নয়া ওয়াকফ আইন বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ওয়াকফের ইতিহাসকে ফিরে দেখা

 

তায়দুল ইসলাম

ওয়াকফ আরবি শব্দ। এর একটি অর্থ উৎসর্গ করা। আর একটি অর্থ পূর্ণ বন্ধ। কোন ব্যক্তি দ্বারা তার নিজস্ব বৈধ সম্পদ বা সম্পত্তি সমাজের কল্যাণের জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা বা দান করাকে বলা হয় ওয়াকফ করা। যিনি দান করেন তাকে বলা হয় ওয়াকিফ। উৎসর্গকৃত বা দানকৃত সম্পদ, সম্পত্তিকে বলা হয় ওয়াকফ সম্পত্তি। ওয়াকফ করার দুটো উদ্দ্যেশ্য। সমাজের কল্যাণ এবং পরকালীন জীবনে কল্যাণ। কোন সম্পত্তি এক বার ওয়াকফ করা হলে তা আর ফেরত নেওয়া যায় না। ওয়াকফ করার পর ওয়াকফকৃত সম্পত্তির মালিক হন আল্লাহ। দানকারীর ব্যক্তি মালিকানা স্বত্ব চিরদিনের মতো বিলোপ বা বন্ধ হয়ে যায় বা ছিন্ন হয়ে যায়। এই জন্যই ওয়াকফের একটি অর্থ পূর্ণ বন্ধ অর্থাৎ ব্যক্তি মালিকানা পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ওয়াকফ করার পর মালিক আল্লাহ হওয়ার পর ব্যক্তি, মুতাওয়াল্লী, বোর্ড এবং কাউন্সিল কেউ আর মালিক থাকে না। এরা হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক ( caretaker) । মালিক যেহেতু আল্লাহ সেহেতু তত্ত্বাবধায়করা নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা বা ব্যবহার করতে পারে না। তা করতে হয় আল্লাহ তথা ইসলামের বিধান অনুযায়ী।

ওয়াকফ এর ইতিহাস :
বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা শহরে কাবা ঘর হযরত ইব্রাহিম পুনর্নির্মাণ করে উৎসর্গ করেছিলেন আল্লাহর নামে। বিশ্বের ইতিহাসে ইহাই প্রথম ওয়াকফ। হযরত ইব্রাহিমের আদর্শের সর্বশেষ সংস্কারক হযরত মুহাম্মাদ মদীনায় হিজরত করার পর একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি ক্রয় করার জন্য জমি খুঁজছিলেন। সেই সময় সেখানকার বনু নাজ্জার সম্প্রদায় একটি বাগান মসজিদ নির্মাণের জন্য ওয়াকফ করেন। সেই বাগানের জমিতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদটির নাম মসজিদে নববী এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ তিনটি মসজিদের একটি। হযরত ইব্রাহিমের পর বিশ্বে এটি দ্বিতীয় ওয়াকফ। উৎসর্গকারী বা ওয়াকিফ হলেন মদীনার বনু নাজ্জার সম্প্রদায়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর খয়বর এর একটি ভাল জমি ওয়াকফ করেছিলেন। খয়বর একটি জায়গার নাম। বিখ্যাত সৈনিক খালিদ তাঁর অস্ত্রভাণ্ডার এবং বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু তালহা বাগান ওয়াকফ করেছিলেন। খুলাফায়ে রাশিদিন, উমাইয়া এবং আব্বাসী সাম্রাজ্যে ওয়াকফ একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠে এবং পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। সে যুগের রাজা, বাদশা, উজির নাজির সহ সকল কর্মচারী ও বিত্তশালীরা কিছু না কিছু ওয়াকফ করে মানবতার সেবায় নিজের নিজের অবদান রেখেছেন। মুসলিম বিশ্বের এমন কোন জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে ওয়াকফ এর অস্তিত্ব নেই। ওয়াকফ এর মাধ্যমে মানবসেবার বিনিময়ে পূণ্য অর্জনে কেবলমাত্র পুরুষরা এগিয়ে এসেছিলেন তা নয়। মহিলারাও পিছিয়ে ছিলেন না। খলিফা হারুন অল রশিদের সম্রাজ্ঞী জোবেদা মদীনায় একটি খাল খনন করিয়ে জনগণের জলকষ্ট লাঘব করার জন্য খালটি ওয়াকফ করে দেন। সেই খাল আজও ” নহরে জোবেদা” নামে সম্রাজ্ঞী জোবেদার স্মৃতি বহন করে চলেছে।
ওয়াকফ ও ইসলাম:
ওয়াকফ ব্যবস্থা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওয়াকফ সম্পত্তির ইতিহাস শুরু হয়েছে মুসলমানদের মধ্যে কুরআন লেখার সময় থেকে। হজরত মুহাম্মদ ওয়াকফ সম্পত্তি উৎসর্গ করাকে উৎসাহ দিয়েছেন। কিন্তু সর্বত্র এ ধরনের সম্পত্তির হেপাজতকারী ছিলেন সর্বোচ্চ শাসক, এমনকি ভারতে সুলতান আমলে সুলতান এবং মোগল আমলে মোগল সম্রাট। সদর উস সদর, সদর ই সুব্বা, সদর ই সরকার যথাক্রমে কেন্দ্র,  রাজ্য ও জেলা ওয়াকফ প্রশাসন দেখতেন। সকল ধর্মের মধ্যে ঈশ্বরে সম্পত্তি সমর্পণ করতে দেখা যায় যাতে ধর্মীয়, সেবা, শিক্ষা, দাতব্য কার্য ব্যহত না হয়। হিন্দুদের মধ্যে দেবোত্তর, শিবোত্তর, ব্রহ্মোত্তর, লাখেরাজ নিষ্কর, সেবায়েত প্রভৃতি আরও নানা রকম সম্পত্তি যেগুলি বহু বছর পূর্বে ভূমিপতিগণ দান (grant) করেছিলেন। মুসলমানদের মধ্যেও নানা শ্রেণীর সম্পত্তি আছে। যেমন এতিমখানা, মসজিদ, কবরস্থান, মাজার, ঈদগাহ, দরগা, খানকাহ, দরগা শরীফ, পীরস্থান, পীরোত্তর,  খাদেম , পীরা, পীরান প্রভৃতি।
ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মাদ এর উপদেশ অনুসরণ করে তৎকালীন সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিরা প্রচুর বিষয় সম্পত্তি ওয়াকফ করেন। তা থেকে তৎকালীন সমাজ দুই ভাবে উপকৃত হয়েছিল। সরাসরি উপকার। যেমন রাস্তা, পুকুর, বাগান, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। রাষ্ট্রের মাধ্যমে। ওয়াকফ রাজকোষের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। রাজকোষের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনকল্যাণমূলক কাজ। এ ধারাবাহিকতা চলে আসছে সব যুগ, সব মুসলিম সমাজে, সব মুসলিম ও ইসলামী দেশে। উপমহাদেশে মুসলিমদের আগমনের পর থেকে এর সূচনা। ব্রিটিশরা মুসলিমদের কাছ থেকে সব কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে শেষের দিকে ওয়াকফ কেও নিয়ন্ত্রণ করার কাজ শুরু করে। তখন থেকেই এ দেশে ওয়াকফ সমস্যার সূচনা।

উপমহাদেশে ওয়াকফ আইনের সূত্রপাত :

১৯১৩ সালে বৃটিশ সরকার প্রথম ওয়াকফ আইন তৈরি করে। প্রিভি কাউন্সিল ওয়াকফ ফিল আওলাদ বিচারে ওয়াকফ অবৈধ ঘোষণা করেন ( LR 22 IND APP 76, Abdul Fata Mahomad Ishak vs Russomoy Dhur Chowdhry )।  ১৯১৩ সালে Musalman Wakf Validating Act, 1913 আইন হয়েছিল। যেখানে ওয়াকফ মানে ” wakf means the permanent dedication by person professing the musalman faith of any property for any purpose recognised by the musalman law as religious, pious or charitable.”। ইসলাী আইনে  স্বীকৃত ধর্মীয়, পূণ্য ও দাতব্য উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে উৎসর্গীকরনকে বলা হয় ওয়াকফ করা। দেশে চলতি প্রথা ও রীতিনীতি মান্যতা পেয়েছিল। আইন অনুসারে ওয়াকফ হতে পারত মুসলমান সাধারণের (public) জন্য বা দাতার নিজ, সন্তান, পরিবার বা উত্তরাধিকারীদের ( private ) ভরণপোষণের জন্য। তাই ওয়াকফ সম্পত্তি হয় দু ধরনের । সাধারণ (public, Wakf-ul-Khayr)ওয়াকফ এবং ব্যক্তিগত (private, Wakf-ulal-aulad) ওয়াকফ। ১৯২৩ সালে আইন তৈরি করা হয় ওয়াকফ এর উন্নত ব্যবস্থা ও ব্যবহারের জন্য। ১৯৩০ সালে এই আইনকে রেট্রোস্পেক্টিভ এফেক্ট দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালে এই আইনের পুনরায় সংশোধন করা হয় এবং সাধারণ ওয়াকফকে নির্দিষ্ট ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বিভিন্ন রাজ্য নিজের মতো সংশোধন করে প্রয়োগ করতে থাকে। বিভিন্ন রাজ্যে ওয়াকফ বোর্ডগুলোর কাজ সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং ওয়াকফ সম্পত্তির আরও ভালো পরিচালনার জন্য ১৯৫৪ সালের ওয়াকফ আইন সংশোধনের প্রয়োজন মনে করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার Wakf Enquiry Committee তৈরী করেন । ঐ কমিটির রিপোর্টে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকারগুলি, সেন্ট্রাল ওয়াকফ কাউন্সিল, রাজ্য ওয়াকফ বোর্ড, মুসলমান এম পি গণ সকলের মতামত নিয়ে নতুন আইনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সালে ( ৬৯ of ১৯৮৪) সংশোধন নিয়ে আসা হয়। এই সংশোধনীতে  জোর দেওয়া হয় মূলত নীচের বিষয়গুলিতে
১) সারা দেশে এক ওয়াকফ আইন ( Uniform Wakf legislation) ।
২) কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল ও রাজ্য ওয়াকফ বোর্ড গঠন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে থেকে হবে।
৩) ওয়াকফ সম্পত্তি হস্তান্তর বন্ধ, মুতাওয়াল্লী কর্তৃক লীজ দেওয়া বন্ধ, এবং তাদেরকে বোর্ডের অডিটের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সম্পত্তিতে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা।
৪) ওয়াকফ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা ।
৫) জবর দখল ( adverse possession) ১২ বছরের পরিবর্তে ৩০ বছর করা।
৬) ওয়াকফ ফিল আওলাদকে এই আইনের অধীনে আনা এবং
৭) যত দীর্ঘ হোক না অব্যবহারে সম্পত্তির ওয়াকফ স্বত্ব নষ্ট হবে না।

১৯৮৪ সালের সংশোধনী আইনের লক্ষ্য ছিল ওয়াকফ সম্পত্তির উপর কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। ১৯৫৪ আইন এবং ১৯৫৯, ১৯৬৪, ১৯৬৯ ও ১৯৮৪ এর সংশোধন সত্বেও দেশ জুড়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল ছিল। ফলে সারা দেশে সব ওয়াকফ এর জন্য ১৯৯৫ সালে নূতন আইন ( waqf act, ৪৩/১৯৯৫ ) করা হয়। প্রতি বার সংশোধনের সময় সরকারের নিয়ন্ত্রণ মজবুত ও বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুরোপুরি কব্জা করার বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছে ২০২৫ এর সংশোধনীতে।

ওয়াকফ আইন ১৯৯৫ :

১৯৯৫ আইন অন্য সব আইনকে অকার্যকর করে সারা দেশে এক আইন প্রয়োগ করে। ওয়াকফ ব্যক্তিগত ও সাধারণ এই ফারাক তুলে দিয়ে সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তিকে সাধারণ ওয়াকফ গণ্য করা হয়। ২ ধারায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ” waqf means the permanent dedication by a person professing Islam, of any movable or immovable property for any purpose recognised by the Muslim law as pious, religious or charitable and includes -“ওয়াকফ সুবিধাভোগী  ( beneficiary) নির্দিষ্ট করা হয় ” a person of objective for whose benefit a waqf is created and includes religious, pious and charitable objects and any other object of public utility sanctioned by the Muslim law.” কোন দলিলে যদি উল্লেখ থাকে, যে সম্পত্তি উৎসর্গ করা হল তার কিছু অংশ ঐ ব্যক্তি বা তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য এবং বাকি অংশ সাধারণ মুসলমানদের জন্য ব্যবহৃত হবে বা মসজিদের জন্য ব্যবহৃত হবে তবে এ ধরনের সম্পত্তি ওয়াকফ বলে গণ্য হবে। কিন্তু কোন সম্পত্তি ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণের জন্য ব্যবহৃত হলে সেক্ষেত্রে সম্পত্তিটি ওয়াকফ বলে গণ্য হবে না ( AIR ১৯৮২ Kant ৩০৯ )। ১৯৯৫ আইনের ১০৪ ধারা মতে কোন অমুসলিম ব্যক্তি মসজিদ, দরগা প্রভৃতির জন্য সম্পত্তি দিয়ে থাকলে একইভাবে ওয়াকফ বলে গণ্য হবে।
১৯৯৫ আইন মুতাওয়াল্লী নিয়োগ করার ক্ষমতা বোর্ডের হাতে দিয়েছে। কিন্তু নীতি নির্ধারণ করার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের হাতে দিয়েছে। ওয়াকফ সম্পত্তি বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য প্রত্যেক রাজ্যে ওয়াকফ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে যা বোর্ড থেকে পৃথক প্রতিষ্ঠান এবং দেওয়ানী প্রক্রিয়া সংহিতার বিধান মেনে পরিচালিত হচ্ছে। ওয়াকফ সম্পত্তি বিষয়ে বিবাদ সিভিল কোর্টের বিচার এলাকা বহির্ভূত ( bar of civil court)। এ বিষয়ে অন্য ব্যখ্যা রয়েছে। একমাত্র ঐ আইনের ৬ ও ৭ ধারায় বিবেচ্য বিষয় ট্রাইব্যুনালের বিচার্য। অন্যথায় সিভিল কোর্ট বিচার করতে পারবে ওয়াকফ সম্পত্তির ক্ষেত্রেও ( ২০১৭(৪) ICC ২১৭ CAL )। একাধিক দাবিদারের মধ্যে কে মুতাওয়াল্লী, সিভিল কোর্ট বিচার করতে পারবে ( AIR ২০৩ Ker ৮৪ ), ( ২১২(২) CLJ ৪৩ Cal )।  মুতাওয়াল্লী ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ মামলা করতে পারবে সিভিল কোর্টে ( ১৯৯৭(২) CWN ২০০)। এমনকি কোন ব্যক্তি ওয়াকফ সম্পত্তিতে নথি বা জবর দখল ( document or adverse possession) মূলে মালিকানা দাবি করে সিভিল কোর্টে মামলা দায়ের করতে পারেন। ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের কোন  এক্তিয়ার থাকবে না ( ২০০৫(১) WBLR ৬৬৫ Cal )।
১৯৯৫ আইন বোর্ডের অধীনে সার্ভে কমিশনার নিযুক্ত করেছে  রাজ্যের সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তিকে ওয়াকফ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। ওয়াকফ কমিশনার সম্পত্তি গুলিকে চিহ্নিত, পরিমাপ, রেকর্ড ভুক্ত প্রভৃতি করবে এবং বোর্ডের অধীনে আনবে। দখলমুক্ত করবে। প্রত্যেক রাজ্যে বিপুল ওয়াকফ সম্পত্তি চিহ্নিত না হয়ে নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত রয়েছে। ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রয়, হস্তান্তর, লীজ করা যাবে না বোর্ডের আগাম অনুমতি ব্যতিরেকে। মুতাওয়াল্লী, ট্রাস্টি বা সেবায়েত এর হস্তান্তর করবার ( alienate/ lease ) কোন ক্ষমতা নেই। ওয়াকফ ফান্ড তৈরীর বিধান রয়েছে দরিদ্র ও দাতব্য কার্যে মুসলিমদের জন্য অর্থ ব্যয় করা যাবে। Muslim Women  Act, ১৯৮৬ আইনে তালাকপ্রাপ্তা, বিধবাদের ওয়াকফ ফান্ড থেকে পর্যাপ্ত খোরপোষ দেওয়ার বিধান আছে । দরখাস্ত করলেই দিতে হবে, নতুবা বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছে আবেদন করা যায়।

ওয়াকফ আইন ২০২৫ :

ওয়াকফ (সংশোধন) আইন ২০২৫ ওয়াকফ এর মূল নীতিকে অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন করেছে। ওয়াকফ অ্যাক্ট নামের স্থলে করেছে “Unified Waqf Management, Empowerment, Efficiency and Developmen Act 2025.” বা সংক্ষেপে ummeed । আইনে অনেক গুলো মূল পরিবর্তন করা হয়েছে:-
১) আগাখানি ওয়াকফ, বোহরা ওয়াকফ ও শিয়া ওয়াকফকে পৃথক করা হয়েছে।
২) কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত পোর্টাল বা ডাটাবেস সিস্টেমে ওয়াকফ সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন ও বিবরণ , অডিট, বোর্ড, মুতাওয়াল্লী ও বর্তমান ম্যানেজমেন্ট সব তথ্য দিতে হবে। আইন চালু হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তা করা বাধ্যতামূলক। বিশেষ কারণে আবেদনের ভিত্তিতে আরও ছয় মাস সময় বাড়ানো যেতে পারে। নতুন সম্পত্তি ওয়াকফ ঘোষণার ১৫ দিনের মধ্যে পোর্টালে ভুক্ত করতে হবে।
৩) ওয়াকিফ হতে পারবেন কোন ব্যক্তি কমপক্ষে ৫ বছর ধরে ইসলাম ধর্ম পালন করলে ( professing Islam at least for five years), এবং সম্পত্তির আইন সম্মত মালিক হলে।
৪) অমুসলিমরা কোন ওয়াকফ করতে পারবে না, আইনের ১০৪ ধারা তুলে দেওয়া হয়েছে।
৫) ওয়াকফ আলাল আওলাদ এর ক্ষেত্রে ওয়াকিফ এর মহিলা উত্তরাধিকারী সহ উত্তরাধিকারীদের উত্তরাধিকার প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না।
৬) সার্ভে কমিশনার পদ তুলে দিয়ে তার দায়িত্ব জেলা কালেক্টরকে দেওয়া হয়েছে।
কালেক্টর বা তাঁর প্রতিনিধি ডেপুটি কালেক্টর ওয়াকফ সম্পত্তির সার্ভে করবেন, দখলমুক্ত করবেন, রক্ষনাবেক্ষণ করবেন, এবং রেকর্ড অব রাইটস এ নাম পরিবর্তন করবেন, কিন্তু সম্পত্তি বিলি ব্যবস্থা করতে পারবেন না।
৭) কোন সম্পত্তি সরকারী সম্পত্তি না ওয়াকফ সম্পত্তি তা নিয়ে বিতর্ক থাকলে এবং বর্তমানে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসাবে চিহ্নিত বা ঘোষিত হয়ে থাকলে তা ওয়াকফ সম্পত্তি থাকবে না, এবং এ ধরনের কোন বিবাদ দেখা দিলে জেলা কালেক্টর তদন্ত করে রাজ্য সরকারকে রিপোর্ট দেবেন, এবং সরকারি সম্পত্তি হলে প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংশোধন করাবেন, কিন্তু সম্পত্তি ওয়াকফ হলে বোর্ড প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংশোধন করাবেন।
৮) কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হবেন ওয়াকফ বিষয়ক দপ্তরের দায়িত্ব প্রাপ্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এ ছাড়া কাউন্সিলে অন্তত দুজন মহিলা সদস্য, দুজন অমুসলিম সদস্য থাকবেন। রাজ্য বোর্ড বা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে একই ভাবে অন্তত দুজন মহিলা, দুজন অমুসলিম, এবং সুন্নি, শিয়া ও মুসলিম অনগ্রসর শ্রেণীর একজন করে সদস্য থাকবেন।
৯) ৫০এ ধারা অনুযায়ী মুতাওয়াল্লী অযোগ্য হবেন যদি
ক)বয়স ২১ এর কম হলে
খ) মানসিক অসুস্থ হলে
গ) ঘোষিত দেউলিয়া হলে
ঘ) দু বছরের বেশি মেয়াদ অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হলে
ঙ) ওয়াকফ সম্পত্তি বলপূর্বক দখল করে থাকলে
চ) পূর্বে ওয়াকফ পদ থেকে অপসারিত হলে বা কোন কোর্ট দ্বারা অব্যবস্থাপনা বা দুর্নীতির জন্য কোন ট্রাস্ট থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে।
১০) ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করা যাবে।
কথার ফুলঝুরি:
নতুন আইন ২০২৫ এর লক্ষ্য হিসাবে বলা হয়েছে ইতিপূর্বে ১৯৯৫ আইনের ২০১৩ সালে সংশোধন করা হলেও ঐ আইনে যথাযথভাবে ওয়াকফ সম্পত্তির পরিচালনা, উন্নয়ন, ব্যবহার, রক্ষনাবেক্ষণের ব্যবস্থা ও সব গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব হয়নি। সে কারণে পুনরায় সংশোধন করার আবশ্যকতা রয়েছে।
মুসলিমদের সামনে চ্যালেঞ্জ:
আজকে মুসলিম সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ওয়াকফ আইনে সংশোধনী এনে আইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওয়াকফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া বন্ধ করা।
আইনটি সারা দেশে ওয়াকফ সম্পত্তি লুটপাট ও দখল করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে। এই আইনের পেছনের ষড়যন্ত্র, এর বিপদ ও প্রভাবগুলো সাধারণ মানুষকে বোঝানো ও সচেতন করা জরুরি।
এই আইনের ক্ষতিকর দিকগুলো হল:
– ওয়াকফ প্রশাসনিক বোর্ডগুলোর দূরভিসন্ধি নিয়ে পুনর্গঠন ,
– ক্ষমতাহীন ট্রাইব্যুনাল
– ওয়াকফ অনুদানে নিষেধাজ্ঞা
– জটিল পোর্টাল নিবন্ধন
– ’ব্যবহার-ভিত্তিক ওয়াকফ’ বিলোপের পথ
– সময়সীমা আইনের বাধ্যবাধকতা
– সরকারের ভুলের বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই
– আইন লঙ্ঘনে অত্যন্ত কম শাস্তি

উপরোক্ত বিষয়গুলোর বিশদ বিবরণ :

১. ওয়াকফ প্রশাসনিক বোর্ডের অসঙ্গত ও দূরভিসন্ধি মূলক পুনর্গঠন ।

কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল (CWC) এবং রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডগুলিতে (SWB)  অমুসলিমদের নিয়োগের ব্যবস্থা। এটা সম্পূর্ণরূপে অন্যায়। এ ধরনের সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করে ওয়াকফ সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেগুলো লুটের ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল (CENTRAL WAQF COUNCIL):
এটি একটি ২২ সদস্যের কাউন্সিল হবে। ইউনিয়ন সরকার এদের নিয়োগ করবে:
১. সভাপতি ,  সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী (  মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
২. দুই জন লোকসভা সাংসদ ও একজন রাজ্যসভা সাংসদ (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
৩.  জাতীয় স্তরের মুসলিম সংস্থা বা সংগঠনের ৩ জন প্রতিনিধি
৪. ৩টি রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান (পর্যায়ক্রমে)
৫. একজন মুতাওয়াল্লির প্রতিনিধি
৬.   ৩ জন মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞ
৭. উপরের ৩, ৪, ৫ ও ৬ নং পয়েন্টে অন্তত ২ জন মহিলা ও ২ জন অমুসলিম থাকা বাধ্যতামূলক।
৮. সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
৯.  হাইকোর্টের একজন বিচারক (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
১০. একজন জাতীয় খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
১১.  প্রশাসন/ব্যবস্থাপনা, অর্থ, ইঞ্জিনিয়ারিং/স্থাপত্য, চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্রের ৪ জন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
১২.  ভারত সরকারের অধীনে চাকরিরত একজন উপদেষ্টা বা যুগ্ম সচিব – ওয়াকফ বিভাগ থেকে (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
এই ২২ সদস্যের কাউন্সিলে মাত্র ৮ জন সদস্য মুসলিম হতে পারবেন — এটি লক্ষণীয় বিষয়।
বাকি ১৪ জন মুসলিমও হতে পারেন, অমুসলিমও হতে পারেন। বিজেপি তথা আরএসএস এর ভাবনা, নীতি, কাজের ইতিহাস বলছে এই ১৪ জন হবেন অমুসলিম এবং আরএসএস এর ভাবাদর্শে প্রভাবিত ব্যক্তি।
রাজ্য ওয়াকফ বোর্ড (STATE WAQF BOARD):

রাজ্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত সদস্যদের সংখ্যা ১১ এর বেশি হতে পারবে না। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে সর্বনিম্ন ৫ এবং সর্বোচ্চ ৭ জন সদস্য থাকবেন।
১. চেয়ারম্যান (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
২.  রাজ্যের একজন সাংসদ (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
৩.  রাজ্যের একজন বিধায়ক (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
৪.  একজন মুতাওয়াল্লি
৫.  একজন ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ
৬.  নগর পরিষদ বা গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে নির্বাচিত দুই সদস্য
৭.  ব্যবসা, সমাজসেবা, অর্থ, কৃষি ও উন্নয়ন ক্ষেত্র থেকে দুই জন প্রতিনিধি
৫, ৬ ও ৭ নং পয়েন্টে অন্তত ২ জন মহিলা ও ২ জন অমুসলিম থাকা বাধ্যতামূলক। যদি মুসলিম পাওয়া না যায়, তবে অমুসলিমদের সংখ্যা বাড়ানো যাবে।
রাজ্য সরকারের অধীনে ওয়াকফ বিভাগে চাকরিরত একজন যুগ্ম সচিব (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
বার কাউন্সিলের একজন সদস্য (মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক নয়)
এইভাবে, রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডের ১১ সদস্যের মধ্যে মাত্র ৪ জন মুসলিম হতে পারবেন। বাকি ৭ হবেন অমুসলিম এবং অবশ্যই আরএসএস বা বিজেপি প্রভাবিত ব্যক্তি।
মুসলিম বাদে অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দেবোত্তর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমিটিতে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের না নেওয়ার বিধান রয়েছে।

অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বোর্ডের বিধান :

কাশী বিশ্বনাথ মন্দির আইন, ১৯৮৩ বলছে , হিন্দু ছাড়া কোন ব্যক্তি বোর্ডের সদস্য বা কার্যকরী কমিটি সদস্য , বা অফিসের প্রধান নির্বাহী অফিসার হতে পারবেন না বা অফিসের কোন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
তামিলনাড়ু রিলিজিয়াস অ্যান্ড চ্যারিটেবল এনডাউমেন্ট অ্যাক্ট
এই আইনের অধীনে নিয়োগকৃত কমিটি বা কমিশনারকে অবশ্যই হিন্দু ধর্মের হতে হবে।
অন্ধ্রপ্রদেশে চ্যারিটেবল অ্যান্ড হিন্দু রিলিজিয়াস ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড এনডাউমেন্ট অ্যাক্ট
কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, উপকমিশনার, সহ কমিশনার সকলকে বাধ্যতামূলক ভাবে হিন্দু ধর্মের হতে হবে।
কর্নাটক হিন্দু রিলিজিয়াস ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড রিলিজিয়াস এনডাউমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৯৭।
কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার,সহ কমিশনার সকলকে হিন্দু ধর্মের হওয়া উচিত।
উড়িষ্যা হিন্দু রিলিজিয়াস এনডাউমেন্ট অ্যাক্ট
নিয়োগকৃত সকলকে বাধ্যতামূলক ভাবে হিন্দু ধর্মের হতে হবে।
দ্য রিলিজিয়াস এনডাউমেন্ট অ্যাক্ট,১৮৬৩ বলছে, কমিটি নিয়োগ :
রাজ্য সরকার জেলার প্রতি বিভাগে নিজ নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে একটি করে কমিটি নিয়োগ করবে মসজিদ, মন্দির বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে বা বর্তমানে যে উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য।
অমুসলিমদের ওয়াকফ বোর্ডে নিয়ে আসা সংবিধানে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার বিরোধী।
26 no section of the Indian constitution Freedom to manage religious affairs.
Subject to public order, morality and health, every religious denomination or any section thereof shall have the right
A)  to establish and maintain institutions for religious and charitable purposes
B) to manage its own affairs in matters of religion
C) to own and acquire movable and immovable property and
D)  to administer such property in accordance with law.
ধর্মীয় বিষয় সমূহ ব্যবস্থাপনা করার স্বাধীনতা :
জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং স্বাস্থ্যের সাপেক্ষে প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের অথবা তার যে কোন বিভাগের অধিকার থাকবে–
ক)  ধর্মীয় এবং দান বিষয়ক উদ্দেশ্যসমূহের জন্য প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠা করার এবং পরিচালনা করার
খ) ধর্মীয় বিষয়সমূহ এবং নিজস্ব কার্যাদি পরিচালনা করার
গত) স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন করার এবং স্বত্ববান হওয়ার এবং
ঘ)  সেই সম্পত্তি আইন অনুসারে পরিচালনা করার।

২. ক্ষমতাহীন ট্রাইব্যুনাল (Powerless Tribunal):
এখন পর্যন্ত, ওয়াকফ বিষয়ক চূড়ান্ত সমাধান ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইনের অধীনে ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে হতো।  ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা যেত বা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করতে পারত। কিন্তু তা সহজ পদ্ধতি ছিল না। কিছুটা জটিল ও কঠিন শর্তসাপেক্ষ ছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনী আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করা যাবে।
এর ফলে বিবাদ বছরের পর বছর ঝুলে থাকতে পারে এবং মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে দেরি হবে।
দেশে মোট ১৪টি ট্রাইব্যুনাল (Tribunal) রয়েছে। সাধারণত, এই ট্রাইব্যুনালগুলি তাদের নিজ নিজ এখতিয়ারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যদিও, এই সিদ্ধান্তগুলি উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যায়, তবে এই প্রক্রিয়া সহজ নয়। সাধারণত ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়, এবং কেবল কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতেই উচ্চ আদালত এতে হস্তক্ষেপ করে।
এখন নতুন ওয়াকফ সংশোধনী আইন ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের স্বায়ত্তশাসন বিলোপ করে এবং ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে পুনর্বিচার আবেদন দাখিলের নিয়ম চালু করে।
৩. ওয়াকফ দান শর্তযুক্ত (Waqf Donation Restricted):
এখন ওয়াকফ হিসেবে দান করতে হলে দাতাকে অন্তত গত ৫ বছর ধরে অনুশীলনরত মুসলিম হতে হবে, এমন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এটি ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের পরিপন্থী। যেখানে কোনো ব্যক্তি তার সম্পত্তি যে কাউকে দান করতে পারে, সেখানে এই নতুন বিধান বিশেষভাবে মুসলিমদের এই অধিকার সীমিত করছে।
৪. জটিল পোর্টাল নিবন্ধন: ওয়াকফ সম্পত্তির তথ্য ৬ মাসের মধ্যে সরকারি পোর্টালে আপলোড করতে হবে। প্রয়োজন হলে মাত্র একবার ৬ মাসের সময় বাড়ানো যাবে। যদি আবেদনে বিলম্ব হয়, তবে সেই সম্পত্তির মালিকানা সন্দেহের মুখে পড়তে পারে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক বিধান।
৫. ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়াকফ’ (Waqf by User) বাতিল:
যে সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তি  “ব্যবহারের ভিত্তিতে” (Waqf by User) নিবন্ধিত আছে, কেবল সেগুলিই সুরক্ষিত থাকবে। যেগুলি সরকারি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ফলে বিতর্কিত, সেগুলি এই শ্রেণি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অলিখিত কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত ওয়াকফ সম্পত্তিগুলি ধ্বংস হতে পারে। অনেক ঐতিহাসিক ও পুরাতন সম্পত্তি, মসজিদ, দরগাহ ইত্যাদি আছে যেগুলোর মূল দলিল এখন আর পাওয়া সম্ভব নয়। বা আগের অনেক সময় মুখের কথার উপর নির্ভর করেই ওয়াকফ হিসেবে স্বীকৃত ও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেগুলো হারানোর সুযোগ থাকবে। যেমন দিল্লির জামা মসজিদ। জমি দান করেছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। এখন যদি সে দলিল পাওয়া না যায় তা হলে জামা মসজিদ আর ওয়াকফ সম্পত্তি থাকবে না। দেশে এ ধরনের বহু সম্পত্তি আছে।
৬. সময়সীমা আইনের প্রযোজ্য (Limitation Act ):
১৯৯৫ সালের আইনে ১৯৬৩ সালের Limitation Act ওয়াকফ সম্পত্তির উপর প্রয়োগে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু নতুন আইনে তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সে আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে থাকে, তবে সে ঐ সম্পত্তির মালিকানা দাবি করতে পারে। এটি ওয়াকফ সম্পত্তির জন্য গুরুতর হুমকি।
৭. সরকারের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই:
যদি ওয়াকফ জমিতে সরকার কোন ভবন নির্মাণ করে, তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে কোন আইনি অধিকার বা আপিলের সুযোগ থাকবে না। এটি ওয়াকফ সম্পত্তির সুরক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করবে।
৮. আইন লঙ্ঘনের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা :
আগের আইনে ওয়াকফ জমি জবরদখলকারীদের জন্য ২ বছরের কঠিন সাজা এবং জামিন অযোগ্য ওয়ারেন্টের বিধান ছিল। এখন এটিকে জামিনযোগ্য এবং সাধারণ অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।  ফলে  অপরাধীরা শাস্তি থেকে বাঁচার পথ পেয়ে যাবে।

বিজেপি  প্রচারিত বিভ্রান্তিকর দাবি:
✔ বিজেপি অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, নতুন সংশোধন আইন ‘পশ্চাৎপদ  মুসলমানদের’ স্বার্থে’। এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই আইনে এমন কোনো উপাদান নেই।
✔ মোদী, অমিত শাহ এবং বিজেপি নেতারা দাবি করছেন যে, এই আইন ওয়াকফ সম্পত্তিকে মাফিয়া ও ভূ-মাফিয়াদের হাত থেকে রক্ষা করবে ।এটি বিপজ্জনক এবং মিথ্যা প্রচার।
বাস্তবে ওয়াকফ বোর্ডে অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা,  ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়াকফ (Waqf by User)  বাতিল, Limitation Act-এর বাধ্যবাধকতা, জটিল পোর্টাল প্রক্রিয়া – এগুলির মূল উদ্দেশ্য ওয়াকফ সম্পত্তিকে মুসলিম নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আনা এবং ফ্যাসিস্ট শক্তিকে এগুলি দখলের সুযোগ দেওয়া।
✔ বিজেপি দাবি করে যে ওয়াকফের জমি সেনাবাহিনী ও রেলওয়ের পর দেশের তৃতীয় বৃহত্তম সম্পত্তি — এটি মিথ্যা। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা এবং ওড়িশার মতো মাত্র চারটি রাজ্যে মন্দিরের জমি ১০ লক্ষ একরের বেশি। খ্রিস্টান গির্জার জমি এর চেয়েও বেশি (১৭ লক্ষ একরের বেশি) — এটি অর্গানাইজার পত্রিকায় প্রকাশিত।
✔ বিজেপি সরকারের মুসলমানদের পক্ষে থাকার দাবি কেবল ভন্ডামি। তারা মুসলিম ছাত্রদের জন্য চালু থাকা বেশ কিছু বৃত্তি প্রকল্প বাতিল করেছে।
১. ন্যাশনাল ওভারসিজ স্কলারশিপ
২. প্রি-ম্যাট্রিক স্কলারশিপ
৩. পোস্ট-ম্যাট্রিক স্কলারশিপ
৪. মেরিট-কাম-মিনস স্কলারশিপ
৫. মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল ফেলোশিপ
৬. মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষা ঋণে সুদ ভর্তুকি প্রকল্প

ওয়াকফ ( সংশোধনী) আইন ২০২৫ সংবিধান বিরোধী :
✔ ওয়াকফ প্রশাসনিক বোর্ডে অ-মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত করা ভারতীয় সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
✔ ওয়াকফ দানের জন্য কমপক্ষে পাঁচ বছরের ধর্মীয় অনুশীলন বাধ্যতামূলক করা সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ (সমতা ও আইনের সুরক্ষা) এবং ১৫ অনুচ্ছেদ (ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষেধ) লঙ্ঘন করে।
✔ ওয়াকফ সম্পত্তির ক্ষতি করার জন্য শাস্তি হ্রাস, ‘ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়াকফ’ বাতিল করা এবং Limitation Act জোরপূর্বক প্রয়োগ করা — এগুলি ২১ অনুচ্ছেদ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষার অধিকার) এবং ১৫ থেকে ২৮ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে।

আন্দোলনকারীদের ত্রুটি :

ওয়াকফ সংশোধনী আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত মুসলিমদের কেউ কেউ দু একটা ভুল যুক্তি উপস্থাপন করছেন বলে আমাদের মনে হয়েছে। “পুবের কলম” পত্রিকার ২৪ ডিসেম্বর সংখ্যার পাঁচ পাতায় ” দেশের সর্বাধিক তৃতীয় ভূ-সম্পত্তির মালিক ওয়াকফ বোর্ড, বাংলায় ৫৯ হাজার একর ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে । প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশে সামরিক বাহিনীর হাতে রয়েছে সর্বাধিক ভূ-সম্পত্তি। দ্বিতীয় সর্বাধিক ভূ-সম্পত্তির মালিক রেল বিভাগ। তৃতীয় সর্বাধিক ভূ-সম্পত্তির মালিক ওয়াকফ বোর্ড। এই তথ্য এবং বিশ্লেষণ সঠিক নয়। সামরিক বাহিনী ও রেল বিভাগের হাতে যে ভূ-সম্পত্তি আছে তার মালিক সরকার। অর্থাৎ সেগুলো সরকারি ভূ-সম্পত্তি। সরকার এগুলোকে বিক্রি করতে পারে। অন্য দপ্তরে হস্তান্তর করতে পারে। যে কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার জন্য আইন অনুযায়ী দপ্তরের কাছ থেকে নিতে পারে। কিন্তু ওয়াকফ সে ধরণের ভূ-সম্পত্তি নয়। এগুলো আল্লাহর সম্পত্তি। মুসলিমরা তার তত্ত্বাবধায়ক মাত্র। ওয়াকফ সম্পত্তি কেউ এমনকি সরকারও ক্রয় বিক্রয় করতে পারে না। অধিগ্রহণ করতে পারে না। ওয়াকফ সম্পত্তির মালিক কোনভাবেই সরকার নয়। তাই সরকারি সম্পত্তির সাথে ওয়াকফ সম্পত্তির তুলনা সঠিক নয়। এই তুলনার মধ্যে ওয়াকফ সম্পত্তিকে সরকারি সম্পত্তি ভাবার ভাবনা চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
তা ছাড়াও দেশে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দেবোত্তর সম্পত্তি ওয়াকফ সম্পত্তির চেয়ে অনেক বেশি।
নতুন সংশোধিত আইনে ওয়াকফ কাউন্সিল ও বোর্ডে অমুসলিমদের রাখার বিধান রাখা হয়েছে। এর বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা বলছি অন্যান্য ধর্মের কমিটি বা বোর্ডে কি মুসলিমদের সদস্য করবে? আমাদের মনে হয় এই রকম যুক্তি ন্যায়সঙ্গত নয়। কারণ আগামী কাল যদি মুসলিমদের অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দেবোত্তর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমিটিতে রাখা হয় তা হলে কি আমরা ওয়াকফ কাউন্সিল ও বোর্ডে অমুসলিমদের রাখাকে মেনে নেব? আমাদের মনে হয় মুসলিমদের অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দেবোত্তর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমিটিতে যাওয়া ঠিক হবে না এবং ওয়াকফ কাউন্সিল ও বোর্ডে অমুসলিমদের রাখাকে মেনে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিষয়ে নিজেদেরই পরিচালনা করা ন্যায়সংগত।
আরও একটি বিষয় হল, বিজেপি সরকার বলছে এই আইন সংশোধনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে পশমনদা বা পিছিয়ে রাখা মুসলিমদের, মুসলিম নারীদের কল্যাণ করা। এর উত্তরে আমরা বলছি বিজেপি সরকারের ইতিহাস, বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে বিজেপি মুসলিমদের কল্যাণ চায় না। অতএব, এই দাবি ভাওতা ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের আরও বলা দরকার আমাদের সম্পত্তি নিয়ে আমাদের উপকার করবে এটা সরকারের দায়িত্ব নয়।  এটার মধ্য দিয়ে সরকার নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে এবং আমরা সেটা মেনে নিচ্ছি। সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব জনগণের করের টাকায় প্রতিটি নাগরিকের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার পূরণ করা। সরকারকে মুসলিমদের, মুসলিম নারীদের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে সরকারি তহবিল থেকে। ওয়াকফ তহবিল থেকে নয়। ওয়াকফ তহবিল থেকে উন্নয়ন করার কাজ মুসলিমদের।
আমাদের করণীয় :
ওয়াকফ সংশোধনী আইন কেবলমাত্র মুসলিমদের সমস্যা নয়। এটা সাংবিধানিক সমস্যা। সংবিধান স্বীকৃত ধর্মীয় অধিকার রক্ষার সমস্যা। সংবিধান স্বীকৃত সকলের সমানাধিকার রক্ষার সমস্যা। তাই যারা সংবিধান, ধর্মীয় অধিকার, সমানাধিকার রক্ষার লড়াই করছেন তাদের সবার সমস্যা। সবাইকে নিয়ে একত্রে ঐক্যবদ্ধ ভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাজের অন্যান্য অংশের বিশেষ করে দলিত ও আদিবাসীদের সমস্যাকে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত করতে হবে। তা ছাড়াও সমাজের সব স্তরের অংশগ্রহণ মূলক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নারী পুরুষ, যুবক যুবতী, ছাত্র ছাত্রী, কৃষক, মজুর সবার অংশগ্রহণ দরকার। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে। আন্দোলনে প্রতিটি মহল্লাকে যুক্ত করতে হবে। ধাপে ধাপে আন্দোলনের গতি তীব্রতর করতে হবে। এই লড়াইকে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র তৈরি করার বিরুদ্ধে পরিচালিত লড়াইয়ের সাথে জুড়ে দিতে হবে। ফ্যাসিস্ট বিরোধী লড়াইয়ের অংশ হতে হবে ওয়াকফ আইন বাতিল করার লড়াইকে। আমাদের বুঝতে হবে সংবিধান বাঁচলে দেশ বাঁচবে, দেশ বাঁচবে ওয়াকফ বাঁচবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *