শুধু ভিল প্রদেশ নয়: হিন্দুত্ববাদের ভয়ের কারণ, ভিলরা আর হিন্দু থাকতে চান না

 

Tribals gathered in Rajasthan demanding a new state – ‘Bhil Pradesh’. (Representational)

রক্তিম ঘোষ

ভিল জনজাতির ব্যাপক জমায়েত দেখা গেল রাজস্থানের মানগড়ে। সেখান থেকে আওয়াজ উঠে এল ভিলদের নিজেদের রাজ্য চাই। চাই ভিল প্রদেশ। ভিল জনজাতির সর্ববৃহৎ সামাজিক সংগঠনের নাম আদিবাসী পরিবার। আদিবাসী পরিবার ছাড়াও আরও ৩৫টি সংগঠন মিলে গত ১৮ জুলাই রাজস্থানের মানগড়ে এক মহামিছিলের ডাক দেয়। বাঁশওয়ারার মানগড় ধামের এই মহামিছিল ও জনসভায় মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত ও মহারাষ্ট্র থেকেও বহু ভিল জনজাতির মানুষ অংশ নেন। রাজস্থান সরকারের গোয়েন্দা দফতরের কল্যাণে অবশ্য এই মহামিছিল যেসব অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে গেছে, সেখানে সেখানে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সে যাই হোক, ভারত আদিবাসী পার্টি (বিএপি) কিংবা ভারত ট্রাইবাল পার্টি (বিটিপি)-র ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে বাঁশওয়ারা থেকে জয়ী হওয়া সাংসদ রাজকুমার রোয়াত বলেছেন, “ভিল প্রদেশের দাবি নতুন নয়, বিএপি জোরের সঙ্গে এই দাবি তুলে ধরছে। এই মহামিছিলের পর একটা প্রতিনিধি দল এই নতুন রাজ্য তৈরি প্রস্তাব নিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।”

কিন্তু ভিলদের এ হেন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্থান রাজ্যের ট্রাইবাল অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রী বাবুলাল খারারির বক্তব্য হলো, জাত বা ধর্মের নিরিখে রাজ্য তৈরি করা উচিত নয়। কারণ সেইভাবে রাজ্য তৈরি হলে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। প্রথমত, ভিল জনজাতিটি কোনো জাত ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। আর দ্বিতীয়ত তারা ধর্মের ভিত্তিতে রাজ্যের দাবি করেননি। এবার প্রশ্ন হলো একটা জনজাতি কি জাতিসত্ত্বা হয়ে ওঠার দাবি করতে পারে? ঝাড়খণ্ড বা ছত্তিসগড় কিন্তু জনজাতি অধ্যুষিত রাজ্যই বটে। যদিও এ ছাড়াও মন্ত্রী মশাইয়ের কথার ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করবার বড়ো বড়ো যুক্তি আছে। একেবারে মূল থেকে ভেবে দেখলে দেশ-কাল-রাজ্যপাট অনেক কিছুই ঘেঁটে যাবে। যথা সময়ে সে আলোচনায় আসবো। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের কথার তাৎপর্য আরও স্পষ্ট করে বোঝা যাবে তাঁর বক্তব্যের যদি আর একটু অংশ দেখা যায়। তিনি বলেছেন, “যারা নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন করেছে, তাদের ট্রাইবাল রিজার্ভেশন পাওয়া উচিত নয়।” না ভিল জনজাতির কেউ কেউ যদি বা ইসলাম বা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে থাকে, একথা কিন্তু তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলছেন না। তাহলে কাদেরকে বলছেন? উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে এক্মাস পিছনের একটি ঘটনায়।

গত মাসে অর্থাৎ জুন মাসের ২১ তারিখ ভিল জনজাতির এক নেতা জানিয়েছিলেন, তিনি এবং তাঁর সমর্থকরা হিন্দু নন। সেই বক্তব্যে ভয়ানক ক্ষেপে ওঠে সরকার পক্ষ। রাজস্থানের অপর এক মন্ত্রী মদন দিলওয়ার বলেছিলেন, “আমরা ওনার পূর্ব পুরুষদের ধরে জিজ্ঞাসা করবো উনি হিন্দু কিনা—আর যদি তিনি বলেন যে তিনি হিন্দু নন, তাহলে আমরা ওনার ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখবো, উনি আদৌ ওনার বাবার সন্তান কিনা।” অর্থাৎ ভিলদের হিন্দু হয়ে থাকতে না চাওয়াটা গায়ে লেগে গেছে হিন্দুত্ববাদী রাজস্থান সরকার পক্ষের। সেটাকে তাঁরা ভয় বা আতঙ্কের চোখে দেখছেন বলেই এমন হুমকি দিয়ে মন্তব্য। যদিও ভয়ের বহিঃপ্রকাশ এই একভাবেই হয়নি। ১৮ জুলাইয়ের মহামিছিল দেখে দিলওয়ার ২১ জুন করা এই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে ১৮ জুলাই তিনি বলেন, “হিন্দুরা হলেন সমাজের শ্রেষ্ঠ অংশ। যদি আমার বক্তব্য বিরোধীদের বা আদিবাসী ভাইদের আহত করে থাকে, তাহলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।” অর্থাৎ ভাঙলেন তাও মচকালেন না। সে তো অন্য প্রসঙ্গ, তবে ১৮-র এই মহামিছিলে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী পরিবার সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যা মানেকা দামোর। তিনি বলেন, জনজাতির মহিলাদের পণ্ডিতদের নির্দেশ মেনে চলা উচিত নয়। তিনি জানান, আদিবাসী পরিবারে সিঁদুর লাগানো হয় না, মঙ্গলসূত্র পরবার কোনও রেওয়াজ নেই। জনজাতি পরিবারের মেয়েদের লেখাপড়ায় মন দেওয়া উচিত। এখন থেকে বন্ধ করা উচিত সমস্ত রকমের উপোস। আমরা হিন্দু নই।

তার উপর আবার বিএপি-এর সাংসদ রাজকুমার রোয়াত বলেছেন, “১৯১৩ সালে আদিবাসীদের আত্মবলিদান শুধু ভক্তি আন্দোলনের কারণে নয়, ভিল প্রদেশের দাবিতেও।” আর সবশেষে তিনি সরকার পক্ষে আদিবাসীদের হ্নিদু না থাকা নিয়ে ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়ার যথাযথ উত্তর দিয়েছেন। সব কথার সার কথা যাকে বলা যায়। এমনিতেই বিএপি রাজনৈতিক দল হিসাবে আরএসএস-এর প্রভাব ঠেকানোর জন্য এবং হিন্দুত্বের আগ্রাসনকে রোখার জন্য নিজেদের আদিবাসী সংস্কৃতিকে তুলে ধরবার ডাক রেখেছে। রোয়াত, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমাদের নিজস্ব প্রথাগত নিয়ম কানুন রয়েছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট-ও তার কিছু রায়ে বলেছেন যে জনজাতিরা হিন্দু নয়। আমরা ধর্ম আসবার আগেকার লোক।” উপমহাদেশে ধর্ম বলতে যা যা বোঝানো হয়, সেসবের আগে থেকেই উপমহাদেশে হাজির ছিলেন জনজাতির মানুষেরা। তাঁদেরকে কি জোর করে হিন্দু বানিয়ে রেখে দেওয়া সম্ভব? মানুষ এনেছে ধর্ম—ধর্ম আনেনি মানুষ কোনও। সোজা কথায় সিধা বাস্তব। আর এর মধ্যেই রয়েছে অনেক জটিল ধাঁধার উত্তর। সে উত্তর খুঁজবো আমরা। দেখবো এই ভিল আন্দোলন দিয়ে আমাদের অর্থাৎ পশ্চিম বাংলার মানুষদের কী আসে যায়! কিন্তু তার আগে দেখে নেওয়া যাক রোয়াত ১৯১৩ সালের কোন ভিল আন্দোলনের কথা বলছেন। কিন্তু সবার আগে দেখবো, ভিল কারা? তারা যে ভিল প্রদেশ চাইছেন সেটার আঞ্চলিক বিন্যাস কেমন।

ভিল প্রদেশের চেহারা কেমন হবে?

ভিলরা ভারতের প্রাচীনতম জনজাতি। এই মুহূর্তে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনজাতি হলেন তাঁরা। গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ভিল জনজাতির মানুষের সংখ্যা ১ কোটি। ভিল কথাটা এসেছে একটা দ্রাবিড় শব্দ থেকে। শব্দটি হলো ‘বিল্লু’। এই শব্দের অর্থ হলো তীর-ধনুক। বর্তমানে ভিল সম্প্রদায়ের যাদের গুজরাতে বসতি, তাঁরা কর্মসূত্রে মূলত কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে। অনেকেই এখানে কৃষি শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। অবশ্য এই জনজাতির অনেকেই মূর্তি নির্মাণের পেশার সঙ্গে জড়িত। ভিল জনজাতির মানুষরা একলব্যের আরাধনা করেন। একলব্যই ওনাদের কাছে রোল মডেল। হিন্দুস্তান টাইমসের একটি রিপোর্ট অনুসারে ভিল জাতির মানুষরা কখনও তীর-ধনুক চালানোর সময় বুড়ো আঙুল ব্যবহার করেন না। করতে তাঁদের আত্মসম্মানে বাঁধে। দ্রোণাচার্যের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে এ হলো তাঁদের যুগান্তরের প্রতিবাদ।        

ভিল প্রদেশের দাবি নিয়ে জমায়েত হয়েছে রাজস্থানে ঠিকই কিন্তু এই দাবির প্রভাব পড়বে গুজরাত, মহারাষ্ট্র এবং মধ্য প্রদেশেও। যে ভিল প্রদেশ দাবি করা হয়েছে তাতে, এই চারটি রাজ্যের ৪৯টি জেলা দাবি করা রাজ্যটির আওতায় আসছে। সুরাট, ইন্দোর, কোটা, থানের মতন বড়ো বড়ো বাণিজ্য কেন্দ্র এই জেলাগুলির মধ্যে অবস্থান করে। এছাড়াও ভিল জনজাতির মানুষদের দেখা পাওয়া যায় কর্ণাটক, অন্ধ্র প্রদেশ, এমনকি ত্রিপুরার চা বাগানেও।  

যে চারটি রাজ্যে প্রস্তাবিত ভিল প্রদেশের দাবির প্রভাব পড়তে চলেছে, তাদের মধ্যে মধ্য প্রদেশের জনসংখ্যার ২১.১%, গুজরাতের ১৪.৮%, রাজস্থানের ১৩.৪% এবং মহারাষ্ট্রের ৯.৩% মানুষ জনজাতির বাসিন্দা। প্রসঙ্গত এই সমস্ত রাজ্যতেই সরকারে রয়েছে বিজেপি। সুতরাং আলাদা ভিল প্রদেশের দাবি তাদের মাথাব্যথার বিশেষ কারণ হবে বইকি।

যদিও আমি আগেই দেখানোর চেষ্টা করেছি যে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী শক্তির মূল চিন্তার বিষয় কেবল আলাদা প্রদেশের দাবিটাই নয়, বরং জনজাতির হিন্দু পরিচয় অস্বীকার করাটা এদের কাছে আতঙ্কের বিষয়। সে আলোচনায় ফিরবার আগে এক চোখ দেখে নিই ভিল জাতির ইতিহাস। জালিয়ানওয়ালাবাগের আগে ঘটে যাওয়া নাম না জানা, ইতিহাস বইয়ের পাতায় ঠাঁই না পাওয়া অন্য এক জালিয়ানওয়ালার কথা।

১৯১৩-র জালিয়ানওয়ালার কথা

সাব হেডিং-টা এমনই রাখতে হলো। ইতিহাসের মুছে যাওয়া/দেওয়া একটা অধ্যায়কে বুঝতে হলে একটা রেফারেন্স পয়েন্ট চাই তো! একটা তুলনা চাই। যে ঘটনাটা সবাই জানেন, এমন কোনও একটা ঘটনার রেফারেন্স। জালিয়ানওয়ালা শব্দটা তাই রেফারেন্স হিসাবে ধার করা। নির্বিচার গণহত্যার প্রতিশব্দও বলতে পারেন। অবশ্যই ঔপনিবেশিক নির্বিচার গণহত্যা।

ভারতের স্বাধীনতার আগে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে ভিলরা মূলত ঠিকা শ্রমিক বা চুক্তি শ্রমিক হিসাবে কাজ করতেন। তাঁদের উপর চলত বেপরোয়া জুলুম ও অত্যাচার। চালাত ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের দালাল দেশি বাবুশ্রেণির মানুষেরা। একে প্রবল শোষণ, তার উপর ১৮৯৯-১৯০০ সালে খরার জন্য দেখা দেয় মহা দুর্ভিক্ষ। এতে মারা যান ৬ লক্ষের বেশি ভিল জনজাতির মানুষ। এও এক গণহত্যা বলা চলে কারণ, খেতে না পেয়ে মানুষ মারা যাওয়ার দায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রর উপর অবশ্যই বর্তায়। আর এমন উদাহরণ খুব কম নেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে। কিন্তু আপাতত সেই চর্চায় যাচ্ছি না। যে গণহত্যার কথা আমরা আলোচনা করতে যাচ্ছি, সেটা ভিন্ন।

ভিল সমাজের এমনই এক ঠিকা শ্রমিক ছিলেন গুরু গোবিন্দগিরি। বর্তমানে সকলে অবশ্য তাঁকে সকলে চেনেন গোবিন্দ গুরু নামে। তিনি ভিলদের সামাজিক উন্নতিকে লক্ষ্য বানিয়ে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। জন্ম তাঁর রাজস্থানের দুঙ্গারপুরে।

সাল ১৯০৮। গোবিন্দগিরি শুরু করলেন ‘ভগৎ আন্দোলন’। চুক্তি শ্রমের প্রথা ভাঙবার আন্দোলন। সকলের ন্যায্য মজুরি এবং ন্যায্য অধিকারের দাবিতে ভিল জনজাতির মানুষদের সংগঠিত করতে শুরু করেন তিনি। ভিল জনজাতির মানুষদের এই আন্দোলনে দেশি ও বিদেশি শাসকেরা দেখেছিল সিঁদুরে মেঘ। দেশি রাজ্য দুঙ্গারপুর, বাঁশওয়ারা ও সন্তরামপুর এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সকলেই এই আন্দোলন নিয়ে ছিল বেশ আশঙ্কিত।

অবশেষে ১৯১২-১৩ সালে গ্রেফতার হন গুরু গোবিন্দগিরি। রুনা হুজা-র “A History Book of Rajasthan” থেকে জানা যাচ্ছে, এই সময় থেকেই গোবিন্দগুরুর লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ভিল রাজ কায়েম করা।

        Bhil men hunting with bows and arrows in the Satpura forest, Rajpipla, Gujarat (Source : Getty)

তারপর এল সেই সময়। নভেম্বর ১৩, ১৯১৩। তৎকালীন বাঁশওয়ার ও সন্তরামপুর রাজ্যের সীমানা এলাকায় ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা মানগড় পাহাড়। গোবিন্দগিরির অনুগামীরা সকল ভিল জনজাতির মানুষকে ১৩ নভেম্বর ওই মানগড় পাহাড়ে ধর্মীয় সমাবেশে একত্রিত হতে আহ্বান জানান। কার্যত এই সমাবেশ পরিণত হয়েছিল অস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবিরে। বিদেশি হুকুমতের বিরুদ্ধে লড়াই হবে, তাই সেই যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য সকলকে তীর, দেশি রিভলভার ও তলোয়ার চালনা করা শেখালেন গোবিন্দগিরি নিজে।

এই সমস্ত প্রস্তুতির ফাঁকেই ভিল জনজাতির মানুষেরা ব্রিটিশ ও দেশীয় রাজ্য প্রশাসঙ্গুলির কাছে ৩৩ দফা দাবি জানালো। চুক্তি প্রথা বাতিল করা, চড়া হারে রাজস্ব নেওয়া বন্ধ করা, গোবিন্দগিরির অনুগামীদের উপর প্রশাসনিক নির্যাতন বন্ধ করবার দাবিগুলি ছিল এই তালিকায়। সমস্ত দাবিগুলি নস্যাৎ করে দেয় দেশি ও ঔপনিবেশিক প্রশাসন। উলটে নির্দেশ আসে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে ভিলরা যেন মানগড়ের ওই এলাকা খালি করে দেন।

ভিলেরাও এলাকা ছাড়তে রাজি হয়নি। অতঃপর ১৭ নভেম্বর ৭ কোম্পানি ব্রিটিশ বাহিনী (মেওয়ার ভিল কর্পস) এবং তার সহযোগী হিসাবে দুঙ্গারপুর, সন্তরামপুর ও বাঁশওয়ারা রাজ্যের বাহিনী, একযোগে মানগড়ে আক্রমণ করে। ব্রিটিশ বাহিনীর কম্যান্ডিং অফিসার ছিলেন মেজর এস. বেইলি এবং ক্যাপ্টেন ই. স্টইলি। তাঁদের নির্দেশে শুরু হয় কামান দেগে নির্বিচার গোলাবর্ষণ। সেই আক্রমণে নিহত হন মহিলা ও শিশু সহ ১৫০০-র বেশি ভিল জনজাতির মানুষ।

শোনা যায় এই নির্বিচার গণহত্যা থেমেছিল তখনই, যখন এক ব্রিটিশ অফিসার দেখতে পান, এক ভিল শিশু তার মৃত মায়ের স্তনে মুখ গুঁজে দুধ পান করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

গোবিন্দগিরি বিজয়ী বাহিনীর হাতে বন্দি হন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা হয় তাঁর।পরে ১৯৩১ সালে গুজরাতের লিম্বডির কাছে কম্বোই-তে তিনি মারা যান।           

১৯১৩ সালের ১৭ নভেম্বর ভিল জনজাতির মানুষের এই নির্বিচার গণহত্যাকে, মানগড় ম্যাসাকার বা আদিবাসী জালিয়ানওয়ালা বলা হয়।

এই মানগড় পাহাড় তাই ভিল জনজাতির মানুষের কাছে শহিদের রক্তে পূত পবিত্র। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভিল জনজাতির মানুষ তাই মানগড় ধামের বার্ষিক মেলায় যান গুরু গোবিন্দগিরিকে স্মরণ করতে।

ভিলদের এই মারণযজ্ঞের একশ বছর পর পৃথক ভিল রাজ্যের দাবি আবার নতুন করে ফিরে এসেছে ভিল জনজাতির মধ্যে। ২০১৭ সালে পৃথক ভিল প্রদেশের দাবি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় ট্রাইবাল পার্টি বা বিটিপি। ২০১৭ সালেই বিটিপি গুজরাত ও রাজস্থানের দুটি করে বিধানসভা আসনে জয়লাভ করেছে।

২০২৩ সালে গুজরাতে এএপি দলের বিধায়ক তথা আদিবাসী নেতা চৈতর ভাসভা পৃথক ভিল প্রদেশের দাবি তুলেছিলেন। তিনি দাবি করেন, সরকার জনজাতি মানুষের ‘জল-জঙ্গল-জমি’-র অধিকার কেড়ে নিয়ে, তাঁদের প্রতি অন্যায় করছে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাঁশওয়ারা লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিটিপি প্রার্থী রাজকুমার রোয়াত কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে বিজেপি-কে পরাস্ত করে জয়লাভ করেন। কিন্তু বিষয়টা এমন নয় যে বিটিপি-এর পৃথক রাজ্যের দাবির প্রতি কেবল বিজেপি-রই বিরোধিতা রয়েছে। ২০২০ সালে দুঙ্গারপুরে জেলা পরিষদ নির্বাচনে কংগ্রেস ও বিজেপি একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে বিটিপি প্রার্থীকে পরাস্ত করে।

Mangarhdham Monument – Mangarh is revered as a sacred place by Bhils from three states-Rajasthan, Gujarat and Madhya Pradesh-is a key element of tribal identity, It was on Mangarh Hill, that over 1500 Bhil tribals that were gathered for a peaceful meeting under social reformer GovindGiri and Punja, were killed by British Forces on November 17, 1913. (Image Source – Wikipedia)

ভিল প্রদেশের দাবির প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা    

শেষ কথা নয়। কারণ এই দফার আন্দোলনের সবেমাত্র সূচনা হয়েছে। আন্দোলনের মেজাজে ভয় পেয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখাটা আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে বলেই মনে হয়।

তবে যে বিষয়টা ভিল জনসমাজের এই আন্দোলন থেকে উঠে আসছে, সেটা হলো তিন হাজার বছরের সর্বগ্রাসী একটা প্রকল্পের বিরুদ্ধে একটা স্পষ্ট ‘না’-এর ঘোষণা। এই উপমহাদেশ জুরে প্রায় তিন হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জনজাতির নিজস্বতা ও স্বাধীনতাকে হরণ করে, তাঁদেরকে ব্রাহ্মণায়ন করা হয়েছ। ব্রাহ্মণ্যবাদী কিংবা ঔপনিবেশিক, দুয়ের ভাষাতেই তথাকথিত সভ্য করা হয়েছে জনজাতির মানুষদের। এঁদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নিজস্ব সমাজ-সংস্কৃতি, প্রাক-ধর্মীয় জাদুবিশ্বাস কিন্তু যা মূলত প্রকৃতির আরাধনা সবটাকে ধাপে ধাপে গ্রাস করা হয়েছে। আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার হিসাবে এককেন্দ্রিক এবং বহুত্ব ধ্বংসকারী একটা ব্যবস্থা সবার ঘাড়ের উপর লাগু করার চেষ্টা জারি রয়েছে। এক জাতি-এক ভাষা-এক ধর্ম, হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান হলো এই প্রকল্পের নাম। ভিল জনজাতি হিন্দু পরিচয়কে অস্বীকার করে তাঁদের প্রাক-ধর্মীয় পরিচয়ে ফিরে যেতে চেয়েছে। একই সঙ্গে পৃথক রাজ্যের দাবির মাধ্যমে নিজেদের জাতিসত্ত্বার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এই আন্দোলন ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দুত্ববাদের হাত থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের মুক্তি সংগ্রামের এক নয়া মডেল হিসাবে দাঁড়াবার প্রতিশ্রুতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলার মানুষের সামনেও প্রশ্ন রয়েছে, বৈদিক সাহিত্যের পাপভূমি-র সন্তান বাঙালির আদৌ কি হিন্দু? বাংলাকে হিন্দুত্ববাদ তিন টুকরো করার ভয় দেখিয়ে আক্রমণ শানাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক ভিল আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে বাংলার মানুষের সামনে। ভিল আন্দোলনের ভবিষ্যতের প্রতি আশা রাখাই যায়।  

তথ্যসূত্রঃ

  1. The Daily Guardian,Bhil Pradesh Demand Raises Political Tension from Gujrat to Maharashtra, Shukriya Shahi, July 20, 2024, 11:50 am.    

https://thedailyguardian.com/bhil-pradesh-demand-political-tension/

  1. Optimize IAS,Bhil Tribe Have Demanded a Separate Bhil Pradesh, OptimizeIAS Team, July 20, 2024.

https://optimizeias.com/bhil-tribe-have-demanded-a-separate-bhil-pradesh/

  1. NDTV,Tribals Demands New State ‘Bhil Pradesh’ by Breaking Rajasthan, Gujrat, 2 Other States, Indo-Asian News Services, July 18, 2024, 6:29 pm.

https://www.ndtv.com/india-news/tribals-demand-new-state-bhil-pradesh-by-breaking-rajasthan-gujarat-2-other-states-6133716

  1. ABP live,Explained: Who are the Bhils? Why They are Demanding a Separate Bhil Pradesh Carved out of Gujrat, ABP News Bureau, Edited by: abhishekd, 10 April, 2023, 11:17 am.

https://news.abplive.com/explainers/who-are-bhils-why-is-this-tribal-community-demanding-separate-bhil-pradesh-carved-out-of-gujarat-1594440

  1. Indian Express,Why members of the Bhil Tribe Again Demanded a Separate ‘Bhil Pradesh’, Hamza Khan, July 19, 2024, 19:00 GST.

https://indianexpress.com/article/explained/explained-politics/bhil-pradesh-tribals-rajasthan-9463871/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *