ডিলিমিটেশন ২০২৬: জাতীয়তাবাদ বনাম অস্তিত্বরক্ষা

 

ডঃ আবু সঈদ আহমেদ

আমাদের সকলেরই কম বেশী জানা আছে যে, ২০২৬ হল ডিলিমিটেশনের বছর। মানে ২০২৬ সালের পরে প্রতিটি রাজ্যের জনসংখ্যা হিসাব করে সেই অনুপাতে কোন রাজ্যে লোকসভায় কটা করে আসন থাকবে সেটা নির্ধারণ করা হবে। নিয়ম মতো ২০২৬ এর পর প্রথম যে জনগণনা হবে, তার ভিত্তিতে ডিলিমিটেশন হওয়ার কথা।
আমাদের দেশের নির্বাচন হয় First Past The Post (FPTP) পদ্ধতিতে, যেটা এমনিতেই ত্রুটিপূর্ণ আর সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার তুমুল সহায়ক। এই পদ্ধতিটি ছোট দলগুলিকে ‘ন্যায্য’ প্রতিনিধিত্ব থেকে বাদ দেয়। ধরা যাক, যে একটি দল যে প্রায় ১০ শতাংশ ভোট জিতবে, তার আইনসভার প্রায় ১০ শতাংশ আসন জিততে হবে। কানাডার ১৯৯৩ সালের ফেডারেল নির্বাচনে, প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভরা ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল কিন্তু আসন পেয়েছিল মাত্র ০.৭ শতাংশ, এবং লেসোথোর ১৯৯৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে, বাসোথো ন্যাশনাল পার্টি ২৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল কিন্তু মাত্র ১ শতাংশ আসন পেয়েছিল। এটি এমন একটি ধরণ যা FPTP-এর অধীনে বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়। আমাদের দেশে ও রাজ্যে এরকম উদাহরণ প্রায় প্রত্যেক নির্বাচনেই তৈরি হয়। এই পদ্ধতিটি ‘regional fiefdoms’র ঘটনাটিকে বাড়িয়ে তোলে যেখানে একটি দল একটি প্রদেশ বা এলাকার সমস্ত আসন জিতে নেয়। যদি কোনও দলের দেশের একটি নির্দিষ্ট অংশে শক্তিশালী সমর্থন থাকে এবং তারা বহুসংখ্যক ভোট পায়, তবে তারা সেই এলাকার আইনসভার সমস্ত বা প্রায় সমস্ত আসন জিতবে। এই দুই ক্ষেত্রেই সেই এলাকার সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব থেকে বাদ দেয় এবং এই ধারণাটিকে আরও জোরদার করে যে রাজনীতি হল একটি যুদ্ধক্ষেত্র যা আপনি কে এবং আপনি কোথায় থাকেন তার উপর নির্ভর করে। আপনি কী বিশ্বাস করেন তার উপর নির্ভর করে না। যেমনটা এই ডিলিমিটেশনের ফলে হতে চলেছে। মহিলা পিছু শিশুর জন্মে অনেক এগিয়ে আছে গোবলয়। যেমন বর্তমানে ইউপির আসন সংখ্যা ৮০, সেটা বেড়ে ১৪৩ হতে পারে। এরকম ভাবেই বিহার, দিল্লি, উত্তরাখন্ড ইত্যাদিতেও। এদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার শর্তে ডিলিমিটেশন বন্ধ ১৯৭৬ থেকে। কিন্তু ১৯৭৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে, জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ১.২ বিলিয়ন হয়, যা ২০০০ সালে বিলিয়নে পৌঁছে যায়। তবে হিন্দি বলয় বাদ দিলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নে বাকিরা অনেক সফল। এই জন্মহার হ্রাসের সাফল্যই কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে দেশের জাতীয় স্তরের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতিতে দরকষাকষির প্রশ্নে। দেওয়ানী ও সামরিক চাকরির পরীক্ষায় অন্যভারতীয় ভাষার চেয়ে হিন্দি ভাষার বাড়তি গুরুত্ব এই রাজ্যগুলোকে ব্যাপকভাবে এগিয়ে রেখেছে। তাছাড়াও আছে অন্য রাজ্যে আগে থেকেই আড্ডা গেড়ে থাকা বেরাদরির সাহায্যে চাকরি, মজুরী বা ব্যবসা করে খাওয়ার সুযোগ যার প্রভাব পড়ে সেই রাজ্যের অর্থনীতিতে।
এরপরেও থেকে যায় জেরিম্যান্ডারিংএর ভয়। “জেরিম্যান্ডারিং/গেরিম্যান্ডারিং” শব্দটি একজন সালামান্ডার এবং এলব্রিজ গেরির একটি শব্দবন্ধ। এলব্রিজ গেরি, তাঁর মৃত্যুর সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ১৮১২ সালে ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর হিসেবে একটি বিল স্বাক্ষর করেছিলেন যা বোস্টন এলাকায় একটি পক্ষপাতদুষ্ট আসন তৈরি করেছিল যার তুলনা একটি পৌরাণিক সালামান্ডারের আকৃতির সাথে হয়েছিল।। সহজভাবে বলতে গেলে, জেরিম্যান্ডারিংয়ের অর্থ হলো নির্বাচনী এলাকা এভাবে ভাগ করা, যাতে ক্ষমতাসীন দল বা ব্যক্তি সহজেই পুনর্নির্বাচিত হতে পারে। যারা এই জেরিম্যান্ডারিং করতে চায়, তাদের লক্ষ্য থাকে নির্বাচনী এলাকা এমনভাবে কাটাছেঁড়া করে সাজানো, যাতে নিজ দলের সমর্থক আছে, এমন লোকদের এক অভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় রেখে বিরোধীদের তার বাইরে ঠেলে দেওয়া। এসবের সুযোগ নিয়ে, অসহিষ্ণু রাজনীতির কাণ্ডারিরা সীমিত কিছু রাজ্যে FPTP পদ্ধতিতে কিছু ভোট নিয়ে বিপুলভাবে জিতে এসে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের প্রত্যেকটা এজেন্ডা নির্বিঘ্নে চাপাবে। আরো বেশি করে চাপাবে হিন্দি ভাষা, হিন্দুস্থানী উৎসব, গোবলয়ের সংস্কার। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ন্যূনতম শিষ্টতা ধরে রাখতে চাইবে না। যেগুলো ইতিমধ্যেই হচ্ছে। আরও দুর্ভাগ্যের সাথে বলতে হচ্ছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলগুলো তো বটেই শাসকদলও এই প্রশ্নে যে ভূমিকা নিয়েছে তাতে আতঙ্কিত হওয়ার অনেক কারণ আছে। রাজ্যের বিরোধী দল উন্নয়নের গুজরাট মডেল পুঁজি করে কলেবর বাড়ালেও সংখ্যালঘু-আতঙ্কের অসহিনষ্ণু রাজনীতিকেই হাতিয়ার করেই এগিয়ে যাচ্ছে। সাথে যারা হক-আদায়ের রাজনীতি করেন তাঁদেরকেও জনগণের চোখে গণশত্রু বানানোর চেষ্টা অব্যাহত। আর শাসকদল তো রেড রোডে ঈদের ময়দান থেকে ছটপুজো কোনওটাতেই গোবলয়ের তোষণের কোনও সুযোগ ছাড়েনা। ডিলিমিটেশন প্রশ্নে বিরোধী দলগুলোর বৈঠকে অনুপস্থিতি এই দলের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অবাঙালি শ্রমিক নির্ভর বামদলগুলো এবং বাংলার স্বার্থকে একশতকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া কংগ্রেসের ভূমিকাও কোনও ভরসা দেয় না। অন্য দিকে পিছড়ে বর্গের রাজনীতির দাবিদার দল ও সংগঠনগুলোর জাতীয়স্তরের মঞ্চগুলোতে বাংলার দলিত নায়কদের নামগন্ধ কোনও দিনও পাওয়া যায় না। বোম্বাইয়ে ভোটে হেরে যাওয়া আম্বেদকরকে, বাংলার কারা কারা জিতিয়ে গণপরিষদে পাঠিয়ে ছিলেন এই প্রশ্নের উত্তর বাইরের দূরে থাক, বাংলারই কজন দলিত নেতা দিতে পারবেন এটা বড় প্রশ্ন।
যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, আশা করি তাঁদের কাছে এটা সাফ হয়ে গেছে যে বাংলার স্বার্থ, বাঙালির স্বার্থ বিপন্ন হলে কোনও দলের তা নিয়ে বিশেষ মাথাব্যাথা নেই। ফলে যা করার বাঙালিকে নিজের দায়েই, নিজের দায়িত্বেই করতে হবে। আর এটা করতে হবে ডিমিলিটেশন নিয়ে যেখান থেকে প্রশ্ন উঠেছে সেই তামিলনাড়ু, সেই কেরালা আর দেশের অন্যান্য প্রান্ত তাদের সাথে মিলেই। আমাদের ভরসামন্ত্র হোক রবি ঠাকুরের সেই কথা,
“শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *