ভারতের বৌদ্ধধর্মে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রসারণ

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

ভারতে বৌদ্ধধর্ম ও ব্রাহ্মণ্যবাদ

ভারতের বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রসারণের ইতিহাস নিয়ে সন্ধান শুরু করার আগে বাবাসাহেব আম্বেডকরের এই বিষয়ে একটি প্রাসঙ্গিক মন্তব্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। আম্বেডকর তাঁর ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অফ ব্রাহ্মিনিজম’ নিবন্ধে ঐতিহাসিক দিক থেকে ভারতের তিনটি পৃথক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কথা উল্লেখ করেছেন, – ব্রাহ্মণ্য, বৌদ্ধ ও হিন্দু। তিনি লিখেছেন, “In the first place it must be recognized that there has never been such as a common Indian culture, that historically there have been three Indias, Brahmanic India, Buddhist India and Hindu India, each with its own culture”। আম্বেডকর যেভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতিকে দুটি পৃথক সংস্কৃতি হিসাবে দেখেছেন, এই আলোচনার সময় সেই পার্থক্যের কথা আমাদেরও খেয়াল রাখতে হবে। আধুনিক বিদ্বানদের অনেকে বৈদিক জনগোষ্ঠীদের পুরোহিতদের দ্বারা উদ্ভাবিত এবং প্রসারিত প্রাচীন ধর্মীয় মতাদর্শের সাধারণাব্দের সূচনার অব্যবহিত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কয়েক শতকের বিবর্তিত রূপকে ব্রাহ্মণ্যবাদ বলে মনে করেন। অনেক আধুনিক বিদ্বান শৈব, বৈষ্ণব ও শাক্ত দেবদেবীদের উপাসনাকেও ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, কিন্তু, প্রাচীন ও আদি-মধ্যযুগের ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধদের মতোই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধী শৈব ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সন্ধান পাওয়া যায়।

প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শের প্রসার মূলত সমাজের উচ্চবর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, আদি মধ্যযুগে এই মতাদর্শ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে সমাজের প্রায় সর্বস্তরে প্রসারিত হয়। এর পরিণামে, ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত প্রায় সব অবৈদিক ধর্মমতের অনুসারীরা এই কালপর্বে ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ, বিশেষত, এর তিনটি মুখ্য অঙ্গ – জন্ম থেকেই বর্ণ ও জাতিগত বিভেদ, বর্ণভিত্তিক উচ্চাবচ সামাজিক কাঠামো, অস্পৃশ্যতা এবং স্মার্ত সংস্কার (অর্থাৎ, জন্ম, মৃত্যু বা বিবাহের সময় বৈদিক বা স্মার্ত রীতি অনুসারী ধর্মীয় অনুষ্ঠান) মেনে নিতে শুরু করেন। ভারতের বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অনুসারীরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। প্রাচীন বৌদ্ধ শ্রামণিক ঐতিহ্যের কথা চিন্তা করলে এই বিবর্তন আপাতদৃষ্টিতে আশ্চর্যজনক বলে মনে হতে পারে।

ভারতে বৌদ্ধধর্মে ব্রাহ্মণ্যবাদের স্বীকরণ

শেষ থেকে শুরু করা যাক। ন্যায়দর্শনের প্রখ্যাত আচার্য উদয়ন দশম শতাব্দী সাধারণাব্দের শেষার্ধ থেকে একাদশ শতাব্দী সাধারণাব্দের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ব্যাপ্ত কালপর্বে বিদ্যমান ছিলেন। মিথিলার ব্রাহ্মণ বিদ্বান উদয়নাচার্যের বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ নিয়ে কয়েকটি লোকশ্রুতি দীর্ঘদিন যাবৎ প্রচলিত ছিল। তাঁর রচিত আত্মতত্ত্ববিবেক গ্রন্থটি মূলত বৌদ্ধদর্শনের অনাত্মবাদ খণ্ডন করে অবিনশ্বর আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণের উদ্দেশে রচিত। সপ্তদশ শতক সাধারণাব্দে গদাধর ভট্টাচার্য তাঁর বৌদ্ধাধিকারবিবৃতি গ্রন্থে আত্মতত্ত্ববিবেক গ্রন্থের আরেক নাম ‘বৌদ্ধাধিকার’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই গ্রন্থটি ‘বৌদ্ধধিক্কার’ নামেও পরিচিত ছিল। মুদ্রিত সংস্করণে গ্রন্থটি ‘ক্ষণভঙ্গবাদ’, ‘বাহ্যার্থভঙ্গবাদ’, গুণগুণিভেদভঙ্গবাদ’ এবং ‘অনুপলম্ভবাদ’ নামের চারটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। ‘অনুপলম্ভবাদ’ নামের চতুর্থ পরিচ্ছেদে উদয়নের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: “নাস্তি এব তদ্দর্শনং যত্র সাংবৃতং ইতি উক্ত্বাপি গর্ভাধানাদ্যন্ত্যেষ্টিপর্যন্তাং বৈদিকীং ক্রিয়াং জনো ন অনুষ্ঠিততি, স্পৃশ্যাস্পৃশ্যাদিবিভাগং বা ন অনুমনুতে, ব্যতিক্রমে চ আচমনাদিস্নানাদিপ্রায়শ্চিত্তং বা ন অনুষ্ঠিততি।”৩ অর্থাৎ, এমন কোন দর্শন নেই, যেখানে, [জগৎকে] সংবৃত (অর্থাৎ, মিথ্যা বা কাল্পনিক) বলা সত্ত্বেও, [ঐ দর্শনের অনুগামীরা] গর্ভাধান থেকে অন্ত্যেষ্টি পর্যন্ত বৈদিক অনুষ্ঠান পালন করে না, [বা,] স্পৃশ্য ও অস্পৃশ্যদের মধ্যে বিভেদ মানে না, [বা, নিয়মের] ব্যতিক্রম হলে আচমন বা স্নান ইত্যাদির অনুষ্ঠান পালন করে [শুদ্ধ হয়] না। উদয়নের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় তাঁর সমকালীন, অর্থাৎ, দশম-একাদশ শতকের মহাযানী বা তন্ত্রযানী বৌদ্ধরা, ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ অনুযায়ী বৈদিক অনুষ্ঠান পালন করতেন ও অস্পৃশ্যতাকে মেনে নিয়েছিলেন।

উদয়নের কিছু কাল পূর্বে, দশম শতাব্দী সাধারণাব্দের শেষভাগে, কাশ্মীরের ব্রাহ্মণ দার্শনিক ও আলঙ্কারিক অভিনবগুপ্তের লেখা ‘ধ্বন্যালোকলোচন’ গ্রন্থে ‘ব্রাহ্মণশ্রমণন্যায়’ (অর্থাৎ জনৈক শ্রমণ, যিনি প্রবজ্যার পূর্বে ব্রাহ্মণ ছিলেন)  অলঙ্কারধ্বনির উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, তাঁর সময়ে বা তার পূর্বেই, বৌদ্ধ শ্রমণরা ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শের প্রভাবে তাঁদের জন্মগত বর্ণ অনুযায়ী বিভাজন মেনে নিয়েছিলেন।

দশম শতক সাধারণাব্দে ভারতীয় বৌদ্ধ শ্রমণ ও গৃহী উপাসকরা ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন, সে কথা তৎকালীন বিদ্বানদের লেখা থেকে সুস্পষ্ট। কিন্তু, ঠিক কবে ও কীভাবে ভারতের বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী গৃহী উপাসক ও শ্রমণদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদকে স্বীকরণের সূচনা হয়েছিল এবং কখন ব্রাহ্মণ্যবাদের আত্তীকরণ পূর্ণতা লাভ করেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের প্রয়াস করা যাক।

প্রাচীন ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী ঐতিহ্য

সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী সহস্রাব্দের মাঝামাঝি বৌদ্ধ ধর্মের সূচনাপর্বে ব্রাহ্মণ্যবাদকে সম্ভবত কোন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বৌদ্ধ ধর্মের কর্ম ও পুনর্জন্মের ধারণা আদৌ প্রাচীন ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ থেকে গৃহীত কিনা, এই বিষয়ে সাম্প্রতিককালে কোন কোন আধুনিক বিদ্বান সংশয় প্রকাশ করেছেন। সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী শেষ কয়েক শতকে প্রচলিত বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন ঐতিহ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ ও জাতির ধারণাকে কখনোই স্বীকৃতি দেওয়া হয় নি, বরঞ্চ বিরোধিতা করা হয়েছে। বুদ্ধবচন অর্থাৎ বুদ্ধের বাণী, সংস্কৃতের পরিবর্তে প্রাকৃত জনের ভাষায় প্রচারিত হয়েছে। প্রাচীন থেরবাদী নিকায়ের পালি সুত্তপিটকের দীঘনিকায়ের তৃতীয় বিভাগ পাথিকবগ্গের চতুর্থ সুত্ত, ‘অগ্গঞ্ঞসুত্ত’। এই সুত্তে ব্রাহ্মণদের ব্রহ্মার মুখ থেকে উৎপত্তির বিশ্বাসকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সুত্তে বর্ণিত সৃষ্টির কাহিনি অনুযায়ী, সদৃশ মানুষদের মধ্য থেকে সামাজিক প্রয়োজনবশত প্রথমে ক্ষত্রিয়মণ্ডল, তারপর একে একে ব্রাহ্মণমণ্ডল, বৈশ্যমণ্ডল ও শূদ্রমণ্ডলের  উদ্ভব হয়, এবং এই চার মণ্ডলের মানুষদের প্রবজ্যাগ্রহণের ফলে শ্রমণমণ্ডলের উদ্ভব। এই সুত্তে যেমন বর্ণপ্রথার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয় নি, তেমনই চার বর্ণের মধ্যে কোন বৈষম্যকেও স্বীকার করা হয়নি। অগ্গঞ্ঞসুত্তে প্রবজ্যাগ্রহণের পর, প্রবজ্যার পূর্ববর্তী বর্ণনির্বিশেষে সব শ্রমণদের এক বর্ণনিরপেক্ষ পৃথক অস্তিত্বের কথা উল্লিখিত হয়েছে। সুত্তপিটকের মজ্ঝিমনিকায়ের অন্তর্গত মজ্ঝিমপণ্ণাসের পঞ্চম বিভাগ ব্রাহ্মণবগ্গের অষ্টম সুত্ত এবং খুদ্দকনিকায়ের অন্তর্গত সুত্তনিপাতের তৃতীয় বিভাগ মহাবগ্গের নবম সুত্ত ‘বাসেট্ঠসুত্ত’। বাসেট্ঠসুত্তে বলা হয়েছে, পশু, পাখি বা বৃক্ষের মতো মানুষের বিভিন্ন জাতির মধ্যে কোনও শারীরিক পার্থক্য নেই। কর্মসুত্রে বিভিন্ন মানুষ কৃষক, শিল্পী, বণিক, চোর, যুদ্ধজীবী, যাজক বা রাজা হয়, জন্মসূত্রে নয়। বাসেট্ঠসুত্তে জন্মসূত্রে জাতিগত বিভাজন বা ব্রাহ্মণত্ব লাভের ধারণাকে অস্বীকার করা হয়েছে। এই সুত্তে বহুবিধ গুণের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই গুণাবলি যাঁর আছে, তাঁকেই শুধু ব্রাহ্মণ বলে স্বীকার করা যায়। কেবলমাত্র তপ, ব্রহ্মচর্য, সংযম ও মিতাচারের দ্বারাই মানুষের ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্তি সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন পালি জাতকের কাহিনিতেও বর্ণপ্রথা ও বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিরোধিতা দেখা গেছে। ভূরিদত্ত জাতকে দেখা যায়, বোধিসত্ত্ব অনেকগুলি গাথার মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণপ্রথা ও বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেছেন। ব্রাহ্মণদের প্রবঞ্চক ও শঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাচীন শ্রাবকযানী বৌদ্ধ ঐতিহ্যে শ্রমণদের বর্ণ ও জাতি নিরপেক্ষ অস্তিত্ব থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ গৃহী উপাসকরা সম্ভবত কোনও সময়ই ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে বর্ণ ও জাতিপ্রথার অস্তিত্ব সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী শতকগুলিতেও বিদ্যমান ছিল বলেই মনে হয়। আধুনিক বিদ্বান লুই রেনু, তাঁর ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত ‘রিলিজিয়নস অফ এনশ্যেন্ট ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, “আমার মতে, ভারতের মানুষ সামগ্রিকভাবে সর্বদাই হিন্দু ছিল; বৌদ্ধধর্ম থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে হয়নি, (কারণ,) এই (ধর্ম) রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও, সূচনা থেকে কমবেশি মঠ এবং শিক্ষায়তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল (My view is that the people of India as a whole must always have been Hindu; they did not have to be won back from Buddhism, which, in spite of royal patronage, was from the start more or less confined to monasteries and schools)।”

সাধারণাব্দের প্রথম কয়েক শতকে রচিত কয়েকটি সংস্কৃত বৌদ্ধ ধর্মীয় সাহিত্যে প্রাচীন সুত্তপিটকের গ্রন্থাবলির ধারা অনুসরণ করে ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ ও জাতিপ্রথার বিরোধসূচক যুক্তি ও মন্তব্য লক্ষ্য করা যায়। ‘বজ্রসূচী’ প্রথম শতক সাধারণাব্দের অশ্বঘোষের রচনা বলে জ্ঞাত।১০ অবশ্য, এই বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। ‘বজ্রসূচী’ গ্রন্থে ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ খণ্ডন করার জন্য বৈদিক সাহিত্য, মহাভারত, হরিবংশ ও মনুস্মৃতি (দু’টি শ্লোক ৩.১৯ ও ১০.৯২ আক্ষরিকভাবে উদ্ধৃত) থেকে উদ্ধৃত অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। দিব্যাবদান সর্বাস্তিবাদী বৌদ্ধ শাস্ত্রের অংশ, সর্বাস্তিবাদী বিনয় ও সূত্রগ্রন্থে সঙ্কলিত কাহিনিমালা অবলম্বনে আনুমানিক দ্বিতীয় শতক সাধারণাব্দে রচিত। দিব্যাবদান গ্রন্থের ৩৩তম অবদান ‘শার্দূলকর্ণাবদান’ এবং তৃতীয় শতক সাধারণাব্দে সৌত্রান্তিক দার্শনিক কুমারলাত রচিত ‘কল্পনামণ্ডিতিকা’ বা ‘দৃষ্টান্তপংক্তি’ (বা ‘কল্পনালঙ্কৃতা’) গ্রন্থের ৭৭তম কাহিনিতেও এই বিরোধের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। জাতিপ্রথার বিরুদ্ধে শার্দূলকর্ণাবদানের যুক্তিধারাতে বাসেট্ঠসুত্ত বা জাতকের গাথাগুলির প্রায় পুনরাবৃত্তি দেখতে পাওয়া যায়।১১ উল্লেখ্য, ‘শার্দূলকর্ণাবদান’ অবলম্বন করেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যটি রচনা করেছেন, যদিও সেই অনুবাদে এই বিরোধের উল্লেখ নেই।

ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রসারণের ইতিহাস

সাধারণাব্দের দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকে ভারতের বৌদ্ধ ধর্মে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রসারণের প্রথম সূচনা দেখতে পাওয়া যায়। বৌদ্ধ বিদ্বান মাতৃচেট বুদ্ধের বন্দনা করে সংস্কৃতে ‘বর্ণার্হবর্ণস্তোত্র’ নামের একটি কাব্য রচনা করেছিলেন। বর্ণার্হবর্ণস্তোত্র কাব্যের একটি শ্লোকে (২.২০) মাতৃচেট বুদ্ধকে বেদ ও বেদাঙ্গ জ্ঞানসম্পন্ন ব্রাহ্মণ বলে উল্লেখ করেছেন, অন্যত্র (৭.১৩) বুদ্ধকে ব্রহ্মা বলে অভিহিত করেছেন।১২ এরপর, ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ সমর্থনের প্রথম প্রত্যক্ষ নিদর্শন লক্ষ্য করা যায় সাধারণাব্দের ষষ্ঠ শতকে, ভাববিবেক (বা ভাবিবেক) (আনুমানিক ৫০০-৫৭০ সাধারণাব্দ) রচিত মহাযান বৌদ্ধ আচার্য নাগার্জুনের ‘মূলমধ্যমককারিকা’ গ্রন্থের সংস্কৃত বৃত্তি (অর্থাৎ ব্যাখ্যা) ‘প্রজ্ঞাপ্রদীপ’ গ্রন্থের ‘প্রত্যয়’ শীর্ষক প্রথম অধ্যায়ে। এই অধ্যায়ে বলা হয়েছে, আচার্য নাগার্জুনের প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্ব শিক্ষার পূর্বে শিক্ষার্থীর জন্ম (অর্থাৎ কুল), বয়স, জাতি ও নিবাসস্থান বিচার করার প্রয়োজন।১৩ সপ্তম বা অষ্টম শতক সাধারণাব্দে অবলোকিতব্রত প্রজ্ঞাপ্রদীপ গ্রন্থের একটি সংস্কৃত টীকা রচনা করেন, বর্তমানে এর কেবল তিব্বতী অনুবাদ বিদ্যমান। প্রজ্ঞাপ্রদীপটীকায় প্রজ্ঞাপ্রদীপ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের এই অংশের ব্যাখ্যায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে, প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্ব শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের শিক্ষা দেওয়া যাবে, বৈশ্য ও শূদ্রদের নয়। অবলোকিতব্রত, তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থনে ‘অবৌদ্ধ’ ধর্মশাস্ত্র থেকে একটি পংক্তি উদ্ধৃত করেছেন। এই পংক্তিটি যে মনুস্মৃতির একটি শ্লোক (৪.৮০), তা এই শ্লোকের আক্ষরিক তিব্বতী অনুবাদ থেকে সন্দেহাতীতভাবে পরিষ্কার। মনুস্মৃতির এই শ্লোকে শূদ্রদের ধর্ম শিক্ষা দিতে নিষেধ করা হয়েছে।১৪ অবলোকিতব্রত সম্ভবত প্রথম বৌদ্ধ বিদ্বান, যিনি নিজের বর্ণাশ্রমবাদী মতের সমর্থনে কোনও বেদানুসারী স্মৃতিগ্রন্থ উদ্ধৃত করেছেন।

অহোরাত্রব্রত একটি মহাযানী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাসক অর্থাৎ গৃহীদের চৈত্য উপাসনার অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান নিয়ে সংস্কৃতে রচিত তিনটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া গেছে। সাহিত্যিক শৈলী বিশ্লেষণ করে ‘অহোরাত্রব্রতচৈত্যসেবানুশংসাবদান’ ষষ্ঠ শতক সাধারণাব্দ বা তার পরবর্তীকালে রচিত বলে অনুমান করা যায়।১৫  ‘অহোরাত্রব্রতকথা’ নামের দু’টি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে, এর মধ্যে একটি গদ্য ও অপরটি পদ্যে রচিত। এই গ্রন্থদ্বয়ের নেওয়ারি প্রভাবিত অত্যন্ত অশুদ্ধ সংস্কৃত ভাষা১৬ থেকে এই গ্রন্থগুলিও আদি-মধ্যযুগে রচিত বলে মনে হয়। ‘অহোরাত্রব্রতচৈত্যসেবানুশংসাবদান’ গ্রন্থের ১৩০-১৩৬ শ্লোক, পদ্যে লেখা ‘অহোরাত্রব্রতকথা’ গ্রন্থের ১০৮-১১৬ শ্লোক ও গদ্যে লেখা ‘অহোরাত্রব্রতকথা’ গ্রন্থের দশম অনুচ্ছেদে বিভিন্ন বর্ণ ও জাতির উপাসকদের জন্য পৃথক উপাসনা পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। গদ্যে লেখা ‘অহোরাত্রব্রতকথা’ গ্রন্থের দশম অনুচ্ছেদে ৩৬টি জাতিরও উল্লেখ রয়েছে।১৭ এই গ্রন্থগুলির বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সাধারণাব্দের সপ্তম-অষ্টম শতক থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ ও জাতির ধারণা ভারতের মহাযান বৌদ্ধ বিদ্বান শ্রমণদের মধ্যে স্বীকৃত হয়েছিল। বৌদ্ধ গৃহী উপাসকদের কথা তো বলাই বাহুল্য। সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক জুয়ানজাং (আনুমানিক ৬০২-৬৬৪ সাধারণাব্দ) শতদ্রু নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ভ্রমণের সময় লক্ষ্য করেছিলেন, স্থানীয় অধিবাসীরা মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও বর্ণ ও জাতিপ্রথা মেনে চলেন।১৮

সপ্তম শতক সাধারণাব্দ থেকে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মে, বিশেষত বৌদ্ধ তান্ত্রিক ভাবনায় বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের আত্মীকরণও শুরু হয়ে গিয়েছিল। বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান রীতি থেকে গৃহীত হোম এর মধ্যে অন্যতম।  ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’ অন্যতম প্রাচীন সংস্কৃত বৌদ্ধ তন্ত্রগ্রন্থ, সপ্তম শতক সাধারণাব্দের প্রথমার্ধ এই গ্রন্থের রচনাকাল বলে অনুমান করা হয়। চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উজিং ৬৬৭ সাধারণাব্দে ভারতে আসেন এবং ৬৭৪ সাধারণাব্দে চীনে ফিরে যাওয়ার সময় তাঁর মৃত্যু হয়, ভারত থেকে যে গ্রন্থসমূহ সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর চীনে পৌঁছে দেওয়া হয়। তাঁর সংগৃহীত গ্রন্থগুলির অন্যতম এই ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’। উজিং নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, এই গ্রন্থের চীনা ভাষায় অনুবাদক শুভাকরসিংহও নালন্দায় ধর্মগুপ্তের কাছ থেকে এই গ্রন্থের শিক্ষালাভ করেছিলেন এবং এই গ্রন্থের ‘পিণ্ডার্থ’ নামে সংস্কৃত ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থের রচয়িতা আর এক ভারতীয় বৌদ্ধ বিদ্বান বুদ্ধগুহ্যও নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। সেই কারণে এই গ্রন্থের রচনা নালন্দা মহাবিহারে হয়েছিল বলে আধুনিক বিদ্বান স্টিফেন হজ অনুমান করেছেন। স্টিফেন হজের অনুমানের আর একটি কারণ এই তন্ত্রগ্রন্থে বর্ণিত উদ্ভিদগুলি একত্রে একমাত্র পূর্ব ভারতে হিমালয়ের পাদদেশে পাওয়া সম্ভব।১৯ শুভাকরসিংহের সঙ্গে তাঁর চীনা শিষ্য ইসিংয়ের (৬৭৩-৭২৭ সাধারণাব্দ) ৭১৬ সাধারণাব্দে প্রথম দেখা হয়। ইসিং চীনা ভাষায় ‘দা পিলুঝে’না চেনফো জিংশু’ নামে মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র গ্রন্থের একটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। ‘দা পিলুঝে’না চেনফো জিংশু’ গ্রন্থে প্রথম ‘বৌদ্ধ বেদ’ বা ‘বুদ্ধ বেদ’ কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র গ্রন্থের জাগতিক এবং অধিজাগতিক হোম বিষয়ক ২৭তম অধ্যায়ের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইসিং লিখেছেন যে, বেদের মূল শিক্ষা স্বয়ং বুদ্ধ প্রদান করেছেন, এবং প্রকৃত হোমের তত্ত্ব ও পদ্ধতি সেই শিক্ষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ইসিং যে ব্রাহ্মণ্যবাদী হোমকে জাগতিক বেদ ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক হোমকে অভিজাগতিক বুদ্ধ বেদ বলে পৃথকীকরণ করেছেন, তা ‘মহাবৈরোচন-অভিসম্বোধি-সূত্র’ গ্রন্থে তা অবশ্য বেদ সংক্রান্ত উল্লেখ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। পাশাপাশি এটাও বোঝা যায়, সপ্তম শতক সাধারণাব্দ থেকে বৌদ্ধ পরিমণ্ডলে বেদ ও হোমের অনুপ্রবেশের ফলে নালন্দা ও অন্যান্য বিহারে শ্রমণদের পালিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যেও প্রাচীন বৌদ্ধ বিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় চিন্তন যুক্ত হতে শুরু হয়ে গেছে।

শেষকথন

কেবল মাত্র প্রজ্ঞাপ্রদীপ ও প্রজ্ঞাপ্রদীপটীকার উল্লেখ থেকে একেবারে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়, তথাপি, অনুমান করতে অসুবিধা নেই যে, সাধারণাব্দের ষষ্ঠ শতক থেকে মূলত মহাযানী বৌদ্ধ বিদ্বান ভিক্ষুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ আত্তীকরণের প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে যায় এবং সম্ভবত সপ্তম-অষ্টম শতক সাধারণাব্দ নাগাদ ভারতে প্রচলিত মহাযান বৌদ্ধ মতাবলম্বী শ্রমণদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শকে আত্তীকরণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে যায়। দশম-একাদশ শতক সাধারণাব্দে, ভারতের বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বুদ্ধভক্তি, কিছু নিজস্ব দেবচিন্তন ও বিশিষ্ট উপাসনা পদ্ধতি ছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদী ভাবনার অনুসারীদের সঙ্গে কোনও পার্থক্য ছিল বলে মনে হয় না।

টীকা

১. B.R. Ambedkar “The Triumph of Brahmanism” in ‘Dr. Babasaheb Ambedkar: Writings and Speeches, Vol. 3’; New Delhi: Dr. Ambedkar Foundation, Ministry of Social Justice & Empowerment, Govt. of India, 2014 [1987], p. 275.

২. Johannes Bronkhorst, “Brahmanism: its place in ancient Indian Society” in ‘Contributions to Indian Sociology, Vol.51, Issue 3’; Los Angeles: Sage Publications, 2017, pp. 361-369.

৩. V. Dvivedin and L.S. Dravida edited, ‘Udayanācārya Ātmatattvaviveka’; Calcutta: Royal Asiatic Society of Bengal,1939, p. 885.

৪. Daniel H.H. Ingalls, Jeffrey M. Masson, and M.V. Patwardhan translated, ‘The Dhvanyāloka of Ānandavardhana with the Locana of Abhinavagupta’; Cambridge, Massachusetts: Harvard University Press, 1990, p. 81.

৫.  Johannes Bronkhorst, ‘Greater Magadha: Studies in the Culture of Early India’; Leiden: Brill, 2007, pp. 53,176.

৬. Maurice Walshe, ‘The Long Discourses of the Buddha: A Translation from the Pali’; Boston: Wisdom Publications, 1995, pp. 407-415.

৭. ভিক্ষু শীলভদ্র অনূদিত, ‘সুত্ত নিপাত’; কলিকাতা: মহাবোধি সোসাইটি, ১৯৪১, পৃ. ১২৩-১৩৩।

৮. ঈশানচন্দ্র ঘোষ অনূদিত, ‘জাতক, ষষ্ঠ খণ্ড’; কলিকাতা: করুণা প্রকাশনী, পুনর্মুদ্রণ, ১৯৭৯, পৃ. ১৪৭-১৫৩।

৯. Louis Renou, ‘Religions of Ancient India’; London: The Athlone Press, University of London, 1953, p.100.

১০. Sujitkumar Mukhopadhyaya, ‘The Vajrasūcī of Aśvaghoṣa, A Study of Sanskrit Text and Chinese Version’; 2nd edition, Santiniketan: Viśvabharati, 1960 [1949], p. vii.

১১. J. W. de Jong, “Buddhism and the Equality of the Four Castes” in W. Sundermann et al. edited, ‘A Green Leaf: Papers in Honour of Professor Jes P. Asmussen’; Leiden: Brill, 1988, pp. 426-429.

১২. Johannes Bronkhorst, ‘Buddhism in the Shadow of Brahmanism’; Leiden: Brill, 2011, p. 163.

১৩. William L. Ames, “Bhāvaviveka’s ‘Prajñāpradīpa’: A Translation of Chapter One: ‘Exmination of Causal Conditions’ (‘Pratyaya’)” in ‘Journal of Indian Philosophy, Vol. 21, No.3, September 1993’; Dordrecht: Kluwer Academic Publishers, p. 214.

১৪. J. W. de Jong, “Buddhism and the Equality of the Four Castes”, pp. 429–430.

১৫. Ratna Handurukande, ‘Three Sanskrit Texts on Caitya Worship in Relation to Ahorātravrata’; Tokyo: The International Institute for Buddhist Studies, 2000, pp. i-iii.

১৬. ibid, pp. iii-v.

১৭. ibid, pp. 22-23, 75-77, 88.

১৮. T. Watters, ‘On Yuan Chwang’s Travels in India 629-645 A.D’; London: Royal Asiatic Society, 1904, p. 299. আরও দেখুন, Samuel Beal, ‘Si-Yu-Ki, Buddhist Records of the Western World: Translated from the Chinese of Hiuen Tsiang (AD 629), Vol. 1’; London: Trübner & Co., 1884, p. 178.

১৯. Stephen Hodge translated, ‘The Mahā-Vairocana-Abhisaṃbodhi-Tantra with Buddhaguhya’s Commentary’; Oxon: Routledge Curzon, 2003, pp. 11, 17-18.

সহায়ক গ্রন্থ

১. Sujitkumar Mukhopadhyaya edited, ‘The Śārdūlakarṇāvadāna’; Santiniketan: Viśvabharati, 1954.

২. Gail Omvedt, ‘Buddhism in India: Challenging Brahmanism and Caste’; New Delhi: Sage Publications, 2003.

৩. David Seyfort Ruegg, ‘The Symbiosis of Buddhism with Brahmanism/ Hinduism in South Asia and of Buddhism with ‘Local Cults’ in Tibet and the Himalayan Region’; Vienna: Verlag der Osterreichische Akademie der Wissenschaften, 2008.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *