গোপীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
ধর্মের উৎপত্তি ঠিক কোন সময়ে তা সঠিক ভাবে বলা যায় না।
তবে সমাজ বিকাশের বিশেষ একটি স্তরে এর উৎপত্তি হয়েছিল। আদিম সাম্যবাদী স্তর পেরিয়ে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব হলো, সম্ভবত দাস যুগে। টিকে থাকবার জন্য ধর্মকেও নবীকরণের মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়েছে। আদিমতম রাজনীতি হিসেবেই ধর্মের উৎপত্তি এবং একেও ক্রমশ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। এঙ্গেলস বলেছেন, ‘ধর্ম হলো শ্রেণি বিভক্ত সমাজের উপরিকাঠামোর একটি উপাদান’। আবার আমরা নিঃস্ব মানুষেরাও ধর্মের মধ্যে মানসিক মুক্তি খুঁজি। আন্টি ডুরিংস-এও এঙ্গেলস বলেছেন, ‘মানুষের মনের ভেতর বহির্জগতের কাল্পনিক প্রতিফলনই ধৰ্মীয় ভাবকে গড়ে তোলে’। মার্ক্স বলেছেন, ‘ধর্ম হলো শাসক শ্রেণির সামাজিক উৎপীড়ন চালাবার মতাদর্শগত হাতিয়ার’।
ধর্মও ও রাষ্ট্র কোনও সমাজ বহির্ভূত শক্তির দ্বারা সৃষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠান নয়। যদিও রাষ্ট্রের সঙ্গে ঈশ্বর ও অতিপ্রাকৃতিক ধারণাকে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। দুটোরই উৎপত্তি সমাজ বিকাশের একটি বিশেষ স্তরে। যাদের সৃষ্টি ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ও শ্রেণিসংঘর্ষের নিরিখে। যা শ্রেণি বিরোধের অমীমাংশিত ফল। এক শ্রেণি কর্তৃক আর এক শ্রেণীকে দমনের যন্ত্র ছাড়া রাষ্ট্র আর কিছুই নয়। সে জন্যই তাকে রাখতে হয়, আমলাতন্ত, বিচারবিভাগ, পুলিশ, মিলিটারি।
প্রাচীন ভারতে আর্য আগমনের আগে যে দুটো প্রাচীন সভ্যতা ছিলো তার একটি হলো, অস্ট্রিক সভ্যতা ও দ্রাবিড় সভ্যতা। আজ থেকে আনুমানিক এক লক্ষ পঁচিশ হাজার বছর আগে আফ্রিকান যে জনগোষ্ঠী অজানা কারণে বেরিয়ে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিযায় ছড়িয়ে পড়ে। এই জনগোষ্ঠীরই একটি দল 75 হাজার বছর আগে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে আরব উপদ্বীপে পৌঁছয়। তার আট হাজার বছর পরে এরাই এশিয়া সংলগ্ন ইউরোপে বসতি গড়ে। এর পরবর্তীতে 40 হাজার বছরের মধ্যেই ইউরোপের রাইন নদী থেকে তুরস্ক পর্যন্ত ব্যাপক এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আবার খ্রিশস্টপূর্ব 35 হাজার বছর আগে এদেরই একটি দল দানিউব নদী তিরবর্তী বৃহৎ তৃণভূমি অঞ্চলে এসে বসবাস করতে শুরু করে। এদের মূল জীবিকা ছিলো পশু পালন। অন্তঃগোষ্ঠী বিবাদ ও জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির কারণে একটি দল শেষ অব্দি এই এলাকা ত্যাগ করে, দার্ডেলিস প্রণালী হয়ে এশিয়া মাইনরে এবং পরবর্তীতে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এদেরই একটি দল চলে আসে ইরানে, এই ইরানেরই পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীরা ভারতে প্রবেশ করতে শুরু করে। যদিও এই অনুপ্রবেশ একদিনে ঘটেনি। যারা ইরানে থেকে গিয়েছিল তাদের বলা হতো ইন্দো-ইরানিয়, যারা ভারতে প্রবেশ করে তারা আর্য। দীর্ঘ সময় ধরে যে অনুপ্রবেশ চলছিল তা খ্রি পূ 1800 থেকে 1500 অব্দ পর্যন্ত। তবে আর্যরাই প্রথম লোহার ব্যবহার শেখে, সেটা মোটামুটি খ্রি পূ 700 অব্দে, যা আর্য আগ্রাসনকে তরান্বিত করতে সাহায্য করেছিল।
আর্য সমাজে সবচেয়ে প্রাচীন বেদ ঋক বেদ। রচনাকাল খ্রি পুঃ 1200– 1100 অব্দ। যার উল্লেখযোগ্য দেবতারা হলো ওগ্নি, বরুন, বৃহস্পতি, বিষ্ণু। ঋক বেদ স্তোত্রাবলির একটি সংকলন। আনুমানিক 1500 খ্রিষ্টপুর্বাব্দে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংশের পর বৈদিক যুগের সূচনা। বেদ, উপনিষদ লিখিত ভাবে তৈরি হয়নি। এটি শ্রুতি সাহিত্য হিসেবেই গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ শুনে শুনেই মনে রাখতে হতো। আবার লক্ষনীয় আর্য সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণ ও ধর্মীয় আদান-প্রদান আর্য সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছিল, একইসঙ্গে বহু অনার্য দেব-দেবী আর্য ধর্মাচারে প্রবেশ করে এবং নতুন নতুন ধর্মীয় আখ্যান গড়ে ওঠে। এরসঙ্গে উভয় ভাষাই পরিবর্তিত রূপ পেয়েছিল।
আজ যে ভাবে হিন্দু ধৰ্ম বা ব্রামণ্যবাদকে সবচেয়ে প্রাচীন ধৰ্ম বলে বলা হচ্ছে, এর কোনও সারবত্তা নেই। এক্ষেত্রে প্রাচীন ইরানিও (পারস্য) ধর্মও উল্লেখ করবো, যার উৎপত্তি সঠিক ভাবে বলা যায় না। কিন্তু এর সঙ্গে ঋক বেদের ভাষাগত মিল ও পারস্য ধর্মে বর্ণিত ঈশ্বর একই। মোটামুটিতে ঋক বেদের চার হাজার বছর আগে প্রাচীন পারস্য ধর্ম সৃষ্টির অনুমান করা হয়। আর্য গোষ্ঠী ভারতে প্রবেশ করা শুরু করে খ্রিষ্টপূর্ব 1500 অব্দে। খাইবার গিরিপথ ধরে আর্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল।
বাস্তবিক অর্থে ধৰ্ম আমাদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি। একইসঙ্গে এটাও বলার, ধৰ্ম কোনও স্বর্গীয় জগৎ থেকে নেমে আসেনি। বৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারণা ও যুক্তিবাদের অভাবই প্রাচীন মানুষকে ধর্মের ঘেরাটোপে বাঁধতে পেরেছে। একে রাষ্ট্র ভাবনার সঙ্গে সম্পক্তকরণের মধ্যে দিয়ে আরও দৃঢ় করা হয়েছে (যা প্ৰতিটি ধর্মের অবলম্বন)। ধৰ্ম ইহলোকে আমাদের সুখী হবার পথ দেখায় না, পরলোকে সুখী ও পরিতৃপ্ত হবার আষাঢ়ে গল্প বলে। এই কাল্পনিক মোক্ষ লাভের দাওয়াই কিন্তু সব ধর্মেই এক। আসলে ভ্রান্ত বিজ্ঞান ও ভ্রান্ত দর্শন দিয়েই ধর্ম চিরকাল আমাদের বোকা বানিয়েছে। আর তাই একে ব্যবহার করতে হয়েছে অদ্ভুত উপাক্ষান, আত্মা এমন কি জাদু বিদ্যাকেও ব্যবহার করেছে অজ্ঞ মানুষকে বোকা বানাতে।
ধর্মীয় কঠোরতার ঘেরাটোপ মানুষ কি চিরকাল মেনে নিয়েছে? মোটেই তা নয়। মধ্য যুগ থেকে আজকের যুগেও ধর্মকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার অপচেষ্টা চলছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগকে প্রাচীন যুগ, মুসলিম যুগকে মধ্য যুগ এবং ব্রিটিশ যুগ থেকে বর্তমান যুগকে আধুনিক যুগ বলে। মধ্য যুগে চৈতণ্যের নেতৃত্বে ভক্তি আন্দোলন যা, সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। যা মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদের স্বেচ্ছাচার, অস্পৃশ্যতা ও সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে চালিত হয়েছিল।
আবার সুফিবাদ যাকে সাধারণ ভাবে আমরা ইসলামী দর্শন হিসেবে জানি, আমাদের দেশে এই মতাদর্শের প্রবেশ 11 শতাব্দীতে। এই দর্শনের প্রভাব অনিবার্য ভাবেই ভারতীয় দর্শনের ওপর পড়েছিল।
আবার বাউল ধর্ম বা দর্শনের কথাও উল্লেখ করতে হয়। যদিও এই মত বা দর্শনের লিখিত কোনও পুঁথি, দলিল বা সাহিত্য পাওয়া যায় না। ফলে এর উদ্ভবের বিষয়ে সঠিক ভাবে কোনও মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে বৈষ্ণব সহজিয়া সাহিত্যের মধ্যে বাউল তত্ত্বের কথা পাওয়া যায়। এই সম্প্রদায়ের তিনটি ভাগ আছে – গৃহি, সংযোগী আর উদাশী। এঁরা বেদ, পুরাণ, কোরান মানেন না। একইসঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ নির্দেশিত জাত-পাত ইত্যাদির বিরোধিতা করেন। এরও বিকাশ সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অবশ্যই আছে, কিন্তু তাকে ভেঙে ফেলবার বা নতুন করে গড়ে তোলবার সংকল্প নেই, যা চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলনে ছিলো। হতাশা ও নিরাশার নৈরাজ্য থেকেই হয়তো বাউলদের কাছে ঘরের বদলে ‘পথই’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সুফী, ফকিরি ধারা, বাউল মতবাদ শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণববাদী ভক্তি আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছিলো। তাঁর ভক্তি বা বৈষ্ণব আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অপরিসীম। সেই সময়ে বর্ণভেদ, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, জাতিচ্যুতি, কৌলিন্য প্রথা ইত্যাদি নানা কুসংস্কারে সামাজিক জীবন জর্জরিত। তাঁর ভক্তি আন্দোলন ছিলো ব্রাহ্মণ্যবাদী অচলায়তনের বিরুদ্ধে কেবল জেহাদ নয়, তাকে ভেঙে ফেলার পবিত্র কর্তব্য। স্মার্ত পন্ডিত, যার রচিত – ‘স্মৃতিশাস্ত্র’, ‘ন্যায়শাস্ত্র’ এই সমস্ত বইগুলোর মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক নিষেধাজ্ঞা ছড়ানো হয়েছিল। খ্রিষ্টিয় ষোড়ষ শতাব্দীর বৈষ্ণব আন্দোলন বা চৈতণ্যবাদ ধর্মীয় বেড়াজালে আবদ্ধ ছিলো না, যা ছিলো আদপে একটি বিপ্লবী প্রকল্প। যার প্রধান বিষয় ছিলো তথাকথিত নিম্ন বর্ণের সামাজিক অধিকার এবং জাতিভেদ প্রথার অবসান। আরও লক্ষণীয়, ইসলামের উদারনৈতিক শক্তি হিসেবে যে সুফিবাদের বিকাশ, তার আত্মিকরণ ।
আবার যে কথাটা না বললে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায় তা হলো 11-12 শতাব্দীতে সেন রাজাদের আমলে জাত-পাত, বর্ণবিভাজনের অত্যাচারের তীব্রতা সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষকে উদার সুফিবাদের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। সুফিদের ‘মারেফাতি’ দর্শনের প্রভাব কেবল বাউল দর্শনে নয়, শ্রী চৈতণ্যের ধর্মীয় আন্দোলনকেও প্রভাবিত করেছিল। সুফিবাদের আরও কিছু প্রগতিশীল ভূমিকা ছিলো, যেমন হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের কুসংস্কার বিরোধিতা, সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা, নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। এথেকে বলা যায় শ্রী চৈতণ্যের বৈষ্ণব আন্দোলন হঠাৎ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে গড়ে ওঠেনি।
উনিশ শতক থেকে বর্তমান :
সেদিন থেকে আজ বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ধর্মকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তোলা হয়েছে। সেদিনের সেই সময় থেকে আজ আমরা কতটা এগিয়েছি বা কোথায় পড়ে আছি, এই আত্মজিজ্ঞাসার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। মধ্যযুগ এবং তৎপরবর্তী সময়কে আলোচনায় আনি তাহলে দেখবো, মধ্যযুগের সামাজিক আন্দোলন শ্রী চৈতণ্যকে তাঁর যুগের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই তাঁকে করতে হয়েছিল।
উনিশ শতক, যখন ইংরেজরা জাঁকিয়ে বসেছে ভারতের বুকে। ওদিকে 1781 সালের ফরাসি বুর্জোয়া বিপ্লব। ইউরোপে যে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা জন্ম নিয়েছিল সেটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। আমাদের দেশের পরিস্থিতিটা অন্য। এখানে পুরোনো পশ্চাদপদ সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ব্রিটিশের চাপানো উৎপাদন ব্যবস্থা ভারত তথা বাংলায় উৎপাদন ও উৎপাদন সম্পর্কের কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি এবং তা সম্ভবও নয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালির এক অংশের চিন্তা ও মননে একটা পরিবর্তন এসেছিলো, যাকে এক শ্রেণির ঐতিহাসিকেরা রেনেসাঁ বলে উল্লেখ করেছিলেন, বাস্তবে যার সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের কোনও যোগ ছিলো না। ধর্ম ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনও সংগ্রামও ছিলো অনুপস্থিত। ইউরোপের বুর্জোয়া বিপ্লবের সঙ্গে ভারতীয় নবজাগরণকে মেলাতে যাওয়া ভুল। কেবল সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে নয়, ধর্মের বিরুদ্ধেও সেখানে সংগ্রামটা ছিলো, ভারতে যা একান্ত ভাবেই অনুপস্থিত।
তাই তো আমাদের দেশের যে সামাজিক কুপ্রথাগুলো ছিলো তা আজও আমরা ভাঙতে পারিনি। রামমোহন রায়ের অবদানকে অস্বীকার করতে পারা যায় না, একথা ঠিকই। সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর একটি ভূমিকা থাকলেও, সমগ্র বিষয়টি ধর্মকে অতিক্রম করতে পারেনি। শাস্ত্রের মধ্যে থেকেই তিনি সতীদাহ বিরোধী লড়াইটা করেছিলেন। আবার অন্যদিকে 1815 সাল থেকে ‘বেদ্দান্তগ্রন্থ’, ‘বেদন্তসার’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলো অনুবাদের মধ্যে দিয়ে ‘একেশ্বরবাদ’ প্রতিষ্ঠার কাজে নামেন। অবশ্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাঁর এই কাজকেও মানতে পারেনি। তবে ভারতে শিক্ষা সংস্কার, সতীদাহ, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, বর্ণপ্রথা, এমনকি নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার এসব অবশ্যই, তাঁর প্রগতিশীল কাজ।
আবার 1827 সালের অগাস্ট মাসে ‘ব্রাহ্ম সভা’ পরবর্তীতে যা ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ নাম নেয়, এও কিন্তু স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত। তার প্রধান কারণ সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী অবস্থানগত মানুষেরাই এর হর্তা-কর্তা-বিধাতা ছিলেন। ঠাকুর পরিবারের দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম ধৰ্ম গ্রহণ করলেও, হিন্দু আচার পদ্ধতিতেই পিতৃ শ্রাদ্ধ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠানও ঘটা করে করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে রাজনারায়ণ বসু শুদ্র বলে সেখানে অপমানিত হয়েছিলেন এবং ঠাকুরবাড়ি থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয় (তথ্য সূত্র: আত্মচরিত, রাজনারায়ণ বসু)।
1817 সালে ডেভিড হেয়ার, আলেকজানডার ডাফ প্রমূখের সহযোগিতায় রামমোহন রায় এঁর প্রচেষ্টায় হিন্দু কলেজ স্থাপন। যেখানে অধ্যাপক হয়ে আসেন, হেনরি ভিভিয়ান লুই ডিরোজিও। তিনি এখানে অধ্যাপক হন 1928 সালে। এখানে তাঁর আগমন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্ত চিন্তা, প্রশ্ন তোলা, অন্ধ ভাবে সবকিছুকে গ্রহণ না করা, সমালোচনা মূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা, যা তৎকালীন হিন্দু সমাজে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। তাঁরই উদ্যোগে গড়ে ওঠে ইয়ং বেঙ্গল সোসাইটি বা নব্য বঙ্গ আন্দোলন। এই নব্য বঙ্গ আন্দোলনই বাঙালি চিন্তা ও মননে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিলো। সনাতনপন্থী হিন্দুত্বওলারা ডিরোজিও – কে হিন্দু কলেজ থেকে বিতারণ করেছিল 1831সালের 31 এপ্রিল। এই বিতারণ প্রক্রিয়ার মূল মাথা ছিলেন, রাধাকান্ত দেব।
এখানেই শেষ নয়, 1829 সালে উইলিয়াম বেন্টিংক আইন করে ‘সতীদাহ প্রথা’ রদ করেন। রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীরা 1832 সালে সতীদাহ প্রথা বজায় রাখার জন্য প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করেছিলেন। 1829 সালে আইনগত ভাবে সতীদাহ রদ হবার পরেও কমিশন অফ সতী ( প্রতিরোধ ) অ্যাক্ট ( 1987) রাজীব সরকারকে পাস করতে হয়! প্রাসঙ্গিক ভাবে বলা দরকার ওই বছরেরই 4 নভেম্বর 18বছর বয়েসি রূপ কানোয়ারকে সতীদাহের নামে খুন করা হয়েছিল। উনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের 41-তম সতী! তারপর গঙ্গা-যমুনা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, এরপরেও আরও কত সতীদাহর ঘটনা ঘটেছে তা জানা নেই, কারণ তা মিডিয়ায় আসেনি। 1987 সালের নতুন সতী প্রতিরোধ অ্যাক্ট অনুযায়ী সতীদাহকে আবার নতুন করে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এই প্রথাকে গৌরবান্বিত করাও নিষিদ্ধ করা হয়। রূপকে সতীদাহের নামে খুন করার ঘটনা ঘটেছিলো রাজস্থানের শিকর জেলার দেওয়ালা গ্রামে। এই ঘটনায় 45 জন গ্রেফতার হয়, তাদের মধ্যে 25 জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। 32 বছর ধরে চলা এই বিচার আমাদের বিস্মিত করে কেবল তাই নয়, এই মামলার রায় কি হবে তাও আমাদের একরকম বলে দেয়।
রাজস্থান জয়পুরের বিশেষ আদালতের বিশেষ বিচারক অক্ষি কানসাল জামিনে মুক্ত থাকা অপরাধী মহেন্দ্র সিং, উদয় সিং, শ্রাবন সিং, জিতেন্দ্র সিং, লক্ষন সিং, ভাওয়ার সিং, নিহাল সিং-কে খালাস দেন। বিচারকের অভিমত, সরকারপক্ষ ‘এদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমান দাখিল করতে পারেনি। তাই বেনিফিট অফ ডাউটে তাদের মুক্তি দেওয়া হলো’। 37 বছর ধরে প্রলম্বীত এই মামলা বলে দেয়, ‘গৌরব জনক’ সতী সংস্কৃতির মূল আদৰ্শ ব্রাহ্মণ্যবাদ। যেখানে নারীর অধিকার, তার স্বাধীনতা এসব ভারত রাষ্ট্রের কাছে কেবল গৌণ নয়, অবান্তর প্রশ্ন।
1947 ক্ষমতা হস্তান্তর পরবর্তী ভারত রাষ্ট্র ও আজকের ভারত রাষ্ট্র হিন্দুত্ববাদী ভাবাবেগের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি। আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনার জগতকে তালা বন্ধ করে রাখি। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বলবো, ‘দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি / সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি’।
আমরা যদি গান্ধী নেতৃতাধিন ভারতীয় মুক্তি আন্দোলনের ধারা খোঁজবার চেষ্টা করি, তাহলে দেখবো, ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গড়ে ওঠা কংগ্রেস শ্রেণি সমন্বয়ের আদর্শের মধ্যে লুক্কায়িত ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারণাকে পরিত্যাগ করতে পারেনি ( ইচ্ছেকৃত ভাবেই ইতিহাস কথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ ধারাকে বাদ দিচ্ছি )। ওদিকে আমরা যদি ভারতের কমুনিস্ট আন্দোলনের কথা বলি, তাহলে দেখতে পাবো যে, ভারতের মুক্তি সংগ্রামে তারা কোনও সদর্থক ভূমিকা নিতে পারেনি। 1938 সাল থেকে 1948 সাল পর্যন্ত চলা তেলেঙ্গানা আন্দোলনে ভারতের কমুনিস্ট পার্টি প্রকারান্তরে বিস্বাসঘাতকতা করেছিল। 1948 সালে জওহরলাল নেহেরু ও বল্লভভাই প্যাটেল পরিচালিত, ভারত সরকারের 26 হাজার সেনা হায়দ্রাবাদ আক্রমণ করেছিল। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল 25 টি গ্রাম, সেনাবাহিনীর হাতে ধর্ষিতা হয়েছিলেন পাঁচ হাজার কৃষক রমণী।
আবার 50-এর দশকের তেভাগা আন্দোলন যা প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে উঠলেও, যা পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত প্রতিরোধ সংগ্রামে। এখানেও কমুনিস্ট পার্টির সুবিধেবাদী ঝোঁক, কৃষক সমাজের সঙ্গে চরম বিস্বাসঘাতকতা করেছিল। এই সময়কালেই ভারতের কমুনিস্ট পার্টির মধ্যে সংশোধনবাদের জন্ম। কেরলে 1959 সালে প্রথম অকংগ্রেসী বাম সরকার ( যদিও তা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল ) গঠনের মধ্যে দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসন ক্ষমতার অংশিদার হওয়ার সুখ। স্টালিনের মৃত্যু এবং ক্রুশ্চেভের উত্থান। 1956 তে সোভিয়েত কমুনিস্ট পার্টির বিংশতি-তম কংগ্রেসে স্তালিনকে ‘স্বৈরাচারী একনায়ক’ হিসেবে চিহ্নিতকরণ এবং নতুন তত্ত্ব আমদানি করা হলো, ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা’। এই প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্বের পিঠে সওয়ার হয়েই, মার্কসিও দর্শনের মূল বিষয়টিকে গুলিয়ে দেওয়া হলো।, 1964-এ আবার ভাঙন এবং সিপিআইএম দলের প্রতিষ্ঠা এবং নবগঠিত পার্টির বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ক্ষমতার মধু খাওয়া এবং প্রতিক্রিয়াশীল শাসনযন্ত্রের শরিক হয়ে যাওয়া। ওই বছরই নকশালবাড়িতে দুজন শিশু সহ নয় জন কৃষক রমণীকে খুন করতে সিপিএম এতোটুকুও দ্বিধা হয়নি।
1977-এ ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্ট সরকার নারী ধর্ষণ ও নারী হত্যায় পিছিয়ে ছিলো না। যখন কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিক্রিয়াশীল শাসনজন্ত্রের মধ্যে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়ে, সেও তখন পিতৃতন্ত্রের সামন্তবাদী ভাবধারায় নিজেকে জড়িয়ে নেয়।
পিতৃতন্ত্র মেয়েদের চরিত্রের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবত করলেও, পুরুষের ক্ষেত্রে কোনও চারিত্রিক নিয়ম রাখেনি। মনে পড়ছে 1990-এর 30 টিকাকরণ কর্মসূচি সেরে ফেরবার পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অতিরিক্ত জেলা গণমাধ্যম বিভাগের উপ আধিকারিক অনিতা দেওয়ানকে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের কাছে বানতলায় স্থানীয় একটি ক্লাবের কাছে, ধানক্ষেতে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। অনিতাদের দলে ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রকের আধিকারিক উমা ঘোষ, ইউনিসেফ এর দিল্লি দিল্লি কার্যালয়ের প্রতিনিধি রেনু ঘোষ। সিপিএম ক্যাডারদের 10/12 জনের একটি দল তাঁদের গণধর্ষণ করে। এদের মধ্যে অনিতা দেওয়ান মারা জান তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু একে “স্বাভাবিক ঘটনা” বলার পাশাপাশি তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী প্রশান্ত সুর ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে বলেছিলেন, “ওই আধারিকদের শিশু পাচারকারি মনে করে আক্রমণ করেছিল”।
সিঙ্গুরে তাপসী মালিক ধর্ষণ ও খুন? জঙ্গলমহল আন্দোলনে কত নারী, পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা ও খুন তারও হিসেব নেই। আর আজ তো ঘোষিত ভাবেই ভারত রাষ্ট্র হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃনমুলি স্বৈরতন্ত্রও ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিবাদের হাত ধরে এগোচ্ছে। আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মহিলা, এই ভেবে কেউ কেউ আত্মশ্লাঘা বোধ করেন। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পিতৃন্ত্রিকতার রক্ষক। আর সেই কারণেই “অতো রাতে মেয়েটি ওখানে কি করছিলো”। রাষ্ট্র ব্যবস্থাই তার অনুগত বাহিনীদের অবাধ ধর্ষণে শিলমোহর দেয়, পার্টিতন্ত্র, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, বিচার বিভাগ একযোগে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে। রাষ্ট্র আমাদের আরও কঠোর আইনের আশ্বাস শুনিয়ে আশ্বস্ত করে, যেন কঠোর আইন হলেই আর ধর্ষণ হবে না। কখোনো, “মেয়েটির চরিত্রের দোষ ছিলো”, “শরীর থাকলে যেমন জ্বর-জ্বালা হয়, তেমনি একটু-আধটু ধর্ষণও হয়”, আবার ধর্ষণ হয়ে যায় “ছোট্ট ঘটনা”, অথবা “দুস্টু ছেলেদের কাজ” এরকম আরও অনেক কথাই আছে। এই কথাগুলো আমরা কার মুখে শুনি? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে, যিনি মহিলা! সাম্প্রতিক আরজিকর ঘটনা এবং তার আগে ও পরে অনেক অনেক ধর্ষণকান্ড আমাদের রাজ্যে ঘটছে।
প্রশ্ন, ভারতের সংবিধান কি সত্যি সত্যিই কি হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী ঝোঁককে এড়াতে পেরেছিলো? যে হিন্দুত্বের ওপর দাঁড়িয়ে ফ্যাসিস্ট ভারত রাষ্ট্র গঠনের একটি প্রকৃয়া শুরু হয়েছে এবং যার সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম। বহু সংগ্রামে অর্জিত সাধারণ মানুষের অধিকারগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। মনুবাদে উচ্চবর্ণের সেবা বা দাসত্ব করাই শুদ্রদের ধৰ্ম, নারী শুদ্রদের অধম। ব্রাহ্মণ ও শুদ্র নারীর মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। পতি সেবা ও পতির আদেশ পালনই নারীর একমাত্র কর্ম। এই মনুবাদ আমাদের মনের গভীরে পারিবারিক ভাবেই প্রথিত হয়ে যায়। শিশু কন্যার বেড়ে ওঠবার সময়ই তার মনে পারিবারিক ভাবেই গেঁথে দেওয়া হয়, ‘এটা করো না’, ওটা করো না’-র স্তবমালা। এই ভাবেই শিশু কন্যার বেড়ে সময়েই তার মনে ধৰ্ম ও পিতৃতন্ত্র বাসা বাঁধে। এইভাবে কখন যেন, সে নিজের অজান্তেই নারী বিদ্বেষী ও পিতৃতন্ত্রের নারী প্রতিনিধি হয়ে যায় । ফ্যাসিবাদ তো বটেই, সংসদিও বামরাও এই ভাবনায় অবস্থান করে। নারীর ভূমিকা হ্রাস করতে তাকে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হয়। পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় মহিলা শ্রমিকেরা কম মজুরি পান।
আদিবাসী সমাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঘনিষ্ট থাকার সুবাদে জানতে পেরেছি আদিবাসী সমাজ সাধারণ ভাবে পিতৃতান্ত্রিক হলেও (অবশ্য কোনও কোনও আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো মাতৃতান্ত্রিক) নারীকে পিতৃতান্ত্রিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দি জীবন কাটাতে হয় না। একইসঙ্গে এটাও বলার এই সমাজে বাল্য বিবাহ, সতীদাহ, পনপ্রথা ইত্যাদি কোনোদিনই ছিলো না। এই সমাজে নারী তার পুরুষ সঙ্গী নিজেই নির্বাচন করতে পারে, এমন কি তার স্বাধীন মতামতও সে রাখতে পারে। এর দুটো কারণ আছে, এক, আদিবাসী নারী পুরুষের পাশাপাশি শ্রমে অংশ নেয়, দুই, তাঁদের জীবনচর্চাগত অভ্যেস। ফলে পিতৃতান্ত্রিক শোষণের উর্ধে নিজস্ব অস্তিত্বর পাশাপাশি লিঙ্গ সাম্য এই সমাজে যথেষ্টই উপস্থিত।
নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি আজকের সমাজে যে ‘নারীবাদ’ সামনে এনেছে তা মূলত মৌলবাদ আধারিত ফ্যাসিস্ট কার্যক্রমের একটি চক্রান্ত বই অন্য কিছু নয়। কোথাও খ্রিস্টান, কোথাও ইসলাম, আবার আমাদের দেশে তা ব্রাহ্মণ্যবাদ। ধর্মীয় প্রকল্পের অন্তর্গত এই ‘নারীবাদে’ নারী কেবল পণ্যমাত্র। পুঁজিই নারী অধিকারের নির্ণায়ক, নারী শরীরকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনই ‘নারী স্বাধীনতা’, এভাবেই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে ব্যাপারটা।
নারী-পুরুষ দ্বন্দ্বকে প্রধান দেখিয়ে গড়ে ওঠা নারীবাদ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিনির্মাণ ঘটাতে পারবে না। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন –’বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। সত্তরের দশক মুক্তির দশক হয়ে উঠতে পারেনি ঠিকই, আবার জঙ্গলমহল আন্দোলনে আমরা দেখেছি নারীর বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম। সত্তরের নয় কিষানীর শহীদের মৃত্যুবরণ সমগ্র দেশকে উদ্বুদ্ধ করেছিল মানব মুক্তির সংগ্রামে। আমরা দেখেছি পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও রাষ্ট্রীয় রাইফেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আধেক আকাশ হয়ে উঠেছিলেন। লালগড় বা জঙ্গলমহল আন্দোলন সমাজ বদলের বিপ্লবী গৃহযুদ্ধ ছিলো না ঠিকই। যার সূচনা নারীর পূর্ণ সামাজিক অধিকার ও ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে। এঁরা বেশিরভাগই ছিলেন, আদিবাসী, দলিত বা তথাকথিত নিম্নবর্ণ সম্প্রদায়ের নারী। তাঁরা কিন্তু দেখেয়েছিলেন পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালাতে হয়। কিভাবে নারীকে নিয়ে গড়ে তোলা মিথ নামক মিথ্যেকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিতে হয়। এঁরা প্রায় সকলেই উঠে এসেছিলেন দরিদ্র, প্রান্তিক শ্রেণি থেকে, যাঁদের জীবিকা বলতে ছিলো, বাবুই ঘাস থেকে দড়ি বানানো, জঙ্গল থেকে সালপাতা, মাশরুম, ধুনো, কেন্দু পাতা ইত্যাদি বনজ সম্পদ সংগ্রহ, হাস, মুরগি, গরু, ছাগল পালন ইত্যাদি।
বহুজাতিক লগ্নি পুঁজি, দেশীয় বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলো আপনাকে ত্রিকিল ডাউন অর্থনীতির গল্পগাছা শোনাবে। বিশ্বায়ন বা নিউ লিবারেল অর্থনীতির প্রবক্তারাও অনেক গল্প শোনাবে। শ্রমিক, কৃষকদের সংগ্রামী ঐক্য ও সামাজিক রূপান্তরের মধ্যেই প্রকৃত নারী মুক্তি সম্ভব।
জাতীয়তাবাদী উগ্রপন্থাকে দেশপ্রেমের ক্যাপসুলে ভোরে বিভাজনের শেকড় ছড়ানো হচ্ছে, আমরা কেউ কেউ যুধিষ্টীরের সঙ্গে সেই ধর্মের ছদ্দবেশি কুকুরকে অনুসরণ যাত্রায় ব্যস্ত। পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রই নারীকে বেশ্যা বানায় এবং তাকে ভোগ ও ঘৃণা করতে শেখায়। আবার এই রাষ্ট্রই ‘নারীর ক্ষমতায়ন’-এর গল্পগাছা শুনিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করে। মেয়েদের পিতৃতন্ত্রের অধীনে রাখার বুর্জোয়া কৌশল হলো ‘নারীবাদ’। এতে তার মুক্তি নেই।
সর্বোচ্চ ন্যায়লয়ের নির্দেশ, ‘ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। সেই ‘চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রই… “অতো রাতে মেয়েটি ওখানে কি করছিলো”? নিশ্চুপ বিচার বিভাগ! মাহিসি আমিনীর হত্যা, হাথরস বা কামদুনির নিহত মেয়েরা… ভারত অথবা ইরান মূলগত পার্থক্য কোথায়?
——–
তথ্যসূত্র :
1.ইতিহাসের আলোকে বৈদিক সাহিত্য, সুকুমারী ভট্টাচার্য।
2.bn. wikipedia. org.>wiki পারসি
3.আত্মচরীত, রাজনারায়ণ বসু
4.ভারতে ফ্যাসিবাদের ‘গুরুজী’, গৌতম চৌধুরী
5.নির্ভয়া থেকে তিলোত্তমা: মুক্তি কোন পথে, বহ্নিহোত্রী হাজরা

