর আরও ব্যাপক অংশগ্রহণের  প্রশ্নে, নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রশ্নে ভাবতে হবে, চর্চা করতে হবে। আমাদের প্রতি পদে পদে ভাঙতে হবে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী পরিবেশকে যা কায়িক শ্রমকে ছোট করে, উচ্চবর্ণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব, নারীর ওপর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বকে মান্যতা দেয়। পারিবারিক প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে মুক্ত স্বাধীন চিন্তা, খোলামেলা আদান প্রদান, পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সরল স্বাভাবিক সম্পর্ককে সুনিশ্চিত করে এমন কমিউন জীবনযাপনের দিকে এগোতে হবে, যা নারী কর্মীদের এগিয়ে আসতে আরও বেশি উৎসাহিত করতে পারে।

4 Comments

  1. সঠিক বার্তা দিয়েছেন লেখিকা। একেবারে ই মূল কারণ গুলো তুলে ধরেছেন। যতক্ষণ নতুন চিন্তা ভাবনা করে পুরোনো ব্যবস্থা ত্যাগ দ্বারা
    খোলনলচে পাল্টে ফেলা যাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত সেই ফিউডালিস্টিক পদ্ধতি নিয়ে ই সমাজ চলবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
    আদিম জন জাতি সমাজ জীবনের কিন্তু নারীদের আলাদা চিন্তা ভাবনা করার জায়গা দেওয়া হয়। হয়তো তাদের থেকে ও তথাকথিত
    মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পুরুষদের কিছু কিছু শিক্ষা গ্রহণ করার দরকার আছে।

    1. Bonhihotri Hazra says:

      অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য। আপনি যথাযথ বলেছেন আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে আদিম জন জাতি জীবন থেকে, প্রতিদিন নিজেদের পরিবর্তন করে নিজেদের খোলনোলচে পাল্টানো দরকার।

  2. ভাস্কর চক্রবর্তী says:

    পরিবার হোলো রাষ্ট্রের একটি একক। তাই পরিবারের সব বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দেখা যায়। দ্বন্দ্ব সমেত।
    পরিবার থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে, রাষ্ট্রীয় প্রভাব থেকে মুক্তির কথা ভাবা যেতে পারে, সংসদীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবা যেতে পারে। ব্যক্তিগত স্তরে।
    যে পরিমানে পরিবারের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা যায় সেই পরিমানেই রাষ্ট্রীয় প্রভাব থেকেও বেরিয়ে আসা যায়।
    তবে এই কাজ ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত দুইভাবেই বেশ কঠিন।

  3. Bonhihotri Hazra says:

    অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য। হ্যাঁ, সত্যিই এই কাজ কঠিন। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এ ছাড়া কোনও বিকল্পও হয়ত নেই।

Leave a Reply to Bonhihotri Hazra Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *