রক্তিম ঘোষ
১
প্রায় চার বছর হয়ে গেল কংগ্রেস কোনও বড় জমায়েত করেনি কলকাতায়। সেই শেষবার হয়েছিল ৪২-এর গোড়ায়। তারপর বহুদিন কেটে গেছে। কংগ্রেস নিষিদ্ধ হয়েছে। এতদিন বাদে ব্রিটিশ সরকার তুলে নিয়েছে সেই নিষেধাজ্ঞা। অতঃপর জমায়েতের সিদ্ধান্ত, তাই প্রায় এক লক্ষ মানুষ এসে সামিল হয়েছেন এই অনুষ্ঠানে। আকারে খুব বড় নয় জায়গাটা। মধ্য কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্ক। তাতে একেবারে ঠাসাঠাসি গাদাগাদি অবস্থা আর কী! হবে নাই বা কেন। দিনটা হল ‘আজাদ হিন্দ দিবস’। ৫ নভেম্বর ১৯৪৫।
আজাদ হিন্দ দিবস। না নির্দিষ্ট কোনও দিন নয়। ওই বাৎসরিক পূজা অর্চনার মতন কোনও দিন তো একেবারেই নয়। ১৯৪৫ সালে এই দিনটা পালন করা হয়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচারাধীন বন্দিদের মুক্তির দাবিতে। সারা দেশে ঠিক একই দিনে নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন দিনে। আবার একই জায়গায় একাধিক দিনে। মোদ্দা বিষয় হল নিঃশর্ত বন্দি মুক্তি।
একে পার্ক জুড়ে প্রচন্ড ভিড়, তার উপর বিশাল এক মঞ্চ বানানো হয়েছে। মঞ্চের ডায়াসের ঠিক সামনে সাজানো রয়েছে সুভাষচন্দ্র বোসের বিরাট এক প্রতিকৃতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কংগ্রেস যদিও সুভাষ বোসের আজাদ হিন্দ বানানোর বিষয় নিয়ে প্রসন্ন ছিল না, কিন্তু এইদিনের অনুষ্ঠানে সেই অপ্রসন্নতার কোনও আভাস নেই। বরং এই দিন অনুষ্ঠান সফল করতে হাজির হয়েছেন গণ্যমান্য নেতৃবৃন্দ। সেন্ট্রাল প্রভিন্স থেকে এসেছেন পন্ডিত রামশংকর শুক্লা। সমাবেশের সূচনা হল বন্দেমাতরম গান গেয়ে। গান চলাকালীনই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন খোদ বাংলার তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি শ্রী সুরেন্দ্রনাথ ঘোষ। এরপর গাওয়া হল ‘জন-গণ-মন অধিনায়ক…’। মঞ্চে এলেন আই.এন.এ. রিলিফ ফান্ড কমিটির সম্পাদক শ্রী অমিয় বোস। সকলের কাছে তিনি আবেদন রাখলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের মুক্তির জন্য ১, উডবার্ন পার্কের ঠিকানায় সাহায্য পাঠানোর। এর মধ্যেই বেজে উঠল আজাদ হিন্দ বাহিনীর যুদ্ধসংগীত।
সভার মুখ্য এবং একমাত্র বক্তা ছিলেন সৈয়দ নৌসের আলি। তিনি ছিলেন বাংলা কৃষক প্রজা পার্টির সম্পাদক। আরও বিষদ পরিচয় বললে বলতে হয়, তিনি ছিলেন বাংলা প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য, ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত। তার উপর তিনি আবার ১৯৩৭-৩৯ পর্যন্ত বাংলা প্রাদেশিক আইনসভার স্পিকারও ছিলেন।
তো সেই বিরাট জনসভায় তিনি রীতিমতো হুমকির সুরে ঘোষণা করেন, ‘Touch a hair of the head of a single member of the Azad Hind Fauj and you commit an act of sacrilege which India will never forgive or forget’.
কিন্তু শুধু হুমকি দিয়েছেন বলে আজাদ হিন্দ দিবস-এ তাঁর ভাষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এমনটা নয়। ৭ নভেম্বরের অমৃতবাজার পত্রিকার পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাবো আজাদ হিন্দ ফৌজ-এর শিক্ষা থেকে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রশ্ন কেমন করে আবির্ভূত হয়েছিল ভারতীয় রাজনীতির মূল আঙিনায়। শুধু সাম্প্রদায়িকতাই নয়, উঠে এসেছিল লিঙ্গ বৈষম্য এবং জাতিবৈষম্যের মতন বিষয়গুলির প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আর নভেম্বর ৪৫’-এর কলকাতার লক্ষ মানুষ সেই নতুন চেতনাকে কীভাবে বিপুল উৎসাহে আপন করে নিয়েছিলেন—
‘The Azad Hind Fauj have already paved the way for national unity and have practically killed the demon of communalism. Hindus, Moslems, Sikhs and persons professing other religions composed the Azad Hind Fauj. They never thought, felt, talked or acted in terms of sects or communities. They ate together in the same mess, fought together and died together banishing all prejudices of caste, creed or colour. The rank and file, the officers and the Commander- in-Chief Subhas Bose ate the same food and ate it together. The brave daughters of India formed the Rani of Jhanshi Brigade under Captian Lakshmi. Thus the valiant children of India of both sexes and of all creeds formed themselves into an Indian army of independence for the emancipation of India from bondage. We may remember in this connection the desire of the officers awaiting trial that they would not accept any assistance from any communal organisation’.
The Azad Hind Fauj’, the speaker said, ‘was one army under one leadership for the liberation of India as a whole without any other consideration whatsoever. Hindustan or Pakistan never occurred to them and the vision of the Azad Hind Fauj will be an eye-opener to those sections of the Indian people who still have got the slightest trace of communalism in them. The days of religious wars are gone; nobody now jumps at the throat of another simply for his religion, and communalism exists nowhere in the world except where a third party stirs it up and keeps it alive in its own interest. It is bound to disappear with the attainment of independence and this has been amply demonstrated by the Azad Hind Fauj (Loud Cheers)’.১
নভেম্বর ৪৫-এর কল্পনায় আগস্ট ৪৬ ছিল না তার মানে? মনের কথা তো মনই জানে… তবে থেকে থাকলেও লুকিয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। হায়নার মতো রক্তের তেষ্টা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বার অপেক্ষায়।
২
২১ নভেম্বর : অমৃতবাজার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে এমন দৃশ্য কলকাতা আর দেখেনি। নিছিকই ছিল শান্তির সময়। হঠাৎ কোথা থেকে কী একটা হয়ে গেল। কলকাতার রাস্তায় ছাত্র-পুলিশ প্রবল সংঘর্ষ। কিন্তু এটুকু বললে যে বলা হয় না কিছুই। কারণ সেইদিন রাতে গোটা কলকাতা কনকনে ঠাণ্ডার একটা রাত কাটিয়ে ছিল খোলা আকাশের তলায়। না তেমন কোনও প্রস্তুতি ছিল না। গরম জামাকাপড় কিচ্ছু না। নিছক রক্তস্নান বললে তাই মিথ্যে বলা হয়।
ছাত্রদের মিছিলটা শুরু হয়েছিল ওয়েলিংটন স্কোয়ার থেকে। এখন অবশ্য সেটা রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার নামে পরিচিত। সেখান থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত দিব্যি এগিয়েছিল মিছিল, কোথাও কোনও বাধা পায়নি। হঠাৎই ধর্মতলা স্ট্রিট আর মদন স্ট্রিটের সংযোগ স্থলে মিছিল আটকাল পুলিশ। ডালহৌসি স্কোয়ারের দিকে যেতে দেবে না মিছিলটাকে অর্থাৎ আজকের বিবাদী বাগে।
ছাত্ররা শান্তভাবে বসে পড়লেন সেখানেই। রাস্তার উপর। স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ হয়ে গেল যান চলাচল। পুলিশের ডেপুটি কমিশনার এগিয়ে এলেন ছাত্রদের দিকে। এভাবে রাস্তা আটকে বসে থাকলে ছাত্রদের দেশের লোকের ক্ষতি হয়ে যাবে সেটা কি ছাত্ররা ভুলে গেছেন? খোলাখুলি স্বীকার করে নেওয়া যে এদেশ ছাত্রদের আর ডেপুটি পুলিশ কমিশনার ভিনদেশী হয়েও মানে ওই আর কী শুভাকাঙ্ক্ষী… যেমন হয়। ছাত্ররা স্পষ্ট জবাব দিলেন, রাস্তা বন্ধ হওয়ার দায় তাঁদের তো নয়! তাঁদের যেতে দিলেই হয়। তাঁরা তো মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতেই চান। খামোকা রাস্তা আটকে হুজ্জুত তো পাকাচ্ছে পুলিশই।
অনেকক্ষণ তারপর চলল ধৈর্য ধরার খেলা। কে কার চেয়ে বেশি স্থৈর্যশীল—ছাত্ররা নাকি পুলিশ! এদিকে বেলা বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে অফিস ফেরতা জনতার ভিড়। তাঁরা বাড়ি যাচ্ছিলেন পায়ে হেঁটে। ছাত্রদের দেখে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। খবর পেয়ে হাজারে হাজার সাধারণ মানুষও পৌঁছেছেন ধর্মতলায়। অবশেষে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল পুলিশের। সন্ধ্যে ছটা নাগাদ শুরু হল তাঁদের সাধারণ মানুশের থেকে ছাত্রদের আলাদা করবার চেষ্টা। লম্বালম্বি একটা ফাটল ধরাতে পারলেন তাঁরা। মাঝখানে পুলিশ। একদিকে ছাত্র আর আর এক দিকে সাধারণ জনতা। সন্ধ্যে ৬ টা ৫০-এর দিকে ছাত্ররা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য চেষ্টা শুরু করেন। ৬ টা ৫৫ নাগাদ প্রবল ধাক্কা এসে আছড়ে পড়ে পুলিশের ব্যারিকেডে। সঙ্গে সঙ্গে বেধে যায় খণ্ড যুদ্ধ। পুলিশ একদিকে লাঠিচার্জ শুরু করে দেয় ছাত্রদের উপর। কিন্তু সংখ্যায় অনেক বেশি ছিলেন ছাত্ররা। তাই শুধু সামনের সারির ছাত্ররাই সেই লাঠিচার্জের শিকার হন প্রথমে। পিছনের ছাত্ররা এবং সাধারণ মানুষ তখনও বুঝতে পারেননি লাঠিচার্জের ব্যাপারটা। এর খানিক বাদেই সমবেত জনতা এবং ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে মাউন্টেড পুলিশ। ছাত্ররা নয় কিন্তু সাধারণ মানুষ দূর থেকে পাথর আর ইট ছুঁড়তে শুরু করে দেন পুলিশের উপর।
লাঠিচার্জ তীব্র হয়। নির্মমতা বাড়ে। রক্তাক্ত হতে থাকেন ছাত্ররা। ইট বর্ষণও চলতে থাকে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যান ছাত্ররা এবং জনতা। জায়গার দখল প্রায় পুলিশের হাতে চলে আসে। তারপরও ঠিক সন্ধ্যে ৭ টা ১০-এ গুলি চালাতে শুরু করে পুলিশ। কয়েক মিনিট একটানা নির্বিচার গুলিবর্ষণ চলে।
সেইদিনের লাঠিচার্জ এবং গুলিবর্ষণে মোট ৬১ জন আহত এবং ২ জন নিহত হন। ১০ বছর বয়স্ক এক বালক গুলিতে প্রাণ হারায়। ক্যালকাটা টেকনিক্যাল স্কুলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র রামেশ্বর ব্যানার্জির খুলিতে এসে গুলি লাগে। হাসপাতালে যাওয়ার পথেই সব শেষ। আহতদেরকে সাধারণ মানুষ এবং ছাত্ররা ধরাধরি করে নিউ সিনেমার উল্টোদিকের একটা বাড়িতে ঢুকিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা চালু করে দেন।
কিন্তু গুলি চালানোর ফল হল হিতে বিপরীত। জনতা পালিয়ে যাওয়ার বদলে এবার রুখে দাড়ালেন। ইট আর পাথর বর্ষণের তীব্রতা এবার তীব্রতর হয়ে উঠল। পুলিশরা সেই আঘাত থেকে বাঁচতে পারল না। অনেকে আহত হল তো বটেই, বাকিরা রীতিমতো ছুটে পালাতে বাধ্য হল। গাড়ি-ট্রাক সব জনতার দয়ায় ফেলে এক্কেবারে হাওয়া। মদন স্ট্রিটের মোরে প্রথম পুলিশের ট্রাকটায় আগুন লাগানো হল। ততক্ষণে ছাত্র-জনতা মিলেমিশে গেছেন এক ব্যারিকেডে।
তেতে ওঠা জনতার সামনে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে এক পুলিশ কনস্টেবল পরলেন জনতার পাল্লায়। একটা মারও ফেলা যায় না। পাগড়ীটা অব্দি উপড়ে নেওয়া হল। অবশেষে এক ছাত্রনেতার চেষ্টায় প্রাণ রক্ষা পেল কনস্টেবলের। জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে তাকে পালাতে দেওয়া হল। মোট আহত ১২ জন পুলিশ।
এদিকে গুলি চালাচালি শেষ হতেই কংগ্রেসের এক বিধায়ক এসে উপস্থিত। তাঁর নাম শ্রীমান গোবিন্দ ভৌমিক। তিনি ছাত্রদের শান্ত হবার উপদেশ দিলেন। তাঁদের বললেন, ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে। আসলে ছাত্ররা ঠিক কংগ্রেসের নির্দেশিকা মেনে প্রতিরোধ করছিলেন না। তাই… কিন্তু শ্লোগানিং আর সমবেত গানের আওয়াজে, তাঁর আবেদন যে কোথায় ভেসে গেল ঠিক নেই। আদৌ কেউ শুনতে পেয়েছিল কিনা জানা নেই। এরপর অবশ্য আর এক কংগ্রেস নেতা যশোদা ভট্টাচার্য এসেও ছাত্রদের শান্তি বজায় রাখতে অনুরোধ করেন।
গুলি চলবার পরে অবশ্য প্রথমসারির মান্যগণ্য রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যক্তিরাও এসে হাজির হয়েছিলেন। কিরণ শঙ্কর রায়, ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার ডক্টর রাধাবিনোদ পাল প্রমুখ। শরৎ চন্দ্র বসু তথা সুভাষ চন্দ্র বসুর ভাই সুনীল বসু ধর্মতলায় এসে ছাত্রদের ফিরে যাবার অনুরোধ জানান। ছাত্ররা সসম্ভ্রমে সকলকেই প্রত্যাখ্যান করেন।
বাংলার গভর্নর পর্যন্ত এসে হাজির হন ছাত্রদের কাছে। তিনি তাঁদেরকে মিছিল ভাঙবার অনুরোধ জানান। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আবার তাঁর কাছে পালটা অনুরোধ করেন মিছিল কার্জন পার্ক অব্দি যেতে দিতে। বলা বাহুল্য দুটি অনুরোধই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
অবশেষে রাত ২ টো নাগাদ প্রশাসন প্রস্তাব দেয়, চারজন করে ছাত্র শৃংখলা মেনে এগোলে, তাঁদের ডালহৌসি স্কোয়ারের দিকে এগোতে দেওয়া হবে। ছাত্ররা বললেন, ৪ নয়, সংখ্যাটা ৮ করতে হবে। পুলিশ আবার সেটা মানতে নারাজ। অনেক দর কষাকষির পরও পৌঁছন গেল না কোনও সমাধান সূত্রে।
অগত্যা নভেম্বরের সেই শীতের রাতটা ছাত্ররা আর তাঁদের ঘিরে সাধারণ মানুষ কাটালেন ধর্মতলার রাস্তাতেই। গান গাইলেন তাঁরা। “জন-গণ-মন-অধিনায়ক” আর “কদম কদম বাড়ায়ে যা”…। কাগজ ইত্যাদি দাহ্য জিনিস জড়ো করে জ্বালানো হল আগুন। ক্যাম্প ফায়ার।
ভোর সাড়ে চারটের সময় সমস্ত আওয়াজ হঠাৎই থেমে গেল। আহত এবং শহীদদের উদ্দেশ্যে এক মিনিটের নীরবতা পালন করলেন ছাত্র এবং সমবেত জনতা। ২২ নভেম্বরের ভোর সাক্ষী থাকল এই শহীদ স্মরণ অনুষ্ঠানের। বলতে ভুলেছি, ২১ নভেম্বরও কিন্তু কলকাতায় ‘আজাদ হিন্দ দিবস’ পালন করা হচ্ছিল।২
৩
২২ নভেম্বর : অমৃতবাজার
সকালবেলা আস্তে আস্তে রাত জেগে পথে বসে থাকা ছাত্র এবং জনতা ফিরে যান। নিজে থেকেই। কিন্তু সেটা পুলিশের সঙ্গে জেদাজেদিতে পরাজয় মেনে নেওয়া মোটেই নয়। আবারও ফিরে আসেন তাঁরা। অনেক অনেক গুণ বেশি সংখ্যায়। এবার আসেন বিজয়ীর বেশে। সেই কথাই বলবো এখন।
২২ তারিখ দুপুর সাড়ে ১২ টায় ওয়েলিংটন স্কোয়ারে আবার জমায়েত। এবার জনসমাবেশ আরও বিপুল। প্রায় দুই লক্ষ মানুষ। কংগ্রেস-মুসলিম লীগ-কমিউনিস্ট পার্টি-হিন্দু মহাসভা-খাকসার সক্কলে হাজির। দূর থেকে মনে হচ্ছিল লক্ষ মানুষের ভিড়ে হাজার হাজার রঙ—রঙিন পতাকার সমাবেশ। সমস্ত পতাকা আজ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ।
দেখা গেল বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা সেইভাবে কোনও প্রস্তুতি নেননি এইদিনের সমাবেশের। সভাস্থলে কোনও মাইক্রোফোনের ব্যবস্থাও ছিল না। মঞ্চের কয়েক হাত দূর পর্যন্ত খালি গলার বক্তব্য যতটা শোনা যায় ততটুকুই ছিল সম্বল। তায় আবার লাখো মানুষের ভিড়। সেই পরিস্থিতিতেই বক্তব্য রাখলেন জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী। তারপর ভাষণ দিতে এলেন বাংলার সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর সহযোদ্ধা এবং দাদা শরৎ চন্দ্র বসু। তাঁর বক্তব্য কেমন একটা মিছিলের স্পিরিটের মধ্যে খাপছাড়া শোনালো। তিনি বললেন,
‘I know that some mischief-makers were at work yesterday and they were anxious to bring about a clash between students and the police and they succeeded to some extent. I know some of them are still at work today. You must not allow those mischief- makers to repeat last night’s tactics. Always remember that you are expected to be disciplined soldiers of the Congress. You are expected to be non-violent. You are expected to endure all sufferings in spite of provocation.’
এমনকি তাঁর বক্তব্যে শোনা গেল প্রচ্ছন্ন হুমকির সুর। তিনি শ্রোতাদের মনে করিয়ে দিলেন চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধিজী কীভাবে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মিছিল শান্ত এবং শান্তিপূর্ণ না থাকলে তেমন সিদ্ধান্ত কংগ্রেস নেতৃত্ব আবারও নিতে বাধ্য হতে পারেন, এমন একটা প্রচ্ছন্ন সুর ছিল তাঁর বক্তব্যে। যদিও সেইদিনের মিছিলের আহ্বায়ক কিংবা পরিচালক কংগ্রেস ছিল কিনা সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন। কিন্তু এত সব কোথা যেন বিফলে চলে গেল। কারণ তাঁর বক্তব্যের মাঝখানেই খবর এল পুলিশ আবার গুলি চালিয়েছে। গতকাল ধর্মতলার যেখানে চালিয়েছিল, সেইখানেই। সেখানে জমায়েতের একটা অংশ আগেই পৌঁছেছে, তাঁরাই হয়েছেন গুলি বর্ষণের শিকার।
অতঃপর শরৎবাবুর ভাষণ মাঝপথে ফেলেই জনগণ ছুটলেন ধর্মতলার দিকে। এদিকে গ্র্যান্ট স্ট্রিটে পুলিশ ব্লকেড বানিয়ে রেখেছে। সেই ব্লকেড ভাঙতে উদ্যত হলেন মিছিলকারীরা। সংঘাত শুরু হল পুলিশের সঙ্গে।
সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আবার। সেই আগে লাঠি পরে গুলি চালাল পুলিশ। জনতার দিক থেকে জবাব মিলল ইট-পাটকেল পাথর দিয়ে। খোদ অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার অফ পুলিশ পাথরের ঘায়ে আহত হলেন। এদিকে ৩ জন আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে শুরুতে আহত হলেন। পরে আবার গুলি চলল। এক ডজন আন্দোলনকারী কমপক্ষে আহত হলেন গোটা ঘটনায়।
কিন্তু ইতিমধ্যে নানা দিক থেকে আরও আরও মিছিল এসে হাজির হল ঘটনাস্থলে। অগুন্তি মানুষ চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললেন পুলিশকে। এই বিপুল জনসমুদ্রের সামনে পুলিশ অসহায় হয়ে পড়ল। আর কোনও বাধা না মেনে মিছিল ধিরে ধিরে এগোতে লাগল ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিটের দিকে। পুলিশ আর কোনও রকম প্রতিরোধ করল না। এমনকি মিছিল যখন সেই পথ ধরে ডালহৌসি স্কোয়ারে পৌছয়, তখন সেই এলাকা পুলিশ শূন্য।
মিছিল ধিরে সুস্থে ডালহৌসি স্কোয়ারকে ঘিরে এক চক্কর কেটে ফের এগিয়ে চলল। পুলিশ তখন লালবাজারে নিজেদের আটকে নিয়েছে। সেখান থেকে নজর রাখল মিছিলের উপর।
এদিকে বেন্টিংক স্ট্রিট, হ্যারিসন রোড হয়ে মিছিল চলে এল একদম মেডিক্যাল কলেজের সামনে। সেখানে ২১ নভেম্বরের শহীদ রামেশ্বর ব্যানার্জির দেহ রক্ষিত ছিল। সেই দেহ নেওয়ার জন্য মিছিল অপেক্ষা করল। তারপর বিকেল ৫ টায় পুলিশ মর্গ থেকে দেহ নিয়ে মিছিল আবার রওনা হল।
বিশাল একটা প্ল্যাকার্ড মিছিলের সামনে ধরে নিয়ে এগোনো হতে লাগলো। সেখানে লেখা, ‘প্রথম শহীদ, কমরেড রামেশ্বর ব্যানার্জি, ক্যালকাটা টেকনিক্যাল কলেজ’। ক্রোধ থেকে পরিবর্তিত এই শোক মিছিলে উপস্থিত ছিলেন ডঃ বিধান চন্দ্র রায়, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, এ. জামান, নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার, ডঃ নলীনাক্ষ সান্যাল, মীরা দত্তগুপ্ত প্তমুখ।
সন্ধ্যা ৮ টা নাগাদ মিছিল এসে উপস্থিত হল হরিশ মুখার্জি রোডে। এখানে শহীদ রামেশ্বরের বাড়ি। ৮ টা ৩০ এ ক্যাওরাতলা শ্মশানে নিয়ে আসা হল তাঁর মরদেহ। পদযাত্রার সময় আসেপাশের বাড়ির উপর থেকে পুষ্পবৃষ্টি করা হয়েছিল শহীদের উদ্দেশ্যে।
একদিকে যখন শহীদকে নিয়ে শোকযাত্রা চলছে, অন্যদিকে নিম্নবর্গের কলকাতায় দানা বাধছে ভীষণ রকম প্রতিরোধ। প্রতিরোধের সে এক অন্য ভাষা। টুপি পড়া কোনও মানুষ দেখলেই চেষ্টা চলছে টুপি খুলে নেবার। টুপিটা ওই বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের প্রতীকের মতন কিনা। টুপি না খুললে অবশ্য বেদম প্রহার। আর জোরে গাড়ি কিংবা মোটর সাইকেল চালানো নিষিদ্ধ জনতার কানুনে। থামিয়ে থামিয়ে তাদের গতি কম করতে বলা হচ্ছে। না থামলে কিংবা ঝগড়া করলে অবশ্য ইট পাথর বর্ষণ অনিবার্য। বস্তুত ভারতের নিম্নবর্গের মানুষের জাতীয় হাতিয়ার চিরকালই ইট পাথর। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এই ইট-পাথরের ব্যবহার নিয়ে মহাকাব্য রচনা করা যায়।
যাক প্রসঙ্গে ফিরি। সন্ধ্যে নামার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য গাড়িঘোড়া চলাচল বন্ধ হয়তে গেছিল। শুধু চলছিল মিলিটারি লরি আর পুলিশের জিপ। তাই এবার আক্রমণের নয়া লক্ষ্য হল মিলিটারি লরি। সার্কুলার রোড আর চিত্তরঞ্জন এভেনিউ-এর সংযোগস্থলে বহু মিলিটারি লরিতে আক্রমণ চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কমপক্ষে খান ১২ মিলিটারি লরি অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল সেইদিন। তারমধ্যে মহম্মদ আলি পার্ক এলাকায় চারটে আর হাজরা রোড এবং ল্যান্সডাউন রোডের সংযোগে ছটা লরি আগুনে পোড়ানো হয়েছিল।
দক্ষিণ কলকাতা ছিল বেশি উত্তপ্ত। জগুবাবুর বাজার এলাকায় এক পথচারীকে মিলিটারি লরি ধাক্কা মারে। ড্রাইভার ছিলেন মার্কিন নিগ্রো। তো সেই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে জনতা লরিতে আগুন লাগায়। সেই শুরু মিলিটারি লরি জ্বালানোর। আর ড্রাইভার যে উত্তম মধ্যম প্রাপ্ত হয়েছিল তা না বললেও চলে।
উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে জনতার পাথর থেকে বাঁচতে লরি থেকে মিলিটারি নির্বিচার গুলি চালায়। আহত হন তিন জন।
কার্যত কলকাতা এবং হাওড়ার সমস্ত ভারতীয় দোকানদার এইদিন দোকান বন্ধ রাখেন। জায়গায় জায়গায় মিলিটারি এবং পুলিশ জনতার উপর গুলি বর্ষণ করে। পাথর বনাম গুলির লড়াই ক্রমশ তীব্র হয়েছে যত দিন এগিয়েছে। সারাদিনে মোট ১৩ জন সাধারণ মানুষ মারা গেছেন গুলির আঘাতে। আহত হয়ে ১৩১ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। শুধু দক্ষিণ কলকাতায় গুলিবিদ্ধ ৫০ জনের বেশি মানুষ।
এইদিন পুলিশের গুলি চালনার বিরুদ্ধে মেডিক্যাল কলেজ এবং ইসলামিয়া কলেজের ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রণেন সেনের সভাপতিত্বে মহম্মদ আলি পার্কে পরিবহন শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি মিলিত হয়ে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সমস্ত ট্রাম-বাস-ট্যাক্সি-রিক্সা বন্ধ থেকেছে শহরজুড়ে।৩
৪
২১ নভেম্বর : টুকরো স্মৃতি
২২ তারিখ কলকাতার রাস্তায় স্বতঃস্ফূর্ত বিলিতি পণ্য বয়কট হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ খানিক জোরজার করেই। মাথায় হ্যাট, গলায় টাই ইত্যাদি দেখলেই জনতা সেসব খুলে নিচ্ছিলেন। সাহেবী পোশাকের কোনও জায়গা নেই। এক ভদ্রলোক নিজের মাথার হ্যাট নিজেই রাস্তার উপর পায়ে পিশে দিলেন হেদুয়ার মোরে। সে ভয় পেয়ে না বয়কটে সামিল হয়ে বলা মুশকিল। কিন্তু হিন্দুস্তানী এক বাচ্চা এক ভদ্রলোককে বলল সিগারেট ফেলে দিতে। ওসব তো বিদেশীরা খায়। বিদেশী জিনিস বয়কট তাই…। অগত্যা কটমট করে ছেলেটির দিকে তাকিয়েও, ফেলে দিতে হল সিগারেট।৪
৫
গোয়েন্দা রিপোর্ট-এও এত উত্তেজনা ঝরে পড়তে পারে, ভাবা যায়! ৪৫-এর নভেম্বরের কলকাতা নাকি বিগত ২০ বছরের সমস্ত উত্তেজনার গণ্ডী পার করে ফেলেছিল। অন্তত ইন্টেলিজেন্স বিভাগের গোয়েন্দাদের অভিজ্ঞতা তাই জানাচ্ছে।
২৩ নভেম্বর সকালের এই রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে ২২ তারিখ পুলিশ কলকাতার ৬ জায়গায় গুলি চালিয়েছিল। ভবানিপুর থানা তো কোনও মতে বেঁচে গেছে। বার তিনেক লাঠি হাতে জনতা হামলা চালিয়েছে সেখানে। পাথরও ছুঁড়েছে। কোনও মতে ঠেকানো গেছে তাঁদের।
কলকাতার রাস্তা জুড়ে হেথায় হোথায় খালি ব্যারিকেড আর ব্যারিকেড। মিলিটারি গাড়ি দেখলেই আগুন লাগাচ্ছে জনতা। কলকাতা কর্পোরেশনের কর্মীরা শুরু করেছেন ধর্মঘট। তাঁদের ধর্মঘটের ফলে গোটা কলকাতা জলশূন্য। শুধু টিউবওয়েল ছাড়া কোথাও জল নেই।
এদিকে হাওড়ার সমবত জুট মিল শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে সামিল হয়েছেন ধর্মঘটে। রেলের কুলিরাই বা বাকি থাকেন কেন? তাঁরাও পূর্ব ভারতীয় রেলের লাইনের উপর বসে পড়েছেন।
চারিদিকে এই যে সব কিম্ভূত কিমাকার কান্ডকারখানা চলছে, তাকে গোয়েন্দা বিভাগ সহজ চোখে দেখতে পারছেন না। আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় সভা-সমাবেশে বড্ড বেশি বলা হয়েছে। ওঁদের পক্ষে ওসব প্রচারের ফলেই শহর জুড়ে এসব নষ্টামো দানা বেঁধেছে আর কী! ৫
৬
২৩ নভেম্বর দুপুর ৩ টে নাগাদ গোয়েন্দা বিভাগে খবর আসে, লিলুয়ায় রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিকেরা রেললাইন অবরোধ করে বসেছেন। কলকাতার ঢোকার আর বেরোবার সমস্ত রেললাইন স্তব্ধ হব হব অবস্থা তৈরি হয়। এদিকে দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর আর উত্তরের দমদম, দুই বিমানবন্দরে যাওয়ার রাস্তায় তৈরি হয়েছে অসংখ্য ব্যারিকেড। বিমানবন্দরে পৌঁছন কার্যত অসম্ভব। দক্ষিণ কলকাতার যত্রতত্র এবং সি. আর. এভেনিউ জুড়ে লাগাতার ব্যারিকেড। শহর চারিদিক থেকে বিচ্ছিন্ন আর উত্তর কলকাতার খানিক এলাকা বাদ দিলে প্রায় অচল।
এহেন কলকাতায় বেলা ৩ টে নাগাদ কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবীরা লাউড স্পীকার নিয়ে ভ্যানে চড়ে বেরিয়ে পড়লেন। এলাকাটা মূলত ভবানিপুর। তাঁরা পেয়েছেন জওহরলাল নেহরুর বার্তা। তিনি ছাত্র যুবদের উদ্দেশ্যে অনুরোধ জানিয়েছেন, এই ধরনের গুণ্ডামি-বিশৃঙ্খলা অবিলম্বে বন্ধ করতে। বার্তায় জানিয়েছেন, এসব চললে কংগ্রেসের স্বার্থ আর ভবিষ্যৎ দুইই ঝরঝরে হয়ে যাবে। কংগ্রেসের ভ্যান প্রচার চালিয়ে যাবার দশ মিনিটের মধ্যেই ওই এলাকায় ট্যাক্সি বোঝাই ছাত্রদের দেখা গেল। গোয়েন্দাদের মতে তাঁরা নাকি ভীষণ প্ররোচনামূলক শ্লোগান দিচ্ছিলেন। সঙ্গে আবার বলছিলেন, যা চলছে, সেইসব ‘ভাল’ কাজ, আর সেই সব ভাল কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে।৬
৭
নভেম্বরের টুকরো স্মৃতি
ভারতে নানা জায়গায়, পূর্ববঙ্গে তো বটেই, সর্বত্র ছাত্রছাত্রীরা দাঁড়িয়েছিল কলকাতার ছাত্রছাত্রীদের পাশে। কলকাতায় গুলি চালানোর প্রতিবাদে বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীরা অনশন পালন করলেন। তারপর মিছিল করে গাইলেন রবীন্দ্রনাথের গান। আগ্রা-নাগপুর এবং পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কনভোকেশন বয়কট করেন কলকাতার ছাত্রছাত্রীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে। এমনকি খোদ ইংল্যান্ডে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির মজলিশেও কলকাতার ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশের গুলি চালনার নিন্দা করা হয়। নভেম্বরে কলকাতায় টেস্ট সিরিজ চলছিল, তাই উপস্থিত ছিল অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। কলকাতার ঘটনায় মৃত এবং গুলিবিদ্ধদের প্রতি সম্মান জানিয়ে অস্ট্রেলিয়া দল এবং বেঙ্গল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন নীরবতা পালন করে।৭
৮
কলকাতার ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর পক্ষ থেকে ইস্টার্ন কমান্ডের হেড কোয়ার্টারে ২৮ নভেম্বর একটা রিপোর্ট গিয়েছিল। রিপোর্ট-টা ছিল ২১ থেকে ২৪ নভেম্বর ১৯৪৫ কলকাতার গণ্ডগোলের বিষয়ে। সেই রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে তিন দিনের সমস্ত ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন মাত্র একজন মার্কিন সেনা। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল ২২ জন ব্রিটিশ এবপ্নগ ৫ জন মার্কিন সেনাকে। এছাড়া আরও ৪৩ জন ব্রিটিশ সেনা আহত হন। সবটাই জনতার রোষে, পাথরের ঘায়। আর গাড়ি পুড়েছে অনেকগুলো। ৪৮ টা ব্রিটিশ মিলিটারি গাড়ি আর ৫ টা মার্কিন।
তবে এই রিপোর্ট-এ গোয়েন্দা বিভাগের মতামত থেকে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপলব্ধি করা যায়। তাঁদের মতে এই ২১-২৪ নভেম্বরের ঘটনাবলীর পিছনে কংগ্রেসের হাত রয়েছে। না, সরাসরি হাত নেই, ঘুরিয়ে রয়েছে। কীভাবে? আসলে আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবি জানিয়ে কংগ্রেসের কয়েক সপ্তাহব্যাপী লাগাতার প্রচার, আজাদ হিন্দ ফৌজকে বিশাল মহৎ হিসাবে প্রতিপন্ন করা, এইসবই ২১ নভেম্বর আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম বিচার শুরু হওয়ার দিনের জনরোষকে ইন্ধন জুগিয়েছে।
আরও আগ্রহজনক বিষয় হল, ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ মনে করছে যে এর পিছনে কংগ্রেসের বিশেষ স্বার্থও ছিল। কংগ্রেস নাকি ‘ট্রায়াল রান’ হিসাবে ২১-২৪ নভেম্বরের ঘটনাবলীকে দেখছিল। ভারতের আসন্ন পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে কংগ্রেস এই পরীক্ষা চালাচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিল তিন।অসামরিক এবং সামরিক কর্তৃপক্ষ আন্দোলনে কী ভূমিকা নেয় সেটা পর্যবেক্ষণ করা আর জনগণের উপর নিজেদের কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেটাও ঝালিয়ে নেওয়া। সেক্ষেত্রে প্রথম এবং তৃতীয় উদ্দেশ্যে তারা সাফল্যও পেয়েছে। অসামরিক কর্তৃপক্ষ কতদূর যেতে পারে, কীভাবে পদক্ষেপ করতে পারে কোন পরিস্থিতিতে, তার একটা স্বচ্ছ ধারণা করে নিতে পেরেছে। আর কংগ্রেস কর্মীরা ২৩ নভেম্বর থেকে যেভাবে দাঙ্গা থামানোর জন্য লাউড স্পীকার নিয়ে প্রচার চালিয়েছেন, তার ফলে পরিস্থিতি অনেকটা ঠাণ্ডা হয়েছে। যদিও কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকেও মাইকে প্রচার চালানো হয়। আর কংগ্রেসের স্থানীয় নেতারাও চেষ্টা করেন। কিন্তু লাউড স্পিকারে জওহরলাল নেহরুর নাম নিয়ে প্রচার চালানোর ফলে জনতা অনেক দ্রুত সাড়া দিয়েছে। এরফলে জনতার উপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণেরও একটা পরীক্ষা নেওয়া হয়ে গেল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। তবে সামরিক কর্তৃপক্ষকে মোকাবিলা করবার অভিজ্ঞতাটা সেভাবে হল না। কার্যত পরিস্থিতির উত্তাপ দেখে সামরিক বাহিনী নামার আশঙ্কাতেই কংগ্রেস ও কমিউনিস্টরা তাড়াহুড়া করে জনতাকে শান্ত করতে বেরিয়ে পড়েন বলে মনে হয়েছে ব্রিটিশ গোয়েন্দা দফতরের।
ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চের মতে, এবারের অবস্থা ছিল ৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের চেয়েও ভয়ংকর। ব্রিটিশ প্রশাসনকে আতঙ্কিত করেছিল ব্যাপকভাবে মুসলমান ছাত্রদের বিক্ষোভে অংশগ্রহণ। ইসলামিয়া কলেজ এবং ক্যালকাটা মাদ্রাসার ছাত্ররা শুধু যে বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন এমনই নয়, তাঁরা মুসলিম লীগ যাতে কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলন করে সেই জন্য চাপ তৈরি করছিলেন। অপরদিকে কলকাতার মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ ওসমান এবং মুসলিম প্রাদেশিক ছাত্র লীগের একজন নেতা ছাড়া প্রকাশ্যে অন্য কোনও মুসলিম নেতা বিক্ষোভের বিরোধিতা করেননি। বরং নীরব থাকার কৌশল নিয়েছিলেন। ব্যারিকেডে হিন্দু-মুসল্মানের এই ঐক্য ব্রিটিশ প্রশাসনকে বেশ খানিকটা চমকে দিয়েছিল।
তাঁরা জনসাধারণের মধ্যে আই.এন.এ.-এর প্রভাবকে নিয়ে ভীষণই চিন্তিত ছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং তাঁদের বিচারের বিষয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চর্চায় ঢুকে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষ পরস্পরকে আজাদ হিন্দের কায়দায় ‘জয়হিন্দ’ বলে সম্বোধন করতেও শুরু করেন। আর আজাদ হিন্দের এই প্রবল জনপ্রিয়তাই ছিল ব্রিটিশ প্রশাসন এবং ভারতে বসবাসকারী ইউরোপীয়দের প্রবল আশঙ্কার কারণ। গোয়েন্দা রিপোর্টে আশঙ্কা করা হয়েছে ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় অংশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না।
আজাদ হিন্দের ভূত ব্রিটিশ প্রশাসনকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।৮
৯
নিছক পরিসংখ্যান
হ্যাঁ তাই বটে। ২৯ নভেম্বর ১৯৪৫-এ বাংলার গভর্নরের সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে আর কিছু নেই। তবে ২১ নভেম্বর ওয়েলিংটন থেকে ধর্মতলায় যাওয়া মিছিলে মাত্র ৫০০ ছাত্র ছিল, এই তথ্যটা একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। মানে ওই সাম্ন্য জমায়েত আটকাতে লাঠি-গুলি ঠিক দাঁড়াচ্ছে না আরকি। তবে ওনার দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানে একটু চোখ বোলানো যেতেই পারে।
Casualties
Police
Detained in hospital 16
Treated and discharged from hospital 36
Major injury A large number (not ascertained).
Fire Brigade
Treated and discharged from hospital 30
Military
(a) British Forces
Detained in hospital 14
Treated and discharged from hospital 55
(b) US Forces
Killed (burnt to death) 1
Detained in hospital 5
Treated and discharged 32
Public
Killed or died in hospital up to midnight November 25/26 32
Injured Not accurately ascertainable, 150
Estimated to be and Between 200
Vehicles Destroyed and Damaged
Police
Destroyed 1
Damaged 12
Fire Brigade
Destroyed 1
Damaged 3
Other Government vehicles
Destroyed 1
Damaged 3
Military
(a) British
Destroyed 37
Damaged 29
Missing 4
(b) USArmy
Destroyed 9
Damaged 50৯
১০
ক্যাপ্টেন রশিদ আলি
৪ ফেব্রুয়ারি শাস্তি হল তাঁর। মানে শাস্তি কমলো। প্রথম শাস্তিটা দিয়েছিল আদালত। কমিয়ে দিলেন কমান্ডার ইন চিফ। তাঁর বিরুদ্ধে ৭টা অভিযোগ ছিল। তার মধ্যে ৫ টা অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি হল তাঁর। যাবজ্জীবন থেকে কমে হল ৭ বছরের কারাদণ্ড।
এই ঘটনাই কিন্তু আগুন জ্বালিয়েছিল ফেব্রুয়ারির কলকাতায়। ১০
১১
ফেব্রুয়ারি ‘বিপ্লব’-এর উদ্যোক্তারা
১০ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতা পত্রিকার পাতায় একটা বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছিল। ক্যাপ্টেন রশিদ আলির শাস্তির বিরুদ্ধে ১১ তারিখ একটা প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হয়েছিল সেই বিজ্ঞপ্তিতে। আহ্বায়ক ছিলেন দুই জন। এক সিটি ছাত্র ফেডারেশনের আহ্বায়ক গৌতম চট্টোপাধ্যায় আর দুই কলকাতা ছাত্র মুসলিম লীগের সম্পাদক মোয়াজ্জেম আহম্মদ চৌধুরী।১১
১২
১১ ফেব্রুয়ারী : স্বাধীনতার পাতায়
১২ ফেব্রুয়ারী স্বাধীনতার পাতার হেড লাইন ছিল— “কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম ছাত্র শোভাযাত্রার উপর পুলিশের লাঠি চালনা। শতাধিক আহত : ৩২ জন গ্রেপ্তার ক্যাপ্টেন রসিদের মুক্তির দাবিতে কংগ্রেস-লীগ ও কমিউনিস্ট ঐক্য”।
সভা শুরু হতে না হতেই খবর পাওয়া যায় ডালহৌসি স্কোয়ারে জেনারেল পোস্ট অফিসের সামনে পুলিশ একটি ছাত্রদের মিছিলের উপর লাঠিচার্জ করেছে। সেই ঘটনায় ছাত্র ফেডারেশনের সালে মহম্মদ সহ মোট ১২ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রবল উত্তেজনার মধ্যে সভা শুরু হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন ছাত্র ফেডারেশনের গৌতম চট্টোপাধ্যায়, মুসলিম ছাত্র লীগের মুয়াজ্জেম হোসেন, এক ছাত্র কংগ্রেস কর্মী এবং ট্রটস্কিপন্থী ছাত্রী সুপ্রভা রায় প্রমুখ।
লীগ নেতা সুরাবর্দী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমার জীবনের একটা বড় আশা আজ পূর্ণ হইয়াছে—কংগ্রেস, লীগ পতাকার নীচে হিন্দু-মুসলমান ছাত্ররা এক হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
পুলিশ ডালহৌসিতে লাঠি চালাইয়াছে; তাহার প্রতিবাদে সমস্ত কলিকাতাকে জাগাইয়া তুলিতে হইবে। ইহার জন্য আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে কাজে অগ্রসর হইতে হইবে।”
ক্লাইভ স্ট্রিটের কাছে ছাত্রদের মিছিল পুলিশ আটকালে ছাত্ররা রাস্তায় বসে পড়েন। সেখানে কলকাতা সিটি মুসলিম লীগের সম্পাদক মহম্মদ ওসমান ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণ রাখেন। তিনি বলেন, “আজ কংগ্রেস ও লীগের পতাকা একসঙ্গে উড়িতেছে। ইহাই আমাদের জয়ের সূচনা করিতেছে।” ইতিমধ্যে কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার সামসুজ্জোহা হুমকি দিয়ে বলেন, “হয় আপনারা চলিয়া যান, না হইলে আপনাদের ছাতু করিয়া দিব।” জবাব এলো মুখে মুখেই। ছাত্রনেতা অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য জবাব দিলেন, “তোমরা আমাদের পেটাতে পার, খুন করতে পার, চূর্ণ করতে কিছুতেই পারবে না।” অতঃপর নির্মম লাঠিচার্জ এবং লীগ নেতা মহম্মদ ওসমান গ্রেফতার।
লাঠির আঘাতে আহত ছাত্রদের তালিকায় হিন্দু-মুসলিম মিশে একাকার হয়ে গেছে। নামের তালিকাটায় একটু চোখ বুলিয়ে নিন। চমকে উঠতে পারেন কয়েকটা নাম দেখে। রবীন মুখার্জি, নীরেন্দ্র রায়, গোলাম নবী, অমল মুখার্জি, অন্নদাশংকর ভট্টাচার্য, সুনীল মুন্সি, গৌতম চট্টোপাধ্যায়, রশিদা খায়ের, মোরশেদ আলী, অমলেন্দু চ্যাটার্জী, উমর আবিদ জুবেরী, জহিরুদ্দীন ফারুকী, আরশেদ আলী, লুৎফর রহমান, মহম্মদ আলী ফারুকী, সুনীল ব্যানার্জী, চিত্তরঞ্জন গোস্বামী, বাদল সরকার, সাহাজান, তারক সরকার, নৃপেন ব্যানার্জী, মহম্মদ আবদুল্লা, পান্নালাল ঘোষ, আব্দুল করিম খান, এস.সি. দাস, সুবোধ রায়, প্রদ্যোৎ দাস, রাজকান্ত ঝা, শ্যামলাল মিত্র। এছাড়া গুরুতর ভাবে আহত হয়েছেন আহমদ আহসান, শিবু সেন, কালীমোহন দাস এবং সদ্য মুক্ত কমিউনিস্ট রাজবন্দী নন্দদুলাল সিংহ। ছোট ছোট ছেলেদেরকেও নির্মম ভাবে মারা হয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় গোটা কলকাতা অশান্ত হয়ে ওঠে। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ রাজাবাজারে দুটো মিলিটারী লরী জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। রাত ৯ টা নাগাদ হ্যারিসন রোড (বর্তমান মহাত্মা গান্ধী রোড) এবং সেন্ট্রাল এভেনিউ-এর মোড়ে পুলিশ জনতার উপর কাঁদানে বোমা ছোঁড়ে। রাত ১০টায় রাজাবাজারে পুলিশ ২৩ রাউন্ড ফাঁকা রিভলবারের গুলি ছোঁড়ে। তারপরেই মানিকতলায় পরপর কয়েকটি মিলিটারী লরী পোড়ানো হয়। মুসলমান জনতাকেই রাস্তার উপর বেশি মাত্রায় নেমে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা যায়। তাঁদের গলায় শ্লোগান ছিল, ‘কংগ্রেস লীগ এক হো’।১২
১৩
টুকরো স্মৃতি : ১১ ফেব্রুয়ারি
সন্ধ্যেবেলা হ্যারিসন রোড আর চিত্তরঞ্জন এভিনিউ-এর মোড়ে দুটো মিলিটারী লরীতে আগুন লাগান বিক্ষুব্ধ জনতা। এই জায়গার আধ মাইলের মধ্যে চিত্তরঞ্জন এভিনিউ-তেই আরও দুটি মিলিটারী লরীতে আগুন ধরানো হয়। এদিকে সন্ধ্যেবেলা কলেজ স্কোয়ার থেকে একটা মিছিল বেরোয়। কলেজ স্ট্রিট, বৌবাজার স্ট্রিট, শিয়ালদহ, হ্যারিসন রোড হয়ে মিছিলটা এগোতে থাকে। মিছিলকারীদের হাতে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ দুই দলের পতাকা ছিল। আর গলায় ছিল শ্লোগান—“হিন্দু-মুসলিম এক হও”, “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক”। এই মিছিল থেকে জনতা সমস্ত ট্রাম, বাস এবং অন্যান্য গাড়িগুলিকে আটকাচ্ছিলেন। যাত্রীদের বলছিলেন পায়ে হেঁটে যেতে। আর সমস্ত দোকান বন্ধ করতে বলছিলেন দোকানদারদের। আর সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছিলেন পরের দিন অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালন করতে। রাত ৯টা নাগাদ চিত্তরঞ্জন এভিনিউ সংলগ্ন কলুটোলা স্ট্রিটে মিলিটারী গাড়ি থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। কেউ হতাহত হয়েছেন কিনা সে খবর অবশ্য নেই। তবে একটা হাসপাতালে ৩ জন বুলেটের ক্ষত নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। তার মধ্যে একজনের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। রাত ১০ টা নাগাদ রাস্তা জনশূন্য হলেও নানা জায়গায় মিলিটারী লরী জ্বলতে দেখতে পাওয়া যায়। সংখ্যাটা অন্তত ৬।১৩
১৪
১২ ফেব্রুয়ারীর প্রতিবাদ সভার জন্য যৌথ আবেদন
গতকল্য (সোমবার) ছাত্র সমাজের উপর পুলিশ যে আক্রমণ করিয়াছে তাহার প্রতিবাদে অদ্য মঙ্গলবার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে বেলা ১ টায় এক সভা হইবে।
অদ্য মঙ্গলবার শহরের সর্বত্র শান্তিবাহিনী কাজ করিবে। আমরা জনসাধারণের নিকট আবেদন করিতেছি, তাহারা যেন শহরের শান্তিরক্ষার কাজে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেন। লোকজন এবং সাধারণ বা ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলে যেন কোনপ্রকার বাধা দেওয়া না হয়। আমরা আশা করি জনসাধারণের প্রত্যেক অংশই শান্তিপূর্ণ আবহাওয়া সৃষ্টি করিতে বা রক্ষা করিতে সাহায্য করিবেন।
স্বাক্ষর
শরৎ চন্দ্র বোস সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ চৌধুরী ময়াজ্জেম হোসেন
আবুল হাসেম সতীশ সরকার (লাল মিঞা)
জিতেন্দ্রমোহন দত্ত দেবতোষ দাশগুপ্ত এইচ.এস. সুরহাওয়ার্দী
সতীশ্চন্দ্র দাশগুপ্ত পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী মুজাফ্ফর আহ্মদ
যতীন্দ্র চক্রবর্তী এম.এম. ওসমান মহম্মদ হাবিবুল্লা১৪
১৫
১২ ফেব্রুয়ারি : দ্য স্টেটসম্যান
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের মুখপত্র বলা হতো দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকাকে। সেই পত্রিকার পাতায় ১২ ফেব্রুয়ারির কলকাতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে সেইদিকে চোখ রাখবো এবার। পরিস্থিতি এতটাই বিগরে ছিল যে সেনা নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয় বাংলার গভর্নর কেসি-কে, ইস্টার্ন কমান্ডের জি.ও.সি.-এর সঙ্গে আলোচনা করে।
১১ এবং ১২ তারিখ মিলিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৯০ জন। তার মধ্যে ১২ তারিখেই মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। আহতদের মধ্যে ৬৫ জনের গুলির আঘাত এবং ২৫ জন লাঠিচার্জের শিকার। নভেম্বরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কলকাতা শহর থেকে সমস্ত মার্কিন সেনা তুলে নেওয়া হয়েছে।
১২ তারিখের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল দুপুরের জমায়েত। এক লক্ষ মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন ওয়েলিংটন স্কোয়ারে। কমিউনিস্ট-কংগ্রেস-মুসলিম লীগ-ছাত্র-মহিলা-খাকসার সকলেই উপস্থিত ছিলেন সেখানে। সকলের পতাকা আবারও মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। ডালহৌসি স্কোয়ার পর্যন্ত চলল এই লক্ষ মানুষের মিছিল। মিছিল থেকে ঘন ঘন যে শ্লোগানগুলো উঠছিল, সেগুলোর দিকে একটু মনোনিবেশ করা যাক। ক্যাপ্টেন রশিদ আলি সহ আই.এন.এ.-এর সমস্ত বন্দীর মুক্তির দাবী তো ছিলই কিন্তু জোর গলায় দানা বেঁধেছিল হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের শ্লোগান। মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন বাংলার প্রাক্তন মন্ত্রী এইচ.এস. সুরাবর্দী এবং খাদি প্রতিষ্ঠানের সতীশ চন্দ্র দাশগুপ্ত। এই কর্মসূচী নেওয়া হয়েছিল ১১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের লাঠি ও গুলি চালনার প্রতিবাদে সে কথা বলা বাহুল্য।১৫
১৬
ভরসন্ধ্যায় হুমকি
হ্যাঁ মানে কোনও রকম লুকোচুরি নয় একদম সরাসরি হুমকি। ফেব্রুয়ারির বিক্ষুব্ধ কলকাতাকে ধমকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টায় ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ৮ টা ১৫-এ অল ইন্ডিয়া রেডিও-র ক্যালকাটা সেন্টার থেকে প্রত্যক্ষ বক্তব্য রাখলেন খোদ বাংলার গভর্নর ক্যাসি। শুনুন সেই হুংকার—
“I regret to have to tell you that Calcutta is again in a state of disturbance. Arising out of a political procession held this afternoon the situation has degenerated and has rapidly developed into an attempt to mob rule in several important parts of Calcutta. Within a very short time from the holding of the procession, unruly elements started looting shops and setting lire to buildings and transport. A number of motor lorries have been burnt— both army vehicles and lorries containing the people’s food. Peaceful citizens are being molested in many parts of Calcutta. It is impossible to believe that any of the principal political parties are supporting the present state of affairs. The mob are trying to take charge—and they are not going to be allowed to take charge. The situation is such that I have asked the army to come to the assistance of the civil power in order that order may be restored in Calcutta as soon as possible. I am speaking to you at this early stage in order that the public of Calcutta may be aware of the steps that are being taken. Peaceful citizens should keep to their houses. The police and the armv will not interfere with any peaceful citizens in any way whatsoever-but they will take all necessary steps against malefactors and those who refuse to obey their orders. Keep off the streets and keep out of trouble. Both the army and the police will use the greatest possible restraint provided they are not interfered with. If the troops are impeded in their efforts to restore order and to open up the roads to normal traffic they will use their weapons. You will remember that in the course of last disturbances in late November I was extremely reluctant to ask for the assistance of the army. I am equally reluctant now but I believe that urnn assistance is essential in the public interest and in these circumstances I have not hesitated to invoke their aid. The lesson to be leamt-for the second time within a few months is that political processions however well intentioned prove nothing. They inevitably lead to public disturbance and casualties. I hope very much that this second costly experience will have its lesson for those responsible for the demonstrations in November and now.”১৬
১৭
১২ ফেব্রুয়ারী : স্বাধীনতার পাতায়
১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬-এ প্রকাশিত স্বাধীনতা পত্রিকার হেডিং ছিল—“কলিকাতায় গুলিবর্ষণে দুই শতাধিক হতাহত, মিলিটারির হাতে সহরের ভার/পুলিশ জুলুমের বিরুদ্ধে কংগ্রেস-লীগ-কমিউনিস্ট মিলিত প্রতিবাদ/লুটতরাজ ও গুন্ডামির বিরুদ্ধে জননেতাদের সতর্কবাণী”।
১২ তারিখ বেলা সাড়ে ১২ টা নাগাদ বিবেকানন্দ রোড এবং সেন্ট্রাল এভেনিউ-এর সংযোগস্থলে পুলিশ গুলি চালায়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মনোরঞ্জন দত্ত নামে এক যুবক নিহত হন। এইদিন সকাল ১০ টা ৩০ নাগাদ সেন্ট্রাল এভেনিউ এবং বিডন স্ট্রিটের মোড়ে পুলিশ গুলি চালায়। ১২ টা ৪৫ নাগাদ সেন্ট্রাল এভেনিউ এবং বৌবাজার মোড়ে পুলিশ আবারও গুলি চালায়।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে শুরু করে। জনতা আরও বেশি মাত্রায় রাস্তায় নেমে আসেন এবং জঙ্গী কার্যকলাপ আরও বেশি তীব্রতা পায়। বেলা ১টার সময় পুলিশ হাজরা এবং মনোহর পুকুর রোড এলাকায় ২৫ রাউন্ড ফায়ার করে জনতার উপর।
বিকেলের পর থেকে মেডিক্যাল কলেজ প্রায় যুদ্ধ শিবিরের চেহারা নেয়। বস্তুত বিকেল ৪ টে ৩০-এর পর থেকে সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করে। পুলিশ সর্বত্র গুলি চালাতে থাকে। আর আহত জনতার ভিড়ে উপচে পড়তে থাকে মেডিক্যাল কলেজ। মেডিক্যাল কলেজ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাম্বুলেন্স কোরের স্বেচ্ছাসেবক এবং সেবিকারা প্রাণপাত করে কাজ করে যাচ্ছিলেন। মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের সোশ্যাল সার্ভিস বিভাগ থেকে লাগাতার বাইরে অপেক্ষারত স্বজনদের আহতদের খবর মাইক্রোফোনে দেওয়া হচ্ছিল।
এইদিন ওয়েলিংটন স্কোয়ারের জমায়েতে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মৌলানা আক্রম খাঁ বলেন, “বিনাশর্তে ক্যাপ্টেন রসীদের মুক্তি, অত্যাচারীদের শাস্তি ও মৃতদের ক্ষতিপূরণ চাই—যদি এইসব দাবী মানিয়া লওয়া না হয়, তবে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের জন্য যেভাবে হিন্দু মুসলমান সম্মিলিত আন্দোলন চালাইয়াছিলেন, আমরা পুনশ্চ তেমনই আন্দোলন চালাইব। এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে আমি ঝাঁপাইয়া পড়িব।”
কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ লাহিড়ী উপস্থিত ২০,০০০ জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আজ বিভিন্ন দলের নেতারা এক হইতে না পারিলেও, জনসাধারণ যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে এক হইতে পারে, এই যুক্ত সভা তাহাই প্রমাণ করিয়াছে। আমরা কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ নেতাদের বলিতেছি, আজ তাঁহারা প্রতিজ্ঞা করুন, আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির জন্য আলাদা হইয়া আন্দোলন চালাইবেন না। যুক্তভাবে আন্দোলন চালাইয়া আজাদ হিন্দ ফৌজকে মুক্ত করিতে হইবে।”
লক্ষ লোকের মিছিল এরপর এগিয়ে চলে ডালহৌসির দিকে। সেই মিছিলে জায়গায় জায়গায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস বোমা ছোঁড়ে। সেই বোমায় বিধ্বস্ত মানুষদের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলারা জল দিয়ে সাহায্য করছেন, এমন দৃশ্য কলকাতার রাস্তায় দেখা যায়।
১১ তারিখের ঘটনায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন নাজীমুদ্দিন। তাঁর দেহ নিয়ে ১২ তারিখ ৫০,০০০ মানুষের শোকযাত্রা বেরোয়। নাখোদা মসজিদ থেকে মানিকতলা পর্যন্ত এই শোভাযাত্রা চলে। এতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অসংখ্য সাধারণ নরনারী অংশ নেন। একজন মুসলিম লীগ নেতা নাজীমুদ্দিনের কবরে মাটি দেবার সময় শপথ নিয়ে বলেন, “এই মাটী যেন লীগ ও কংগ্রেসের পতাকাকে শক্ত করে বেঁধে দেয়, শহীদের রক্তে এই বন্ধন চিরদিনের জন্য এক হয়ে যাক।”১৭
১৮
উত্তাল ফেব্রুয়ারি ৪৬ : পিপল’স এজ-এর পাতায়
কমিউনিস্ট পার্টির সর্বভারতীয় মুখপত্র ছিল এই পত্রিকাটি। নিখিল চক্রবর্তীর নিজ অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে এই বিবরণে। এই বিবরণ থেকে আমরা পেতে পারি বেশ কিছু নতুন তথ্য। যেমন—
১১ ফেব্রুয়ারি যে মিছিলটা ডাকা হয়েছিল, তার আহ্বায়ক ছিল দুই ছাত্র সংগঠন। একটি মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস’ লীগ অর্থাৎ এ.বি.এম.এস.এল.। দ্বিতীয় সংগঠনটিতে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও অন্যরা কাজ করত, নাম বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল স্টুডেন্টস’ ফেডারেশন অর্থাৎ বি.পি.এস.এফ.।
এই মিছিলে যোগদান করতে কিছু মুসলিম স্কুল ছাত্র আসছিলেন ডালহৌসি স্কোয়ার এলাকা দিয়ে। তাঁদেরকে পুলিশ লাঠিপেটা করে। ১২ জন স্কুল ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়।
মিছিল শুরু হয়েছিল ওয়েলিংটন স্কোয়ার থেকে। মিছিলের আগে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শহীদ সুরাবর্দী। তিনি বলেন, “Today the great desire of my life is fulfilled, that Hindu and Muslim students have stood unitfied under the banners of the Congress and the Muslim League.” ৪৬-এর সুরাবর্দী বলেছিলেন এই কথাগুলো। ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট কেমন ওলট পালট হয়ে গেল সবকিছু।
সেইদিনের মিছিলে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৫০০০ মতন। হিন্দু এবং মুসলিম ছাত্রদের যৌথ শ্লোগান ছিল — “পুলিশি জুলুম বন্ধ করো”, “কংগ্রেস-লীগ এক হো”। ঐক্যের মিছিল। ডালহৌসি ঢোকার রাস্তায় ক্লাইভ স্ট্রিটের মুখে পুলিশ মিছিল আটকায়। অফিস পাড়ার লোকজন কংগ্রেস এবং লীগের যৌথ পতাকা হাতে ছাত্রদের দেখে কৌতূহলে ভীড় জমান মিছিলের চারিপাশে। ইতিমধ্যে গোর্খা পুলিশ এসে পৌঁছয়। বি.পি.এস.এফ.-এর সাধারণ সম্পাদক আনন্দ ভট্টাচার্য-কে পুলিশ অফিসার আলোচনা করতে ডাকেন। আনন্দ জানিয়ে দেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণ ভাবে মিছিল নিয়ে এগোতে চান। আনন্দ তখন ছাত্রদেরকে শান্তিপূর্ণ থাকতে বলেন।
ইতিমধ্যে কলকাতা সিটি লীগের সম্পাদক মহম্মদ ওসমান, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা দিয়ে বক্তব্য রাখেন। তখনই কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শামসুজ্জোহা হুমকি দিয়ে ওঠেন, “Either you go away or I will smash you.” সঙ্গে সঙ্গে মুখের মতন জবাব দেন আনন্দ, “You can never smash us.”
আর কী! তারপর ২০০ পুলিশ লাঠি হাতে ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একঘণ্টা টানা লাঠিপেটা চলে শান্তিপূর্ণ ছাত্রদের উপর। ১০০-এর বেশি ছাত্র আহত হন। ২০ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়।
ছাত্রদের উপর আঘাত নেমে আসতে দেখে শহর ধীরে ধীরে নিজে থেকেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ট্রাম-বাস থেকে যাত্রীরা নিজেরাই খালি করে নেমে আসেন রাস্তায়। পুলিশ তার মধ্যে দুই জায়গায় কাঁদানে গ্যাস চার্জ করে। এলোপাথাড়ি গুলিও চালায়। জনতাও ক্ষিপ্ত হয়ে এবার মিলিটারি লরিগুলিকে আক্রমণ করতে শুরু করেন। মাঝরাতের মধ্যে জনতার ক্ষোভ চারিদিকে আগুনের মতন ছড়িয়ে যায়।
এদিকে সন্ধ্যে থেকে রাত পর্যন্ত কংগ্রেস-লীগ আর কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলে। যৌথ বিবৃতি প্রস্তুত হয়। কিন্তু কংগ্রেস বলে শরৎ বাবুর সই নাহলে তারা বিবৃতিতে নাম রাখতে পারবে না। অতএব রাত ১টার সময় লীগ নেতারা শরৎ বসুর বাড়িতে দৌড়য়। যৌথ মিটিং-এ আগে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১২ ফেব্রুয়ারি হরতাল করা হবে আর বেলা ১টায় ওয়েলিংটন স্কোয়ারে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে কমিউনিস্ট পার্টি ট্রাম, বাস ইত্যাদি সব যানবাহন বন্ধ রাখার কথা পরিবহন শ্রমিকদের ইউনিয়নদের জানিয়ে দেয়। তারপর শেষরাতে শরৎ বোসের বাসা থেকে বেরিয়ে কংগ্রেস ও লীগ নেতারা জানান, তাঁরা হরতালের বিরুদ্ধে।
১২ তারিখ সকাল ৮টা থেকেই যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা শহরে। জনতা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। সামরিক যানবাহনের উপর আক্রমণ চলতে থাকে। পুলিশ গুলি চালায় উত্তর কলকাতায়। একজন মারা যান গুলিতে।
বেলা একটা নাগাদ ২৫,০০০ মানুষ জমায়েত হন ওয়েলিংটন স্কোয়ারে। তাঁদের হাতে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা। কোথাও কোথাও তিন পতাকা একসঙ্গে বেঁধে রাখা। আর আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চলছে জনতার গর্জন— “হিন্দু-মুসলিম এক হো”, “কংগ্রেস-লীগ এক হো”, “ডাউন উইথ ব্রিটিশ ইম্পিরিয়ালিজম”… ।
ওয়েলিংটনের সভায় মুসলিম লীগের ছাত্র জাহিরুদ্দীন বলেন, “The British Government by making discrimination against Abdul Rashid, who was defended by the league, schemed to keep Hindus and Muslims apart. We stand here united today to confound the British calculations. By settling the question of Hindustan and Pakistan ourselves, we will drive the British out by our united movement. By our blood we will wipe of this shame.”
বাংলা মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট মৌলানা আক্রম খান বলেন, “I might be old in age, but today I shall not only not lag behind, but will lead you.”
এরপর বক্তব্য রাখেন বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আব্দুল হাশিম। বলেন, “I can clearly visualise the day, which is not far distant, when British Imperialism will crumble like a house of cards in a new Plassey or Panipat. Yesterday’s tragedy has been turned from a curse to a blessing since it has brought Hindus and Muslims together. Through greater unity in the whole country we shall build our Azad Hind Fouz. Don’t bother about arms. If we unite, weapons will fall from the sky.”
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবার মতন আহ্বান। ছেচল্লিশের কলকাতায় এমনটাও কিন্তু ঘটেছিল। আর কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ লাহিড়ী বলেন, “If leaders last night took six hours to come together, it did not take six minutes for the common people, both Hindu and Muslim, to unite in the face of the Police. We ask the Congress and League leaders to take the pledge today that they will not campaign separately and against each other for the release of the Azad Hind Fouz, but will get all of them freed through a united movement.”
আরও সব বিশিষ্ট কংগ্রেস এবং লীগ নেতারা বক্তব্য রাখেন সেখানে। কিন্তু কংগ্রেসের প্রথম সারির দুই নেতাকে সেখানে দেখতে পাওয়া যায়নি। শরৎ বোস এবং সুরেন ঘোষ দুইজনেই এইদিনের সভায় আসেননি। অতঃপর মিছিল শুরু হয় সুরাবর্দী এবং গান্ধিবাদী নেতা সতীশ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে।
মিছিলের নানা জায়গায় পুলিশ প্ররোচনা দিতে শুরু করে। বৌবাজার স্ট্রিটের কাছে মিছিলের মাঝখানে একটা পুলিশ লরি ঢুকে যায়। কিছু কিছু জায়গায় কাঁদানে গ্যাসও ছোঁড়া হয়। কিন্তু সেদিনের কলকাতা আর এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে। আশেপাশের বাড়ির ছাদের উপর থেকে বালতি ভর্তি করে জল ফেলা হতে থাকে কাঁদানে গ্যাসে বিদ্ধস্ত মিছিলের অংশগুলির উপর। এমন ঐক্য কলকাতা এর আগেও কখনও দেখেছে কি?
এক মুসলিম লীগ কর্মী সবুজ লীগের পতা জলে ভিজিয়ে তুলে দিলেন সতীশ দাশগুপ্তের হাতে। কাঁদানে গ্যাসের জ্বালা থেকে বাঁচতে সেই ভেজা পতাকা দিয়ে চোখ মুখ মুছলেন তিনি। তারপর সেটা বাড়িয়ে দিলেন সুরাবর্দীর দিকে। সুরাবর্দী চোখ মুখ মুছে আবার সতীশ দাশগুপ্তকে দিলেন। এভাবেই কলকাতার রাস্তায় লেখা হতে লাগল ৪৬-এর এক জাদু বাস্তব মহাকাব্য। কংগ্রেসের বড় বড় নেতাদের অনুপস্থিতিতে কর্মীরা তাঁদের মতো করেই ঐক্যের বার্তা দিয়ে গেলেন শেষ পর্যন্ত। আর নেতৃত্বের মৌনতাকে সম্মতি ধরে নিয়েই হয়তো বা কর্মীরা আক্রমণ চালিয়ে গেলেন মিলিটারি ট্রাকগুলোতে। আক্রান্ত হল কালিঘাট ট্রামডিপো-পোস্ট অফিস। চৌরঙ্গীতে ইউরোপীয় দোকান-হোটেল আক্রান্ত হল। রাস্তায় অপদস্থ হতে লাগলেন ইউরোপীয় আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা। পুলিশ জবাব দিল লাঠি আর গুলিতে। গুলি আর পাথরের সেই অসম যুদ্ধ আবারও চলল কলকাতা জুড়ে। একদনের মৃত ২০ আহত ২০০…
এদিকে গভর্নর কেসি শহরটা মিলিটারির হাতে তুলে দিলেও লড়াই চালিয়ে গেল জনতা একটুও পিছু না হঠে। মরল আর মারল। বহু রক্ত-ঘাম আর চোখের জলের বিনিময়ে পাওয়া এই ঐক্য তাঁরা আর কিছুতেই যেন ভাঙতে দিতে চান না।
নেতারা বুঝলেন এমনকি বললেনও, পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। জনতার রাশ আর তাঁদের হাতে নেই। তবু নেতারা যেন জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রেও আর ঐক্য চাইছিলেন না। কংগ্রেস, কমিউনিস্ট আর লীগ আলাদা আলাদা ভাবে শান্তি বাহিনী পাঠাতে লাগলো জায়গায় জায়গায়। জনতা কিন্তু তখনও ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাও নেতাদের ভিন্ন রঙের খেলা… ১৮
১৯
টুকরো স্মৃতি : ১২ ফেব্রুয়ারি
উত্তর কলকাতার চিত্তরঞ্জন এভিনিউ জুড়ে একটা গাড়িও যেতে দেননি জনতা। ছাত্র এবং তরুণ ছেলেরা রাস্তায় নেমে সমস্ত গাড়ি থামিয়েছেন। এমনকি একটা রিক্সাও যেতে পারনি রাস্তা দিয়ে। তাছাড়া রাস্তার জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন, জঞ্জাল ইত্যাদি ফেলে ব্যারিকেড করে রাখা হয়েছিল। দুপুর ৩ টে নাগাদ হাজরা পার্ক এলাকায় জনতা ইঁট-পাথর নিয়ে পুলিশকে তাড়া করে। পুলিশ সেখানে গুলি চালায়। অন্তত তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দুপুর ২ টো নাগাদ চিত্তররঞ্জন এভিনিউ-বৌবাজার ক্রসিং-এ মিলিটারী লরী পোড়ানোর ফলে পুলিশ জনতার উপর কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে। ভবানীপুর এলাকায় জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে এইদিন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার এস. দোহা এবং অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার অফ পুলিশ আর.এন. গুপ্ত আহত হন। বিকেলের দিকে এসপ্ল্যানেড এলাকায় জনতা পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ইঁট-পাথর ছোঁড়েন। তাছাড়া রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা ইউরোপীয় এবং অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের টুপি-টাই ইত্যাদি খুলে নিতে চেষ্টা চালান। তাই বিকেল ৪ টে থেকে ৬ টা ৩০-এর মধ্যে পুলিশ অন্তত তিনবার ওই এলাকায় গুলি চালায়। অনেকেই আহত হয়েছে। যদিও সংখ্যাটা জানা যায়নি। আবার মিছিল শেষ হবার পর ডালহৌসি স্কোয়ার এলাকায় বেশ কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশদের আক্রমণ করেন। তাদের পাগড়ী খুলে নিয়ে আগুন লাগিয়ে দেন। আর এক গোর্খা অফিসার অনাদের হাতের নাগালে চলে এলে, তাকেও উত্তম মধ্যম খেতে হয়। তারপর আবার ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিটের দিকে গাড়ি নিয়ে কিছু ইউরোপীয় ব্যবসায়ী যেতে গেলে, তাদের গাড়ির উপর ইঁট-পাথর বর্ষণ করেন একদল বিক্ষোভকারী। ফলে ওই অঞ্চলে আর্মর্ড কার বা সশস্ত্র গাড়ি টহল মারতে থাকে ক্রমাগত। দক্ষিণ কলকাতায় দুপুরের গণ্ডগোল খানিক কমলে দেখা যায় একদল গোর্খা কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের পতাকা হাতে মিছিল করছেন। সেই দলে অনেক মহিলাও ছিলেন।
এইদিন রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা আক্রমণ করে কালিঘাট ট্রামডিপোয়। অন্তত ৯ টা ট্রাম পুড়িয়ে দেন তাঁরা। আগুনে ডিপোর ছাদ ভেঙে পড়ে যায়। ডিপোর ক্যাশ কাউন্টারে লুঠ করা হয় এবং তারপর যথারীতি লাগিয়ে দেওয়া হয় আগুন। দমকল বাহিনী কলকাতায় গণ্ডগোল ১১ তারিখে শুরু হওয়ার পর থেকে মোট ৮০ জায়গায় ডাক পেয়েছে; সবক্ষেত্রেই বিক্ষোভ সংক্রান্ত বিষয়। এছাড়া এইদিন রাতে কালিঘাট পোস্ট অফিস-এ আগুন লাগানো হয়। রসা রোড সংলগ্ন রেলওয়ে বুকিং অফিসেও হামলা চালানো হয়। সেখান থেকে টাকাপয়সা লুঠ করা হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার অন্তত দুটি জায়গায় জনতা বাঁশের ব্যারিকেড স্থাপন করেছেন। এদিকে মুসলিম লীগের কিছু স্বেচ্ছাসেবক খাদি প্রতিষ্ঠানের একটা লরীতে চড়ে, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পতাকা লাগিয়ে গোটা কল্কাতাময় শান্তির জন্য প্রচার চালায়। দক্ষিণ কলকাতায় আশুতোষ মুখার্জি রোডের কাছে সন্ধ্যেবেলায় সেই লরীতি আক্রান্ত হয়। লরীতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিছু স্বেচ্ছাসেবক এই ঘটনায় আহত হয়েছেন।
চৌরঙ্গীর সমস্ত ইউরোপীয় দোকান ও রেস্টুরেন্টের কাঁচ ভেঙে ফেলা হয়েছে। রাস্তার ফুটপাথ ভর্তি কাঁচের টুকরোয়। পার্ক স্ট্রিটের অবস্থাও তথৈবচ। মেট্রো সিনেমার সমস্ত কাঁচ ভেঙে ফেলা হয়েছে। পার্ক স্ট্রিটে ইউরোপীয়দের বাড়ি বাড়ি ঢুকে আসবাবপত্র সব টেনে তেনে রাস্তায় ফেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিক রো এলাকায় অন্তত ৬ ঘর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান থাকে। তাঁদের বাড়িতে জনতা আক্রমণ চালান। তবে স্থানীয় মানুষ আক্রমণ রত জনতাকে নিবৃত্ত করে ওনাদের প্রাণ রক্ষা করেন। উত্তেজনা প্রবণ এলাকাগুলিতে রাজনৈতিক নেতারা এবং কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের শান্তিবাহিনী দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরা মাঝ্রাত অব্দি প্রচার করেন সেখানে। মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। মিলিটারীরা তাঁদের কখনও কখনও চ্যালেঞ্জ করলেও শেষমেশ ছাড় দেয়।১৯
২০
১৩ ফেব্রুয়ারী : টুকরো স্মৃতি
গতকাল অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এম.এম. স্টুয়ার্ট আলুপুরে জনতার হাতে প্রহৃত হন। তাঁর গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। আর গতকাল রাতের দিকে চিত্তরঞ্জন এভিনিউ-এ এক পুলিশ সার্জেন্ট-কে ধরে পাশের সরু গলিতে নিয়ে গিয়ে প্রবল পেটানো হয়। তার জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। এমনকি রিভলভার-টাও কেড়ে নেওয়া হয়। এইদিন অর্থাৎ ১৩ তারিখ প্রথম গুলি চলে জগু বাবুর বাজার এলাকায়। আসলে গত রাতে সেখানে ব্যারিকেড সরিয়েছিল মিলিটারী। আজ ভোর না হতেই জনতা আবার ব্যারিকেড বানাতে শুরু করে রাস্তায়। তাই গুলি। এইদিন সকালে খিদিরপুরের মনসাতলায় একটা পোস্ট অফিসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু খানিকক্ষণের মধ্যেই সেই আগুন নিয়ন্ত্রণ করে ফেলা সম্ভব হয়। আর কলুটোলার ইউনিভার্সিটি পোস্ট অফিসেও আগুন লাগিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ জনতা। তিনটি দমকল ইঞ্জিন অনেক চেষ্টায় অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সকালে ওয়েলিংটন স্কোয়ার এলাকায় মিলিটারি অন্তত ছয় রাউন্ড গুলি চালায়। ভোর ৬ টা থেকে বেলা ১ টার মধ্যে মেডিক্যাল কলেজে ৩৬ জন আহত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ, বাকিরা কাঁদানে গ্যাসের কারণে অসুস্থ। কালিঘাট ট্রাম ডিপো এলাকায় এদিন সকালে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে জনতাকে ভাগিয়ে দেওয়া হয়। সকাল ১১ তা নাগাদ গিরীশ পার্ক এলাকায় মিলিটারী এবং সশস্ত্র পুলিশ আক্রমণ রত জনতার উপর গুলি চালায়। মোট ১১ জন আহত হয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন। উপার সার্কুলার রোডেও পুলিশ গুলি চালিয়েছে। তবে সেখানের হতাহতের খবর জানা যায়নি। সমস্ত দোকান বোধ থাকলেও এই দিন কিছু বাজার চালু হয়েছে। আর যে সামান্য গাড়ি চলেছে রাস্তায়, তাও চলেছে মিলিটারী পেট্রলের ভরসায়।
মানিকতলা এলাকায় মিলিটারীর সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ লুকোচুরি খেলা চলে। এখানে জনতা ট্রাম লাইনের তার কাটতে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। মিলিটারী পেট্রল দেখলেই তাঁরা গলিতে পালাচ্ছিলেন। আবার মিলিটারী চলে গেলেই রাস্তায় এসে হামলা। এদিকে মিলিটারী লরী ও ভ্যানের দিকে পাথরও ছোঁড়া হয়। পালটা কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে মিলিটারী। কিন্তু কাঁদানে গ্যাসে কোনও কাজ দেয় না। অবশেষে মিলিটারী গুলি চালায়। গুলিতে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। দুপুর ২ টো থেকে ৬ টার মধ্যে জগু বাবুর বাজারে পুলিশ তিনবার গুলি চালায়। আহত ১। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদিকে কলকাতা টেলিফোন এক্সচঞ্জের অবস্থা খুব খারাপ। ৫০০ মহিলা অপারেটরের মধ্যে মাত্র ৫০ জন উপস্থিত হতে পেরেছেন কাজে। বেশির ভাগ অপারেটর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হওয়ায় তাঁরা পৌঁছতে পারেননি। আর যারা বেড়িয়েছেন তাঁরাও বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে আক্রান্ত হয়েছেন।
কাঁকিনাড়ায় শ্রমিকদের উপর গুলি চালিয়েছে পুলিশ। মারা গেছেন ৪ জন শ্রমিক। আহত অন্তত ১৪ জন। আহতদের ৯ জনকে চুঁচুড়া হাসপাতালে আর ৫ জনকে ব্যারাকপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শ্রমিকরা কলকাতায় পুলিশের গুলি চালনার প্রতিবাদে এইদিন কাজে যোগ দেননি। প্রতীবাদ প্রদর্শন করতে বেলা ১১ টা নাগাদ তাঁরা রেল লাইনে অবরোধ করেন। আটকে যায় ৯৯ শান্তিপুর লোকাল। ২ টো ৩০ নাগাদ পুলিশের সাহায্য নিয়ে আবার ট্রেন চালানোর চেষ্টা হলে শ্রমিক্রা রুখে দাঁড়ান। সেই পরিস্থিতিতে গুলি চালায় পুলিশ। গুলি চালানোর সঙ্গে সঙ্গে শত শত শ্রমিক কাঁকিনাড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটে যান। তাঁরা প্ল্যাটফর্মের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেন। সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি রেল ইঞ্জিনেও আগুন লাগিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় কোনও ডাউন ট্রেন শিয়ালদহে আর পৌঁছতে পারেনি। আপ ট্রেনগুলিকে নৈহাটি দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বেলা বাড়তে কাঁকিনাড়ার বিক্ষোভ চারপাশে ছড়িয়ে যায়। নৈহাটি স্টেশনেও শ্রমিকরা আক্রমণ করেন। একটা রেক ভাঙচুরও করা হয়। তবে কেউ হতাহত হননি সেখানে। নৈহাটি থেকে কাঁকিনাড়া, প্রায় ৬ কিলোমিটার রেললাইন এবং তার আসেপাশের শ্রমিক এলাকায় কড়া মিলিটারী পেট্রলিং চলছে।
ধর্মতলা স্ট্রিট-এ থোবার্ন মেথডিস্ট চার্চে এইদিন বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন ধরিয়ে দেন। আগুন নেভাতে এগিয়ে আসে তিনটি দমকল ইঞ্জিন। কিন্তু সেগুলির উপর ইঁট পাথর দিয়ে ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে থাকেন জনতা। ফলে দমকলগুলি আবার ফায়ার স্টেশনে ফিরে যায়। পরে যথেষ্ট পুলিশ আর মিলিটারী নিয়ে তারা আগুন নেভাতে ফিরে আসে। এক ঘণ্টা পরে আগুন নিয়ন্ত্রনে এলেও ততক্ষণে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।
ই.আই. রেলওয়ে-তে জায়গায় জায়গায় জনতা ট্রেন আটকে রাখে। অনেক অনুনয় বিনয় করলে কংগ্রেস ও লীগের পতাকা লাগিয়ে কোনও কোনও ট্রেনকে যেতে দেওয়া হয়।
কলকাতার রাস্তায় যত্রতত্র নেপালীদের কিংবা গোর্খাদের দেখলে আক্রমণ করা শুরু হয়। কারন ব্রিটিশ বাহিনীর শক্তিশালী স্তম্ভ হল গোর্খারা। এবং ভারতীয়দের উপর লাঠি বা গুলি চালনায় গোর্খাদেরকেই সামনে ঠেলে দেয় ব্রিটিশরা। তাই গোর্খাদের উপর সাধারণ মানুষের রাগ প্রবল। এহেন পরিস্থিতিতে কংগ্রেস সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলকাতাবাসীর কাছে আবেদন রাখেন—. “1 am grieved to learn that some people are harbouring feelings of ill-will against the civilian Nepalis who reside in various parts of the city. They think that the aetions of the Gurkha Military .hould be avenged on all the Nepalese. If it is true, it is very regrettable. I would appeal to all the citizens not to give way to such evil feelings, and they should try to bring it home to others also. The Gurkhas employed in the Army have no grudge against Indians. When they carry out orders of their officers, they do so because they have been trained to follow the military discipline as a soldier, and they have no capacity to understand anything forther. It would be criminal to hold all the Nepalia responsible for it and to avenge- on them.”
পরিস্থিতি দেখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা এবং ভবানীপুর সেন্টারের পরীক্ষা অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা হবার কথা ছিল।২০
এইদিন রাত ৯টা পর্যন্ত ১৬৯ জন গুলিবিদ্ধ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। তার মধ্যে মৃত ১৫ জন। তারপর থেকে প্রতি মিনিটে একটা করে গুলিবিদ্ধ মানুষ এসে পৌঁছচ্ছেন হাসপাতালে। কোনও কোনও দেহ তো একদম সোজা মর্গে নিয়ে যেতে হচ্ছে। রক্তের ভীষণ অভাব। তাই একদিকে পাথর বনাম মিলিটারীর গুলির যুদ্ধ শহর জুড়ে, অন্য দিকে ব্লাড ব্যাংকের সামনে মানুষের প্রবল ভিড়। রক্ত দিতে। হিন্দু বা মুসলমান বেছে নয়, শুধু রক্ত দিতে নিজের ভাইবোনেদের জন্য।২১
২১
১৪ ফেব্রুয়ারি : টুকরো স্মৃতি
এইদিন সকাল ৯ টায় মট লেনে চায়ের দোকানে এক মুসলমান ব্যক্তি চা খাচ্ছিলেন। তাঁকে গুলি করে মারে মিলিটারি। আসলে ১৪ তারিখ নিরীহ সাধারণ মানুষকে যেখানেই যে অবস্থায় পেয়েছে মিলিটারি সোজা গুলি চালিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া ‘সন্দেহভাজন’ ব্যক্তিদের খোঁজে এইদিন তারা যত্রতত্র হানা দেয়। পদ্মপুকুর রোডে একটার সরকারী গ্রেন শপ দোকানের ক্রেতাদের অকারণে মারধোর করে মিলিটারি। বিভিন্ন এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে মিলিটারি লোকজনকে মারধোর করে। খোঁজ নেয়, বাড়িতে কোনও ‘গুণ্ডা অথবা মুসলমান’ লুকিয়ে আছে কিনা। শুধু তাই নয়। পুলিশ ও মিলিটারি সুযোগ মতন লুঠপাটও চালায়। খাবার হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ফলের দোকান এবং সিগারেটের দোকানে।
রাস্তার পথচারীদের ধরে ধরে পুলিশ এবং মিলিটারি, রাস্তার জঞ্জাল পরিষ্কার করতে বলে। অর্থাৎ রাস্তার বিভিন্ন ব্যারিকেড এবং অবরোধকারী উপাদান সাফা করতে বলে। কেউ অস্বীকার করলে বেপরোয়া মার দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত হন লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁকে মিলিটারি রাস্তা সাফ করতে বললে তিনি সোজাসুজি না করে দেন। সেই কারনে তাঁকে রাস্তার উপর ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়।
এইদিন সকাল থেকে কলকাতা শান্ত হয়ে যায়। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও, পুলিশ এবং মিলিটারী গাড়ির টহল ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে। প্রথম থেকে শুরু করে এইদিন পর্যন্ত সরকারী হিসাবে মোট ৮৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে অবশ্য পুলিশ-মিলিটারীর হিসেব ধরা হয়নি। এইদিন কলকাতায় কাঁচড়াপাড়া থেকে ৭৫ টি ট্রাকের একটা কনভয় এসে পৌঁছয়। এর মধ্যে মার্কিন সেনারা ছিলেন। এঁদের গত সন্ধ্যায় আক্রমণ করা হয়। ১৯ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। শুধু দু’জন বাদে। তাঁদের আঘাতের মাত্রা বেশি। তাই কলকাতায় চিকিৎসা করিয়ে তারপর দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঝামেলা শুরু হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত পুলিশের ৬ জন অফিসার সহ মোট ৩২ জন আহত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।২২
২২
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের চোখে ফেব্রুয়ারি ‘বিপ্লব’
“মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি চলছে কার্জন পার্কের দিকে। তারই মধ্যে একটি বাচ্চা ছেলে দেখি একটা লাঠির আগায় ছেঁড়া ন্যাকড়া জড়িয়ে মশাল জ্বালিয়েছে। মশালটা নিয়ে সে আস্তে আস্তে রাস্তা পার হল। সামনে মিলিটারি ট্রাক দাঁড়ানো তবু ভ্রূক্ষেপ নেই। কাছেই সাহেবদের একটা হোটেল। একতলার দরজা, জানালা আঁটা। ছেলেটা হাতে মশাল নিয়ে থাম বেয়ে উপরে উঠল। তারপর জ্বলন্ত জ্বলন্ত মশালটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ভেতরে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। সাহেবদের ভয়ার্ত চিৎকার। তারপর ছেলেটা থাম বেয়ে আস্তে আস্তে নিচে নেমে এল। মিলিটারি লরিটার দিকে ক্রুদ্ধচোখে একবার তাকিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে যখন সে চৌমাথায় এসে পৌঁছল, তখন লুঙি-পরা এক ফলওয়ালা ঝুড়ি হাতে ছুটতে ছুটতে এসে তার হাতে একটা কমলালেবু গুঁজে দিয়ে গেল। কমলালেবুটা ছাড়াচ্ছে এমন সময় পেছন দিক থেকে গুলির একটা শব্দ। ছেলেটা মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল।”২৩
গ্যাস শ্রমিক এবং ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী মহম্মদ কদম রসুলের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু প্রসঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন—“পরদিন সন্ধ্যাবেলা বস্তির সবাই দড়ির ভাঙা খাটিয়াগুলো রাস্তায় টেনে মিটিং করল। সবাই দু-চার আনা করে চাঁদা দেবে। বাঁচিয়ে রাখবে তারা কদম রসুলের অসহায় কাচ্চা-বাচ্চাদের। পয়সা দেবে যারা সারাদিন রিক্সা টানে, বিড়ি বাঁধে, ফেরি করে জিনিস বেচে, কল-কারখানায় কাজ করে। মরদ ছিল কদম রসুল। গ্যাস কোম্পানির ইউনিয়নের পান্ডা ছিল সে। মালিকের চোখরাঙানিকে কখনও ভয় করেনি। দিল ছিল তার। বস্তির সবাই তাকে ভালবাসে।”২৪
২৩
সমরেশ বসুর চোখে ফেব্রুয়ারি ‘বিপ্লব’
“১১ই ফেব্রুয়ারির পর পরিস্থিতি এমনভাবে বাঁক নিল যে পার্টি বুঝতেই পারল না শ্রমিকদের মনোভাব। পার্টি ধারণাও করতে পারেনি যে শ্রমিকের মেজাজ এমনভাবে চড়ে যাবে। জগদ্দলে আগুন জ্বলছে। শ্রমিকদের রোখা গেল না। ‘মাষ্টারজী হঠ যাও’—বলে তারা অকল্যান্ড মিলে ঢুকল। সব তাঁত ছুঁড়ে গঙ্গায় ফেলে দিল। তারপর সাহেবদের ধরে পিটল। অবশেষে শ্রান্ত অবসাদগ্রস্ত শ্রমিক ফিরে গেল। সেদিন যদি গুলি চলত—তাহলে কী সাঙ্ঘাতিক কান্ড হত। জগদ্দলের পার্টি সংগঠক সত্য মাস্টারের আফশোস—লাল ঝান্ডার কর্মী লছমন পর্যন্ত আমার কথা শুনল না।”২৫
২৪
দেবতার শাস্তি
নামটা কিন্তু হওয়া উচিত জনতার শাস্তি। ওই আর কী অর্থদণ্ড। আন্দোলনে জনতা কী কী ভুল করেছেন তার হিসেব মেলাতে গিয়ে দণ্ড দিলেন খোদ তৎকালীন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। আর সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা হল একেবারে রাজদরবারে। মানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। ১৮ মার্চ ১৯৪৬ হাউস অফ কমন্সে কলকাতার দাঙ্গা ও ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কী আলোচনা হয়েছিল শুনুন।
“Mr Sorensen: To ask the Under Secretary of State for India, if he is aware that certain Indian political leaders have suggested Indians should personally share the financial burden of restoring church property destroyed in the recent disturbances; to what extent the Indian Government or the provincial governments are responsible for restoration and repair; if the offer has been accepted; and what is the estimated cost of the damage.
Mr A. Henderson: I have seen in the Press a statement by Maulana Abul Kalam Azad that he had visited the American Episcopal Methodist Church damaged in recent disturbances in Calcutta, and had suggested to the Church Committee that the damage should be made good by contributions from the citizens, and that he is issuing instructions to local Congress Committees to raise the necessary funds. Beyond this I have no information regarding the suggestion referred to by my Hon. Friend or the estimated cost of damage to church property, but I will make enquiries. With regard to the responsibility for the cost of repair and restoration I would invite attention to the replv which I gave the Hon. Member for Cheltenham on the 4th March.”২৬
২৫
যারা লড়ে তারই দায়…
হ্যাঁ কে কতটা দায়ী ফেব্রুয়ারির কলকাতার জন্য, সে নিয়ে চুল চেরা বিচার করেছেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার। তাঁর এই সংক্রান্ত রিপোর্ট পেশ হয় ৩ এপ্রিল ১৯৪৬।
ছাত্রদের বিরদ্ধে ভাঙচুর দাঙ্গা হাঙ্গামার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই সেই কথা নিজেই স্বীকার করেছেন কমিশনার। কিন্তু ঘটনা পরম্পরার চেন রিয়াকশন তৈরি করতে ছাত্রদের ভূমিকা যে প্রাথমিক ছিল সেটাও তিনি মনে করেছেন। সুতরাং তাঁর বিচারে এইসব দাঙ্গা হাঙ্গামার জন্য ছাত্ররা অন্যতম দায়ী।
মুসলিম লীগ কেন ফেব্রুয়ারির “গণ্ডগোলে” বেশি অংশ নিল, সেই বিষয়েও মুসলিম ছাত্রদেরকেই দায়ী করছেন পুলিশ কমিশনার। আসলে মুসলিম লীগ এবং তার বাংলার শীর্ষ নেতা সুরাবর্দী জনমত হারানোর নাকি কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি। সামনে নির্বাচন, তাই সেইভাবেই নিজেদের জনসমক্ষে তুলে ধরতে হয়েছে মুসলিম লীগকে। সুরাবর্দী সাহেব জানতেন যে ১২ তারিখের মিছিলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে না। তাই তিনি নিজে সামনে থেকে মিছিলে নেতৃত্ব দেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে হিন্দু-মুসলিম এবং কংগ্রেস-লীগ ঐক্যের প্রতীক হিসাবে সামনে তুলে ধরতে পারলেন। এর প্রভাব ভোটে পড়বে বলে নিশ্চিত ছিলেন তিনি। শরৎ বসু নভেম্বর ৪৫-এর বিক্ষোভের সময় অকুস্থলে না গিয়ে জনপ্রিয়তা হারিয়েছিলেন বহুলাংশে। তার থেকে শিক্ষা নিয়েছেন মুসলিম লীগ নেতারা। কমিশনারের মতে যদি সামনে নির্বাচন না থাকতো, তাহলে লীগ নেতারা ছাত্রদের এতো লাগামছাড়া হতে দিতেন না কিছুতেই।
আর গণ্ডগোলের সবচেয়ে বড় জিম্মাদার হল কমিউনিস্ট পার্টি। নিম্ন শ্রেণীর লোকের মধ্যে তাদের সমর্থক বেশি। জঙ্গি কার্যকলাপ ধারাবাহিকভাবে না চালালে তাঁদের সমর্থকেরা কংগ্রেসের দিকে চলে যেতে পারে, তাই এরা সবসময় ঝামেলা পাকাবার ধান্ধায় থাকে। সশস্ত্র বিপ্লবেও এরা বিশ্বাস করে তো বটেই, ফেব্রুয়ারির গণ্ডগোলের শুরুর দিন থেকে, মানে ১১ ফেব্রুয়ারি থেকেই এরা ঝামেলায় সামিল ছিল। ১২ তারিখ শ্রমিক-পরিবহন ইত্যাদি ধর্মঘট ডেকে এরা ঝামেলা আরও বাড়ায়। আর শহর জুড়ে উচ্ছৃঙ্খল কার্যকলাপে যে এদের ইন্ধন ছিল, সে তো সকলেই জানে। পুলিশ আর মিলিটারি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেবার পরেও নাকি কমিউনিস্টরা পরিকল্পনা করছিল নৈরাজ্য সৃষ্টির।
তবে পুলিশ কমিশনার ক্লিন সার্টিফিকেট দিয়েছেন কংগ্রেসকে। ব্যক্তিগতভাবে কে কী করেছেন সে আলাদা ব্যাপার, কিন্তু সাংগঠনিক ভাবে কংগ্রেস এইসব ঝঞ্ঝাটের মধ্যে ছিল না কোনোভাবেই।
আর এই ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ থেকে পুলিশ শিক্ষা নিয়েছে যে ছোটখাটো যেকোনো জমায়েত থেকেই গণ্ডগোল বাঁধতে পারে। তা ছাত্রছাত্রীদের নিরীহ জমায়েতই হোক না কেন। তাই জমায়েত থেকে বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আর সরকার বিরোধী যে লাগাতার প্রচার রাজনৈতিক নেতারা করে চলেছেন সেইসব কথা মানুষ রীতিমতো বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছেন। মানুষের তাই সরকারের প্রতি কোনরকম বিশ্বাস তো দূর, কোনও ভয় বা শ্রদ্ধাও নেই। আর পরিবারের অভিবাবক মা শিক্ষকদের তো নতুন প্রজন্মের উপর কোনও নিয়ন্ত্রণই নেই, তাই যাকে বলে উচ্ছন্নে গেছে এই যুব প্রজন্ম। পুলিশ কমিশনার তাই অভিবাবকদের উপর প্রবল ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। সমাজের সর্বস্তরেই যে প্রয়োজন কর্তৃত্বের। শুধু পুলিশ প্রশাসন দিয়ে আর কি চলে? আর ভারতীয়দের নেচার মানে প্রকৃতি চরিত্র ইত্যাদি নিয়ে খানিক কুবাক্য বলে পুলিশ কমিশনার তাঁর বক্তব্যে ইতি টেনেছেন।২৭
লেখকের কৈফিয়ত
আচ্ছা ৪৬ সালের দাঙ্গা নিয়ে চর্চায় বাঙালীর এতো উৎফুল্লতা কেন? হ্যাঁ দেশভাগ বাঙালীর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনকে চিরদিনের মত দ্বিধাবিভক্ত এবং পঙ্গু করে দিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার জন্য শুধু মাত্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার স্মৃতিই রোমন্থন করা হবে কেন? দাঙ্গার সঙ্গে নিঃসন্দেহে কোনও ভাল স্মৃতি জড়িয়ে থাকা সম্ভব নয় আমাদের। আরও একটা বিষয় মনে হয়, দেশভাগ এবং তার পিছনের যে রাজনীতি অথবা যে ঘটনাক্রম রয়েছে তার উৎসও কিন্তু এই দাঙ্গা নয়। বরং দাঙ্গা আমাদের ভিতরকার পশুপ্রবৃত্তির স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। আর সেটা সগর্বে লালন করাচ্ছে দেশভাগ ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতি। বাকি পড়ে থাকে টুকরো মন। বাঙালীর সেই ভেঙে যাওয়া হৃদয়কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি যুগ যুগ ধরে তার ফায়দা লোটার ব্যবস্থা করে রেখেছে। আর ক্রমান্বয়ে আমরা ভুলে গেছি আমাদের সেই ইতিহাসকে, যেই ইতিহাস আমাদের কথা বলতে শিখিয়েছে, জানিয়েছে আমাদের সংস্কৃতি কী আর এমনকি ৪৬-এর রক্তঝরা দিনগুলোতে আমাদের নতুন একটা ভারতবর্ষের স্বপ্নও দেখিয়েছে। যেই দেশটা আমরা দেখিনি, হয়তো কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু যেই দেশটার স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের কোনও পূর্বপুরুষ, সেই স্বপ্নটা মিশে রয়েছে আমাদের রক্তে আমাদের চেতনায়। আমরা বাঙালী বলেই হয়তো বা। তবে সার-জল না পেয়ে প্রকট হয়নি, প্রচ্ছন্নে ঘুমিয়ে রয়েছে।
সেই স্বপ্নটা আর হারিয়ে যাওয়া ছেচল্লিশের কলকাতার কথাই এই প্রবন্ধে লিখেছি। আমাদের ইতিহাসটা কেমন হতে পারত? মানে এমন একটা সময়, যখন সবে কিনা বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। গোটা বিশ্বজুড়ে পরাস্ত ফ্যাসিবাদ। আর গণতন্ত্র-স্বাধীনতা ইত্যাদির কথা বলে মুক্তিদূত বনার প্রচেষ্টায় আছে মিত্রশক্তি। সেই মিত্রশক্তির মধ্যে আবার বড় বড় ফাটল। ইংল্যান্ড-ফ্রান্স ইত্যাদি বড় বড় সাম্রাজ্যবাদী ‘শক্তির দিন তো গেল সন্ধ্যে হল…’ রব উঠে গেছে। সমস্ত উপনিবেশে শুরু হয়েছে মুক্তি সংগ্রাম। স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের জন্যই যদি যুদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে উপনিবেশদের স্বাধীনতা নেই কেন? সাম্রাজ্যবাদী দাদারা মহাবিপদে পড়ে মুখ লুকোচ্ছে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বড় শক্তি হয়ে ওঠা আংকেল টমের দেশের পিছনে। মিত্রশক্তির আর এক পার্টনার সোভিয়েত রাশিয়া তো কমিউনিস্ট আর সে সর্বত্র কমিউনিজমের ভয় দেখাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপ হাতছাড়া হয়েছে, চীনও গেল বলে। আর সমস্ত উপনিবেশে প্রভাব বাড়ছে ওঁদের। এখন মার্কিন শক্তিই ভরসা। ঠিক এমনই এক মুহূর্তে উপমহাদেশের এতো বড় উপনিবেশকে সামলানো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছিল ব্রিটেনের পক্ষে।
তাও হয়তো কংগ্রেস বনাম মুসলিম লীগ দুই পক্ষকে লড়িয়ে দিয়ে হিন্দু-মুসলমান ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ চালিয়ে কিছুদিন সামাল দেওয়া যেত, কিন্তু বিধি বাম। বীরত্ব দেখিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের ভারতে নিয়ে এসে বিচার চালাতে গিয়ে মহাবিপদ তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশের মানুষ আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরত্বে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, অন্যদিকে তাঁরা সেই বন্দীদের মুক্তির দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। আর যে তিনজনকে লালকেল্লায় বিচারের জন্য ইংরেজরা তুলেছেন তাঁরা হলেন শাহ্ নাওয়াজ খান (মুসলিম), পি.কে. সাইগল (হিন্দু) এবং গুরুবক্স সিং ধীলন (শিখ)। সুতরাং আজাদ হিন্দের প্রথম রাউন্ড বিচার প্রক্রিয়ায় হিন্দু-মুসলিম-শিখ ঐক্য নিশ্চিত করে দিল খোদ ব্রিটিশ সরকারই। আর দেশের নেতাদের তখন আজাদ হিন্দ প্রেম উথলে উঠেছে। সর্বত্র তপ্ত ভাষণ রেখে বেড়াচ্ছেন তাঁরা। সর্বাগ্রে রয়েছেন খোদ পন্ডিত জওহরলাল নেহরু। সমাজতন্ত্রী কংগ্রেস কর্মীরা তো আছেনই। “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনের অবিসংবাদী নেত্রী অরুণা আসফ আলি তখন আজাদ হিন্দ সরকার মডেল-কে সামনে রেখে দেশের যুবক-যুবতীদের প্রকাশ্যে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে সামিল হতে বলছেন। ইংরেজ শিবিরে প্রায় ত্রাহি ত্রাহি রব। বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না ভারতীয় সেনাদের উপরেও। তাঁদের কাঁধেও যেন আজাদ হিন্দ ভর করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবিতে দু-দু’বার গণ অভ্যুত্থান হয়ে যায় কলকাতায়। সেই অভ্যুত্থানের ছবিই আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এখানে। আর সজ্ঞানে চেষ্টা করেছি কলকাতার বাইরের ঘটনাগুলিকে বাদ রাখতে। কারণ আমার লক্ষ্য ছিল শুধু ছেচল্লিশের ‘বিকল্প’ এক কলকাতার চিত্ররূপ হাজির করা।
এই অভ্যুত্থানগুলোর কয়েকটা বৈশিষ্ট্যর উপর আলোকপাত একেবারে না করে পারছি না। প্রথমত, ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বে প্রতিবাদের সূচনা। রাজনৈতিক দলের নেতারা যেমন অবস্থানই নিক, এই পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবীতে দলমত নির্বিশেষে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। এবং কংগ্রেস-লীগ-শিখ-খাকসার-আর কমিউনিস্ট লাল পতাকাকে একসঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরাই নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সূচনা বিন্দুতেই। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নেতাদের ভুমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। তখন সকলেই চলছেন যে যার ধান্ধায়। দু’চারজনের কথা বাদ দিলে বেশির ভাগই তাই। নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি দুই ক্ষেত্রেই প্রথম সারির কংগ্রেস নেতারা আন্দোলনকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিলেন। যদিও আজাদ হিন্দ-এর বিচার নিয়ে তাঁদের চিন্তার কমতি ছিল না। না মানে চিন্তা থাক বা না থাক, চিৎকার চেঁচামেচির কোনও অন্ত ছিল না। কিন্তু ওইটুকুই। মুখেন মারিতং জগতম্। যখন সত্যিই আন্দোলনের সূচনা হল তখন তাঁরা থামাতে ব্যস্ত-বিরক্ত। ৪৬ সালের আসন্ন নির্বাচন তাঁদের এমন ভূমিকা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল বলে মনে হয়। কারণ ক্ষমতা হাতবদলের আগে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ তথা সংবিধান সভায় কর্তৃত্ব না রাখতে পারলে আর এতদিন রাজনীতি করে হল কী! মুসলিম লীগ নেতাদের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। নেহাত তাঁরা ছিলেন কংগ্রেসের তুলনায় অনেক নবীন এবং তখনও পাকিস্তান প্রস্তাবের কী হাল হবে সেই নিয়ে তাঁরা সম্ভবত সংশয়ে ছিলেন। আসন্ন নির্বাচনের আগে নিজেদের জনদরদী হিসাবে তুলে ধরতে, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসাবে আর তাঁরাও কংগ্রেসের মতন গণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পারেন এটা দেখাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। নভেম্বরে লীগ নেতৃত্ব চুপচাপ সবটা পর্যবেক্ষণ করলেও ফেব্রুয়ারি-তে মুসলিম ছাত্রদের চাপে খোদ সুরাবর্দী মিছিলের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে, নিজেকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসাবে আসন্ন নির্বাচনের আগে তুলে ধরেন। হিন্দু মহাসভার কথা নভেম্বরের ২২ তারিখের মিছিলে তাদের অংশগ্রহণ থেকে জেনেছি। শ্যামাপ্রসাদও নভেম্বর ২১-এ ছাত্রদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু তারপর যে তাঁরা কোথায় ভ্যানিশ হয়ে গেলেন কে জানে? ফেব্রুয়ারিতে কোথাও তাদের কোনও পাত্তা নেই। যদি সামগ্রিকভাবে এদের ভূমিকার কথা ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বরের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, তাহলে এমনটা বলা যেতে পারে—আছি কিন্তু নেই, মাত্র এই। কমিউনিস্ট পার্টির কথা বরং বলা চলে বাকিদের তুলনায় বেশ ভাল। ৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের বিরোধিতা করে মোটামুটি ভাল মতই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন তাঁরা। সেই ভাবমূর্তি তাঁদের উজ্জ্বল হয় নভেম্বরে, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকায়। বাকিদের চেয়ে ভাল বলছি ঠিকই, তার কারণ তাঁরা পি.সি. যোশির নির্দেশ মেনে জনসাধারণের পাশে থাকবার কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিকে বোঝা, তাকে কাজে লাগানোর কথা ভাবা, বিপ্লবের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কী হচ্ছে বুঝতে না পারা ইত্যাদি সমস্ত বৈশিষ্ট্যেই কমিউনিস্ট-রা উজ্জ্বল ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে সোমনাথ লাহিড়ীর মতন কোনও কোনও নেতা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝলেও স্বাধীনতার পাতায় অগ্নিঝরা ভাষায় ডাক দেওয়া ছাড়া তেমন খুব একটা কিছু করে উঠতে পারেননি। আসলে জনতা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল, কমিউনিস্টরা ভাবছিলেন মিস্ড কল দিয়ে জনতাকে দাঁড়াতে বলবেন কিনা। দেবেন কি দেবেন না ভাবতে ভাবতেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। তৃতীয়ত, ব্রিটিশ প্রশাসকেরা ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর বিক্ষোভে অত্যন্ত দমনমূলক নীতি নিয়েছিলেন। তাঁরা অতটা বাড়াবাড়ি না করলে পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত তখনই হয়তো হতো না। কিন্তু এসব তাঁরা করেছিলেন আসন্ন বিপ্লবের ভয় পেয়ে। বিপ্লবের ভয় তাঁদের দু’শ বছরের সাম্রাজ্যবাদী অভিজ্ঞতাকে ফুটপাথে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। আর তাঁরা অসহায়ের মতন হাত-পা ছুঁড়ছিলেন। চতুর্থত, কলকাতার নিম্নবর্গ; নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের ম্যান অফ দ্য ম্যাচ তো বটেই, এমনকি বিপ্লবী পরিস্থিতি বুঝে শাসকের মনে আতঙ্ক ধরানোর প্রশ্নে তাঁদের ম্যান অফ দ্য সিরিজ খেতাবও প্রাপ্য। সেইসব মানুষ এঁরা, যাঁদের জাতীয় হাতিয়ার পাথর-সোডা ওয়াটার বোতল-ইঁট; এঁরা রাস্তায় ব্যারিকেড বানান ময়লা ফেলার ডাস্টবিন আর জীবিকা অর্জনের একমাত্র উপায় ঠেলাগাড়ি বা রিক্সা দিয়ে। একবার ভয় কেটে গেলে বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন মারতে অথবা মরতে। মরেন বেশি মারেন কম। কিন্তু উপমহাদেশের ইতিহাসের পাতা তাঁদের নায়ক বলে কখনও বন্দনা করেনি। অথচ ইতিহাসের প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা দেখতে পাবো এঁদেরই রক্তে-ঘামে-চোখের জলে-পরিশ্রমে এগিয়েছে এই উপমহাদেশের ইতিহাসের কালের ঘোড়া। আর এঁরা ইতিহাসের প্রতিটি বিপ্লবী লগ্নে প্রতিরোধে-প্রতিবাদে-প্রতিশোধে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে মেরেছেন আর মরেছেন, উপনিবেশ কালেও, তার আগেও আর তার পরেও অর্থাৎ বর্তমান কালেও। পঞ্চমত, শ্রমিকশ্রেণীর কথা বলবো। নভেম্বর হোক বা ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করার পর তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে ধর্মঘট করে, কাজ বন্ধ রেখে, পথ কিংবা রেললাইন অবরোধ করে, গুলি খেয়ে মরে আর মেরে নিজেদের ঐতিহাসিক কর্তব্য পালনে প্রস্তুত আছি, জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ‘কমরেড’দের পা চালিয়ে এগোতে যে অনেক দেরী হয়ে গেছে! তাই মিস্ড কল আর এসে পৌঁছয়নি।
যাই হোক, শেষ হয়ে হইল না শেষের মতো বলি, আচ্ছা ফেব্রুয়ারি ৪৬-এর এই কলকাতা আগস্ট ৪৬-এ বদলে গেল কীকরে? উত্তর দেবার পরিসর এই প্রবন্ধ নয়। পরে কখনও সে উত্তর খোঁজার সুযোগ পেলে আবার আপনাদের দরবারে হাজির হব। আপাতত বিদায়।
তথ্যসূত্র
১। Towards Freedom 1945, 796-798.
২। Towards Freedom 1945, 804-807.
৩। Towards Freedom 1945, 807-811.
৪। উত্তাল চল্লিশ, ৪৭।
৫। Towards Freedom 1945, 802.
৬। Towards Freedom 1945, 802-803.
৭। Political Upsurges in Post-War India, 6.
৮। Towards Freedom 1945, 811-821.
৯। Towards Freedom 1945, 821-823.
১০। Towards Freedom 1946, 27.
১১। উত্তাল চল্লিশ, ৫৭।
১২। উত্তাল চল্লিশ, ৫৭-৬০।
১৩। Indian Annual Register 1946 1, 270.
১৪। উত্তাল চল্লিশ, ৬০।
১৫। Towards Freedom 1946, 28.
১৬। Towards Freedom 1946, 29-30.
১৭। উত্তাল চল্লিশ, ৬২-৬৬।
১৮। Towards Freedom 1946, 34-38.
১৯। Indian Annual Register 1946 1, 271-273
২০। Indian Annual Register 1946 1, 275-278.
২১। উত্তাল চল্লিশ, ৬৮।
২২। Indian Annual Register 1946 1, 280.
২৩। উত্তাল চল্লিশ, ৬৯।
২৪। উত্তাল চল্লিশ, ৭০।
২৫। উত্তাল চল্লিশ, ৭৯।
২৬। Towards Freedom 1946, 40.
২৭। Towards Freedom 1946, 40-42.
গ্রন্থপঞ্জি
Prasad, Bimal, ed. Towards Freedom: Documents on the Movement for Independence in India 1945. New Delhi: Oxford U.P., 2007.
সেনগুপ্ত, অমলেন্দু। উত্তাল চল্লিশ অসমাপ্ত বিপ্লব। কলকাতা: পার্ল পাবলিশার্স, ১৯৫৭।
Ray, Keka Dutta. Political Upsurges in Post-War India (1945-46). New Delhi: Intellectual Publishing House, 1992.
Sarkar, Sumit, ed. Towards Freedom: Documents on the Movement for Independence in India 1946, Part 1. New Delhi: Oxford U.P., 2007.
Mitra, Nripendra Nath, ed. The Indian Annual Register, Volume 1, January-June 1946. Calcutta: The Annual Register Office).
Chattopadhyay, Gautam, “Bengal Students in Revolt Against
the Raj.” In Myth and Reality: The Struggle for Freedom
in India, 1945-47, edited by Amit Kumar Gupta, 152-171. New Delhi: Manohar Publications, 1987.
Sarkar, Sumit. “Popular Movements and National Leadership, 1945-47.” Economic and Political Weekly 17, no. 14/16 (April, 1982): 677-689.
Chattopadhyay, Gautam, “The Almost Revolution: A Case Study of India in February 1946.” In Esaays in Honour of Prof. S.C. Sarkar, ed. Diptendra Banerjee, Boudhayan Chattopadhyay, Binoy Chaudhuri, Barun De, Aniruddha Ray, Asok Sen, Mohit Sen, Pradip Sinha, 427-450. New Delhi: People’s Publishing House, 1976.
রায়চৌধুরী, লাডলী মোহন। আজাদহিন্দ ফৌজের কোর্ট মার্শাল ও গণ-বিক্ষোভ। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯৬।

