বহ্নিহোত্রী হাজরা
৫২ সালের ভাষার লড়াইয়ে রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বাররা প্রাণ দিয়েছিল আমরা অনেকেই জানি। উপমহাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লেখা এমনই সব রক্তস্নানের ইতিবৃত্ত। তাই ব্রিটিশ আর তার দালাল ব্যবসাদার আর রাজনীতিবিদরা চক্রান্ত করে যতই বাঙালির বুক চিরে কাঁটাতার তুলে দিক না কেন, ওপার থেকে এই রক্তের ডাক বাঙ্গালীর মননে আজও ঝড় তোলে। তবে বাংলা ভাগের পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে দিল্লির আধিপত্যের ফলে এবং হিন্দি-ইংরাজির কাছে বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির বশ্যতা স্বীকারের ফলে ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে, স্বাধিকারের এবং জাতিসত্তার বিকাশের প্রশ্নে এপারে বাঙালি বেশ পিছিয়ে পড়েছে। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি রুটিন মাফিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং সংস্কৃতি চর্চা হয় বটে তবে তার প্রভাব বোধহয় ২৪ ঘণ্টাও থাকে না। বিশেষত বাবু বাঙালি ফুল-মালায় সুসজ্জিত হয়ে দেখা যায় ওইদিন ঘটা করে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চায় মেতেছে। কিন্তু রাত ভোর হতে না হতেই বাড়ি ফিরে ছেলে-মেয়েকে ইংরাজিতে চোস্ত বানানোর কর্মশালায় আবার মেতে ওঠে তারাই। সেই সঙ্গে বাচ্চাদের স্কুল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, এলিটদের যাতায়াতের শপিং মল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে সব জায়গায় হিন্দির দাপট। তাই অনেকেই বলছেন সর্বতোমুখী ভাঙ্গনের টানে আমরা তলিয়ে যাচ্ছি সর্বনাশের চোরাবালিতে। সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, চাকরি-বাকরি কোথাও এগোতে পারছি না আমরা। পশ্চিমী ও বলিউডের চটকদার অবক্ষয়ী সংস্কৃতি আমাদের চেতনা থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালনের বাউল আর ভাটিয়ালি সুর। সে আজ শুধু টিকে আছে মুখের কথায়, সাহিত্যে ও সংবাদপত্রে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, উচ্চশিক্ষায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে, সরকারি দপ্তরে সেই অর্থে বাংলা ভাষার কোনো স্থান নেই। বাঙালির জাতীয় জীবনে প্রাত্যহিক প্রয়োজনে, সরকারি কাজে মাতৃভাষার গুরুত্ব নেই বললেই চলে। বরং ওপরমহলের বাবুরা দিবা-রাত্র মাথায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে ইংরেজি জানা বা না জানার উপর নির্ভর করছে সমাজে সাফল্যের সিঁড়ি। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে বাঙালি জাতীয় জীবনে এক অশুভ স্তর-বিভাজন। গড়ে উঠেছে মাতৃভাষার প্রতি সচেতনভাবে উন্নাসিক শূন্যচারী এক মধ্যবিত্ত সমাজ। আর অন্যদিকে পড়ে আছে ইংরেজি না জানা হীনমন্যতায় ভোগা সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মানুষ। আর বাবুরা এবং রাজনীতিকদের বৃহদাংশ তথাকথিত ভারতীয় হয়ে ওঠার ছেদো যুক্তি দেখিয়ে এই আগ্রাসনকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন। তাঁরা ভুলে যান যে ভারতবর্ষ একটি বহুজাতিক দেশ। আর প্রতিটি জাতির আছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। জাতিগুলির সার্বিক বিকাশের মধ্য দিয়েই যেমন ভারতবর্ষের সুষম বিকাশ সম্ভব, তেমন জাতিগুলির সার্বিক বিকাশের প্রশ্নে আবশ্যিক কর্তব্য তাদের মাতৃভাষার বিকাশ ও সর্বক্ষেত্রে তাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। এ কথা প্রযোজ্য শুধু বাংলার ক্ষেত্রেই না বাংলায় বসবাসকারী যে গোর্খা, লেপচা, সাঁওতাল, মুন্ডা, কুর্মী সহ বিভিন্ন ভাষা ভাষীর মানুষ আছেন তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে। প্রতিটা ভাষাভিত্তিক জাতির মাতৃভাষায় লেখাপড়া থেকে কাজকর্ম করার অধিকার রয়েছে। জাতি গঠন হয় মূলত ভাষার ভিত্তিতে। বহুজাতীয়তার দেশ ভারতে প্রতিটি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকাটাই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু বাস্তবে “হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান”প্রকল্পের বুলডোজারে এ সব যেন ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একচেটিয়া আগ্রাসন আর আধিপত্য চলছে বুলেট গতিতে। তাই বাংলা, অসমিয়া থেকে শুরু করে রাজস্থানী, মৈথিলী, ভোজপুরি প্রভৃতি ভাষার মানুষদের উপর অগণতান্ত্রিকভাবে তথাকথিত ‘রাজভাষা’ হিসাবে হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী কোনও রাষ্ট্র ভাষা নেই। হিন্দি বা ইংরাজি দাপ্তরিক ভাষা। তা সত্ত্বেও বিগত বছরে ‘হিন্দি দিবস’ উদযাপন উপলক্ষ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তো মন্তব্য করেই বসেছিলেন- “ভারতের একটি জাতীয় ভাষা থাকা প্রয়োজন।” সেই নিয়ে বিস্তর বিতর্ক ওঠে। জোরালো প্রতিবাদ আসে তামিলনাড়ু সহ দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে। গত বছর আইপিসি—সিআরপিসি-কে ন্যায় সংহিতা, দন্ড সংহিতা নামকরণ করার প্রেক্ষিতেও জোরালো প্রতিবাদ আসে তামিলনাড়ু থেকে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় হিন্দির এই আগ্রাসন তারা মানবে না। এদিকে নতুন শিক্ষা নীতি আবার এই বিতর্কে ঘি ঢেলেছে। এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার গৈরিকীকরণ তো ভয়ানক প্রকট যা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত সেই সঙ্গে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হিন্দিকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এর বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে দক্ষিণ সহ বিভিন্ন রাজ্যে, এমনকি বাংলাতেও। এই ষড়যন্ত্র ও হামলার বিরুদ্ধে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আমাদের একুশের ডাক থেকে শিক্ষা নিতে হবে। একুশের ভাষা আন্দোলন নিপীড়িত জাতিগুলির কাছে এক মহান আলোকবর্তিকা। দাবী তুলতে হবে যে পড়াশোনা-চাকরি-বাকরি- পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে শুরু করে জীবনের সকলক্ষেত্রে মাতৃভাষায় কাজকর্ম করতে দিতে হবে, অন্য ভাষার বাধ্যবাধকতা চলবে না। পশ্চিমবাংলায় বিগত কয়েক বছর যাবৎ এই প্রশ্নে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ-এর মতো পশ্চিমবাংলাতেও সব কাজে বাংলা চাই — এই ধরনের বক্তব্য এই বিষয়ক আলাপ-আলোচনায় উঠে আসছে। এইসব কর্মোদ্যাগকে একসূত্রে গেঁথে সাড়া জাগানোর দিকে এগোতে হবে আমাদের। এই ধরনের আন্দোলনের তাৎপর্য, সমস্যা এবং সম্ভাবনার দিকগুলো ইত্যাদি নিয়ে চর্চা করা প্রয়োজন যদি আন্দোলনকে একটা নির্দিষ্ট গতি এবং দিশা দিতে হয়।
প্রথমত বলি হিন্দির এই সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের স্বীকার কিন্তু মূলত বাংলার শ্রমজীবি মানুষ। বাংলার মুর্শিদাবাদ-মালদা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ অন্যান্য প্রদেশে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ হয়ে চলে যান। তাঁরা নিজেদের ভাষাতে কথা বলতেও ভয় পান সেখানে। কারণ চারিদিকে সন্দেহের বাতাবরণ। কিরকম? একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। ‘সি এ এ সমর্থনে একটি সভায় কৈলাশ বিজয়বর্গী বলছিলেন- “আমাদের বাড়িতে একটি নতুন ঘর হচ্ছে। তাই মিস্ত্রিরা কাজ করতে এসেছিলেন। ওদের মধ্যে ছ’সাত জন পোহা খাচ্ছিলেন। ওঁদের পোহা খাওয়ার দেখে আমার সন্দেহ হচ্ছিল ওঁরা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। গত দেড় বছর ধরেই বাংলাদেশী জঙ্গীদের চোখে চোখে রাখি।” হ্যাঁ, এভাবে সন্দেহের চোখেই আপামর বাঙালীকে দেখে হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্থানের ঠিকেদারেরা আর আমাদের বাঙালী ভাইবোনেরা যখন দূর দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ বা অন্যান্য ঠিকা কাজে যায় তাদের হেনস্থা হতে হয়, রক্তচক্ষু দেখানো হয় স্রেফ সন্দেহের বশে। মুসলমান বা অমুসলমান যে ধর্মেরই নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষ হোন, বাঙালি হলেই দিবারাত্র তাঁদের কাঁটাতারের ভূত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যখন তখন তাঁদের মারধোর করা হচ্ছে, ভেঙে দেওয়া হচ্ছে ঘরবাড়ি, আটক করা হচ্ছে। এই মাস দুয়েক আগে উড়িষ্যার ভদ্রকে নাগরিকত্বের পরিচয় দেখার নামে মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জের পরিযায়ী শ্রমিকদের নির্মম ভাবে পেটানো হল। সম্প্রতি মালদার এক পরিযায়ী শ্রমিকও খুন হয়েছেন মধ্যপ্রদেশে। আমাদের ক্যানিং-এর বাসন্তীর ছেলে সাবির মল্লিককে কিছুদিন আগে গো মাংস খাবার সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হল হরিয়ানায়। আন্দামানে বসবাসকারী উদ্বাস্তু নিম্নবর্গের বাঙ্গালীদের অবস্থা আরো শোচনীয়। সর্ব শেষ গণনায় সেখানে হিন্দি জানা বাঙ্গালীদের হিন্দিভাষী হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ৬৩ শতাংশ বাঙালি কমে দাঁড়ায় ২৬ এ। রাতারাতি বাংলা মাধ্যম স্কুল গুলোর হিন্দিকরণ করে দিচ্ছে আর এস এস। এভাবেই চলছে অত্যাচার, বুলডোজার রাজ, আর কোনঠাসা হচ্ছে বাঙালি। তবে বাংলা ভাষার জন্য যারা গেল গেল রব তোলেন আর এসি হলে এক দিনের সংস্কৃতি চর্চা করেন তাঁরা ভুলে যান প্রায় ২৭ কোটি বাঙ্গালীর মধ্যে ১৭ কোটি বাঙালি রয়েছেন কাঁটাতারের ওপারে এবং সেখানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, অফিস কাছারি থেকে দোকানের হোর্ডিং, প্রতিটা অঞ্চলের ভাষার সাহিত্য এবং ইতিহাস চর্চায়- ব্যবহারিক সমস্ত ক্ষেত্র থেকে বাংলাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি বাঙালি। কথায় কথায় “এ পাড়ায় বাঙালি থাকে না মুসলমান থাকে” বলেন যারা তাদের বোধহয় বাঙালি জাতিসত্তার ক খ গ ঘ নতুন করে জানতে-পড়তে হবে। এ প্রসঙ্গেই বলি সালাম-বরকতদের সেই রক্তের ডাক কিন্তু বাবু বাঙালির প্রমিত বাংলা বাঁচানোর প্রকল্প নয়। বরং প্রতিটা অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা যে বাংলা তার বিকাশ, প্রয়োগ এবং চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ভাষা আন্দোলনের জরুরি কর্তব্য। বিশ থেকে চল্লিশের দশকে এই নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয় অভিভক্ত বাংলায়। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো বর্ণ হিন্দু বাবুদের প্রতিষ্ঠান দাঁড়িপাল্লা নিয়ে বসে থাকে ভাষাকে মানদন্ডে বেঁধে দিতে। তার পাল্টা হিসেবে গড়ে ওঠে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি। একের পর এক বাংলা শব্দকে তৎসম অর্থাৎ সংকৃত শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার কাজ চলতে থাকে যদিও তার অনেক আগে থেকেই। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের বাংলা ভাষার জন্ম কিন্তু চর্যাপদের ভাষা থেকে। সে ভাষায় ছিল না সংস্কৃত শব্দ। তার পর অনেক প্রক্রিয়া, পৃষ্ঠপোষকতা এবং মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে গড়ে উঠেছে বাংলা ভাষা। অথচ কোনও এক মানদন্ড নিয়ে বসে আছেন যারা তাঁরা আরবি-ফারসি শব্দকে বিদেশী বলে সংস্কৃত শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করে চলেন। অথচ আরবি-ফারসি শব্দ সাহিত্যে ব্যবহার হচ্ছে সেই ভারতচন্দ্রের সময়তেও। এই দড়ি টানাটানির মাঝে নজরুলের আগমণ কার্যতই ধুমকেতুর মতো। বাংলার সংশ্লেষের সংস্কৃতি যেভাবে তিনি লালন পালন করেছেন তা অভূতপূর্ব। কালির রুদ্রমূর্তি থেকে কামাল পাশা- গঙ্গা তট থেকে আরবের মরুপ্রান্তর পর্যন্ত ভেসে বেড়াত তার সুর। সেই নজরুলের কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ নিয়ে কম বাগবিতন্ডা হয়নি সে যুগে। এমনকি রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যখন রক্ত অর্থে “খুন” শব্দের প্রয়োগ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান তখন নজরুল অভিমানের সুরেই একটি প্রবন্ধে এই ব্যবহারের ব্যাখ্যা দেন- লেখাটির শিরোনাম ছিল “বড়োর পিরিতি বালির বাঁধ”। এই শিরোনামই অনেক কিছু স্পষ্ট করে দেয়। নতুন করে হয়ত আমার আর কিছু বলতে লাগবে না। অবাক লাগে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপদ নিয়ে, জাতীয়তাকে ‘নিচুতলা’ থেকে গড়ে তোলার প্রশ্ন নিয়ে অত সুন্দর বিশ্লেষণ করেন তাঁর জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রবন্ধে তিনিই আবার ভাষার প্রশ্নে কি ভয়ানক আধিপত্যবাদী মানসিকতা পোষণ করছেন। তিনি বলছেন- “Calcutta is the capital of Bengal. The capital city is always like the stomach as the central organ of the body…If it were Dhaka would have had the advantage of ruling us with their own form of language…” এই কেন্দ্রের ধারণা, আধিপত্যের সুর বার বার শোনা গেছে তাঁর কাছ থেকে ভাষা সংক্রান্ত এই বিতর্কে। এত কথা বলার কারণ একটাই ভাষা বা সংকৃতির ক্ষেত্রে এই মানদন্ডের ধারনা, স্ট্যান্ডার্ডের ধারণা একটি আদ্যন্ত ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রকল্প। ভাষা সর্বদাই বহমান- মানুষের মুখে মুখেই তার বিকাশ হয়। মানুষে-মানুষে থাকবন্দির ধারণা, শ্রমশোষণের ধারণার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবেই যুক্ত এই উঁচু-নীচু, শুদ্ধ-অশুদ্ধ বিভাজন রেখা। তাই এই ধরণের থাকবন্দীর (হায়ারার্কির) বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদের ভাষা আন্দোলনকে। ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাই পারে এই হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্থানের ঠিকেদারদের রুখে দিতে। কিন্তু তার জন্য সমস্ত নিপীড়িত জাতিসত্তাকে একে ওপরের ওপর আধিপত্যের বোধকে প্রতিহত করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে দিল্লির কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে। মনে রাখতে হবে দিল্লির মসনদের বাবুরা, মারোয়াড়ী ব্যবসায়ী- ব্রিটিশ সাহেব আর দালাল শ্যামাপ্রসাদরা যতই আমাদের দুটুকরো করে, ক্ষতবিক্ষত করে কাঁটাতার তুলে দিক বুকের ওপর দিয়ে আমাদের মনকে টুকরো টুকরো করে দেওয়া অত সহজ না। বাঙলাকে আঁকড়ে ধরে যে আত্মা গড়ে উঠেছে তার হাজার হাজার বছরের ইতিহাস আছে।

